সূর্যসেনের ১২৮তম জন্মদিন উদযাপন
নেজাম উদ্দিন রানা, রাউজান (চট্টগ্রাম) : ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের অগ্নিপুরুষ মাস্টারদা সূর্যসেনের ১২৮তম জন্মদিনে মাস্টার দা’র স্মৃতি বিজড়িত রাউজানে শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় বাংলার এই সূর্য সন্তানের জন্মদিন উদযাপন করেছে রাউজানের বিভিন্ন সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান।
১৮৯৪ সালের ২২ মার্চ রাউজানের নোয়াপাড়া গ্রামে জন্ম নেয়া এই বিপ্লবীর আবক্ষয় মূর্তিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছে রাউজান পৌরসভার সব নির্বাচিত মেয়র, মাস্টার দা সূর্যসেন স্মৃতি পাঠাগার, রাউজান উপজেলা আওয়ামীলীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, রাউজান বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, মাস্টার দা সূর্যসেন স্মৃতি সংসদসহ বিভিন্ন সংগঠন।
সোমবার (২২ মার্চ) সকাল সাড়ে ১০টায় রাউজান উপজেলা সদরের সূর্যসেন চত্বরে মাস্টারদা সূর্যসেন পাঠাগারের উদ্যোগে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়।
এ সময় মাস্টার দা সূর্যসেন স্মৃতি পাঠাগারের সভাপতি শ্যামল কুমার পালিত সহ পাঠাগারের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। পরে রাউজান পৌসভার মেয়র, রাউজান উপজেলা আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগ, রাউজান কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠন বাঙালির সংগ্রামী চেতনার বাতিঘর মাস্টারদা’র আবক্ষয় মূর্তিতে প্রতি ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান।
এসময় উপস্থিত ছিলেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি আনোয়ারুল ইসলাম, রাউজান পৌরসভার মেয়র জমির উদ্দিন পারভেজ, রাউজান কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ সেলিম নেওয়াজ চৌধুরী, উপজেলা স্বেচ্ছাসেবকলীগের যুগ্ম আহবায়ক শওকত হোসেন, যুবলীগ নেতা সাবের হোসেন, আবু ছালেক, মাসুদ, পৌর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মো. আসিফ কলেজ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ফয়সাল মাহমুদ, সেন্ট্রাল বয়েজ অব রাউজানের সভাপতি সাইদুল ইসলাম, সাদারণ সম্পাদক ইমতিয়াজ জামাল নকিব, সাংগঠনিক সম্পাদক মঈনুদ্দীন জামাল চিশতি, সংগঠক মো: এরশাদ, বেলাল হোসেন সিফাতসহ অন্যান্যরা উপস্থিত ছিলেন।
পরে সূর্যসেন পাঠাগারের সামনে আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, মাস্টার দা সূর্যসেন ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে দেশপ্রেমের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। মাস্টার দা সূর্যসেন শুধু এই রাউজানের নয় তিনি বিশ্বের বুকে এক বিপ্লবী মহানায়ক হিসেবে পরিচিত।
মাস্টারদা সূর্যসেনের স্মৃতি বিজড়িত রাউজানে এই বিপ্লবী মহানায়কের স্মৃতিকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে রাউজানের সাংসদ এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীর উদ্যোগে মাস্টারদা স্মৃতি কমপ্লেক্স, মাস্টার দা’র নামকরণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, আবক্ষ মূর্তি, সূর্যসেন চত্বর, স্মৃতি পাঠাগার ও স্মৃতি তোরণ গড়ে তোলেছেন। ২০১৮ সালের ১৬ই জানুয়ারি রাউজানের মুন্সিরঘাটাস্থ মাস্টার দা সূর্যসেন স্মৃতি পাঠাগার কমপ্লেক্স, আবক্ষ মূর্তির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি। এর পূর্বে সূর্যসেন চত্বর ও তোড়ণ উদ্বোধন করেছিলেন সূর্যসেনের সহযোদ্ধা বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরী ও সাংসদ ফজলে করিম চৌধুরী। সূর্যসেনের সম্মানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি করে আবাসিক হলের নামকরণ করা হয়। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা মেট্রো বিপ্লবী এই মহানায়কের স্মরণে বাঁশদ্রোণী মেট্রো স্টেশনটির নামকরণ করেছে ‘মাস্টার দা সূর্য সেন মেট্রো স্টেশন’।
মাস্টারদা সূর্যসেনের ১৮৯৪ সালের ২২মার্চ চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার ১৩ নং নোয়াপাড়া ইউনিয়নের এক দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতর নাম রাজমনি সেন ও মাতার নাম শশী বালা। মাস্টার দা সূর্য সেন চট্টগ্রাম, মুর্শিদাবাদের বহরমপুর জেলার বহরমপুর কলেজে অধ্যায়ন করেন। পরবর্তীতে ১৯১৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি, এ পরীক্ষায় উর্ত্তীর্ণ হন। বহরমপুর কলেজে অধ্যয়ন কালে তাঁর শিক্ষক অধ্যাপক সতীশ চন্দ্র চক্রবর্তীর সংস্পর্শে গোপন বিপ্লবী সংগঠনের সঙ্গে পরিচিত হন। শিক্ষা জীবন শেষে সূর্য সেন চট্টগ্রামের দেওয়ান বাজার এলাকার “উমাতারা” উচ্চ ইংরেজী বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। এ সময় তিনি ‘মাষ্টার দা’ নামে পরিচিতি লাভ করেন। ১৯১৯ সালে কানুনগো পাড়ার নগেন্দ্রনাথ দত্তের কন্যা পুষ্প কুন্ডলার সঙ্গে প্রণয়সূত্রে আবদ্ধ হন। শিক্ষকতার পাশাপাশি সূর্যসেন অনুরূপ সেন, চারু বিকাশ দত্ত, অম্বিকা চক্রবর্তী, নগেন্দ্রনাথ সেনকে সঙ্গে নিয়ে গোপন বিপ্লবী দল গঠনের কাজ শুরু করেন। ১৯২০ সালে মহাত্মা গান্ধী কর্তৃক অসহযোগ আন্দোলন শুরু হলে গান্ধীজির অনুরোধে তিনিও অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দেন। পরে তিনি এক সময় শিক্ষকতা পেশা ছেড়ে দেন। ১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল সূর্যসেনের নেতৃত্বে বিপ্লবীরা পাহাড়তলীর ফৌজি আস্ত্রাগার দখল করেন এবং চট্টগ্রামকে স্বাধীন ঘোষণা করেন। ২২ এপ্রিল জালালাবাদ পাহাড়ে সন্মুখ যুদ্ধে মাস্টার দা’র বীরত্বপূর্ণ নেতৃত্বে ইংরেজ বাহিনীকে পরাভূত করেন। পরবর্তীতে ব্রিটিশরা সূর্যসেনকে গ্রেফতারের জন্য দশহাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেন। ইংরেজ বিরোধী আন্দোলনের অংশ হিসেবে চট্টগ্রামের অস্ত্রাগার লুন্ঠন, জালালাবাদে ইংরেজদের সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধ, ইউরোপীয় ক্লাব আক্রমণে নেতৃত্ব দান করে বিপ্লবী খেতাব লাভ করেন।
১৯৩৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি সূর্যসেন তার এক নিকট আত্মীয়ের বিশ্বাস ঘাতকতায় চট্টগ্রামের পটিয়ার গৈরালা গ্রামের ক্ষীরোদপ্রভা বিশ্বাস নাম্নী এক পৌঢ়া মহিলার বাড়িতে অবস্থান কালে গুর্খা সৈন্যের হাতে ধরা পড়েন। ১৯৩৪ সালের ১২ই জানুয়ারি চট্টগ্রাম কারাগারে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে তার মৃত্যুুদণ্ড কার্যকর করা হয়।


আপনার মতামত লিখুন