খুঁজুন
, ,

আজ জাতীয় শোক দিবস

ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: Sunday, 15 August, 2021, 3:17 am
আজ জাতীয় শোক দিবস

আজ ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস। স্বাধীনতার স্থপতি, মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪৬তম শাহাদত বার্ষিকী।

জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বাঙালি জাতি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে দিবসটি পালন করবে। তবে, এবারও বৈশ্বিক মহামারি করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯) এর কারণে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিতপূর্বক স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে জাতীয় শোক দিবসের কর্মসূচি পালন করা হবে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোর রাতে সেনাবাহিনীর কিছুসংখ্যক বিপদগামী সদস্য ধানমন্ডির বাসভবনে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে। ঘাতকরা শুধু বঙ্গবন্ধুকেই হত্যা করেনি, তাদের হাতে একে একে প্রাণ হারিয়েছেন বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিনী বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা , বঙ্গবন্ধুর সন্তান শেখ কামাল, শেখ জামাল ও শিশু শেখ রাসেলসহ পুত্রবধু সুলতানা কামাল ও রোজি জামাল।

পৃথিবীর এই জঘন্যতম হত্যাকান্ড থেকে বাঁচতে পারেননি বঙ্গবন্ধুর অনুজ শেখ নাসের, ভগ্নিপতি আবদুর রব সেরনিয়াবাত, তার ছেলে আরিফ, মেয়ে বেবি ও সুকান্তবাবু, বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক শেখ ফজলুল হক মণি, তার অন্তঃস্বত্ত্বা স্ত্রী আরজু মনি এবং আবদুল নাঈম খান রিন্টু ও কর্নেল জামিলসহ পরিবারের ১৬ জন সদস্য ও ঘনিষ্ঠজন। এ সময় বঙ্গবন্ধুর দু’কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা বিদেশে থাকায় প্রাণে রক্ষা পান।

দেশে করোনা মহামারি পরিস্থিতিতে ও জাতীয় শোক দিবসকে সামনে রেখে এ মাসের প্রথম দিন থেকেই আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনসহ বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক সংগঠন বিস্তারিত কর্মসূচি পালন করছে।

স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে জাতীয় শোক দিবসের কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে ঐতিহাসিক ৩২ নম্বরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন। বনানী কবরস্থানে শ্রদ্ধা নিবেদন। টুঙ্গিপাড়ায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিতে আওয়ামী লীগের একটি প্রতিনিধি দলের শ্রদ্ধা নিবেদন। এছাড়াও, দিবসটি উপলক্ষে দেশের সকল মসজিদ, মন্দির, গীর্জা ও প্যাগোডায় বিশেষ দোয়া ও প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হবে। ১৬ আগস্ট অনুষ্ঠিত হবে জাতীয় শোক দিবসের আলোচনা সভা।

জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ বেতার এবং বাংলাদেশ টেলিভিশন বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচার করবে। জাতীয় দৈনিক ও সাময়িকীতে ক্রোড়পত্র প্রকাশ করবে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর ও সংস্থা জাতীয় শোক দিবসের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্ব স্ব কর্মসূচি প্রণয়ন করেছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে যথাযোগ্য মর্যাদার সঙ্গে জাতীয় শোক দিবস পালনের জন্য সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিতপূর্বক স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিল আয়োজন করা হয়েছে।

মূলত, ‘৭৫ এর ১৫ আগস্ট থেকেই বাংলাদেশে এক বিপরীত ধারার যাত্রা শুরু করে। বেসামরিক সরকারকে উৎখাত করে সামরিক শাসনের অনাচারি ইতিহাস রচিত হতে থাকে।

সপরিবারে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর গোটা বিশ্বে নেমে আসে তীব্র শোকের ছায়া এবং ছড়িয়ে পড়ে ঘৃণার বিষবাষ্প। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর নোবেল জয়ী পশ্চিম জার্মানীর নেতা উইলি ব্রানডিট বলেন, মুজিবকে হত্যার পর বাঙালিদের আর বিশ্বাস করা যায় না। যে বাঙালি শেখ মুজিবকে হত্যা করতে পারে তারা যে কোন জঘন্য কাজ করতে পারে।

ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক ও বিশিষ্ট সাহিত্যিক নীরদ সি চৌধুরী বাঙালিদের ‘বিশ্বাসঘাতক’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, বাঙালি জাতির স্বপ্নদ্রষ্টা শেখ মুজিবকে হত্যার মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতি বিশ্বের মানুষের কাছে নিজেদের আত্মঘাতী চরিত্রই তুলে ধরেছে।

দ্য টাইমস অব লন্ডন এর ১৯৭৫ সালের ১৬ আগস্ট সংখ্যায় উল্লেখ করা হয় ‘সবকিছু সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধুকে সব সময় স্মরণ করা হবে। কারণ, তাঁকে ছাড়া বাংলাদেশের বাস্তব কোন অস্তিত্ব নেই। একই দিন লন্ডন থেকে প্রকাশিত ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকায় বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশের লাখ লাখ লোক শেখ মুজিবের জঘন্য হত্যাকান্ডকে অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে বিবেচনা করবে।’

শেখ মুজিবের সুচিন্তা থেকে আজকের বাঙালিরও শেখার আছে উল্লেখ করে ভারতীয় বাঙালী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন সম্প্রতি বলেছেন, তাঁকে ‘বাংলাদেশের জনক’ বা বঙ্গবন্ধু বলাটা নিতান্তই কম বলা। তিনি এর চেয়ে বড় কোনও অভিধা এবং নাম কিনতে চাননি। মানুষ তাঁকে অন্তর থেকে ভালবাসতেন।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর স্বঘোষিত প্রেসিডেন্ট খন্দকার মোস্তাক আহমেদ বিচারের হাত থেকে খুনীদের রক্ষা করতে ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স জারি করেন। পরবর্তীতে জিয়াউর রহমান ১৯৭৯ সালে ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্সকে আইন হিসেবে অনুমোদন করেন।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সুদীর্ঘ একুশ বছর পর ক্ষমতায় আসলে ১৯৯৬ সালের ১৪ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার তিন প্রধান আসামী বরখাস্ত লে. কর্নেল সৈয়দ ফারুক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী তাহের উদ্দিন ঠাকুরকে গ্রেফতার করা হয়।

একই বছরের ২ অক্টোবর বঙ্গবন্ধুর একান্ত সহকারি (পিএ) এ এফ এম মোহিতুল ইসলাম পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট সংঘটিত নারকীয় হত্যাকান্ডের ঘটনায় থানায় একটি এফআইআর করেন।

১৯৯৬ সালের ১৪ নভেম্বর খুনীদের বিচারের হাতে ন্যস্ত করতে পার্লামেন্টে ইনডেমনিটি আইন বাতিল করা হয়। ১৯৯৭ সালের ১৫ জানুয়ারি সিআইডি এই মামলায় ২০ জনকে অভিযুক্ত করে মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালতে চার্জশীট দাখিল করে এবং একই বছরের ১২ মার্চ ছয় আসামীর উপস্থিতিতে আদালতে বিচার শুরু হয়।

১৯৯৭ সালের ১৯ জুন পর্যন্ত বিচারক বিব্রত হওয়াসহ স্বাধীনতা-বিরোধী চক্রের নানা বাধার কারণে আটবার বিচার কার্যক্রম স্থগিত হয়ে যায়। এভাবে দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে ১৯৯৮ সালের ৮ নভেম্বর মামলার রায়ে বিচারক কাজী গোলাম রসুল ১৫ জন সাবেক সেনা কর্মকর্তাকে মৃত্যুদ- প্রদান করেন। অন্যদিকে, ২০০০ সালের ১৪ ডিসেম্বর হাইকোর্ট বেঞ্চ ২৪ দিনের শুনানি শেষে বিভক্ত রায় প্রদান করে। বিচারক এম রুহুল আমিন অভিযুক্ত ১৫ আসামীর মধ্যে ১০ জনের মৃত্যুদ-াদেশ বজায় রাখেন। কিন্তু অপর বিচারক এ বি এম খায়রুল হক অভিযুক্ত ১৫ জনকেই সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদ- প্রদান করেন।

পরবর্তীতে ২০০১ সালের অক্টোবরের সংসদ নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় এলে বিচার কাজ বন্ধ থাকে। দীর্ঘ ছয় বছর পর ২০০৭ সালের ২৩ আগস্ট রাষ্ট্রপক্ষের মুখ্য আইনজীবী বর্তমান সরকারের আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সুুপ্রিম কোর্টে সংক্ষিপ্ত বিবৃতি প্রদান করেন এবং ২৩ সেপ্টেম্বর আপিল বিভাগের তিন সদস্যের একটি বেঞ্চ ২৭ দিনের শুনানি শেষে ৫ আসামীকে নিয়মিত আপিল করার অনুমতিদানের লিভ টু আপিল মঞ্জুর করেন।

২০০৯ সালের ১২ নভেম্বর-২৯ দিনের শুনানির পর চূড়ান্ত আপিল শুনানি শেষ হয় এবং আদালত ১৯ নভেম্বর রায়ের তারিখ নির্ধারণ করেন। ওইদিন (১৯ নভেম্বর) বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের পাঁচ সদস্যের বেঞ্চে হাইকোর্টের দেয়া রায় বহাল রেখে মৃত্যুদ-প্রাপ্ত ৫ আসামীর দায়ের করা আপিল আবেদন খারিজ করা হয়। ২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি আপিলের রায়ের বিরুদ্ধে আসামীদের রিভিউ খারিজ হয়ে গেলে ২৮ জানুয়ারি ৫ আসামীর ফাঁসির রায় কার্যকর করে জাতিকে দায়মুক্ত করা হয়।

২০১০ সালের পর গতবছরের (২০২০) ১২ এপ্রিল ভারতে পালিয়ে থাকা বঙ্গবন্ধুর আরো একজন খুনি আবদুল মাজেদের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবার হত্যার ৪৫ বছর, নৃশংস ওই হত্যাকান্ডের মামলার ২৫ বছর এবং উচ্চ আদালতের রায়ে ৫ আসামির ফাঁসি কার্যকরের প্রায় দশ বছর পর গ্রেফতার হয় খুনি মাজেদ।

সূত্র-বাসস

Feb2
Feb2

জালিয়াতির অভিযোগে ডব্লিউএইচওর আঞ্চলিক পরিচালকের পদ ছাড়লেন হাসিনাকন্যা পুতুল

ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: Thursday, 10 September, 2026, 7:22 am
জালিয়াতির অভিযোগে ডব্লিউএইচওর আঞ্চলিক পরিচালকের পদ ছাড়লেন হাসিনাকন্যা পুতুল

জালিয়াতি ও প্রতারণার অভিযোগের তদন্তের মধ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের পরিচালকের পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন সায়মা ওয়াজেদ পুতুল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক টেড্রোস আধানম গেব্রেয়াসুসের কাছে পদত্যাগপত্র পাঠান তিনি।

বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) রয়টার্সের একটি বিশেষ প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।

সায়মা ওয়াজেদের বিরুদ্ধে চীন ভ্রমণসংক্রান্ত আর্থিক জালিয়াতি, শিক্ষাগত যোগ্যতার ভুল উপস্থাপন এবং বাংলাদেশে অবৈধভাবে জমি অধিগ্রহণের অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তিনি।

গত বছরের শেষের দিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তাকে বিনা বেতনে প্রশাসনিক ছুটিতে পাঠায়। এর আগে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তার বিরুদ্ধে জালিয়াতি ও প্রতারণার অভিযোগ দায়ের করার পর তাকে ছুটিতে পাঠানো হয়।

সায়মা ওয়াজেদ ২০২৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে পাঁচ বছর মেয়াদে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেন।

রয়টার্সের হাতে আসা ২০২৬ সালের ৩ জুলাইয়ের এক চিঠিতে সায়মা ওয়াজেদের আইনজীবীরা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে জানান, চীন ভ্রমণসংক্রান্ত আর্থিক জালিয়াতির অভিযোগটি সঠিক নয়। তাদের দাবি, নিয়মিত ক্ষতিপূরণের আবেদন প্রক্রিয়ার দায়িত্বে থাকা একজন সহকারীর প্রশাসনিক ভুলের কারণে বিষয়টি হয়েছে। ওই ঘটনায় ৯০১ ডলারের একটি অর্থের কথা উল্লেখ করা হয়।

শিক্ষাগত যোগ্যতার অভিযোগের বিষয়ে সায়মা ওয়াজেদ বলেন, বাংলাদেশে অটিজম নিয়ে কাজের জন্য তিনি একটি সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি পেয়েছেন এবং এ বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক টেড্রোস আধানম গেব্রেয়াসুসকে তিনি স্পষ্ট তথ্য দিয়েছিলেন।

অন্যদিকে, পদত্যাগপত্রে সায়মা ওয়াজেদ বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় তার দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়া হচ্ছে। এ কারণে সংস্থাটির নেতৃত্বের প্রতি তার বিশ্বাস ও আস্থা হারিয়েছে।

টেড্রোসকে পাঠানো পদত্যাগপত্রে তিনি বলেন, ‘আমার অঞ্চলের দেশগুলোর সেবা করার জন্যই আমি আঞ্চলিক পরিচালক পদে নির্বাচিত হয়েছিলাম, যা আমি আন্তরিকভাবে করে এসেছি।’

তিনি আরও বলেন, দায়িত্ব পালনে ক্রমাগত বাধা দেওয়ায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নেতৃত্বের প্রতি তিনি ‘বিশ্বাস ও আস্থা’ হারিয়েছেন। বিনা বেতনে ছুটিতে পাঠানোর সিদ্ধান্তের পর প্রায় এক বছর কোনো পারিশ্রমিক না পাওয়ায় তার আর্থিক অবস্থাও অসহনীয় হয়ে পড়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

গভীর সাগরে নতুন এলএনজি টার্মিনাল ও ১৫০ কূপ খননের পরিকল্পনা

ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: Wednesday, 9 September, 2026, 11:09 pm
গভীর সাগরে নতুন এলএনজি টার্মিনাল ও ১৫০ কূপ খননের পরিকল্পনা

গভীর সমুদ্রে নতুন এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন এবং ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে ১৫০টি নতুন কূপ খননের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জাতীয় সংসদে জরুরি জ্বালানি নিরাপত্তা ও শিল্পের ধারাবাহিক উৎপাদন নিশ্চিত করতে বিকল্প উৎস ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির সমন্বয়ে গঠিত সরকারের স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি মাস্টারপ্ল্যান তুলে ধরেন সরকারপ্রধান।

বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ-এর সভাপতিত্বে এ তথ্য জানান প্রধানমন্ত্রী।

সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে মহিলা আসন-১৭ এর সদস্য সুলতানা আহমেদ এবং মেহেরপুর-১ আসনের সদস্য মো. তাজউদ্দীন খানের পৃথক দু’টি প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী সরকার গৃহীত এসব স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপের কথা জানান।

সংসদ সদস্য সুলতানা আহমেদ তার প্রশ্নে জুলাই ২০২৬-এ একটি এলএনজি টার্মিনাল সাময়িকভাবে বন্ধ থাকায় জাতীয় গ্যাস সরবরাহে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট ঘাটতি ও শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি জানতে চান, ভবিষ্যতে এই ধরনের আকস্মিক সংকটে শিল্পখাত যাতে বড় ক্ষতির মুখে না পড়ে, সে জন্য গ্যাস সরবরাহের বিকল্প উৎস, এলএনজি রিজার্ভ সক্ষমতা, শিল্পাঞ্চলভিত্তিক অগ্রাধিকার সরবরাহ এবং জরুরি জ্বালানি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে কিনা।

জবাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানান, আকস্মিক বা সাময়িক সংকটকালে শিল্পখাত যাতে গ্যাস সংকটের সম্মুখীন না হয়, সেজন্য সরকার ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ১৫০টি কূপ খননের পরিকল্পনা নিয়েছে। একই সঙ্গে দেশীয় গ্যাসের উৎস অনুসন্ধানের লক্ষ্যে মোট ৪,৫০০ লাইন কিলোমিটার দ্বি-মাত্রিক (২ডি) এবং ৪,২০০ বর্গ কিলোমিটার ত্রি-মাত্রিক (৩ডি) সাইসমিক সার্ভে পরিচালনা করা হচ্ছে। এছাড়া সমুদ্রাঞ্চলের ২৬টি ব্লকে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান এবং উত্তোলনের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের জন্য গত ২৪ মে আন্তর্জাতিক বিডিং রাউন্ড আহ্বান করা হয়েছে, যার দরপত্র দাখিলের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে নভেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত। পাশাপাশি স্থলভাগে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে ‘বাংলাদেশ অনশোর মডেল পিএসসি ২০২৬’ প্রণয়নের কার্যক্রমও গ্রহণ করা হয়েছে।

ভবিষ্যতের গ্যাস ঘাটতি পূরণ ও এলএনজি অবকাঠামো জোরদার করার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী জানান, দেশে বিদ্যমান দুইটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মাধ্যমে বর্তমানে গড়ে দৈনিক প্রায় ৯৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হয়। ভবিষ্যতে আকস্মিক সংকট সামাল দিতে মহেশখালীর কুতুবজোমে নতুন একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল এবং মাতারবাড়িতে একটি ল্যান্ড-বেইজড এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের কার্যক্রম বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী কুতুবজোম ভাসমান টার্মিনাল থেকে ২০২৮ সালে এবং ল্যান্ড-বেইজড টার্মিনাল থেকে ডিসেম্বর ২০৩০ নাগাদ রি-গ্যাসিফাইড এলএনজি সরবরাহ করা সম্ভব হবে। এছাড়া পায়রা বা মোংলা বন্দর এলাকা কিংবা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সমুদ্র উপকূল বিবেচনায় গভীর সমুদ্রে সুবিধাজনক স্থান নির্বাচন করে জরুরি ভিত্তিতে একটি ভাসমান টার্মিনাল স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে। একই সঙ্গে ভোলার গ্যাস এলএনজি আকারে মেইনল্যান্ডে এনে আগ্রহী শিল্পে সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যেখানে অর্থনৈতিক অঞ্চল, ইপিজেড ও বিসিকের মতো পরিকল্পিত শিল্পাঞ্চলগুলো অগ্রাধিকার পাবে।

অন্য এক প্রশ্নে মেহেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. তাজউদ্দীন খান দেশের ভবিষ্যৎ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি চাহিদা পূরণ এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ বিকল্প উৎসের সমন্বিত পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চান।

জাতীয় সংসদে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের সামগ্রিক উন্নয়ন ও আগামী দিনের লক্ষ্যমাত্রা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানান, দেশজুড়ে ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের বিশাল চাহিদা মেটাতে আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর থেকে নির্ভরশীলতা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে সরকারের সবচেয়ে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। জ্বালানি খাতের রূপান্তর নিশ্চিত করতে সরকার ইতোমধ্যে ২০২৬ থেকে ২০৩০ মেয়াদে ‘জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র’ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রণয়ন করেছে।

কৌশলপত্র অনুযায়ী, সার্বিক সম্ভাবনা ও বর্তমান বাস্তবতাকে মাথায় রেখে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্তত ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে অন্তত ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে অর্জনের সুনির্দিষ্ট জাতীয় লক্ষ্য স্থির করা হয়েছে। এই লক্ষ্যের অংশ হিসেবে ২০৩০ সাল নাগাদ বিভিন্ন প্রযুক্তির মাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে বিকল্প বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা সাজানো হয়েছে। এর মধ্যে একক প্রযুক্তি হিসেবে সর্বাধিক জোর দেওয়া হয়েছে সৌরবিদ্যুতের ওপর। পরিকল্পনা অনুসারে, দেশের বাসাবাড়ি, শিল্পকারখানা ও সরকারি ভবনের ছাদ ব্যবহার করে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে ৫,৫০০ মেগাওয়াট এবং বিশালাকার ভূমিভিত্তিক সৌরপ্রকল্প থেকে আরও ৪,৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সংস্থান রাখা হয়েছে। বাকি ঘাটতি পূরণে বায়ু বিদ্যুৎ, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ, পানিবিদ্যুৎ, ভাসমান সোলার ও কৃষিভিত্তিক অ্যাগ্রিভোলটেইক্সের মতো আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে আরও ৪৫০ থেকে ৫৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ গ্রিডে যুক্ত করা হবে।

বিদ্যুৎ উৎপাদনের এই বিশাল লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়ন ও বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহী করে তুলতে সরকার আমদানিনীতি ও শুল্ক কাঠামোয় বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি অবকাঠামো তৈরির জন্য অতীব জরুরি উপাদান যেমন– সোলার প্যানেল, ইনভার্টার, বিশেষায়িত ব্যাটারি ও স্ট্রাকচার আমদানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান সমুদয় কাস্টমস ডিউটি, রেগুলেটরি ডিউটি, সম্পূরক শুল্ক, আগাম কর এবং দুই শতাংশের অতিরিক্ত অগ্রিম আয়কর সম্পূর্ণ ছাড় দেওয়া হয়েছে।

বিনিয়োগের গতি আরও ত্বরান্বিত করতে এবং সাধারণ গ্রাহকদের সম্পৃক্ত করতে সম্প্রতি একটি বিশেষ মূল্য প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখের নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ব্যাটারিসহ ছাদভিত্তিক সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় প্রতি ইউনিটে সর্বোচ্চ ৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশেষ সরকারি প্রণোদনা হিসেবে এই উৎপাদন ব্যয়ের ওপর অতিরিক্ত ২০ শতাংশ মুনাফা ও ১১.২৫ শতাংশ প্রিমিয়াম হিসাব করে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুতের দাম প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা স্থির করা হয়েছে। এই সুবিধার আওতায় নেট মিটারিং নির্দেশিকা, ২০২৫ অনুসরণ করে যেসব সাধারণ বা বাণিজ্যিক গ্রাহক ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৭ তারিখের মধ্যে ছাদভিত্তিক ব্যবস্থা স্থাপন করবেন, তারা নিজস্ব প্রয়োজন মেটানোর পর উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ বিক্রি করে টানা ৩ বছর, অর্থাৎ ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০৩০ পর্যন্ত ইউনিট প্রতি নির্ধারিত এই ১০ টাকা ৫০ পয়সা হার সুবিধা পাবেন।

সরকারি ও বেসরকারি যৌথ উদ্যোগকে সুনির্দিষ্ট আইনি ও নীতিগত কাঠামোয় আনতে সরকার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালা কার্যকর করেছে। সরকারি মালিকানাধীন ভূমিতে পিপিপি পদ্ধতিতে প্রকল্প তৈরির নির্দেশিকা ২০২৬, বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধির বিশেষ নীতিমালা ২০২৫, সার্বিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিমালা ২০২৫ এবং হালনাগাদ নেট মিটারিং গাইডলাইন ২০২৫ এরই মধ্যে মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। পাশাপাশি টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে গ্রহণ করা হয়েছে জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচি ২০২৫, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সমন্বিত সমন্বিত ব্যবসায়িক মডেল, অনশোর উইন্ড গাইডলাইন এবং কার্বন ক্রেডিট প্রক্রিয়াকরণ সংক্রান্ত পথনির্দেশিকা, যা দেশের ভবিষ্যৎ বিদ্যুৎ নিরাপত্তায় মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করবে।

তিন সন্তান নিয়ে অটোরিকশার হ্যান্ডেলে ইয়াসমিন, পাশে দাঁড়ালেন ডিসি জাহিদ

ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: Wednesday, 9 September, 2026, 8:48 pm
তিন সন্তান নিয়ে অটোরিকশার হ্যান্ডেলে ইয়াসমিন, পাশে দাঁড়ালেন ডিসি জাহিদ

স্বামী মো. শাহিন সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে অসুস্থ। কাজ করার সামর্থ্য নেই। ঘরে তিন শিশু সন্তান। স্বামীর চিকিৎসা থেকে শুরু করে সন্তানদের ভরণপোষণ ও পড়াশোনা—সবকিছুর দায়িত্ব এসে পড়ে ইয়াসমিন আক্তারের কাঁধে।

কিন্তু অসহায় হয়ে বসে থাকেননি ইয়াসমিন। সংসারের হাল ধরতে ভাড়ায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ে নিজেই নেমেছেন রাস্তায়। তিন সন্তানকে নিয়েই অটোরিকশা চালিয়ে কোনোরকমে সংসার চালাচ্ছেন। সীমিত আয়ের মধ্যেও সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে স্বামীর চিকিৎসা, সন্তানদের ভরণপোষণ ও সংসারের দৈনন্দিন ব্যয় একসঙ্গে মেটানো তাঁর পক্ষে ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠেছে।

স্থানীয় এক সাংবাদিকের মাধ্যমে ইয়াসমিনের জীবনসংগ্রামের খবর পৌঁছায় চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার কাছে। বুধবার জেলা প্রশাসকের সাপ্তাহিক গণশুনানিতে ইয়াসমিন নিজেই অটোরিকশা চালিয়ে হাজির হন। জেলা প্রশাসকের কাছে তুলে ধরেন নিজের লড়াইয়ের কথা।

ইয়াসমিনের কথা শুনে প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের শ্রমে সংসার চালানোর চেষ্টার প্রশংসা করেন জেলা প্রশাসক। সন্তানদের পড়াশোনা কোনোভাবেই বন্ধ না করার পরামর্শ দেন তিনি। ইয়াসমিনের সংগ্রামের প্রতি সম্মান জানাতে নিজের কার্যালয় থেকে নিচে নেমে তাঁর অটোরিকশার পাশে দাঁড়িয়ে ছবিও তোলেন জেলা প্রশাসক।

তিনি ইয়াসমিনকে বলেন, ‘এত চ্যালেঞ্জের মধ্যেও তুমি কারও কাছে হাত পাতোনি, কারও কাছে ছোট হওনি। তুমি নিজেই একটা অটো নিয়েছো, অটো নিয়ে পরিশ্রম করে চলছো—এটা খুবই ভালো।’

উৎসাহ দেওয়ার পাশাপাশি ইয়াসমিনের স্বামীর চিকিৎসার জন্য তাৎক্ষণিক আর্থিক সহায়তা দেন জেলা প্রশাসক। তাঁকে চাল, ডাল, তেলসহ খাদ্যসামগ্রী ও কিছু উপহারও দেওয়া হয়। সন্তানদের পড়াশোনা অব্যাহত রাখতেও উৎসাহ দেন তিনি।

সহায়তা পেয়ে ইয়াসমিন বলেন, ‘আমার তিনটা ছেলে আছে। তিনটা ছেলেকে নিয়ে খাচ্ছি। উনি আমাকে চাল দিয়েছেন, কিছু টাকা-পয়সাও দিয়েছেন।’

ইয়াসমিন একা নন

এদিন জেলা প্রশাসকের গণশুনানির টেবিলে ইয়াসমিনের মতো আরও অনেক মানুষের জীবনসংগ্রামের গল্প উঠে আসে। কেউ ক্যানসারের চিকিৎসার খরচ জোগাতে পারছেন না, কারও প্রয়োজন সপ্তাহে তিনবার ডায়ালাইসিস। কেউ প্যারালাইসিসে কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন, আবার কেউ দৃষ্টিপ্রতিবন্ধকতা জয় করে বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছেও অর্থাভাবে উচ্চশিক্ষা চালিয়ে যাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন।

তাঁদের কথা শুনে প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তার ব্যবস্থা করেন জেলা প্রশাসক। এদিন অসুস্থ ও অসহায় ১০ জন এবং একজন শিক্ষার্থীকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। আর্থিকভাবে অসচ্ছল একজনকে দেওয়া হয় চাল, ডাল, তেল, চিনি, লবণ ও মসলাসহ খাদ্যসামগ্রী।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ওমর ফারুক দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। তাঁর বাবা দিনমজুর। পাঁচ সদস্যের পরিবারের খরচের পাশাপাশি ওমরের পড়াশোনা, যাতায়াত ও প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণের ব্যয় বহন করা পরিবারের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রতিকূলতা জয় করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও অর্থাভাবে পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার আশঙ্কায় সহায়তার আবেদন করেন তিনি। তাঁর উচ্চশিক্ষা চালিয়ে যেতে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়।

ইফফাত জাহান ইশা দীর্ঘদিন ধরে কিডনি রোগে আক্রান্ত। সপ্তাহে তিনবার তাঁকে ডায়ালাইসিস করাতে হয়। পাশাপাশি ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপেও ভুগছেন। তাঁর বাবা আবদুর রহিম দীর্ঘদিন ধরে কর্মহীন। মেয়ের নিয়মিত চিকিৎসার ব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে পড়ায় তিনি সহায়তা চান।

কোলন ক্যানসারে আক্রান্ত মো. নাজমুল হুদার অস্ত্রোপচারের পর বর্তমানে কেমোথেরাপি চলছে। পাশাপাশি মৃগীরোগের চিকিৎসাও নিচ্ছেন। দীর্ঘদিনের চিকিৎসায় বিপুল অর্থ ব্যয় হওয়ায় কেমোথেরাপি চালিয়ে যাওয়া তাঁর জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।

রাঙ্গুনিয়ার মোহাম্মদ আবদুল শুকুর দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থতা ও পঙ্গুত্বজনিত সমস্যায় ভুগছেন। নিয়মিত আয়ের উৎস না থাকায় প্রয়োজনীয় চিকিৎসাও করাতে পারছেন না।

প্যারালাইসিসে থেমেছে উপার্জন

বাঁশখালীর মো. আবু তাহের প্রায় সাড়ে তিন বছর আগে প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হন। শরীরের বাঁ পাশ অবশ হয়ে যাওয়ায় স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা বা কাজ করতে পারেন না। উপার্জনের পথ বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি অর্থাভাবে নিয়মিত চিকিৎসাও করাতে পারছেন না।

পটিয়ার আজিজুল হক পেশায় রাজমিস্ত্রি ছিলেন। প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হওয়ার পর কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন। স্ত্রী, দুই মেয়ে ও তিন ছেলে নিয়ে তাঁর সংসার। উপার্জন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিবারের ভরণপোষণ ও নিজের চিকিৎসা—দুটিই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

একই এলাকার আবুল কাসেম চোখের রোগে আক্রান্ত। তাঁর অস্ত্রোপচার ও পরবর্তী চিকিৎসা প্রয়োজন। অর্থের অভাবে চিকিৎসা করাতে না পেরে তিনিও সহায়তার আবেদন করেন।

পারুল বেগমের স্বামী বহু বছর ধরে প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী। তাঁর এক সন্তান প্রতিবন্ধী। পারুল নিজেও কিডনি ও লিভারের সমস্যায় ভুগছেন। পরিবারের ভরণপোষণ ও চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে তাঁকে ভিক্ষাবৃত্তি করতে হচ্ছে বলে আবেদনে উল্লেখ করেছেন।

মর্জিনা বেগমের স্বামীর হৃদ্‌যন্ত্রে অস্ত্রোপচার হয়েছে। চার মাস ধরে তিনি কাজ করতে পারছেন না। দুই মেয়ে ও এক ছেলের পরিবারে তিনিই ছিলেন একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিবারের খাবার জোগাড় করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

হালিশহরের রোকছানা বেগমের স্বামী মারা গেছেন ১০ বছরেরও বেশি সময় আগে। এরপর থেকে ছয় সন্তানকে নিয়ে একাই সংসার চালিয়ে আসছেন। সন্তানদের ভরণপোষণ করতে না পেরে তিনিও আর্থিক সহায়তার আবেদন করেন।

শুনলেন ২১ জনের কথা

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, বুধবার বেলা ১১টায় শুরু হওয়া গণশুনানিতে সরাসরি ২১ জন সেবাপ্রত্যাশী অংশ নেন। চিকিৎসা ও আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি জমিজমা, সম্পত্তি জবরদখলসহ বিভিন্ন সমস্যার কথা তাঁরা জেলা প্রশাসকের কাছে তুলে ধরেন। অনলাইনে একজন প্রবাসীও যুক্ত হয়ে তাঁর অভিযোগ জানান।

অভিযোগগুলো শুনে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন জেলা প্রশাসক। কোনো কোনো ক্ষেত্রে গৃহীত ব্যবস্থার ফলাফল সংশ্লিষ্ট আবেদনকারীকে জানানোর নির্দেশও দেন তিনি।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, ‘একটি আবেদন গ্রহণের পর সেটি কোথায় গেল, কী সিদ্ধান্ত হলো এবং তার ফলাফল কী—সেবাপ্রত্যাশী যেন সেটি জানতে পারেন, সেটিও আমাদের দায়িত্ব।’

সরকারি দপ্তরে জমা পড়া এসব আবেদন শেষ পর্যন্ত নথিতে পরিণত হয়। সেখানে থাকে আবেদনকারীর নাম, ঠিকানা আর সাহায্য চাওয়ার কারণ। কিন্তু বুধবারের গণশুনানিতে কাগজের আড়াল থেকে সামনে এসেছে একেকটি জীবনের গল্প—ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই, সপ্তাহে তিনবার ডায়ালাইসিসের ব্যয়, প্যারালাইসিসে থেমে যাওয়া উপার্জন কিংবা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধকতা জয় করে বিশ্ববিদ্যালয়ে টিকে থাকার চেষ্টা।

তবে তাঁদের মধ্যে ইয়াসমিনের গল্পটি কিছুটা আলাদা। স্বামী দুর্ঘটনায় অসুস্থ, ঘরে তিন শিশু সন্তান, সংসারে অভাব—তারপরও তিনি থেমে যাননি। অটোরিকশার হ্যান্ডেল ধরে নিজের শ্রমে পরিবারকে টেনে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।

সেই সংগ্রামের কথা শুনে তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছেন জেলা প্রশাসক—স্বামীর চিকিৎসায় আর্থিক সহায়তা দিয়েছেন, দিয়েছেন খাদ্যসামগ্রী ও উপহার। আর ইয়াসমিনকে সাহস জুগিয়েছেন, যেন জীবনের লড়াইয়ের মধ্যেও তাঁর তিন সন্তানের পড়াশোনা থেমে না যায়।

বুধবারের গণশুনানিতে তাই শুধু আবেদন ও অভিযোগের শুনানি হয়নি; কাগজের আড়ালে থাকা মানুষগুলোর সংকটের কথা শুনে তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টাও ছিল।