বিশ্বের কোটি কোটি শ্রমজীবী মানুষের অধিকার ও দাবি আদায়ের মহান মে দিবস আজ।

বিজ্ঞাপন

মালিক-শ্রমিক সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠা আর শ্রমিকদের শোষণ-বঞ্চনার অবসান ঘটার স্বপ্ন দেখারও দিন এটি।

প্রতিবছর অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করা হতো। বর্ণাঢ্য র‌্যালি ও আলোচনা সভাসহ নানা কর্মসূচিতে মুখর থাকতো রাজপথ। দিবসটি উপলক্ষে সরকারি ছুটিও রয়েছে। কিন্তু এবছর করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে দিবসটির সব কর্মসূচি স্থগিত করা হয়েছে।

শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, করোনাভাইরাস বিস্তার রোধে সরকারি স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালন এবং সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে এ বছর সব ধরনের আনুষ্ঠানিকতা বাতিল করা হয়েছে। মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো এক বিবৃতিতে জানানো হয়, ‘শ্রমিক-মালিক ঐক্য গড়ি, সোনার বাংলা গড়ে তুলি’— এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে দেশে শুক্রবার (১ মে) পালিত হবে মহান মে দিবস।

১৮৮৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের হে মার্কেটের শ্রমিকরা উপযুক্ত মজুরি এবং দৈনিক আট ঘণ্টা কাজের দাবিতে ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। কল-কারখানা তখন গিলে খাচ্ছিল শ্রমিকের গোটা জীবন। অসহনীয় পরিবেশে ১৬ ঘণ্টা প্রতিদিন কাজ করতে হতো।

সপ্তাহে ছয় দিন কাজ করে শ্রমিকের স্বাস্থ্য একেবারে ভেঙে যাচ্ছিল। শ্রমজীবী শিশুরা হয়ে পড়েছিল কঙ্কালসার। তখন দাবি উঠেছিল, কল-কারখানায় শ্রমিকের গোটা জীবন কিনে নেয়া যাবে না। এই দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলনের সময় ওই বছরের ১লা মে শ্রমিকরা ধর্মঘট আহ্বান করেন। প্রায় ৩ লাখ মেহনতি মানুষ ওই সমাবেশে অংশ নেন। একপর্যায়ে আন্দোলনরত ক্ষুব্ধ শ্রমিকদের রুখতে পুলিশ এলোপাতাড়ি গুলি চালায় মিছিলে। পুলিশের গুলিতে বহু শ্রমিক হতাহত হন।

পরে আন্দোলনে অংশ নেওয়ার অপরাধে গ্রেপ্তারকৃত ৬ শ্রমিককে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। কারাগারে বন্দিদশায় এক শ্রমিক নেতা আত্মহত্যা করেন। সেই শ্রমিকদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে দৈনিক কাজের সময় আট ঘণ্টা করার দাবি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। পরের বছর প্যারিসে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলনে দিনটিকে মে দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

মহান মে দিবস উপলক্ষে দেওয়া বাণীতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলাদেশেও করোনাভাইরাস সংক্রমণের ভয়াল থাবা আঘাত এনেছে। এর ফলে গভীর সংকটে পড়েছে শিল্প-প্রতিষ্ঠানসহ দেশের শ্রমজীবী ও মেহনতি মানুষ। এ পরিস্থিতিতে সরকার জনগণের পাশে থেকে ত্রাণকাজ পরিচালনাসহ সর্বাত্মক কার্যক্রম গ্রহণ করেছে।’

সরকারের পাশাপাশি শিল্প-প্রতিষ্ঠানের মালিকদেরও শ্রমজীবী মানুষের সহায়তায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানান রাষ্ট্রপতি। একইসঙ্গে ভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখাসহ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

দিবসটি উপলক্ষে দেওয়া বাণীতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘সকল শোষণ, বঞ্চনা ও বৈষম্যের অবসান ঘটিয়ে দেশের মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে আমরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের আন্তরিক প্রচেষ্টার ফলে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ও কার্যক্রম আরও সুদৃঢ় হয়েছে। মালিক-শ্রমিকের মধ্যে সৌহার্দ্য ও সুসম্পর্ক বাজায় রাখা, নিরাপদ কর্ম পরিবেশ ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছি।’

মহান মে দিবস শ্রমজীবী-মেহনতি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার এক অবিস্মরণীয় দিন উল্লেখ করে বাংলাদেশসহ বিশ্বের সব দেশের মেহনতি মানুষের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা এবং তাদের আন্তরিক শুভেচ্ছা জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী বেগম মন্নুজান সুফিয়ান বলেন, করোনাভাইরাস সংক্রমণের আশঙ্কায় আমরা মে দিবসের সব কর্মসূচি স্থগিত করেছি। তবে পরিস্থিতি উন্নত হলে পরে দেখা যাবে। তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকার শ্রমিকবান্ধব সরকার। সরকার শ্রমিকদের অধিকার বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যার ফলে শ্রমিকরা অতীতের যে কোনও সময়ের তুলনায় এখন ভালো সময় পার করছে। শেখ হাসিনা সরকার অব্যাহত থাকলে শ্রমিকরা আরও উন্নত জীবন পাবে।

পৃথক এক বাণীতে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘অপ্রতিরোধ্য করোনাভাইরাসের আক্রমণে বিপর্যস্ত বিশ্বে এবার মহান মে দিবস পালিত হতে যাচ্ছে। শ্রমজীবী জনগণের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের বিজয়ের এই ঐতিহাসিক দিনে অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, বাংলাদেশের শ্রমজীবী মানুষ এখনো দৈনিক ৮ ঘণ্টা কাজ, ন্যায্য মজুরি ও শোভন জীবন থেকে বঞ্চিত। অথচ তারাই অর্থনীতির চাকা সচল রেখেছে, বিদেশে উপার্জন করে দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করছে। এই দুঃসময়েও তারা রোগাক্রান্ত মানুষের সেবা দিয়ে যাচ্ছে।’

বাংলাদেশের শ্রমজীবি মানুষের অবদান বিবেচনা করে তাদের প্রাপ্য অধিকার, ন্যায্য মজুরি ও শোভন জীবন নিশ্চিত করার জন্য সরকার ও মালিক পক্ষের প্রতি আহ্বান জানান মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

২৪ ঘণ্টা/এম আর