মোহাম্মদ আলী : দেশের ছয়টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগ থেকে প্রতি বছর প্রায় ১০০ থেকে ১২০ জন শিক্ষার্থী স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পাশ করছেন। নাট্যকলার শিক্ষার্থীরা একটা ঘোরের মধ্যে তাদের জীবনের মূল্যবান সময়কে ব্যয় করে যখন দেখে পেশাগত জীবন অন্ধকার তখন তাদের জীবনের রঙিন স্বপ্ন হতাশায় নিমজ্জিত হতে থাকে।

বিজ্ঞাপন

কেউ কেউ নতুনভাবে পুনরায় পরিশ্রম করে নিজেদের পেশা নির্ধারণ করছেন আবার কেউ কেউ শুরু করছেন চাকরির পড়াশোনা।সৌভাগ্যবান তারা; যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে নিতে পারছেন। কিন্তু বেশিরভাগ শিক্ষার্থীরা থাকছেন চরম হতাশার মধ্যে, পারিবারিক ও সামাজিক বঞ্চনার মধ্যে।

এর সমাধান খুঁজেছেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার ফল পারফর্মেন্স স্টাডিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. মো. কামাল উদ্দিন। ‘প্রাতিষ্ঠানিক নাট্য শিক্ষার্থীদের পেশাগত জীবন : সংকট ও সম্ভাবনা, প্রেক্ষিত বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রবন্ধে তুলে ধরা হয়েছে নাট্যকলা থেকে শিক্ষা জীবন শেষ করা শিক্ষার্থীদের কর্মক্ষেত্র ও এর জন্য করণীয়। সম্প্রতি চট্টগ্রামে বেসরকারি সংস্থা ‘উৎস’ আয়োজিত একটি সেমিনারে প্রবন্ধটি পাঠ করা হয়।

এ প্রবন্ধে বলা হয়েছে, নাট্যকলা বিভাগ থেকে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনকারীদের পেশাগত ক্ষেত্র হতে পারে চার ধরনের সেক্টরে। যথা: সরকারি ক্ষেত্র, কর্পোরেট ক্ষেত্র, প্রায়োগিক নাট্যক্ষেত্র এবং অন্যান্য ক্ষেত্র।

সরকারি ক্ষেত্রে প্রথমত নাট্যকলা বিষয়কে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম-কমিশন (বিপিএসসি)-এ জরুরীভিত্তিতে অন্তর্ভুক্ত করা আবশ্যক। বিশেষত: বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে নাট্যকলার বিষয় কোড অন্তর্ভুক্তকরণ এখন সময়ের দাবি, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে নাটক সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে (পদে) নাট্যকলার প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রিধারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরী, জেলা শিল্পকলা একডেমিতে কালচারাল অফিসার অবশ্যই পারফর্মিং আটর্সে ডিগ্রিধারীদের মধ্য থেকে নিয়োগ দেওয়া আবশ্যক।

বাংলাদেশ শিশু একাডেমি, জাতীয় যাদুঘর, বাংলাদেশ বেতার, বাংলাদেশ টেলিভিশনে বিষয় সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে (পদে) নাট্যকলা বিষয়ে ডিগ্রিধারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।

জরুরী ভিত্তিতে দেশের প্রতিটি উপজেলায় একটি করে উপজেলা শিল্পকলা একাডেমি প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন, যেখানে কালচারাল অফিসার থাকবে, থাকবে নাটকের আলাদা উইংস। আর সেখানে নিয়োগের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক নাট্যশিক্ষার্থীদেরকে গুরুত্ব দেওয়া খুবই দরকার।

এছাড়া প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে চারুকলা ও সঙ্গীতের পাশাপাশি নাট্যকলা বিষয়কে অন্তর্ভুক্তকরণের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট বিষয়ক প্রাতিষ্ঠানিক বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের কাজের সুযোগ দেওয়া একান্ত প্রয়োজন। সরকার প্রজ্ঞাপন দিয়ে প্রতিটি সরকারি, বেসরকারি (প্রতিষ্ঠান) অফিসে একজন করে কালচারাল অফিসার নিয়োগ দিতে পারে।

বাংলাদেশে কর্পোরেট সেক্টর বর্তমানে অন্যতম একটি ক্ষেত্র। বর্তমানে প্রাতিষ্ঠানিক নাট্যশিক্ষার্থীরা নাট্যবিষয়ক কর্পোরেট সেক্টর খুব সহজেই পেশা হিসেবে নিতে পারে। ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট, ফটোগ্রাফি, ভিডিওগ্রাফী, ডিজাইন (পোশাক, ফ্যাশন, রূপসজ্জা, সেট, লাইট), ইলেক্ট্রনিক্স (টেলিভিশন, বেতার, ফিল্ম) অ্যান্ড প্রিন্ট মিডিয়া প্রভৃতি। আর এর জন্য প্রয়োজন নাট্যকলার সিলেবাস/কারিকুলাম যুগোপযোগী করা।

বর্তমানে নাট্যশিক্ষার্থীদের সর্ববৃহৎ কর্মক্ষেত্র হতে পারে প্রায়োগিক নাট্যকলা। যেমন: শিক্ষায় নাটক, থিয়েটার ফর থেরাপি, উন্নয়ন নাট্য এবং অন্যান্য সমসাময়িক প্রায়োগিক নাট্য। এই সেক্টরে কর্ম করে জীবীকা নির্বাহ করলে নাট্যশিক্ষার্থীদের কারো নিকট মুখাপেক্ষী হতে হবে না।

বর্তমান সময়ে সারাবিশ্বে দিনদিন মানসিক রোগীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। তার বিপরীতে ২৫০ জন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ এবং ৬০ জন ক্লিনিক্যাল মনোবিজ্ঞানী রয়েছে। অর্থাৎ এই বিপুল সংখ্যক রোগীর এত কম সংখ্যক বিশেষজ্ঞ কখনোই পূর্ণ সেবা দিতে পারবেন না। এক্ষেত্রে নাট্যদার্শনিক জেকব লিভি মরিনো উদ্ভাবিত ‘থিয়েটার ফর থেরাপি’-টিএফটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। প্রাতিষ্ঠানিক নাট্যক্ষিার্থীরা প্রতিষ্ঠানে টিএফটি পদ্ধতি আয়ত্ব করে মনোসামাজিক চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারবেন। ফলে সৃষ্টি হবে প্রাতিষ্ঠানিক নাট্যশিক্ষার্থীদের পেশাদারী কর্মক্ষেত্র।

উন্নয়নশীল দেশে তথা বাংলাদেশে যেকোনো ইতিবাচক পরিবর্তনে উন্নয়ন নাট্য (টিএফডি- থিয়েটার ফর ডেভেলপমেন্ট)-এর ভূমিকা খুবই গুরত্বপূর্ণ। সামাজিক অবক্ষয় রোধ, দূর্ণীতি প্রশমন, চোরাকারবারী নিয়ন্ত্রণ, খাদ্যাভ্যাস তৈরি, জনসচেতনতা সৃষ্টি, স্বাস্থ্যাভ্যাস তৈরি, সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি প্রভৃতি কার্যক্রমে চলমান প্রক্রিয়া হিসেবে টিএফডি যথোপযুক্ত ভূমিকা রাখতে সক্ষম। আর এধরনের কার্যক্রম বাস্তবায়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা, রাষ্ট্রীয়সহ যেকোনো প্রতিষ্ঠান। তারা প্রকল্পের মাধ্যমে উন্নয়ন নাট্য কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে থাকে। তবে বর্তমানে দিনদিন উন্নয়ন নাট্য কার্যক্রম স্থবির হয়ে যাচ্ছে। এখানে নাট্যশিক্ষার্থীদের দায়িত্ব নিয়ে এনজিওসহ সরকারি, বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় উন্নয়ন নাট্য কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হবে।

প্রবন্ধ থেকে জানা যায়, বাংলাদেশে নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন এবং নাট্যশিক্ষক ড. আফসার আহমদের হাত ধরে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রাতিষ্ঠানিক নাট্যশিক্ষা শুরু হয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৮৬Ñ১৯৮৭ শিক্ষাবর্ষে প্রথম স্নাতক (সম্মান) শ্রেণিতে নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিষয়ে শিক্ষার্থী ভর্তির মাধ্যমে। যদিও ১৯৮৬-১৯৮৭ শিক্ষাবর্ষের পূর্বেই উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে নাটকের কোর্স পড়ানো হতো। তার পূর্বে অধ্যাপক জিয়া হায়দার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে ১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দে শিক্ষক হিসেবে যোগদানের মাধ্যমে তিনি বাংলা বিষয়ের একটি অংশ হিসেবে নাট্যকলার তত্ত্বগত বিষয়াবলি পড়াতেন। তার প্রচেষ্টায় পরবর্তীতে চারুকলা বিভাগে নাট্যকলা বিষয় অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯৯১-১৯৯২ শিক্ষাবর্ষে নাট্যকলা শাখায় প্রথম স্নাতক (সম্মান) শ্রেণিতে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয় এবং তা চলমান থাকে ১৯৯৬-১৯৯৭ শিক্ষাবর্ষ পর্যন্ত। অতঃপর ২০০৯ খ্রিষ্টাব্দে স্বতন্ত্রভাবে নাট্যকলা বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার মাধ্যমে উক্ত বিভাগে ২০০৯-২০১০ শিক্ষাবর্ষে স্নাতক (সম্মান) শ্রেণিতে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়।

ইতোমধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক সৈয়দ জামিল আহমেদ-এর প্রচেষ্টায় নাট্যকলা ও সঙ্গীত বিভাগে নাট্যকলা বিষয়ে ১৯৯৪-১৯৯৫ শিক্ষাবর্ষে প্রথম দুই বছর মেয়াদী স্নাতকোত্তর শ্রেণিতে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। তার পূর্বে ১৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দ থেকে কলা অনুষদে সহায়ক কোর্স হিসেবে নাট্যকলা পড়ানো হতো। অতঃপর ১৯৯৭-১৯৯৮ শিক্ষাবর্ষ থেকে স্নাতক (সম্মান) চালু করা হয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০০০ খ্রিষ্টাব্দে প্রফেসর সফিকুন্নবী সামাদী একাডেমিক নাট্যব্যক্তিত্ব ফরহাদ জামান পলাশকে নিয়ে নাট্যকলা ও সঙ্গীত বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেন। নাট্যকলা শাখায় স্নাতক (সম্মান) শ্রেণিতে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয় ২০০০-২০০১ শিক্ষাবর্ষ থেকে। অতঃপর জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে নাট্যকলা বিভাগে প্রথম ২০১০-২০১১ শিক্ষাবর্ষ থেকে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। সর্বশেষ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১৩-২০১৪ শিক্ষাবর্ষ থেকে চালু করা হয় নাট্যকলা বিভাগ।

নাট্যকলা সংশ্লিষ্ট বিভাগসমূহে স্নাতক (সম্মান) চালু হওয়ার পর প্রতি শিক্ষাবর্ষে নিয়মিতভাবে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়েছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নাটক ও নাট্যতত্ত্বে প্রথম বছর স্নাতক (সম্মান) শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিল (প্রায়) ১২ জন শিক্ষার্থী এবং ২০১৯-২০২০ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি করা হয়েছে ৪৫ জন শিক্ষার্থীকে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে নাট্যকলা বিভাগে ২০০৯-২০১০ শিক্ষাবর্ষে আসন সংখ্যা ছিল (প্রায়) ১৫টি। বর্তমানে ২০১৯-২০২০ শিক্ষাবর্ষে আসন সংখ্যা হয়েছে (প্রায়) ৪০টি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৯৭-১৯৯৮ শিক্ষাবর্ষে নাট্যকলা বিভাগে আসন সংখ্যা ছিল (প্রায়) ১০টি। বর্তমানে ২০১৯-২০২০ শিক্ষাবর্ষে থিয়েটার এন্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগে ভর্তি করা হয় (প্রায়) ২৩ জন শিক্ষার্থীকে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০০০-২০০১ শিক্ষাবর্ষে নাট্যকলা শাখায় ১৫ জন শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয় এবং ২০১৯-২০২০ শিক্ষাবর্ষে নাট্যকলা বিভাগে ভর্তি করা হয় ২৮ জনকে। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে নাট্যকলা বিভাগে ২০১০-২০১১ শিক্ষাবর্ষে আসন ছিল ৪০টি এবং বর্তমানে ২০১৯-২০২০ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি করা হয়েছে ২৮ জন শিক্ষার্থীকে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে নাট্যকলায় ২০১৩-২০১৪ শিক্ষাবর্ষে আসন সংখ্যা ছিল ৩০টি এবং বর্তমানে ২০১৯-২০২০ শিক্ষাবর্ষে এসে হয়েছে ৪০টি।

লেখক: সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকর্মী
মোবাইল : ০১৫৫৮-৪৫৭০৪১.
তারিখ: চট্টগ্রাম:২১-০৩-২০২০