মিরসরাইয়ে বিনা চিকিৎসায় মারা যায় সাপে কাটা রুগি

 আশরাফ উদ্দিন |  শুক্রবার, জুলাই ১, ২০২২ |  ১০:১৫ পূর্বাহ্ণ
24ghonta-google-news

মিরসরাই প্রতিনিধিঃ মিরসরাইয়ে প্রায় সাড়ে ৪ লাখ মানুষের চিকিৎসার জন্য একটি নামকা ওয়াস্তে উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্র থাকলেও সেখানে যথা উপযুক্ত চিকিৎসা সরঞ্জাম নেই।

সাড়ে ৪লাখ মানুষের জন্য নেই একটি আইসিইউ বেড, নেই সাপে কাটা রুগির চিকিৎসা ব্যাবস্থা। ফলে প্রতিবছর বর্ষা মৌসুম আসলেই সাপে কাটায় মানুষ মারা যায় বিনা চিকিৎসায়। সাপে কাটায় বেশিরভাগ মানুষ গ্রামে আক্রান্ত হলেও এর চিকাৎসা রাখা হয়েছে শহরে। সাপে কাটা মানুষ চিকিৎসার জন্য প্রাথমিক ভাবে উপজেলা হাসপাতালের সরণাপন্ন হয়। উপজেলা হাসপাতালে সাপে কাটা রুগির উপযুক্ত চিকিৎসা ব্যাবস্থা না থাকায় প্রেরণ করা হয় জেলা হাসপাতালে। এতে মাঝখানে চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ সময় ক্ষেপন হয় আর মৃত্যু কোলে ঢলে পড়ে ভুক্তভোগি রুগি। একপ্রকার বলতে গেলে বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে বাধ্য হচ্ছে মিরসরাইয়ের সাপে কাটা রুগিদের।

চলতি মাসের গত ১৫ জুন (শুক্রবার) সন্ধ্যায় উপজেলার ১৫ নং ওয়াহেদপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ ওয়াহেদপুর গ্রামের নতুন বাড়িতে সাপের কামড়ে সুফিয়া বেগম (৫০) নামে এক নারীর মৃত্যু হয়। নিহত সুফিয়া ওই বাড়ির মৃত ফিরোজ মিয়ার স্ত্রী। সুফিয়ার ছেলে মোহাম্মদ রিপন বলেন, শুক্রবার সন্ধ্যার পর মা ঘরের পাশে টিউবওয়েল থেকে পানি আনতে যান। এসময় ডান পায়ের নিচে বিষাক্ত সাপ কামড় দিলে বিনা চিকিৎসায় তিনি মারা যান।

২০২১ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর (বুধবার) সকালে উপজেলার জোরারগঞ্জ থানার ৪নং ধুম ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডের সাবেক মোম্বার আজিজুল হক (৫০) সাপের কামড়ে মারা যান। বাড়ির পুকুর পাড়ে তাকে সাপটি ছোবল মারে। পরে বাড়ির লোকজন তাকে উদ্ধার করে মিরসরাই উপজেলা হাসপাতালে নিয়ে যায়। কিন্তু সেখানে সাপে কাটার চিকিৎসা না থাকায় চট্টগ্রাম মেডিকেলে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।
পরদিন আব্দুল্লাহ আল নোমান নামের ৬ বছরের এক শিশুর মৃত্যু হয় সাপের কামড়ে। সে মিরসরাই পৌরসভার নাজির পাড়া গ্রামের প্রবাসী আবদুল মতিনের এক মাত্র পুত্র। বাড়ির শিশুদের সাথে খেলাধূলা করার একপর্যায়ে একটি বিষাক্ত সর্প তাকে দংশন করে। পরে পরিবারের সদস্যরা তাকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স মস্তাননগর হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়। পরবর্তীতে তার অবস্থার কোন উন্নতি না হওয়ায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় একই দিন সন্ধ্যা সাড়ে ৭ টার সময় তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুর কারন হিসেবে জানা যায় সাপে কাটার পরবর্তী উপযুক্ত চিকিৎসায় বিলম্ব।

এছাড়া একই বছর মিরসরাই উপজেলার কাটাছড়া ইউনিয়নে বিষাক্ত সাপের কামড়ে মনোয়ারা বেগম (৩৬) নামক এক গৃহবধূর মৃত্যু হয়েছে। তিনি উপজেলার তেতৈয়া গ্রামের কাশেম মোল্লা বাড়ির মরহুম আবু জাফরের স্ত্রী। মনোয়ারা বেগমকেও প্রথমে মিরসরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে রাত ১০টা নাগাদ চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল (চমেক) নিয়ে গেলে কর্তৃব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

এভাবে প্রতিবছর একের পর এক সাপে কাটা রুগি বিনা চিকিৎসায় মারা গেলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। তারা উপজেলার সাড়ে ৪লাখ মানুষের জন্য একটি আইসিইউর ব্যাবস্থা করে স্থানিয় ভাবে সাপে কাটা চিকিৎসা সুব্যাবস্থায় উদাসীনতা দেখিয়ে আসছেন। অথচ তারা লক্ষ লক্ষ টাকা অবচয় করছেন বিভিন্ন অপ্রয়োজনীয় খাতে।

মিরসরাই মাতৃকা হাসপাতালের ব্যাবস্থাপনা পরিচালক বীর মুক্তিযোদ্ধা ডাক্তার জামশেদ আলাম জানান, দেশের উপজেলা পর্যায়ে সাপেকাটা রুগির চিকিৎসা ব্যবস্থা রাখা হয়নি। অথচ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন ছিল উপজেলা পর্যায়ে এর চিকিৎসা নিশ্চিত করা। কারন জেলার চাইতে উপজেলা পর্যায়ে সাপে কাটা রুগির সংখ্যা বেশি। সাপে কাটা রুগির চিকিৎসায় জটিলতা কিছুই দেখি না। একজন এনেসথেশিয়া, একজন মেডিসিনের ডাক্তর আর প্রশিক্ষিত দক্ষ দুই চার জন নার্স থাকলেই সাপে কাটা রুগির চিকিৎসা দেয়া সম্বব। অতিতে সাপে কাটা রুগির চিকিৎসা জটিলতা থাকলেও বর্তমানে সেটা নেই।

মিরসরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডাক্তার মিনহাজুর রহমান বলেন, উপযুক্ত ব্যাবস্থাপনার অভাবে আমরা উপজেলা পর্যায়ে সাপে কাটা রুগির চিকিৎসা করতে পারিনা। সাপে কাটা রুগিকে আমরা যে এন্টিভেনাম ইনজেকশন পুশ করি সেটি প্রয়োগ করার পর রুগির শরিরে এলার্জী সহ নানাবিধ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পাতে। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া পরবর্তী যে ব্যাবস্থাপনা সেটি আমাদের নেই তাই আমরা সাপে কাটা রুগির চিকিৎসা দিতে পারিনা।

24ghonta-google-news
24ghonta-google-news