সাইবার অপরাধের বিচার চট্টগ্রামে

রাজীব সেন প্রিন্স : বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে বাংলাদেশেও। সেই সাথে হু হু করে প্রযুক্তিগত অপরাধ ও সাইবার অপরাধের মামলাও বাড়ছে। আর প্রায় সব মামলায় হচ্ছে অজামিনযোগ্য তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায়।

বিজ্ঞাপন

এদিকে সাইবার অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দিন দিন মামলার সংখ্যা বাড়লেও নিষ্পত্তির সংখ্যা খুব একটা বাড়ছে না। ফলে দ্রুত মামলা নিস্পত্তির জন্য সাইবার ক্রাইম ট্রাইব্যুনাল গঠনের দাবি জানিয়ে আসছে আইনজীবীরা।

এরই প্রেক্ষিতে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে টেলিফোন, অনলাইন এবং ই-মেইল হ্যাকিং-সংক্রান্ত অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত বিচারের জন্য ২০১৩ সালে সাইবার ক্রাইম ট্রাইব্যুনাল গঠন করে সরকার।

তবে তা মাত্র একটিমাত্র বিভাগ ঢাকায় গঠিত হওয়ায় সারাদেশেই মামলা জট দীর্ঘ থেকে রীতিমত স্তুপে পরিণত হয়েছে। পরে এ সমস্যা নিরসনকল্পে সরকার নতুন করে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, সিলেট, রংপুর ও ময়মনসিংহসহ সাত বিভাগে পৃথক সাতটি ট্রাইব্যুনাল গঠনের সিদ্ধান্ত নেন।

কিন্তু বেশ কয়েকবছর পেরিয়ে গেলেও ঢাকা ছাড়া অন্য কোনো বিভাগীয় শহরে আলোর মুখ দেখেনি এই প্রকল্প। তবে দীর্ঘ জল্পনা কল্পনার পর সাইবার অপরাধের বিচারকার্যে আশার আলো দেখছে বিচারপ্রার্থীরা।

সাইবার সংঘটিত অপরাধের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে অবশেষে চট্টগ্রামে সাইবার ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছে। সাইবার ট্রাইব্যুনাল আইনের-২০০৬-এর বিধানের আলোকেই ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়।

মঙ্গলবার (১৬ মার্চ) আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় জারিকৃত এক প্রজ্ঞাপনে চট্টগ্রাম সাইবার ক্রাইম ট্রাইব্যুনালের বিচারক হিসেবে পদায়ন করা হয় ঝালকাঠির অতিরিক্ত জেলা জজ এস. কে. এম. তোফায়েল হাসানকে।

এর আগে দীর্ঘদিন ধরে এই ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠায় আন্দোলন করে আসছিলেন জেলার আইনজীবীসহ এই অপরাধের শিকার বিচারপ্রার্থীরা। তাছাড়া সাইবার ট্রাইব্যুনাল স্থাপনে ২০২০ সাল থেকে জেলা আইনজীবী সমিতি আইন মন্ত্রণালয়ে জোর তদবির শুরু করে।

অবশেষে মঙ্গলবার (১৬ মার্চ) আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় জারিকৃত এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যম এখন থেকে ঢাকার পর চট্টগ্রামেও সাইবার অপরাধের বিচার কাজ শুরু হওয়ায় প্রধান বিচারপতি, আইনমন্ত্রী এবং সংশ্লিষ্টদের প্রতি আইনজীবী সমিতির পক্ষ থেকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা হয়।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক এ. এইচ. এম জিয়াউদ্দিন বলেন, এর আগে এতদিন ধরে একমাত্র ঢাকার আদালতে স্থাপিত সাইবার ট্রাইব্যুনালে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনে (আইসিটি অ্যাক্ট) দায়ের করা মামলা গুলোর বিচারকাজ সম্পন্ন করা হতো।

মঙ্গলবার সরকারের পক্ষ থেকে এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ঝালকাঠির অতিরিক্ত জেলা জজ এস. কে. এম. তোফায়েল হাসানকে নিয়োগ দিয়ে চট্টগ্রাম বিভাগের বাসিন্দাদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত সাইবার ট্রাইব্যুনাল গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে।

তিনি আরো বলেন, সাইবার ক্রাইম সংক্রান্ত মামলা দায়ের করতে বিচারপ্রার্থীদের ঢাকায় যেতে সময় ও ব্যয় সাপেক্ষ এবং হয়রানিমূলক ছিল। এজন্য আমরা চট্টগ্রামে দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রামে সাইবার ট্রাইব্যুনাল স্থাপনের দাবি জানিয়ে আসছিলাম। অবশেষে দাবি পূরণ হওয়ায় সংশ্লিষ্টদের প্রতি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রামে সাইবার ট্রাইব্যুনালের জন্য ৬টি পদ সৃজন করা হয়েছে। এর মধ্যে জেলা ও দায়রা জজ পদমর্যাদার একজন বিচারক থাকবেন।

এ ছাড়া সাঁটলিপিকার কাম কম্পিউটার অপারেটর, বেঞ্চ সহকারী, আউটসোর্সিং গাড়িচালক, আউটসোর্সিং জারিকারক, ও এমএলএসএসের আউট সোর্সিং পদে একজন করে নিযুক্ত করা হবে। পাশাপাশি ট্রাইব্যুনালে গাড়ি, কম্পিউটার ও ফটোকপিয়ার মেশিন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে বরাদ্দ দেওয়া হবে বলে জানা গেছে।

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, অনলাইনে মিথ্যা ও গুজব রটানোর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে এবং ৫৭ ধারায় আগের করা মামলাগুলোর দ্রুত বিচার শেষ করতে সাইবার ট্রাইব্যুনাল গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

এ ছাড়া মানহানিকর তথ্য প্রকাশ, মিথ্যা বা ভীতি প্রদর্শক তথ্য-উপাত্ত প্রকাশ, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত, আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটানো, অনুমতি ছাড়াই ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহের বিচার হবে এই ট্রাইব্যুনালে।

জানা গেছে, ২০১৩ সাল থেকে এ পর্যন্ত সারাদেশের বিভিন্ন থানা থেকে বিচারের জন্য সাইবার ট্রাইব্যুনালে প্রায় তিন হাজারের মত মামলা হয়েছে। প্রতিবছরই মামলার সংখ্যা বেড়েছে।

২০১৩ সালে মাত্র ৩টি মামলা এলেও বছর বছর ক্রমান্বয়ে তা বৃদ্ধি পেয়েছে। এরমধ্যে ২০১৪ সালে ৩৩টি, ২০১৫ সালে ১৫২টি, ২০১৬ সালে ২৩৩টি, ২০১৭ সালে ৫৬৮টি, ২০১৮ সালে ৬৭৬টি, ২০১৯ সালে ৭২১টি, ২০২০ সালে ৩৫০র বেশি এবং চলতি বছরে এখন পর্যন্ত শতাধিক মামলা হয়েছে বলে সূত্রে জানা গেছে।

২৪ ঘন্টা স্পেশাল/রাজীব