রাহাত্তারপুলে লিটনের রমরমা গ্যাসের অবৈধ ক্রস ফিলিং ব্যবসা! প্রশাসন নীরব
২৪ ঘন্টা ডট নিউজ। বিশেষ প্রতিবেদন : চট্টগ্রাম মহানগর ও আশপাশের উপজেলায় চলছে অবৈধভাবে ক্রস ফিলিং করা এলপি গ্যাসের রমরমা ব্যবসা। নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে চট্টগ্রামে কয়েকটি চক্র এসব কাজ নির্বিঘ্নে চালিয়ে যাচ্ছে।
রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে ম্যানেজ করে দীর্ঘদিন ধরে সংঘবদ্ধভাবে গ্যাসের সিলিন্ডারে ক্রস ফিলিং করে অবৈধভাবে এলপি গ্যাস বাজারজাত করে গ্রাহক ঠকাচ্ছে। একই সঙ্গে যেকোনো মুহূর্তে বিস্ফোরণের ঝুঁকিতেও থাকছে গ্রাহকরা। তবে এসব কাজের সঙ্গে জড়িতরা প্রভাবশালী হওয়ায় কেউ মুখ খোলার সাহস পায় না।
অনুসন্ধানে গ্যাসের অবৈধ ক্রস ফিলিং ব্যবসায়ী ও বেশ কিছু চক্রের সন্ধান পাওয়া গেছে। চট্টগ্রাম নগরীর রাহাত্তারপুল, বায়েজিদ, কদমতলী, হালিশহর, কাঠগড়, মাদারবাড়ী, মোগলটুলী, পানাপাড়া (কামাল গেট) এলাকায় বেশ কয়েকটি দোকান ও কারখানায় এলপি গ্যাসের ভরা সিলিন্ডার থেকে খালি সিলিন্ডারে কনভার্টার ব্যবহার করে ক্রস ফিলিং করা হয়।
এর মধ্যে নগরীর বাকলিয়া থানা রাহাত্তার পুল ওয়েডিং পার্ক সংলগ্ন এলাকায় মোক্তার হোসেন লিটন নামে এক ব্যাক্তি দাপুটের সাথে গ্যাসের অবৈধ ক্রস ফিলিং ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে বলে এলাকাবাসীর কাছ থেকে অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয়রা জানিয়েছে প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের প্রভাব খাটিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নাজিম উদ্দিন শাহ এন্টারপ্রাইজ এন্ড মুক্তা ট্রেডিংয়ের আড়ালে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় গ্যাস ফিলিংয়ের এ ব্যবসা পরিচালিত হচ্ছে।
কোন নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে ঝুঁকিপূর্ণভাবে পরিচালিত এ কারখানায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কোন বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি ছাড়াই অনেকটা ঝুঁকি নিয়ে শ্রমিকরা এক সিলিন্ডার থেকে গ্যাস প্রবেশ করান অন্য সিলিন্ডারে। অধিক মুনাফার লোভে সিলিন্ডার বিস্ফোরণে যে কোন সময় বড় ধরণের যে প্রাণহানির ঘটনা ঘটবে সেদিকে কারো হুশ নেই।
বিশেষভাবে তৈরি কনভার্টার ব্যবহার করে শ্রমিকরা দুটি ভর্তি সিলিন্ডার থেকে খালি একটি সিলিন্ডারে গ্যাস ভরে থাকে। এলপি গ্যাসের ৪৫ ও ৩৩ কেজি ওজনের সিলিন্ডার থেকে পাইপ দিয়ে সাড়ে ১২ কেজির সিলিন্ডার ফিলিং করেন। পুরোপুরি ১২ কেজি না দিয়ে ৮-৯ কেজি গ্যাস দেওয়া হয়। এতে প্রতি সিলিন্ডারে প্রায় ৩০০ টাকা হাতিয়ে নেয় চক্রটি। এতে গ্রাহকরা যেমন প্রতারিত হচ্ছে ঠিক তেমনিভাবে সরকারও বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
তাছাড়া এ ফিলিং প্রক্রিয়া যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, তেমন গ্যাসের ব্যবহারও চরম ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ, এ কাজটি অটোমেটিক মেশিন দিয়ে চাপ পরীক্ষা করে বাল্ব ও সেফটি ক্যাপ স্থাপন করার কথা থাকলেও লিটনের কারখানায় ম্যানুয়ালি বসাচ্ছে বাল্ব।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কারখানার এক শ্রমিক জানায়, এ ক্রস ফিলিং গ্যাস সিলিন্ডার চট্টগ্রাম মহানগরসহ জেলা উপজেলার সর্বত্র বিক্রি হয়। প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি থেকে গ্যাস ভর্তি সিলিন্ডার ক্রয় করে তা এক সিলিন্ডার থেকে গ্যাস সরবরাহ করে অন্য সিলিন্ডারে। সিলিন্ডারের গায়ে লাগানো হয়, ওমেরা গ্যাস, বসুন্ধরা, বিএম গ্যাস নাভানা গ্যাসসহ বিভিন্ন কোম্পানির স্টিকার। বাসাবাড়িসহ ঘনবসতি এলাকা হওয়ায় তার এই অবৈধ গ্যাস ফিলিং কারখানাকে ঘিরে এলাকাজুড়ে আতঙ্ক বিরাজ করছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের সঙ্গে সখ্য রেখেই চলছে এ ভয়ঙ্কর কারবার। প্রশাসন তাদের আয়ের নতুন খাত হিসেবে নিয়েছে বিষয়টিকে। সে কারণে দেখেও না দেখার ভান করছে। তা না হলে প্রকাশ্যে এ ভয়ঙ্কর কাজ হয় কী করে? এতে একদিকে যেমন গ্রাহকরা প্রতারিত হচ্ছেন, অন্যদিকে শারীরিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ব্যবহারকারীরা।
এখনই কঠোরভাবে দমন করা না গেলে মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়তে পারে চক্রটি। এজন্য কঠোর আইন ও প্রশাসনের নজরদারি প্রয়োজন বলে মনে করেন এলপি গ্যাস কোম্পানির সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে অবৈধ গ্যাস ফিলিং ব্যবসায় জড়িত অভিযুক্ত মোক্তার হোসেন লিটনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি উল্টো উদ্ধ্যতপূর্ণ আচরণের সহিত ২৪ ঘন্টা ডট নিউজকে বলেন, আমরা ব্যবসা সম্পর্কে প্রশাসন থেকে সংশ্লিষ্ট সকলেই অবগত আছেন। সকলকে ম্যানেজ করে দীর্ঘদিন ধরে এ ব্যবসা পরিচালনা করে আসছি। আপনারা ভূয়া সাংবাদিকরা যা ইচ্ছে লিখতে পারেন। এতে আমার কিচ্ছু যায় আসেনা। এ ব্যাপারে কথা বলার মতো সময় আমার নেই।
বিষয়টি নিয়ে বাকলিয়া থানার ওসি নেজাম উদ্দিনের কাছে জানতে চাইলে তিনি ২৪ ঘন্টা ডট নিউজকে বলেন, এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কেউ আমাদেরকে অভিযোগ করেনি। বিষয়টি নিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর,ফায়ার সার্ভিস ও জেলা প্রশাসন সংশ্লিষ্টরাই বলতে পারবে। তাছাড়া পরিবেশ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসন যদি পুলিশের সহযোগীতা চাই সেক্ষেত্রে আমরা সর্বাত্মক সহযোগীতা প্রদান করবো।
এ বিষয়ে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স এর বাকলিয়া এলাকার পরিদর্শক মাহবুব এলাহী ২৪ ঘন্টা ডট নিউজকে জানান, আমরা গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রির জন্য প্রতিষ্ঠানের নামে অনুমতি দেয়া হতে পারে। তবে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এ ধরনের ব্যবসা পরিচালনা করার অনুমতি প্রদানের কোন প্রশ্নই আসে না।
এসব এলাকায় ঝুঁকিপূর্ন গ্যাস সিলিন্ডার প্রক্রিয়াকরণ সম্পূর্ণ অবৈধ। এরপরও গোপনে যদি এ ধরনের ব্যবসা করে থাকে তাহলে তদন্ত করে প্রমাণ পেলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
পরিবেশ অধিদফতর চট্টগ্রাম কার্যালয়ের পরিচালক আজাদুর রহমান মল্লিকের কাছে জানতে চাইলে তিনিও একই মত প্রকাশ করেন। তিনি ২৪ ঘন্টা ডট নিউজকে বলেন, চট্টগ্রাম নগরীর বাকলিয়া থানা রাহাত্তার পুল ওয়েডিং পার্ক সংলগ্ন এলাকায় গ্যাস সিলিন্ডার প্রক্রিয়াজাত ব্যবসার জন্য কোন প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যাক্তি তাদের থেকে ছাড়পত্র নেয়নি।
তাছাড়া ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এ ধরনের ব্যবসার অনুমতি দেওয়ার প্রশ্নই আসেনা। বিষয়টি গণমাধ্যমের কাছ থেকে জানতে পেরে শীঘ্রই ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে অধিদপ্তরের এ কর্মকর্তা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিস্ফোরক অধিদপ্তরের সহকারি বিস্ফোরক পরিদর্শক মুহাম্মদ মেহেদী হাসান খান ২৪ ঘন্টা ডট নিউজকে বলেন, এ ব্যাপারে ইতিমধ্যে আমরা বেশ কিছু অভিযোগ পেয়েছি, অভিযানও পরিচালিত হয়েছে। আপনারা তথ্য ও ছবিসংযুক্ত নিউজ করেন। আমরা নিউজের সূত্র ধরে এ কাজে জড়িত থাকার প্রমাণ পেলে প্রতিষ্ঠানটি একেবারে সিলগালা করে মালিকের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেবো।
বিস্ফোরক অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নিয়েছে কিনা এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, বৈজ্ঞানিক সম্মত কাজের মান যাচাই করে দেশের বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলোকে এ ব্যাপারে ছাড়পত্র দেওয়া হয়। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ এসব ছোট প্রতিষ্ঠানকে অনুমোদন দেওয়ার প্রশ্নই আসেনা।
বি : দ্র : এলপি গ্যাসের বড় বোতল থেকে ছোট বোতলে অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণভাবে ক্রস ফিলিং ব্যবসা নিয়ে আরো অনুসন্ধানী খবর থাকছে দ্বিতীয় পর্বে।
উল্লেখ্য : ২০১৯ সালের ১০ ডিসেম্বর পটিয়ায় বাবুল মিয়া নামে একজনের গ্যাস সিলিন্ডারের দোকানে অবৈধ ‘ক্রস ফিলিং’র মাধ্যমে এলপি গ্যাস চুরির সময় সিলিন্ডার বিস্ফোরণে ৫ জন দগ্ধ হবার ঘটনা ঘটে।
তাছাড়া ২০১৫ সালে লোহাগাড়া সদরের রশিদারপাড়ায় নিজের বসতঘরে এলপি গ্যাসের সিলিন্ডার থেকে ক্রস ফিলিং (এক সিলিন্ডার থেকে অন্য সিলিন্ডারে ভরা) করতে গিয়ে চারজন দগ্ধ হয়। এদের মধ্যে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নবী হোসেন নামে এক দিনমজুরের মৃত্যু হয়। একই ঘটনায় গ্যাসের ক্রস ফিলিং ব্যবসায়ী চক্রের সদস্য আলমগীর চৌধুরীও আহত হন।
এর আগে ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে সাতকানিয়ার কেরানি হাটে গ্যাস ক্রস ফিলিং করার সময় অগ্নিদগ্ধ হয়ে আরো একজনের মৃত্যু হয়। চট্টগ্রাম শহরসহ বিভিন্ন উপজেলায় বিস্ফোরণে একাধিক ব্যক্তির আহতের খবর পাওয়া গেছে।


আপনার মতামত লিখুন