বিএনপি নেতা জামাল উদ্দিন হত্যায় জড়িত ‘কালা হেলাল’ বিএনপির সদস্য সচিব, সারাদেশে তোলপাড়

  |  মঙ্গলবার, মে ১৭, ২০২২ |  ১০:৪০ পূর্বাহ্ণ
24ghonta-google-news

নিউজ ডেস্কঃ আনোয়ারা উপজেলা বিএনপির কমিটিতে হেলাল উদ্দিন নামের জনৈক ব্যক্তিকে সদস্য সচিব করা নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে সারাদেশে। ২০ এপ্রিল মোশারফ হোসেনকে আহবায়ক ও হেলাল উদ্দিনকে সদস্য সচিব করে ৬১ সদস্যের আহবায়ক কমিটি অনুমোদন দেয় দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহবায়ক আবু সুফিয়ান ও সদস্য সচিব মোস্তাক আহমেদ। অনুমোদনের ২৪ দিন পর গত ১৪ মে গণমাধ্যমে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়ে জানান দেয়ার পর থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরব বিএনপিসহ বিভিন্ন মতাদর্শের লোকজন।

নতুন করে সামনে এসেছে সারাদেশের আলোচিত অপহরণ ও হত্যাকান্ড ‘ বিএনপি নেতা জামাল উদ্দিন ‘ ইস্যু। জামাল উদ্দিনের অপহরণের পর আদালতে তৎকালীন আনোয়ারা উপজেলা যুবলীগের আহবায়ক (২০০৫) শহিদুল আলমের জবানবন্দিতে ‘ এই অপহরণের সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত কালা হেলালের নাম আসার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

ক্লুলেস অনেক হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করতে সক্ষম হয়েছে দেশের আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, তদন্তকারী সংস্থাগুলো-এমন সফলতার মুকুটে কলঙ্ক তিলকের নাম জামাল উদ্দিন অপহরণ, হত্যাকাণ্ড।

আনোয়ারা উপজেলা বিএনপির কমিটি গঠন প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে নতুনভাবে আলোচনায় এসেছে জামাল উদ্দিন অপহরণ, হত্যাকাণ্ড। বের হয়েছে একযুগ পুরোনো বিভিন্ন জবানবন্দির নথি। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও মহাসচিব বরাবর জমা দেয়া চট্টগ্রামের উপজেলার শীর্ষ আট নেতার অভিযোগ পত্রে উঠে আসে সেই পুরোনো হেলালের নাম। সেই সুত্র ধরে গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে শহিদ চেয়ারম্যানের জবানবন্দির নানা তথ্য।

দীর্ঘ উনিশ বছরেও শেষ হয়নি সারাদেশে তোলপাড় সৃষ্টি করা এই লোমহর্ষক হত্যাকান্ডের বিচারের কাজ। চট্টগ্রামের আনোয়ারার বিএনপি নেতা জামাল উদ্দিন অপহরণ ও হত্যার বিষয়ে গ্রেফতার হওয়া আসামি শহীদ চেয়ারম্যান আদালতে জবানবন্দি দিয়েছিলেন। ২০০৫ সালের ২০ আগস্ট আদালত দেয়া জবানবন্দিতে শিল্পপতি জামাল উদ্দিন অপহরণ ও হত্যার বিভিন্ন তথ্য উঠে আসলেও তদন্ত ও বিচারের ধীরগতির রহস্যের শেষ হয়নি। মামলার আসামীদের কেউই এখন জেলে নেই। এই মামলায় শহিদ চেয়ারম্যান দীর্ঘদিন কারাগারে ছিলেন।

২০০৩ সালের ২৪ জুলাই রাতে চট্টগ্রামের চকবাজারের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে চান্দগাঁওয়ের বাসায় ফেরার পথে সন্ত্রাসীরা অপহরণ করে ব্যবসায়ী ও বিএনপি নেতা জামাল উদ্দিনকে। অপহৃত জামাল উদ্দিনের পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে দুই বছর পর অপহরণের অন্যতম হোতা আনোয়ারা সদরের সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান শহীদকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। কালা মাহবুব ও তাঁর স্বীকারোক্তিতে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলা কাঞ্চননগরের পাহাড়ি এলাকা থেকে ২০০৫ সালের ২৪ আগস্ট জামাল উদ্দিনের কঙ্কাল উদ্ধার করে র্যাব।

শহীদ চেয়ারম্যানের (বর্তমানে সাবেক) দেয়া জবানবন্দিতে বিএনপি নেতা জামাল উদ্দিনকে চট্টগ্রামের চান্দগাঁও আবাসিক এলাকা থেকে অপহরণের বিস্তারিত তথ্য উঠে আসে। অপহরন মিশনে সরাসরি জড়িত হেলাল উদ্দিন (কালা হেলাল, বাড়ি আনোয়ারার হাইলদর) , নাজিম, অমর দাশ, ইসহাক ড্রাইভার, সোবহান ড্রাইভার, গ্যারেজ কাশেমের সম্পর্কে নানা তথ্য প্রদান করেছিলেন তিনি। সেসময় রাজনীতির সাথে জড়িত না থাকলেও ‘ হেলাল’ সম্প্রতি আনোয়ারা উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিবের পদ পেয়েছেন।

এরআগে ২০১৯ সালে দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্য হিসেবে প্রথম পদ পান হেলাল উদ্দিন।

উপজেলা বিএনপির নেতাকর্মিদের দেয়া তথ্যমতে প্রয়াত বিএনপি নেতা শাহজাহান চেয়ারম্যানের সাথে হেলালের পারিবারিক আত্নীয়তার কারনে আনোয়ারা উপজেলা বিএনপির বিভিন্ন নেতার সাথে পরিচয় ও সখ্যতা হয়। ধীরে ধীরে চট্টগ্রামের সাবেক এক সাংসদের ভাইয়ের সাথে তার ব্যবসায়িক সম্পর্ক তৈরি হয়।

মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট একটি সুত্র জানিয়েছে, জামাল উদ্দিন অপহরণের সাথে জড়িত সবাইকেই চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছিল৷ কিন্তু তৎকালীন বিএনপি সরকারের প্রভাবশালী কোন এক মন্ত্রীর কারণে দেশব্যাপী আলোচিত এই অপহরণ ও হত্যাকান্ডের মামলা গ্রহনে দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হয় জামাল উদ্দিনের পরিবারকে । ২০০৭ সালে প্রথম আলোচিত এই হত্যার তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে উপস্থাপন করেছিলেন তদন্তকারী কর্মকর্তা।

শহিদ চেয়ারম্যানের দেয়া স্বাক্ষ্যের ভিত্তিতে দূর্গম পাহাড়ি এলাকা থেকে জামাল উদ্দিনের কঙ্কাল উদ্ধার করার পর সিংগাপুরে ডিএনএ পরীক্ষা করে তদন্তকারী সংস্থা নিশ্চিত হয়েছিল জামাল উদ্দিনকে অপহরণের পর মেরে ফেলা হয়েছে। আদালতে দেয়া জবানবন্দিতে শহিদ চেয়ারম্যান বলেছিলেন, ‘তখন তারা হেসে হেসে বলে জামাল উদ্দিনকে অপহরণ করা হবে। আমি হাস্যকর মনে করছি। তখন তারা বলে গাড়িতে উঠো। সামনের একটি সাদা মাইক্রোতে আমাকে উঠায়।’

জবানবন্দিতে শহিদ চেয়ারম্যানের দেয়া বক্তব্য অনুযায়ী নগরীর চান্দগাঁও আবাসিক এলাকা থেকে সাদা মাইক্রো গাড়িতে অপহরণ করে জামাল উদ্দিনকে উত্তর চট্টগ্রামের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। জামাল উদ্দিন তখন একটি রিকসাতে করে বাসায় ফিরছিলেন। সেদিন রাত ৯/৯.৩০ মিনিটের দিকে অপহরণে ব্যবহৃত গাড়িটি গতিরোধ করে তার। গাড়িতে শহিদ চেয়ারম্যান বসা ছিলো -এমন বক্তব্য দিয়েছিলেন তিনি। বলেছিলেন অপহরণের সাথে ফটিকছড়ির কাসেম চেয়ারম্যানের পরিকল্পনার কথা।

মুক্তিপণ ভাগাভাগি নিয়েও তথ্য দেন শহিদ । তার বক্তব্য অনুযায়ী ‘হেলাল, নাজিম, ইসহাক খুবই দূর্দান্ত প্রকৃতির। আমি মুক্তিপণের কোন টাকাই পাইনি।’

ব্যবসায়ী জামাল উদ্দিনকে অপহরণের পর মুক্তিপণ চেয়ে জামাল উদ্দিনের স্ত্রী, শ্যালককে ফোন করেছিলো অপহরণকারী চক্রটি । জামাল উদ্দিনের পরিবারের সাথে ৫০ লক্ষ টাকায় দফারফাও হয়েছিলো। ততকালীন প্রশাসনের পরামর্শ অনুযায়ী অপহরণকারী চক্রকে মুক্তিপণের ২৫ লাখ টাকাও প্রদান করেছিলো জামাল উদ্দিনের পরিবার। কিন্তু টাকা নিয়েও শেষ পর্যন্ত জামাল উদ্দিনকে মুক্তি দেওয়া হয়নি। শেষ পর্যন্ত কঙ্কাল ছাড়া তার লাশও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। জবানবন্দিতে শহিদ চেয়ারম্যান বলেন, ”অপহরণের পর জামাল উদ্দিনের পরিবার অর্থাৎ জামাল উদ্দিনের স্ত্রী, উনার শ্যালক, উনার ভাই,

সাবেক চেয়ারম্যান সাইফুদ্দিন আমার সাথে কয়েকবার মুক্তিপণের টাকা দিলে, কিংবা কাকে ধরলে জামাল উদ্দিনকে পাওয়া যাবে এই বিষয়ে জানতে চাইলে আমি বলি হেলাল, নাজিম, এবং অমর ও ইসহাক ওদের ধরলে জামাল উদ্দিনকে পাওয়া যাবে। আরো বলি আমি নিজেও খবর পেলে আপনাদের জানাবো। দুই মাসের মাথায় আমার মোবাইল নস্ট হয়ে যাওয়ায় কারো সাথে যোগাযোগ করতে পারি না-এই আমার জবানবন্দি।’

মামলা নিতে অনীহা, তদন্ত প্রতিবেদন থেকে মুল আসামিদের নাম বাদ দেয়া, বাদির নারাজি, উচ্চ আদালতে দুই আসামীর রীট- আদালতের স্থগিতাদেশ নানা কারনে গতি পায়নি জামাল উদ্দিন অপহরণ ও হত্যা মামলার বিচার। শেষমেশ তদন্তের ফাইল চট্টগ্রামের দ্রুত বিচার ট্রাইবুনালে পৌছুলেও বাদির কোন খোঁজ নেই। সমন জারী করেও আদালতে সাক্ষ্য দিতে নেয়া সম্ভব হয়নি জামাল উদ্দিনের ছেলে ও তার স্ত্রীকে। সংশ্লিষ্টদের মতে দেড় যুগের বেশি সময় জামাল উদ্দিনের পরিবার এমন লোমহর্ষক ঘটনার বিচারের জন্য প্রহর গুনছিল। কিন্তু বিচারহীনতার সংস্কৃতি তাদের হতাশ করেছে।

জানতে চাইলে মামলার বাদি জামাল উদ্দিনের ছেলে চৌধুরী ফরমান রেজা বলেন, বিচারের আশায় অনেক দিনই তো হলো। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার প্রতিবেদন নিয়ে বিভিন্ন সময় আদালতে নারাজি উপস্থাপন করেছি। চার্জশিট থেকে অনেককেই বাদ দেয়া হয় যাদের নাম শহিদ চেয়ারম্যানের জবানবন্দিতে এসেছিলো। হেলাল নামের যে লোক আনোয়ারা উপজেলা বিএনপির শীর্ষনেতা হয়েছেন, এতে আমি বিস্মিত নই। সবই তো বুঝেন। তবে উনি একবার এই মামলায় গ্রেফতার হয়েছিলেন সেসময়।’

অভিযোগের তীর যার দিকে সেই হেলাল উদ্দিন বলছেন ভিন্ন কথা। তিনি বলেন, জামাল উদ্দিন হত্যা, তদন্ত প্রতিবেদন, অপহরণের কোন মামলায় আমার নাম ছিলো না। জবানবন্দি কিংবা তদন্তের কোন জায়গায়ও আমার নাম কখনোই আসেনি। গ্রেফতার হওয়া শহিদ চেয়ারম্যানের জবানবন্দিতে কি বলেছিলেন সেটাও আমার জানা নেই। কেন্দ্রীয় বিএনপির কেউ বা দক্ষিণ জেলা বিএনপির কেউ কমিটি ঘোষণার আগে আট বিএনপি নেতার কথিত অভিযোগ যাচাইও করেননি। ‘

আদালতের নথি অনুযায়ী ২০১৬ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি চাঞ্চল্যকর এই মামলাটির অভিযোগপত্র গ্রহণ করেন চট্টগ্রাম মহানগর হাকিম আদালত। এরপর মামলাটি বিচারের জন্য প্রস্তুত করে পাঠানো হয় মহানগর দায়রা জজ আদালতে। একই বছরের নভেম্বরে মামলাটি বিচারের জন্য চট্টগ্রাম বিভাগীয় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে পাঠান চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ।

২০১৮ সালের ৩০শে জুলাই ছিল এই মামলার সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ছিলো মামলার বাদী জামাল উদ্দিনের পুত্র চৌধুরী ফরমান রেজা লিটনসহ তিন জনের সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য ছিল। কিন্তু তাদের কেউ আদালতে উপস্থিত না থাকায় সাক্ষ্যগ্রহণ হয়নি। ৫ই আগস্ট পুনরায় সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য করেন আদালত। সেবারও আদালতে অনুপস্থিত ছিলেন বাদি। তবে এর আগে মামলার বাদী ও সাক্ষীদের খুঁজে বের করে আদালতে হাজির করার জন্য সিএমপি কমিশনারকে নির্দেশ দিয়েছিলেন আদালতের বিচারক।

পুলিশের খাতায় চান্দগাঁও আবাসিকের বাসা পরিবর্তন করে ব্যবসায়ী জামাল উদ্দিন চৌধুরীর পরিবার ও পরিবারের সদস্যরা নিখোঁজ। ধারনা করা হচ্ছে তদন্ত প্রতিবেদন, তদন্ত প্রক্রিয়ায় হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে দিয়েছেন মামলার বাদি। এই ঘটনার মুলহোতাদের কেউ কেউ তদবির করে চার্জশিট থেকে নাম কাটিয়েছেন, কেউ বিদেশে পালিয়ে রয়েছেন, হদিস মেলেনি অনেকেরই। আবার অনেকেই সাফসুতরা হয়ে রাজনীতির মাঠে শীর্ষপদ বাগিয়ে নেবার প্রতিযোগিতায় মাঠে রয়েছেন।

24ghonta-google-news
24ghonta-google-news