গৌতম চন্দ্র বর্মন : প্রত্যেক মানুষ বেচে থাকার জন্য স্বপ্ন থাকে আমারো জীবনে ছিল,যা অন্যদের সাথে মিলত না,আমি ভাবছিলাম হয়তো কোন এক সময় আমার স্বপ্ন গুলো মেনে নেবে কিন্তু মেনে নিল কই? তাই নিজেকে তেমন একটা ভাল জায়গায় দাড় করাতে পারিনি, তাই নেশার জগতে এসে সমাজের কিছু অসংগতির কথা তুলে ধরে পত্রিকায়।

বিজ্ঞাপন

আর আমার এসব লেখা দেখে প্রেমে পরে যায় “কবিতা”। প্রেমে পড়ার বেশী দিন সময়ো নেয়নি অবশেষে আমাকে সাতপাকে বাঁধা পড়তে হয় আমাকে। বিয়ে করার পর কবিতার আমার লেখার প্রতি বিন্দু মাত্র তার আগ্রহ নেই, একজন ক্ষুদ্র সংবাকর্মীর জীবনকে দূর থেকে দেখে যতোটা আকর্ষণীয় মনে হয়েছিল কবিতার, বাস্তবে এখন তার  বিপরীত। সারাদিন দৌড়ের মাঝে থেকে যখন বাসায় এসে কম্পিউটার টেবিলে বসে আবার লেখালেখি করে থাকি। এই বিষয়টা উপলব্ধি করে কবিতা ভেঙে পড়লো।আমি লেখালেখি করি বলে এখন  সে বিরক্ত হয়ে থাকে।

কিন্তু আজ বুজলাম লেখার সাথে আমার বাস্তব জীবনে বিস্তর ফারাক। সাধাসিধা মানুষ আমি বাসায় সবসময়, চুপচাপ থাকি। প্রয়োজন ছাড়া কথা বলি না। একদিন বাসায় ডুকতে গেটে দাড়িয়ে শুনতে পেলাম কবিতা তার মাকে ফোন করে বলছে, শেষকালে কপালে জুটলো একটা পাগলা জামাই। সারাদিন খাওয়া নাই দাওয়া নাই দৌড়াতে থাকে রাতে আবার কম্পিউটার টেবিলে বসে কি যেন লেখে! আমার কিন্তু ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে  যাচ্ছে মা।

প্রতিদিন রাতে ডকুমেন্টস গুলো যখন রাখতে কম্পিউটারে বসি।যতটুকু সময় কম্পিউটার টেবিলে বসে কাজ করি  ততক্ষণই এয়ার ফোন কানে লাগিয়ে গান শুনি। কবিতা তখন ঘুম থেকে উঠে ঋষির মতো মগ্ন হয়ে লিখতে থাকা আমার দিকে ল্যাপটপের নষ্ট ব্যাটারির মতো তাচ্ছিল্যের চোখে তাকিয়ে থাকে।মাঝ রাতে প্রায়ই আমি ইউকুলেলে বাজিয়ে জীবনমুখী গান ধরি। ও বিরক্তির ভান মুখে এনে গানগুলো শোনে ।কবিতা প্রায়ই আমার সাথে ঠিক করে কথা বলে না। আমরা ইশারা ইঙ্গিতে কাজ চালিয়ে নেয়।ঘুমিয়ে যাবার পর কবিতা নিষ্পাপ মুখটার দিকে তাকাইয়া থাকি আউলা দৃষ্টিতে। গভীর রাতগুলো ওর নিখুঁত গভীর নাভিটাকে নিজের লেখা কোন ছোটগল্পের সাথে মেলাই। সহজসরল সাদামাটা সুখগুলোতে বুঁদ হয়ে যেতে নিতান্তই মন্দ লাগে না।

কবিতা আমাকে স্বার্থবাদী বলতো। কবিতা রেগে উঠলে সে আমাকে লুচ্চা বদমাশের বলতো।সে আমাকে ভৎসনা করে ইতর,বহুগামী, লুচ্চা-বদমাশ সেই ভাষায়।সে সব কথা শুনে আমার শ্বাসকষ্টের মতো হয়।এই কঠিন শব্দগুলো বারবার শুনি। নীরবে সহ্য করে যাই।সমাজের নিরিহ মানুষের দুঃখের কথার করনে নিরবে শয্য করি অসহায় মানুষের কথা বুকে ধারণ করে তর্ক না করে তবুও আমি এক বিছানায় ঘুমাই। প্রতিদিন রুটিন মেনে সংসার চালাই এটাই যে সংবাদকর্মীদের জীবন।আমার রুচিতে ভীষণরকম অমিল থাকবার পরও আমি আর কবিতা বছরের পর বছর এক ছাদের নিচে কাটিয়ে দিচ্ছি।

অসুখী কবিতা চাঁছাছোলা বাক্যে প্রতিনিয়ত জর্জরিত হয়েও তাই বেশ আছি।মাঝে মাঝে বাপ হওয়ার জন্যও মন  আঁকুপাঁকু করে। সন্তান নেবার ব্যাপারে নিমরাজি ছিলো সে।সে ঠিক ভরসা পাচ্ছিলো না নিষ্পাপ একটা প্রাণকে অভ্যর্থনা জানিয়ে পৃথিবীতে আনবার জন্য।আর আমার এলাকা ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা হওয়ায় ঘন ঘন লোডশেডিং হতো। তীব্র গরমের মাঝে জেদ করে জামাকাপড় খুলে সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে বসে থাকতো কবিতা। আমি তাকে জামাকাপড় পরাৱ জন্য নরম গলায় অনুরোধ করলে দাঁত কিড়মিড় করতো জেদে। মোমবাতির আলোয় রাগে লাল হয়ে থাকা সুন্দর মুখটা দেখে আমার মায়া লাগতো। কেন যেন সেই মুহূর্তে চোখ মেলে তার সুন্দর শরীরটার দিকে তাকাতে পারতাম না।এক রাতে মিলনের  সময় কি এক ভালো লাগায় আমার চুলের মুঠি ধরে টলাটলা চোখে সে বলে ওঠে, আমি তোমাকে তীব্রভাবে ঘেন্না করি খ্যাপাটে সংবাদকর্মী! যদি সুযোগ থাকতো, সে নাকি  আমার চুলের মুঠি ধরে জবাই করত। আমি শুনে স্পষ্টভাবে তার চোখের দিকে তাকাই। বোঝার চেষ্টা করি, ভালোবাসা না থাকার পরও কারো প্রতি একটা মানুষের এতো প্রেমঘেঁষা ঈর্ষা কি করে কাজ করে! বউটা  হুঁশে নেই। দুখী মানুষদের বেহুঁশ বেহিসেবী কথাবার্তা ধরতে নেই কখনো। আমি ছাড়া এখন ওর কেই বা আছে! হয়তো গভীরভাবে সে আমাকে ভালোবাসে না, কিন্তু এক বিছানায় তো ঘুমায়। বেখেয়ালে আমার বুকে চুমু খেয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। সেটাই বা কম কি? গভীর রাতে দেয়ালে টাঙ্গানো বিয়ের লাল বেনারসি পরা ওর ছবিটা দেখি৷শব্দ নিয়ে খেলার বিলাসিতায় আর মন সায় দেয় না। তার থেকে রান্নাঘরে বউয়ের সামনে হাটু গেড়ে বসে ভাতের চাল ধোয়ার পানি ফেলে দিলে সংসারে সুখও সাচ্ছন্দ আসবে।

আমার খুব ইচ্ছা করতেছে কবিতাকে নিয়ে শহরের যান্ত্রিক, অপবিত্র জীবন ছেড়ে গ্রামে চলে যাই। কিন্তু গ্রামগুলোও আর আগের মতো নাই। সেখানকার মানুষগুলো শহুরে হয়ে উঠবার প্রাণপণ চেষ্টায় আছে। জগাখিচুড়ি এক সংস্কৃতি বানিয়ে নিজদেরকে জাদুঘরে রাখার মায়াবী আবেদন তৈরি করছে ক্রমশ। গভীর ঘুমে থাকা কবিতার চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে আমি জানালা দিয়ে বাইরে তাকাই।দিন শেষে অসময়ের নিঝুম বৃষ্টিতে আকাশে জমতে থাকা এতো সময়ের গ্লানিময় মেঘ কেটে যাচ্ছে ধীরে।