কে মুসলিম কে খ্রিস্টান তা চিন্তা না করেই তারা সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে : সোয়েব কবীর

 নিজস্ব প্রতিবেদক |  বৃহস্পতিবার, মে ৫, ২০২২ |  ১:০৫ অপরাহ্ণ
24ghonta-google-news

মৃত্যুকে উপেক্ষা করে ইউক্রেন থেকে দ্বিতীয়বারের মতো যুদ্ধের সবশেষ সংবাদ জানাচ্ছেন চট্টগ্রামের অকুতোভয় সাংবাদিক সোয়েব কবীর।

পেশাদারিত্বের জন্য পরিবারের মায়া ত্যাগ করে জীবনবাজি রেখে রাশিয়া-ইউক্রেন দুই দেশের মধ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির সবশেষ খবর জানাতে ইউক্রেনে অবস্থান করছেন তিনি। যেখানে এখন নিঃশ্বাস টানলে বাতাসের সঙ্গে বারুদের গন্ধ। চারিদিকে শুধু ধ্বংসস্তুপ, লাশ আর লাশ এবং হাহাকার। অপরদিকে গুলির শব্দ ভারি করেছে পরিবেশ। দুচোখ যে দিকে যায় শুধু যোদ্ধা আর যোদ্ধা। দেশকে শত্রুর কবল থেকে রক্ষা করতে যেন মরিয়া তারা; সোয়েব কবীরদের মতো অকুতভয় যোদ্ধারা ঘটনাস্থল থেকে সংবাদ প্রচার না করলে যুদ্ধে ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে জানা হতোনা।

মঙ্গলবার (৩ মে) তার ফেসবুক ওয়ালে একটি ভিডিও শেয়ার করে সোয়েব কবীর লিখেন, ‘খারকিভ শহরের মুখোমুখি সম্মুখযুদ্ধ না থাকলেও বিন্দুমাত্র আতঙ্ক কমেনি, বরং বেড়েছে। রাজধানী কিয়েব থেকে গাড়িতে করে যেতে বুচা শহরে সময় লাগে এক ঘন্টার মতো। সেখানে যেতে যেতে পরখ করলাম মাসের ব্যবধানে সুন্দর শহরটি ধ্বংসযজ্ঞে পরিনত হয়েছে। বুচা গণকবরটি স্থানীয় একটি চার্চের ঠিক পেছনে। টেক্সি ড্রাইভার স্থানীয়দের সহযোগিতায় সে স্থান খুঁজে বের করে নিয়ে গেল ঠিকই, তবে গিয়ে দেখলাম মূল ফটক বন্ধ। পাশেই লোহার শিকলে বাউন্ডারী করা একটি অংশ ফাঁকা দেখে প্রবেশ করলাম। ভেতরে কেউ নেই, আমি আর ড্রাইভার। এগিয়ে চললাম গনকবরের দিকে। এর খানিক পরেই ফুল হাতে এক নারী আর যুবক ধীর পায়ে এগিয়ে আসলো গনকবরের দিকে।

কেন এখানে আসা জিজ্ঞাসা করতেই ইংরেজি আর ইউক্রেনীয় ভাষায় ইরাইনা আব্রামচুক বললেন, এখানেই শায়িত আছেন নিজের একমাত্র বড় ভাই। রাশিয়ার সামরিক অভিযানে সম্মুখযুদ্ধে লড়াই করে মৃত্যু হয়েছে তার।

তিনি আরো লিখেন, দেশের জন্য হাতে অস্ত্র তুলে নিয়ে প্রাণ দিতে হয় তার ভাইকে। নিথর দেহটি পড়ে ছিলে হাসপাতালের মর্গে, মাথার ঠিক মাঝ বরাবর গুলির বেশ বড় একটা ছিদ্র ছিলো।

কথা বলতে বলতে চোখগুলো পানিতে টলটল করছিলো ইরানার। পাশেই তার ছেলে মাকে শান্তনা দিচ্ছিলো। ইরানার একমাত্র ভাইকে হারিয়ে কতটা যে শোক বুকে চাপা দিয়ে রেখেছে – তা শুধু সেই বুঝতে পারে।

কথা প্রসঙ্গে বললাম লন্ডন থেকে এসেছি এখানে সংবাদ সংগ্রহ করতে। তখন সে জানালো তার ভাই ইওয়র ডিডকিভস্কি পেশায় ভবন নির্মানকাজে সম্পৃক্ত ছিলেন। যুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রথম থেকেই সে যোগ দেয় সেনাবাহিনীতে। বর্তমানে তার ১৫ বছর বয়সী ছেলে ও ৭ বছর বয়সী মেয়ে লন্ডনে শরনার্থী হিসেবে আশ্রয় পেয়েছেন। ইরানা বুচা শহরের বাসিন্দা। শহরের ধ্বংসযজ্ঞের কথাও তুলে ধরে সে। নিজ জন্মভূমির শহরটির কখনো এমন হবে কল্পনাও করতে পারেনি সে।

সোয়েব কবীরের ধ্যান-জ্ঞান সবই সাংবাদিকতাকে ঘিরে। চট্টগ্রামে জন্ম ও বেড়ে ওঠা এই সাংবাদিক ব্রিটেনের কার্ডিফ মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন। ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে যুক্তরাজ্যে সময় টিভির প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছেন।

এছাড়া বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি গণমাধ্যমের সম্পাদক ও প্রকাশক সোয়েব কবীর। তারকা সাংবাদিক সোয়েব কবীর সাংবাদিকতাকে সবসময় চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করেছেন। সেই নেশা থেকে নিজেকে এবার সম্পৃক্ত করেছেন যুদ্ধ সাংবাদিকতার সাথে। হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র কিংবা গোলা বারুদের ভয় তুচ্ছ করে পুরো ইউক্রেন জুড়ে যুদ্ধের খবর জানাচ্ছেন।

ইউক্রেন যুদ্ধে অনুভুতির কথা জানতে চাইলে সোয়েব কবীর বলেন, যুদ্ধের শহরে একমাত্র সঙ্গী ক্যামেরা। আর কোনো সঙ্গী নেই। প্রতি মুহূর্তে এখানে রকেট বোমা আঘাত হানার শব্দ হচ্ছে। শহরের দুটো এলাকা ধোয়াচ্ছন্ন হতে দেখলাম। দিনের বেলায় হয়তো জীবন বাঁচাতে দৌড় দেওয়ার চেষ্টা করা যায়, কিন্তু রাতের ঘুমে-তা সম্ভব না।’

তিনি বলেন, খারকিভ শহরে আসার আগেই ভয়ে ছিলাম কোথায় থাকবো আর কিভাবে চলাফেরা করবো। রাজধানী কিয়েভে যারা ছিলেন পরিচিত সবাই নিষেধ করেছে-এই শহরে না যেতে। কারন এখানে রাশিয়ান সৈন্যরা পিছু হটলেও সীমান্ত থেকে বোমা হামলা অব্যাহত আছে। অন্যদিকে গাড়ির তেল সংকট পুরো শহরে। সবচে বড় সমস্যা হলো ভাষাগত জটিলতা। সবকিছু মিলিয়ে বেশ দুশিন্তা কাজ করছিলো। তবে, অনলাইনে বাংলাদেশি শামিম ভাইয়ের মাধ্যমে পরিচয় এই চার্চের দায়িত্বে থাকা ভ্লাদিমির সাথে।

খারকিভে রাতে থাকার ব্যবস্থা করলো চার্চের দেওয়ালের পাশে একতলার একটি সাময়িকভাবে বানানো রুমে। উঁচু ভবনগুলোতে বোমা হামলা চালানো হচ্ছে, এমনকি এই চার্চেও দুইবার বোমা হামলাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই কঠিন সময়ে কে মুসলিম কে খ্রিস্টান তা চিন্তা না করেই সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে- এটাই বা কে করে; যোগ করেন তিনি।

এন-কে

24ghonta-google-news
24ghonta-google-news