কলেজ পড়ুয়া দুই উদ্যোক্তা

দুর্গম গ্রামে রুপাই ভ্যালীর কৃষি বিপ্লব

নিরাপদ সবজি উৎপাদনকারী জাতীয় শ্রেষ্ঠ পুরষ্কার ২০২২

  |  রবিবার, নভেম্বর ১৩, ২০২২ |  ৩:৪২ অপরাহ্ণ
24ghonta-google-news

ফটিকছড়ি প্রতিনিধিঃ কলেজ পড়ুয়া দুই বন্ধু আব্দুল হালিম ও ওসমান গণি। করোনার বন্ধে বাড়ি ফিরে বেকার। তারা ফটিকছড়ির দুর্গম সীমান্তবর্তী ১নং বাগান বাজার ইউনিয়নে চিকনেরখীল গ্রামের বাসিন্দা। আব্দুল হালিম অনার্স শেষ করে এখন মাস্টার্সের প্রাইভেট ছাত্র আর মো: ওসমান গণি অনার্সের ছাত্র।

তাদের উদ্যোগের আজ সারা দেশেই ছিনে রুপাই ভ্যালী দেশ সেরা কৃষি উদ্যোক্তা। করোনা মহামারী কারো জন্য অভিষাপ হলেও তাদের জন্য আর্শীবাদ বলে মনে করছেন তারা।

24ghonta-google-news

সম্প্রতি নির্বিষ সবজি উৎপাদনকারী সফল কৃষক হিসেবে জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ কৃষকের সন্মান – স্বীকৃতিও লাভ করেছেন তারা। চট্টগ্রাম জেলা পর্যায়েও তারা সম্মাননা পেয়েছেন। লেখাপড়া শেষ করে সরকারি চাকুরি বা প্রবাসীর স্বপ্ন ছুঁড়ে ফেলে এখন তাদের চোখে শুধু মাঠভরা সবুজ সবজি খেত তৈরী ও বাজারজাত করণের লক্ষ্য এবং মানুষকে নির্বিষ-নিরাপদ শাকসবজি খাওয়ানোই তাদের একমাত্র লক্ষ্য ও প্রচেষ্টার সংকল্প।

২০২০ সালে করোনার ছোবলে যখন সব কিছু অচল হয়ে পড়ে, তখন কলেজ ছেড়ে নিজ গ্রামে ফিরেন তারা। অলস-অবসর সময় কাটানোর চিন্তা থেকে মাথায় আসে চাষাবাদের । দুই বন্ধু মিলে গ্রামের কিছু এক ফসলী ধানিজমি লিজ নিয়ে শুরু করেন সবজি চাষ। সফলতার মুখ দেখে ধীরে ধীরে তারা গড়ে তুলেন ৫ একর জমিতে রুপাই ভ্যালি এগ্রো ফার্ম নামে দিগন্তজুড়া সবুজ সবজী খেত। লাউ, চিচিঙা, ঢেড়শ, তিতাকরলা, কাকরোল, টমেটো, বেগুন ইত্যাদি সবজী ছাড়াও আছে পেঁপে বাগান। তিন বিঘা লাউ খেতের মাচায় দুলছে লাউ আর লাউ। নাইচ গ্রীণ জাতের বারোমাসি লাউয়ের ডগায় ডগায় ফুল আর ফল।

আব্দুল হালিম জানান, এ পর্যন্ত প্রায় তিন লক্ষ টাকার লাউ বিক্রি হয়েছে। গাছে আছে প্রায় ১০ হাজার লাউ। দুই বিঘা চিচিঙা খেতে এ পর্যন্ত ৬০ হাজার টাকার চিচিঙা বিক্রি হয়েছে। দেড় বিঘা পেঁপে খেতের ৫০০ গাছে এ পর্যন্ত ১৫ টন পেঁপে বিক্রি হয়েছে প্রায় ৬ লক্ষ টাকা। গাছে আছে আরও প্রায় ১০টন পেঁপে।

হালিম আরও জানান, তার প্রজেক্টে সবচেয়ে বেশী চাষ হয় কাকরোল। ৭ বিঘা জমিতে গত বছর ৭০-৮০ টন কাকরোল উৎপাদন হয়। যা বিক্রি হয় প্রায় ১২ লক্ষ টাকা। এবছর আরও বেশী উৎপাদনের আশা তাদের। আগামী মাসেই ফসল তোলা শুরু হবে। ফেনী, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন স্থান থেকে ব্যবসায়িরা এসে খেত থেকে সবজী কিনে নিয়ে যান। ফলে হাট-বাজারে নিয়ে বেচা-বিক্রি করতে হয় না।

জানা গেছে, রুপাই ভ্যালি এগ্রো ফার্মে নিরাপদ ফসল উৎপাদনের জন্য হলুদ পাতার ব্যবহার ও পেরোমোন জৈব পদ্ধতি এবং জৈব সার ব্যবহার করা হয়। এই দুটি বালাই দমন পদ্ধতির কারণে কীটনাশক ছাডাই পোকামাকড় দমন করা সহজ হচ্ছে। জৈব পদ্ধতিতে খরচও কম। কৃষি বিভাগ থেকেই নিরাপদ সবজী উৎপাদনের কলাকৌশল শেখানোসহ সব ধরণের পরামর্শ-সহায়তা দিচ্ছে।

অপর উদ্যোক্তা মো: ওসমান গণি বলেন, এখন দূর দূরান্ত হতে প্রতিদিনই উৎসুক লোকজন তাদের ফার্ম দেখতে আসেন। জাতীয় সবজী মেলা’২০২২ উপলক্ষ্যে গত ২ মার্চ সেরা নিরাপদ সবজী উৎপাদনকারি কৃষক হিসেবে তারা শ্রেষ্ঠ জাতীয় পুরুস্কার পাওয়ার পর উৎসাহি লোকজন এবং সরকারি বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারাও তাদের ফার্ম পরিদর্শনে আসছেন। অনেকে তাদের অনুপ্রেরণায় পরিকল্পিত সবজী উৎপাদন শুরু করেছেন।

এদিকে কৃষি বিভাগের উদ্যোগে স্মল হোল্ডার এগ্রিকালচারাল কম্পিটিটিভনেস প্রজেক্টের (এসএসিপি) আওতায় বিভিন্ন এলাকার প্রায় ৫০জন কৃষক গত শনিবার রুপাই ভ্যালি এগ্রো ফার্ম পরিদর্শনে আসেন। বিষ বা কীটনাশক প্রয়োগ না করে জৈব প্রযুক্তির মাধ্যমে নিরাপদ সবজী চাষের কলাকৌশল দেখে তারা বেশ উৎসাহি হোন।

পরিদর্শনে আসা দাঁতমারার কৃষক মোঃ রোকন উদ্দিন বলেন, জৈব পদ্ধতিতে চাষাবাদে সহজেই যে পোকামাকড় দমন করা যায় এখানে না আসলে বিশ্বাস করতাম না।

পাইন্দং ইউনিয়নের কৃষক মোঃ সাইফুল ইসলাম বলেন, এখানকার লাউ চাষের পদ্ধতিটি আমার কাছে খুবই ভাল লেগেছে।

ফটিকছড়ি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. হাসানুজ্জামান বলেন, সরকার নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে বেশ জোর দিয়েছে। এ অবস্থায় রুপাই ভ্যালি এগ্রো ফার্মের বিষমুক্ত নিরাপদ সবজি উৎপাদনের সফলতা সারাদেশের জন্য একটি সু সংবাদ। চাকুরির পিছে না দৌঁড়ে শিক্ষিত এ দুই তরুণ কৃষি ক্ষেত্রে যে যুগান্তকারী সফলতা অর্জন করেছেন তা অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। আমরা উপজেলার অন্যান্ন কৃষক সমিতির নেতৃত্বগুলোকে রুপাই ভ্যালী পরিদর্শন করে অভিজ্ঞতা বিনিময়েও উৎসাহীত করছি।

চট্টগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক মো: নাসির উদ্দীন চৌধুরী বলেন, শিক্ষিত তরুণ উদ্যোক্তার রুপাই ভ্যালি এগ্রো ফার্মটি এখন হাতে-কলমের প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। কীটনাশক ছাড়াও যে জৈব পদ্ধতিতে বালাই দমন করে নিরাপদ ফসল উৎপাদন করা যায কৃষকরা এখানে এসে শিখছেন। তিনি আরও বলেন, এ ফার্মের সফল তরুণ উদ্যোক্তাদের আরও বেশী অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের জন্য বিদেশে প্রশিক্ষণে পাঠানোর উদ্যোগ রয়েছে কৃষি বিভাগের।

২৪ঘণ্টা/এসএ

24ghonta-google-news
24ghonta-google-news