খুঁজুন
বুধবার, ২৭শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১৩ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অনন্ত বিহারী খীসা ও জাতির পিতার সাথে তাঁর সম্পর্ক

ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২১, ১২:১১ পূর্বাহ্ণ
অনন্ত বিহারী খীসা ও জাতির পিতার সাথে তাঁর সম্পর্ক

প্রদীপ চৌধুরী : অনন্ত বিহারী খীসা (এবি খীসা) পাহাড়ের এক নিভৃতচারী শিক্ষাবিদ। তিনযুগের অধিক শিক্ষকতার জীবন শেষ করেছেন ১৯৯৫ সনে। ১৯৩৭ সালের ৫ নভেম্বর খাগড়াছড়ি জেলার মহালছড়ি উপজেলার মুবাছড়ি নামক দুর্গম এক পাহাড়ী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শতাব্দী প্রাচীন খবংপর্যা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তাঁর পাঠশালা জীবন শুরু। পাহাড়ের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে তিনি এক নেপথ্যের প্রতিভূ। পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথম রাজনৈতিক সংগঠন ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম জন সমিতি’র গঠন প্রক্রিয়ায় তিনি তরুণ বয়সেই শামিল হয়েছিলেন। প্রয়াত কামিনী মোহন দেওয়ান জনসমিতির নেতৃত্ব দিলেও অনন্ত বিহারী খীসার প্রণোদনায় একঝাঁক তরুণ এই প্রক্রিয়ায় রাজনীতির পাঠ নেন। একই সাথে তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথম ছাত্র সংগঠন ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাত্র সমিতি’র প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন।

অনন্ত বিহারী খীসা জানান, আমি যখন ১৯৫৩ সালে রাঙ্গামাটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞানে মাধ্যমিক উত্তীর্ণ হই তখন কাপ্তাই বাঁধ দেয়ার জন্য পাকিস্তান সরকার গোপনে প্রস্তুতি নিচ্ছিল। চট্টগ্রামের ‘কানুনগোপাড়া সরকারি স্যার আশুতোষ কলেজ’-এ পড়ার সময় পাশ্ববর্তী শ্রীপুর গ্রামে পাহাড়ি ছেলেদের একটি মেস ছিল।

এখানে উল্লেখ্য যে, পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিকাংশ কীর্তিমান মানুষ এই কলেজেই পড়তেন। ছাত্র সমিতির নেতৃত্বেই তৎকালীন সরকারের কাছে শিক্ষা সংক্রান্ত দাবি দাওয়া নিয়ে অনেকগুলি স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছিল। এই কথা স্বীকার করতেই হয়, পাকিস্তান সরকার এই সকল দাবি দাওয়ার খোঁজ খবর নিতেন না। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান ‘মার্শাল-ল’ জারি করলে এই সংক্রান্ত অনেক গুরুত্বপূর্ন দলিলপত্র হারিয়ে যায়। যখন কাপ্তাই বাঁধ হয় সেই ১৯৬০ সালেই অনন্ত বিহারী খীসা খাগড়াছড়ি হাইস্কুলে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। যদিওবা ১৯৫৮ সালেই বিপুলেশ্বর চাকমার (পন্ডিত স্যার) নেতৃত্বে স্কুল যাত্রা শুরু করে। এই সময় অশোক কুমার দেওয়ান, নবীন কুমার ত্রিপুরা এই স্কুলে শিক্ষক ছিলেন।

কাপ্তাই বাঁধ প্রসঙ্গে অনন্ত বিহারী খীসা বলেন, এটি একটি জীবন্ত মরণ ফাঁদ। আজকের এই দিনে পৃথিবীর যেকোন জায়গায় এরকম একটি বাঁধ হলে বিশ্বব্যাপী আন্দোলন দানা বাঁধতো। আবেগ আপ্লুত হয়ে তিনি জানান, কাপ্তাই বাঁধের ফলে এক লক্ষ চাকমা উদ্ধাস্তু হয়ে ভারত পালিয়েছে। চুয়ান্ন হাজার একর উর্বর ভূমি পানির নিচে ডুবে গেছে। সে সময় সবচেয়ে ভাল জমির একর প্রতি ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছিল মাত্র ৬’শ টাকা। এ যেন রূপকথার গল্পকেও হার মানায়।

অনন্ত বিহারী খীসা কাপ্তাই বাঁধ চলাকালীন সময়ের জেলা প্রশাসক ছিদ্দিকুর রহমানের পত্রিকায় প্রকাশিত একটি প্রবন্ধের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন – তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের কাছে আঠাশ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ দাবি করেছিলাম। কিন্তু সরকার দিয়েছিল মাত্র এক কোটি ছিয়ানব্বই লক্ষ টাকা।

ছিদ্দিকুর রহমান লিখেন, জনচাপে আমি সরকারের কাছে আরও কিছু টাকা বরাদ্দের আবেদন জানালে সরকারের পক্ষ থেকে লিখিতভাবে জানানো হয় “ওরা জঙ্গলী লোক। জঙ্গলের ঘাস, লতা-পাতা আর আলু খেয়ে জীবন ধারণ করতে পারবে।”

অনন্ত বিহারী খীসা সত্তরোর্ধ্ব বয়সেও কাপ্তাই বাঁধের বেদনাময় স্মৃতি ভুলতে পারেননি। তিনি স্বীকার করেন, কাপ্তাই বাঁধের ফলে অনেক দুর্গম এলাকায় রাতারাতি নৌ যোগাযোগ সৃষ্টি হয়েছে। সর্বহারা চাকমাদের মাঝে শিক্ষার প্রতি অদম্য এক স্পৃহা জেগে উঠে। এই সময় পাকিস্তান সরকার বাঁধে ক্ষতিগ্রস্থ জনগোষ্ঠীর জন্য উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় বরাদ্দ দেন।

অনন্ত বিহারী খীসা কাপ্তাই বাঁধের পরিবেশগত বিপর্যয় সম্পর্কে বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম উপমহাদেশের গুরুত্বপূর্ন একটি প্রাকৃতিক সূতিকাগার ছিল। রাতারাতি বাঁধ দিয়ে এই অঞ্চলের হাজার বছরের ভৌগলিক-প্রাকৃতিক পরিবেশকে বিনষ্ট করে বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হল। তিনি উষ্মা প্রকাশ করে বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের কত শতাংশ মানুষ এখন বিদ্যুৎ পাচ্ছে। যাদের চোখের লোনা জলে কাপ্তাই বাঁধ হয়েছে সেসব অবুঝ মানুষদের কয়জন বংশধর বিদ্যুৎ প্রকল্পে চাকরি পেয়েছে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা যে প্রতিবাদ করিনি তা নয়। মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা (প্রয়াত সংসদ সদস্য এমএন লারমা) সেই সময় প্রতিবাদ করার কারণে গ্রেফতার হন। মূলত চাকমাদের সামন্ত শ্রেণী পরোক্ষভাবে পাকিস্তান সরকারের অনুকম্পাকামী হওয়ায় সাধারণ মানুষের সংগঠিত প্রতিবাদ সূচিত হতে পারেনি।

তিনি বলেন, এখন সমতলের মানুষের যতবেশী পার্বত্য অঞ্চলের খোঁজ-খবর রাখেন তখন এটা কল্পনা করা যেতনা। আমাদের যাঁরা প্রবীণ মানুষ ছিলেন তাঁরা প্রস্তাব করেছিলেন বাঁধটি আরো নীচে দিলে ক্ষয়ক্ষতি কম হত। কিন্তু তা হয়নি। সে সময়ে পাহাড়িদের সচেতন অংশ এই বাঁধ দেয়ার উদ্যোগটিকে পাহাড়ি উচ্ছেদের অংশ বলেই ধরে নিয়েছিল।

কাপ্তাই বাঁধ নির্মানে আমেরিকান দাতা সংস্থা ‘ইউএসএইড’-এর অর্থায়ন প্রসঙ্গে বলেন, তারা অবশ্যই পরোক্ষভাবে দায়ী। তবে মূলদোষী পাকিস্তান সরকারই। তিনি দৃঢ়তার সাথে মত ব্যক্ত করেন, কাপ্তাই বাঁধের মধ্য দিয়ে পাহাড়িদের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার সম্পর্কে বড় রকমের জানান হয়েছে।

অনন্ত বিহারী খীসা মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে গ্রেফতার হন। এই সম্পর্কে তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে পাহাড়ে বিশেষত চাকমাদের মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী হিসাবে চিহ্নিত করার একটা প্রবণতা লক্ষ করা যায়। দেশ স্বাধীনের আগে আগে মুক্তিবাহিনী পানছড়ি, জোরমরম, ভাইবোনছড়াসহ বেশ কিছু এলাকায় মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী এবং পাকিস্তানপন্থি আখ্যা দিয়ে চাকমাদের উপর ব্যাপক গণহত্যা চালায়। এই গণহত্যায় পৈশাচিকতার মাত্রা এত ভয়াবহ ছিল যে আহত লোকজন হাসপাতালে পর্যন্ত ভর্তি হওয়ার সাহস করেনি। গোপনে এসকল মূমুর্ষ মানুষদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করার অভিযোগে আমাকে মিথ্যা মামলায় জেল খাটানো হয়েছে। অনেকটা জনপ্রতিক্রিয়ার চাপেই আমাকে মুক্তি দিতে হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধকালীন চাকমাদের ভূমিকা সম্পর্কে তিনি বলেন, চাকমাদের রাজনৈতিক সচেতন অংশ গোড়া থেকেই পাকিস্তান বিরোধী দলে ছিল। এমনকি ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের সময়ও রাঙামাটিতে ভারতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়েছিল। পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসমিতি ১৯৪৯-৫০ সালেও কামিনী মোহন দেওয়ান এবং স্নেহ কুমার চাকমা’র নেতৃত্বে পাকিস্তান বিরোধী আন্দোলন করেছিলেন। এখানে সবার জানা থাকার কথা যে চাকমা ও বোমাং রাজপরিবার পাকিস্তানমুখী ছিলেন। তখন সাধারণ পাহাড়িদের মাঝে রাজপরিবারগুলোর ব্যাপক প্রভাব ছিল। অনেকটা রূপকথার রাজার মত।

চাকমাদের ব্যাপক অংশের মুক্তিযুদ্ধে অংশ না নেওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তৎকালীন পার্বত্য চট্টগ্রাম আওয়ামীলীগের সেক্রেটারী ছিলেন সাইদুর রহমান নামের এক পাহাড়ি বিদ্বেষী মানুষ। যদিওবা চারু কুমার চাকমা নামে মাত্র ঐ কমিটির সভাপতি ছিলেন। এই সময় রাঙ্গামাটির ডিসি ছিলেন হোসেন তৌফিক ইমাম প্রকাশ এইচ টি ইমাম। চাকমা তরুণদের বেশ কয়েকটি গ্রুপ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য ট্রেনিংএ যাওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করলে সাইদুর রহমান এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে বিদায় দেয়া হয়। এমনকি রাজা ত্রিদিব চন্দ্র রায়ের নাম ধরে বলেন, চাকমারা মুসলিম লীগের দালাল। প্রথম প্রথম রাজা ত্রিদিব রায়ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষেই ছিলেন বলে মত প্রকাশ করেন অনন্ত বিহারী খীসা। যথাযথ সম্মানবোধের অভাবেই এই দূরত্ব তৈরী হয়েছে।

অনন্ত বিহারী খীসা উল্লেখ করেন, চাকমা সমাজের সামন্ত শ্রেণীর আত্ম-সম্মান তখন খুব প্রবল ছিল। এক পর্যায়ে পাকিস্তান আর্মিকে রাঙ্গামাটিতে রাজা ত্রিদিব রায় স্বাগত জানালে চাকমাদের বিপুল অংশ মুক্তিযুদ্ধের প্রতি নিস্পৃহ হয়ে উঠে এবং রাজা নিজে ‘জাতিসংঘ মিশন’-এ পাকিস্তানের প্রতিনিধিত্ব করেন।

মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনীতির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রথম সংবিধানে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর স্বীকৃতি দাবি জানান তৎকালীন সংসদ সদস্য এম এন লারমা। একই সাথে চারু কুমার চাকমার নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে বেশ কিছু দাবি দাওয়া তুলে ধরা হয়। এরকম একটা প্রতিনিধি দলে আমিও (অনন্ত বিহারী খীসা) ছিলাম কিন্তু সংসদে এবং সংসদের বাইরে এইসব দাবিকে প্রত্যাখান করা হয়েছে। শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের সামনেই এমএন লারমা ও চারু কুমার চাকমাকে বোঝানোর চেষ্টা করেন, ‘আমি কাউকে পৃথক করার চিন্তা করছি না। আমি পাহাড়ি-বাঙালি সকলকে সমানভাবে দেখার স্বপ্ন দেখছি’।

অনন্ত বিহারী খীসা জানান, এই সময়ে আমরা একটি স্বতন্ত্র আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের প্রয়োজন বোধ করি। আমার বাসায় বেশ কয়েকটি বৈঠকের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত হয়, আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি আমরা জাতীয় রাজনীতিতেও সমানভাবে অংশ নেব। দেশ স্বাধীনের একটু আগে আমাকে সভাপতি এবং সন্তু লারমাকে সম্পাদক করে ‘ট্রাইবেল ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশন’ গঠনের পর সবাই দ্রুত দল গঠনে মনোযোগ দেন। ‘৭২ সালের কোন এক দিনের রাঙ্গামাটির ইন্দ্রপুরী সিনেমা হলে পাহাড়ের বিশিষ্টজনদের নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে গঠিত হয় পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি। সে সময় নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনকেই বেছে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তরুণদের একটি অংশ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়েই গোপনে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিল।

অনন্ত বিহারী খীসা মনে করেন, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন এবং পরবর্তী সময়ে পাহাড়িদের উপর পাহাড়ি রাজাকারদের অত্যাচার দমন ও পাড়ায় পাড়ায় শান্তি প্রতিষ্ঠায় সংগঠিত তরুণরাই পরবর্তীতে সময়ের প্রয়োজনে শান্তিবাহিনীরূপে আবির্ভূত হয়।

বাকশাল- এ যোগদান প্রসঙ্গে অনন্ত বিহারী খীসা বলেন, ‘বাংলাদেশের তৎকালীন বাস্তবতায় বাকশালের প্রয়োজনীয়তা ছিল’। হঠাৎ খবর এলো এনএম লারমা বাকশালে যোগ দিয়েছেন। তিনিই আমাকে বাকশালে যোগ দেয়ার আহ্বান জানান- ‘শেখ মুজিব আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলেছেন, আমি আগে তোমাদের সম্পর্কে ভুল জেনেছি। আমি তোমাদের জন্য কিছু করতে চাই।’

অনন্ত বিহারী খীসা আরও বলেন, একদিন হঠাৎ করেই খবর এলো মং রাজা মং প্রু সাইন খাগড়াছড়ির গভর্নর আর আমি বাকশালের সেক্রেটারি মনোনীত হয়েছি। তার একদিন পরেই খাগড়াছড়ির এসডিও স্কুলেই আমাকে সংবর্ধিত করলেন। এই সময়ে ছাত্ররা বাধ সাধল আমি যেন স্কুল ছেড়ে না যাই। তখন আমি ছাত্রদের আশ^স্ত করে বলি, যদি শিক্ষকতা ছেড়ে দিতে হয় তাহলে আমি বাকশাল ছেড়ে দেব। অনন্ত বিহারী খীসা পঁচাত্তর পরবর্তী পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি সম্পর্কে বলেন, এটি একটি রক্তাক্ত সময়। বিপুল পরিমাণ সমতলের দরিদ্র বাংলাভাষিকে পাহাড়ে পুর্নবাসন করা হয়। যা এখনও পর্যন্ত অব্যাহত আছে।

তিনি প্রখ্যাত সাংবাদিক সুবীর ভৌমিকের বইয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, জনসংখ্যা দিয়ে স্বল্প জনসংখ্যাকে নিঃশেষ করার এমন জঘন্য ঘটনা একমাত্র বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামেই ঘটেছে। পৃথিবীতে ঈসরাইল ছাড়া আর কোথাও এর নজির পাওয়া যাবেনা। অনন্ত বিহারী খীসা মিজোরামসহ ভারতে বিভিন্ন রাজ্যে চলমান বিদ্রোহ দমনেও এরকম ‘এথেনটিক ক্লিনজিং পলিসি’ নেওয়া হয়নি বলে মত দেন।

তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামে নিয়ে আসা বাংলা ভাষীদের প্রসঙ্গে বলেন, বিভিন্ন প্রলোভণ দেখিয়ে সরকার তাঁদের নিয়ে আসলেও তাঁদের সাথে প্রতারণা করা হয়েছে। তাঁরা এখনও অসহায়। শুধুমাত্র রেশন দিয়ে এত দীর্ঘ সময় এরকম জনগোষ্ঠীকে পালনের উদাহরণও একমাত্র বাংলাদেশেই হয়েছে। তিনি মনে করেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে সরকার দরিদ্র পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর সাথে দরিদ্র বাংলাভাষীদের সংঘাত লাগিয়ে দিয়ে প্রকৃত সমস্যাকে আড়াল করার চেষ্টা করছে।

তিনি ১৯৮৯ সালে গঠিত ‘স্থানীয় সরকার পরিষদ (বর্তমানে পার্বত্য জেলা পরিষদ) প্রসঙ্গে বলেন, পরিষদ গঠন প্রক্রিয়ায় আমি প্রথম দিকে সক্রিয় ছিলাম। কিন্তু যখন দেখলাম, এই পরিষদ গঠন প্রক্রিয়ায় কোন স্বাধীন মতামত দেওয়া যাচ্ছিলনা তখন আমি নিস্ক্রিয় হয়ে পড়ি। অন্য এক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তৎকালীন ব্রিগেড কমান্ডার সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম আমার উপর খুবই রুষ্ট হয়েছিলেন।

পার্বত্য চুক্তি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, চুক্তির পরে অনেক কিছুই হওয়ার কথা ছিল। আশা করেছিলাম অনেক সমস্যার উত্তরণ ঘটবে। চুক্তি স্বাক্ষরের প্রায় একযুগপূর্তি হলেও মনে হচ্ছে যেন, পরিস্থিতি এখন চুক্তির আগের চেয়েও খারাপ। আশাবাদী হওয়ার মত কিছুইতো ঘটেইনি বরং যারা জীবনের মূল্যবান সময়গুলো যুদ্ধে অতিবাহিত করেছেন তাঁদের অনেকেই আজ হতাশ। তবে পার্বত্য চুক্তির বাস্তবায়ন হলে তিনি খারাপ কিছু দেখেন না বলে মত ব্যক্ত করেন।

পার্বত্য অঞ্চলের দুই আঞ্চলিক দল জনসংহতি সমিতি ও ইউপিডিএফ-এর মধ্যকার রক্তাক্ত হানাহানি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অস্ত্রের ভাষায় কোন রাজনীতি হতে পারে না। আমি গোড়া থেকেই আত্মঘাতী সংঘাতের বিপক্ষে। মূলত সরকার পাহাড়ে সশস্ত্র সংঘাত দমনের সূত্র ধরেই সমতলের মানুষদের রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে পাহাড়ে নিয়ে এসেছেন।

তিনি এখনও মনে করেন, যেকোন ধরনের অস্ত্র নির্ভর রাজনীতি পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসীদের জন্য সুফল বয়ে আনবে না। জনসংহতি সমিতি ও ইউপিডিএফ-এর ঐক্য কামনা করে তিনি বলেন, সাধারণ মানুষ হানাহানির ফলে চরম ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। গত দশ বছরে পাঁচ শতাধিক মানুষ একে অপরের হাতে নিহত হয়েছে। প্রতিবন্ধী হয়েছে অনেকেই। ঘর-বাড়ি পোড়ানো, উদ্ধাস্তু হওয়া আর জীবনের অনিশ্চয়তা পাহাড়িদের জীবন আজ বিপর্যস্ত।

তিনি বলেন, আমরা প্রথম থেকেই ঐক্যের উদ্যোগ নিয়েছিলাম। সে প্রক্রিয়ায় প্রয়াত এমপি উপেন্দ্র লাল চাকমা ও প্রয়াত শিক্ষাবিদ নবীন কুমার ত্রিপুরাও নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। অন্তত দুটি রাজনৈতিক দল ইস্যুভিত্তিক ঐক্য ও গণতান্ত্রিক কর্মসূচিতে এক হলে পুরো পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষ উপকৃত হবে।

বাংলাদেশের সার্বিক রাজনীতি ও সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশের ভালো মানুষরা এখন রাজনীতিতে অসহায়। এই অবস্থার উত্তরণ ঘটাতে সৎ, অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল মানুষদের ইস্পাত কঠিন ঐক্য এখন জরুরী। তিনি সর্বশেষ মন্তব্য করেন, জীবন আমাদের নয়। সাংবাদিক কুররাতুল আইন তাহমিনার একটা উদ্ধৃতিই পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য সময় উপযোগী মনে করেন অনন্ত বিহারী খীসা। আর সেই প্রিয় উক্তিটি তিনি উচ্চারণ করেন এভাবে, “বলির পাঁঠা যার- তাঁকে লেজে কাটা আর মুড়োই কাটার সার্বিক অধিকার তারই আছে।”

(সাক্ষাৎকারটি নেয়া হয়েছে বিগত ২০০৮ সালের মাঝামাঝি। এটি কিছু অংশ ওই সময়ে মঈনুল আহসান সাহেবের সম্পাদিত জনপ্রিয় সাপ্তাহিক ২০০০ নামক পত্রিকায় আংশিক প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু ইতিহাস ও সমকালীন বাস্তবতায় সাক্ষাৎকারটি গুরুত্ব এখানে বিদ্যমান। পাঠমনস্ক পাঠকদের কথা মাথায় রেখে কিছু অপ্রিয় সত্য উহ্য রেখে এটি আবারও পূর্ণাঙ্গরূপে প্রকাশ করা হলো। আশা করি এটি ইতিহাসের অংশ হয়ে উঠবে।)

প্রদীপ চৌধুরী: সভাপতি, খাগড়াছড়ি সাংবাদিক ইউনিয়ন (কেইউজে/ রেজি: নং- চট্ট ২৮০৮)

Feb2

তাকওয়া অবলম্বনের আহ্বান ও মুসলমানদের ঐক্যের জন্য দোয়া

ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২৬ মে, ২০২৬, ৭:৫৯ অপরাহ্ণ
তাকওয়া অবলম্বনের আহ্বান ও মুসলমানদের ঐক্যের জন্য দোয়া

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু

সব প্রশংসা আল্লাহর, যিনি সর্ব কর্তৃত্বময়, নিষ্কলুষ, নিরাপত্তা ও শান্তি দানকারী, ‍যিনি মুসলমানদের ওপর তার সম্মানিত ঘরের হজ ফরজ করেছেন, হজকে দ্বীনের অন্যতম স্তম্ভ বানিয়েছেন। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, যিনি সর্বময় জ্ঞান ও ক্ষমতার অধিকারী। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আমাদের নেতা ও নবি মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহর বান্দা ও রাসুল, যিনি সব সৃষ্টির সেরা। তাঁর ওপর, তাঁর পরিবার-পরিজন, সঙ্গী-সাথী এবং অনুসারীদের ওপর বর্ষিত হোক সর্বোত্তম সালাত ও পূর্ণাঙ্গ সালাম।

আম্মা বা’দ

হে মানবসকল! আপনারা তাকওয়া অবলম্বন করুন। কারণ তাকওয়ার মাধ্যমেই পরকালে বান্দার মুক্তি লাভ সম্ভব। আল্লাহ তাআলা সুরা হজের শুরুতে এরশাদ করেছেন, ‘হে মানবসকল! তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় করো; নিশ্চয়ই কেয়ামতের ভূকম্পন এক ভয়ানক ব্যাপার। যে দিন তোমরা তা প্রত্যক্ষ করবে, সেদিন প্রত্যেক স্তন্যদাত্রী মা তার দুগ্ধপোষ্য সন্তানকে ভুলে যাবে এবং প্রত্যেক গর্ভবতী নারীর গর্ভপাত হয়ে যাবে। মানুষকে তুমি দেখবে মাতালসদৃশ অথচ তারা মাতাল নয়; বস্তুত আল্লাহর আজাব বড়ই কঠিন।’

তাকওয়ার পথ হলো, নেক আমল করা এবং সব ধরনের পাপাচার ও মন্দ কাজ বর্জনের মাধ্যমে কেয়ামত দিবসের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, ‘তা এই জন্য যে, আল্লাহই সত্য এবং তিনিই মৃতকে জীবিত করেন এবং তিনি সর্ব বিষয়ে সর্বশক্তিমান। আর এজন্য যে, কেয়ামত অবশ্যই আসবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই এবং কবরে যারা আছে আল্লাহ তাদের পুনরুত্থিত করবেন।’

পরকালের জন্য সবচেয়ে বড় প্রস্তুতি হলো, তাওহিদের অনুসারী হওয়া, একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করা এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও ইবাদত না করা। মানুষ কীভাবে আল্লাহকে ছেড়ে এমন কিছুর ইবাদত করে বা তাকে ডাকে, যা তার কোনো ক্ষতিও করতে পারে না, উপকারও করতে পারে না? এটাই তো চরম পথভ্রষ্টতা। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘সে এমন কিছুকে ডাকে যার ক্ষতি তার উপকার অপেক্ষা নিকটতর। কতই না নিকৃষ্ট এই অভিভাবক এবং কতই না নিকৃষ্ট এই সঙ্গী!’

আল্লাহ তাআলা আরও ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে শরিক করে, সে যেন আকাশ থেকে আছড়ে পড়ল, অতঃপর পাখি তাকে ছোঁ মেরে নিয়ে গেল অথবা বাতাস তাকে উড়িয়ে নিয়ে কোনো দূরবর্তী নির্জন স্থানে নিক্ষেপ করল।’

ইমানদারদের আসল স্লোগান হলো আল্লাহর তাওহিদ। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন, ‘তোমাদের ইলাহ তো একমাত্র ইলাহ, কাজেই তোমরা তাঁরই অনুগত হও এবং সুসংবাদ দাও বিনীতদের; যাদের অন্তর আল্লাহর নাম স্মরণ করা হলে কম্পিত হয়, যারা তাদের বিপদ-আপদে ধৈর্য ধারণ করে, নামাজ কায়েম করে এবং আমি তাদের যে রিজিক দিয়েছি তা থেকে ব্যয় করে।’ এগুলোই দ্বীনে ইসলামের মূল রোকন—তাওহিদ তথা আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর রাসুল—এই সাক্ষ্য দেওয়া, নামাজ কায়েম করা, জাকাত আদায় করা, রমজানের রোজা রাখা এবং আল্লাহর পবিত্র ঘরের হজ করা।

এর সাথে রয়েছে আল্লাহ তাআলাকে ভয় করার উপদেশ; আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার প্রতিপালকের সামনে দাঁড়ানোকে ভয় করে, তার জন্য রয়েছে দুটি জান্নাত।’ এবং আল্লাহর আনুগত্যের ওপর ও কষ্টদায়ক তাকদিরের ওপর ধৈর্য ধারণ করার উপদেশ; ইরশাদ হয়েছে, ‘ধৈর্যশীলদের তো তাদের পুরস্কার পুরোপুরি দেওয়া হবে বিনা হিসাবে।’ একইসাথে আল্লাহর নেয়ামতের জন্য তাঁর শুকরিয়া আদায় করা; ইরশাদ হয়েছে, ‘এভাবে আমি সেগুলোকে (কোরবানির পশু) তোমাদের অনুগত করে দিয়েছি যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো।’

সৃষ্টিজগতে আল্লাহর কিছু চিরন্তন নিয়ম রয়েছে, বান্দার উচিত সেগুলোর ওপর ঈমান আনা এবং তা থেকে শিক্ষাগ্রহণ করা। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ মুমিনদের রক্ষা করেন; আল্লাহ কোনো বিশ্বাসঘাতক অকৃতজ্ঞকে পছন্দ করেন না।’ তিনি আরও বলেছেন, ‘যে আল্লাহকে সাহায্য (আল্লাহর দ্বীনকে) করবে, আল্লাহ অবশ্যই তাকে সাহায্য করবেন; নিশ্চয়ই আল্লাহ পরম শক্তিমান, পরাক্রমশালী।’ আল্লাহর নিয়মের মধ্যে আরও রয়েছে তাঁর এই বাণী: ‘কত জনপদ আমি ধ্বংস করেছি যেগুলোর বাসিন্দারা ছিল জালেম, তাই এসব জনপদ তাদের ঘরের ছাদসহ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল, কত কূপ পরিত্যক্ত হয়েছে এবং কত সুদৃঢ় প্রাসাদ ধ্বংস হয়েছে!’ অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, ‘কত জনপদকে আমি অবকাশ দিয়েছি এই অবস্থায় যে তা ছিল জালেম, অতঃপর আমি তাকে পাকড়াও করেছি এবং আমার কাছেই তো ফিরে আসতে হবে।’

মহান আল্লাহ তাঁর খলিল ইবরাহিমকে (আ.) হজের আজান বা ঘোষণা দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে ইরশাদ করেছেন, ‘এবং মানুষের মধ্যে হজের ঘোষণা দাও; তারা তোমার কাছে আসবে পায়ে হেঁটে এবং সর্বপ্রকার কৃশকায় উটের পিঠে আরোহণ করে, দূর-দূরান্তের পথ অতিক্রম করে। যাতে তারা তাদের কল্যাণের স্থানসমূহে উপস্থিত হতে পারে এবং নির্দিষ্ট দিনগুলোতে আল্লাহর নাম স্মরণ করতে পারে—তিনি তাদের যে চতুষ্পদ জন্তু রিজিক হিসেবে দিয়েছেন তার ওপর।’

হজের দিনগুলোতে যে ব্যক্তি তাড়াহুড়ো করে দুদিনে চলে যাবে তার কোনো পাপ নেই এবং যে বিলম্ব করবে তারও কোনো পাপ নেই। তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং জেনে রাখো, তোমাদের তাঁর কাছেই সমবেত করা হবে। হজের সফর শেষ করে ফেরার পূর্বে রয়েছে বিদায়ী তাওয়াফ।

আল্লাহ তাআলা আপনাদের মনোনীত করেছেন এবং দ্বীনের ব্যাপারে আপনাদের ওপর কোনো সংকীর্ণতা বা কঠিন নিয়ম চাপিয়ে দেননি; এটা আপনাদের পিতা ইবরাহিমের মিল্লাত। তিনি পূর্বে আপনাদের নাম ‘মুসলিম’ রেখেছেন; যাতে রাসুল আপনাদের জন্য সাক্ষী হন এবং আপনারা সাক্ষী হন মানবজাতির জন্য। অতএব আপনারা নামাজ কায়েম করুন, জাকাত আদায় করুন এবং আল্লাহকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরুন; তিনিই আপনাদের অভিভাবক, কত উত্তম অভিভাবক এবং কত উত্তম সাহায্যকারী!

আল্লাহকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরার অন্যতম উপায় হলো, বেশি বেশি আল্লাহর কাছে দোয়া করা, বিশেষ করে হজের আমলসমূহ পালন করার সময়। কারণ এগুলো দোয়া কবুলের উপযুক্ত সময় ও জায়গা। হাদিস শরিফে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সর্বোত্তম দোয়া হলো আরাফা দিবসের দোয়া। আর আরাফার দিন আমি ও আমার পূর্ববর্তী নবীগণ যে সর্বোত্তম বাক্যটি বলেছি, তা হলো, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারীকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু, ওয়া হুওয়া আলা কুল্লি শাইয়িন ক্বাদীর (অর্থাৎ: আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, তিনি একক, তাঁর কোনো শরিক নেই, রাজত্ব একমাত্র তাঁরই এবং সমস্ত প্রশংসাও তাঁরই, আর তিনি সব বিষয়ে সর্বশক্তিমান)।’

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, ‘তোমাদের প্রতিপালক বলেন, তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব। যারা অহংকারবশত আমার ইবাদত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তারা অবশ্যই লাঞ্ছিত হয়ে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।’ অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, ‘তাদের মধ্যে কেউ কেউ বলে, হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের দুনিয়াতেও কল্যাণ দান করুন এবং আখেরাতেও কল্যাণ দান করুন এবং আমাদের জাহান্নামের আজাব থেকে রক্ষা করুন। তাদেরই জন্য রয়েছে তাদের আমলের প্রতিদান এবং আল্লাহ দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী।’

হে আল্লাহ! আপনি হাজিদের দোয়া ও ইবাদত কবুল করুন, তাদের জন্য হজের সব আমল সহজ করে দিন, তাদের গুনাহ ও ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করুন এবং তাদের নিরাপদে সওয়াব ও সফলতার সাথে নিজ নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার তওফিক দিন।

হে আল্লাহ! আপনি মুসলমানদের সংকট ও দুরবস্থা দূর করে দিন এবং সত্যের ওপর তাদের ঐক্যবদ্ধ করুন। হে আল্লাহ! আপনি মুসলমানদের সংকট ও দুরবস্থা দূর করে দিন এবং সত্যের ওপর তাদের ঐক্যবদ্ধ করুন। হে আল্লাহ! আপনি মুসলমানদের সংকট ও দুরবস্থা দূর করে দিন এবং সত্যের ওপর তাদের ঐক্যবদ্ধ করুন। আপনি তাদের সব বিষয়ের দায়িত্ব নিন এবং তাদের দ্বীন ও দুনিয়ার সার্বিক অবস্থা কল্যাণময় করে দিন।

হে রাব্বুল আলামীন! হে আল্লাহ! আপনি খাদেমুল হারামাইন ওয়াশ-শরিফাইন বাদশাহ সালমান বিন আব্দুল আজিজ এবং যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে তাদের যাবতীয় কর্তব্য যথাযথভাবে পালন করার তওফিক দান করুন এবং দুনিয়া ও আখেরাতে তাদের উত্তম প্রতিদান দিন। নিশ্চয়ই তারা আপনার বান্দাদের প্রতি ইহসান করেছেন, হাজিদের জন্য হজের সব ইবাদত সহজ করে দিয়েছেন এবং হারামাইন শরিফাইনের খেদমতে ও আগত মেহমানদের সেবায় অকাতরে ব্যয় করেছেন। আপনি তাদের মাধ্যমে আপনার দ্বীনকে বিজয়ী করুন। হে আল্লাহ! আপনি তাদের মাধ্যমে আপনার দ্বীনকে সাহায্য করুন। আমাদের নেতা ও নবি মুহাম্মাদের (সা.) ওপর, তাঁর পরিবার ও সঙ্গী-সাথীদের ওপর আল্লাহর রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক।

হজের খুতবা (২০২৬) দিয়েছেন: শায়খ আলী আল হুজাইফি, মসজিদে নববির খতিব ও বিশ্বখ্যাত প্রবীণ আলেম।

জঙ্গল সলিমপুরে হামলার ঘটনায় নিজেদের দুর্বলতা স্বীকার করলেন র‍্যাব মহাপরিচালক

ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২৬ মে, ২০২৬, ৩:১৫ অপরাহ্ণ
জঙ্গল সলিমপুরে হামলার ঘটনায় নিজেদের দুর্বলতা স্বীকার করলেন র‍্যাব মহাপরিচালক

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের দুর্গম জঙ্গল সলিমপুরে ইয়াসিন বাহিনীর অতর্কিত হামলার ঘটনায় আগে থেকে যথাযথ নজরদারি করতে না পারার কথা স্বীকার করেছেন র‍্যাবের মহাপরিচালক আহসান হাবীব পলাশ।

মঙ্গলবার (২৬ মে) জাতীয় ঈদগাহে ঈদের জামাতের নিরাপত্তা ব্যবস্থা পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন তিনি।

র‍্যাব ডিজি বলেন, ‘জঙ্গল সলিমপুরে র‍্যাব এবং পুলিশের চৌকি ছিল। ঠিকভাবেই কাজ করা হচ্ছিল। তবে আমাদের কিছু দুর্বলতা ছিল। সেভাবে মনিটর করতে পারিনি।’

মহাপরিচালক বলেন, ‘কোনোভাবেই ইয়াসিন বাহিনী বা অবৈধ দখলদার কেউ জঙ্গল সলিমপুরে প্রবেশ করতে পারবে না, টিকতেও পারবে না। আমরা তাদেরকে যেভাবেই হোক উচ্ছেদ করবই। এ পর্যন্ত ৩০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এমন কোনো শক্তি নেই যে, সেখানে নতুন করে ঢুকতে পারবে।’

ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের কথাও জানান র‍্যাব মহাপরিচালক। তিনি বলেন, ঈদের জামাত ঘিরে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। গোয়েন্দা নজরদারি, রাতের টহল ও নিরাপত্তা চৌকি বাড়ানো হয়েছে।

এ ছাড়া ঘরমুখো মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। কোরবানির পশুবাহী ট্রাক জোরপূর্বক কোনো হাটে নিতে না পারে, সে বিষয়েও র‍্যাব সতর্ক রয়েছে। পাশাপাশি ফাঁকা ঢাকায় চুরি-ছিনতাই ঠেকাতে দিন-রাত বাড়তি পেট্রোল টিম মোতায়েন করা হয়েছে।

পবিত্র হজ আজ

ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২৬ মে, ২০২৬, ৯:০২ পূর্বাহ্ণ
পবিত্র হজ আজ

আজ মঙ্গলবার পবিত্র হজের দিন। ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হাম্‌দা ওয়ান নি’মাতা লাকা ওয়াল মুল্‌ক, লা শারিকা লাক’… ধ্বনি-প্রতিধ্বনিতে মুখরিত পবিত্র আরাফাতের ময়দান। যার অর্থ: ‘আমি হাজির। হে আল্লাহ! আমি হাজির। তোমার কোন শরিক নেই। সব প্রশংসা ও নিয়ামত শুধুই তোমার। সাম্রাজ্য তোমারই। তোমার কোন শরিক নেই।’

বিশ্ব মুসলিমের মহাসম্মিলন পবিত্র হজ। আজ প্রভাত থেকে আরাফার আদিগন্ত মরু প্রান্তর এক অলৌকিক পুণ্যময় শুভ্রতায় ভরে উঠেছে। সফেদ-শুভ্র দুই খণ্ড কাপড়ের এহরাম পরিহিত হাজিদের অবস্থানের কারণে সাদা আর সাদায় একাকার। পাপমুক্তি আর আত্মশুদ্ধির আকুল বাসনায় ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা ইসলামের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ এই পবিত্র হজ পালন করছেন।

আজ ফজরের পর গোটা দুনিয়া থেকে আগত ২০ লক্ষাধিক মুসলমান ঐতিহাসিক আরাফাতের ময়দানে উপস্থিত হয়েছেন। এর মধ্যে বাংলাদেশি হজযাত্রীর সংখ্যা ৭৮ হাজারের বেশি।

আজ ৯ জিলহজ মূল হজের দিন তারা এখানে সূর্যাস্ত পর্যন্ত অবস্থান করবেন। চার বর্গমাইল আয়তনের এই বিশাল সমতল মাঠের দক্ষিণ দিকে মক্কা হাদা তায়েফ রিং রোড, উত্তরে সাদ পাহাড়। সেখান থেকে আরাফাত সীমান্ত পশ্চিমে আরো প্রায় পৌনে ১ মাইল বিস্তৃত। মুসলমানদের অতি পবিত্র এই ভূমিতে যার যার মতো সুবিধাজনক জায়গা বেছে নিয়ে তারা ইবাদত করবেন; হজের খুতবা শুনবেন এবং জোহর ও আসরের নামাজ আদায় করবেন। আরাফার ময়দানের মসজিদে নামিরায় জোহরের নামাজের আগে এ বছর পবিত্র হজের খুতবা দেবেন মদিনার মসজিদে নববির ইমাম ও খতিব শায়খ আলী বিন আবদুর রহমান আল-হুজাইফি।

সূর্যাস্ত পর্যন্ত তারা আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করে আল্লাহ তা’আলার জিকির আসকার ইবাদতে মশগুল থাকবেন। অতঃপর মুযদালিফার উদ্দেশ্যে আরাফার ময়দান ত্যাগ করবেন এবং মুযদালিফায় গিয়ে মাগরিব ও এশার নামাজ এশার ওয়াক্তে একত্রে পড়বেন এবং সমস্ত রাত অবস্থান করবেন। মিনায় জামরাতে নিক্ষেপ করার জন্য ৭০টি কংকর এখান থেকে সংগ্রহ করবেন। মুযদালিফায় ফজরের নামাজ পড়ে পুনরায় মিনার উদ্দেশে রওনা হবেন। ১০ জিলহজ মিনায় পৌঁছার পর হাজিদের পর্যায়ক্রমে চারটি কাজ সম্পন্ন করতে হয়। প্রথমে মিনাকে ডান দিকে রেখে হাজিরা দাঁড়িয়ে শয়তানকে (জামারা) পাথর নিক্ষেপ করবেন। দ্বিতীয় কাজ আল্লাহর উদ্দেশ্যে পশু কোরবানি করা। অনেকেই মিনায় না পারলে মক্কায় ফিরে গিয়ে পশু কোরবানি দেন। তৃতীয় পর্বে মাথা ন্যাড়া করা। চতুর্থ কাজ তাওয়াফে জিয়ারত। জিলহজের ১১ তারিখ মিনায় রাত যাপন করে দুপুরের পর থেকে সূর্যাস্তের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে হাজিরা বড়, মধ্যম ও ছোট শয়তানের ওপর সাতটি করে পাথর নিক্ষেপ করবেন। আর এ কাজটি করা সুন্নত।

মহান আল্লাহ হজরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালামকে (আ.) নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি যেন তার সবচেয়ে প্রিয় কিছু আল্লাহর জন্য কোরবানি করেন। পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.) ছিলেন হজরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালামের সবচেয়ে প্রিয়। মিনার এই স্থানে তিনি আল্লাহকে খুশি করতে যখন নিজের সবচেয়ে প্রিয় পুত্রকে নিয়ে যান, তখন সেখানে উপস্থিত হয় শয়তান। যেটি নবি ইব্রাহিমকে আল্লাহর আদেশ অমান্য করতে প্ররোচনা দিচ্ছিল। ঐ সময় ইব্রাহিম (আ.) শয়তানকে লক্ষ্য করে পাথর নিক্ষেপ করেন। এখন হাজিরা এ স্থানে প্রতীকী শয়তানকে লক্ষ্য করে পাথর মারেন।

মক্কায় পৌঁছার পর হাজিদের একটি কাজ অবশিষ্ট থাকে। সেটি হচ্ছে কাবা শরিফ তাওয়াফ করা। একে বলে বিদায়ি তাওয়াফ। স্থানীয়রা ছাড়া বিদায়ি তাওয়াফ অর্থাত্ কাবা শরিফে পুনরায় সাত বার চক্কর দেওয়ার মাধ্যমে হাজিরা সম্পন্ন করবেন পবিত্র হজব্রত পালন।

এদিকে গতকাল সারা দিন ও রাতে হজযাত্রীরা মিনায় অবস্থান করেন। সেখানেই শুরু হয় পবিত্র হজের মূল আনুষ্ঠানিকতা। প্রতি বছর হজের সময় মুসলিমদের অস্থায়ী আবাস হিসেবে মিনায় বসানো রাখা হয়েছে লাখ লাখ তাঁবু। পবিত্র মসজিদুল হারাম থেকে প্রায় দশ কিলোমিটার অদূরের মিনা যেন তাঁবুর শহর। যেদিকে চোখ যায়, তাঁবু আর তাঁবু। তাঁবুতে প্রত্যেকের জন্য আলাদা ফোম, বালিশ, কম্বল বরাদ্দ। ফোমের নিচে বালু। মিনায় অবস্থান করা হজের অংশ। হজযাত্রীরা নিজ নিজ তাঁবুতে নামাজ আদায়সহ অন্যান্য ইবাদত বন্দেগিতে মশগুল থাকেন।

পবিত্র হজ উপলক্ষ্যে মক্কা, মদিনা, মিনা, আরাফাত ময়দান, মুজদালিফা ও এর আশপাশের এলাকায় বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে সৌদি সরকার। মোতায়েন আছে ১ লাখের বেশি নিরাপত্তাকর্মী।

এদিকে সৌদিতে গতকাল গড় তাপমাত্রা ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে। প্রখর রোদ আর প্রচণ্ড গরম। সৌদি বার্তা সংস্থা এসপিএ জানিয়েছিল, তীব্র গরমে ভোগান্তিতে পড়ছেন হাজিরা। গত বছরের প্রাণঘাতী গরমের অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে এবার কাজ করছে ৪০টিরও বেশি সরকারি সংস্থা এবং আড়াই লাখ কর্মকর্তা। এছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির সাহায্যে এবার হজ ব্যবস্থাপনায় যুক্ত হয়েছে ড্রোন ক্যামেরা ও বিশাল তথ্য বিশ্লেষণ ব্যবস্থা।