আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় আত্মকেন্দ্রীক ও স্বার্থপরতা
স্বার্থপরতা হলো নিঃস্বার্থপরতার এক অপূর্ণরূপ। যেসব মানুষের জীবনে নিঃস্বার্থতা কখনো পূর্ণতা পায় না, তাঁদের মনেই এই অভিশোপ্ত স্বার্থপরতা বিরাজ করে।
যেমন করে দিনের আলো ফুরিয়ে গেলে রাতের অন্ধকার পৃথিবীকে গ্রাস করে, ঠিক তেমনি মানুষের মনে নিঃস্বার্থতা আর পবিত্রতা কমে গেলে মানুষের মনে কালরাজ স্বার্থপরতা বিরাজ করে।
বর্তমানের এই সময়ে স্বার্থপরতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। শুধু নিজেকে ভালোবাসে, অন্যের চাওয়া পাওয়ার থেকে সর্বদা নিজের চাওয়া পাওয়াকে গুরুত্ব দেয়।
আপনি যদি ক্রমাগতভাবে এরকম স্বার্থপর, আত্মকেন্দ্রিক মানুষের সাথে ওঠাবসা করতে থাকেন তবে আপনার জীবন হয়ে উঠবে শোচনীয়। কিন্তু যদি এমন হয় তীর আপনার দিকেই এসে পড়ছে?
অর্থাৎ স্বার্থপর মানুষ হিসেবে যদি নিজেই অভিযুক্ত হন তখন কি করবেন? তাও কিন্তু ভাবার বিষয়। আসলে কোন বৈশিষ্ট্য থাকলে একজন মানুষকে স্বার্থপর বলা যেতে পারে? তা আমাদের মুখ্য বিষয়।
আসলে স্বার্থপর তারাই যারা সর্বদা নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকে এবং অন্যের চাহিদা, অনুভূতির কথা যারা বিবেচনা করেনা। পৃথিবীতে ‘নিজে ভালো’ থাকতে চাইলে ‘স্বার্থপর’ হয়ে যাও, আর ‘মানুষের কাছে ভালো হয়ে’ থাকতে চাইলে ‘নিঃস্বার্থ’ হও!
আপাত দৃষ্টিতে স্বার্থপর হওয়া দোষের কিছু নয় বলে প্রতীয়মান হয়। কেননা অনেকে মনে করেন, সফল হতে হলে এর প্রয়োজন অনস্বীকার্য।
তবে স্বার্থপরতা তখনই দোষের হয়, যখন তা ‘আমি’ বা ‘আমার’ সীমানা পার হয়ে অন্যের স্বার্থের ক্ষতি করে। অন্যের ক্ষতি না করেও স্বার্থপর হওয়া যায়। প্রবাদে বলে মানুষ মাত্রই স্বার্থপর। তবে কোন বিষয়টিকে আসলে স্বার্থপরতা বলে? খুব বেশি স্বার্থপরতা কি নিজেকে একাও করে তোলে না? চলুন দেখি বিশেষজ্ঞরা কী বলেন।
মনোবিজ্ঞান বিশেষজ্ঞের মতে ‘আমরা সবাই কম বেশি নিজেকে নিয়েই ভাবতে পছন্দ করি। নিজের সুযোগ সুবিধা, আরাম আয়েশ, ভালোমন্দ সবার আগে হিসেব করে নিই।
তবে সেটা যদি জীবনের প্রতি ক্ষেত্রেই মাত্রাতিরিক্ত হয়ে যায় এবং অন্যর কথা না ভেবে শুধু নিজেরটাই বেশি বেশি ভাবতে থাকি তাহলে তা বেশি স্বার্থপরতায় রূপ নেয়।
বেঁচে থাকার তাগিদে এবং কাজে সফলতার জন্য কিছু মাত্রায় স্বার্থপরতা ভালো। তবে বেশি মাত্রায় স্বার্থপরতা অন্যের জন্য সরাসরি এবং নিজের জন্য পরোক্ষভাবে ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।’
স্বার্থপর না হলে আমার চিন্তা হতো সার্বজনীন, সকলের তরে। তাহলে আমার কি হতো? অপরের সেবা বা মঙ্গল কামনায় আমার জীবন শেষ হত। নিজের বলতে কিছুই থাকতো না। সমাজে নানা শ্রেণীর মানুষ বসবাস করে, বিভিন্ন ধরণের মানুষের উদ্ভব ঘটে।
সমাজে চলারপথে বিভিন্ন মানুষের সাথে আমাদের পরিচয় হয়। সবার সাথে সম্পর্ক গড়ে উঠে না কিছু সংখ্যক মানুষের সাথে আমাদের ভ্রাতৃত্ব সম্পর্ক গড়ে উঠে। তাদের মধ্যে কিছু মানুষ যারা সবর্দা সবার স্বার্থ নিয়ে কাজ করে বা চিন্তা করে আর অধিকাংশ মানুষ নিজের স্বার্থকে প্রাধান্য দেয় তাদেরকে মানুষ বিভিন্ন দৃষ্টিতে দেখে।
তারা বিভিন্ন সামাজিকমূলক কাজে নিজের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়। সমাজে কেউ মানুষের কাছে শ্রদ্ধা পাত্র আবার কাউকে মানুষ ঘৃণা করে। তার ব্যবহার আচার আচরনে কারনে অন্য মানুষের কাছে তার ব্যক্তিত্ব প্রকাশ পায়।
মানুষ যদি সর্বজন কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেতে হলে তাহাকে যে বিষয়টি তার কাছে থাকা অত্যন্ত জরুরী তা হল ন্যায়পরায়নতা আর মানুষের ন্যায়নিষ্ঠতা। তখনিও বুঝা যাবে যখন সে তার স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় জড়িত থাকলে সে যদি ন্যায়নীতি তার মধ্যে কাজ করে তখন সে মানুষ সমাজে গ্রহণযোগ্যতা উর্ধে উঠে।
মানুষের নিজের স্বার্থের আঘাত হলে, আপনজন পর হয়ে যায়, দেখে না সে ন্যায়নীতি, তখন তার কাছে মানুষ্যত্ব বলতে কিছু থাকে না। সে নিজের আপনজন ও কাছের মানুষ কে কিছু বলতে দ্বিধাবোধ করবে না! সমাজে মানুষের কল্যাণমুলক কর্মকান্ড বা কাজ নিজের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় জড়িত থাকলে বা আঘাত আসলে বাধা দেয়।
নিজের স্বার্থ থাকলে সমাজে মানুষের কল্যাণে নিজের স্বার্থ ত্যাগ করলে সেই মানুষ সর্বজনকৃত সকলে কাছে সম্মান ও শ্রদ্ধা পেয়ে থাকে। এরকম অনেক উদাহরণ আমাদের আশে পাশে ঘঠে যাচ্ছে তখন তার কাছে মানবসেবা বলতে কিছু থাকে না।
তখন সে জ্ঞান বিবেক ও বুদ্ধির সমন্বয় সে বিচার করবে কোনটি সঠিক তাহলে সে ন্যায়, ইনসাফের স্বার্থে নিজের ভিতরে স্বার্থ ছাড় দিবে। তখন মানুষ কে বিচার করা যাবে সে মানুষটি স্বার্থপর কি না?
কারণ মানুষ অনেক বড় উচ্চশিক্ষিত হলেও অনেক বড় মাওলানা হলে স্বার্থের আঘাত হলে তার মাঝে ন্যায়নীতি খুঁজে পাওয়া যায় না। সে মানুষের গীবত করে বেড়ায় সমাজে। নিজেকে ভাল মানুষ বলে দাবি করে। এর বাস্তব চিত্র সমাজে বিদ্যমান।
অনেক মানুষ সমাজে বসবাস করে তারা সবসময় নিজের স্বার্থ উদ্ধারের কারনে মানুষের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে। সেই ভ্রাতৃত্ব বেশি দিন স্থায়ীত্ব পায় না, কিছুদিনের জন্য। সেই মুখে করে থাকে, আন্তরিক নয়, কারন সে জানে যে স্বার্থ উদ্ধার হলে আর সে তার সাথে যোগাযোগ রাখবে না। কারন তার সম্পর্ক স্বার্থ হাসিলের। সমাজে সবাই তাদেরকে খুব ভাল করে চিনে।
নিজের স্বার্থ চাই না এমন মানুষ সমাজে কম কিন্তু সেই মানুষ স্বার্থপর নয় যে সবার স্বার্থ দেখে নিজের স্বার্থ ত্যাগ করে। সমাজে কারো সম্পর্কে অবগত না হয়ে মানুষকে ভাল স্বীকৃতি দেয়া আমার মতে সন্তোষজনক নয়।
চেহারা ও পোশাকে যদি তাঁকে সূফীসাধক, ধার্মিক আর বুজুর্গ দেখালেও বাহ্যিক তার যথার্থ ব্যবহার কতটুকু হচ্ছে তা দেখবে তার আশে পাশে প্রতিবেশী ও পরিবার! একজন মানুষ তার পরিবারে কেমন আচরণ করে আর বাহ্যিক ভাবে কেমন আচরন করে তা দেখতে হলে তার সাথে কয়দিন চলাফেরা আচার ব্যবহার করার মধ্যেমে ফুটে উঠবে তার লেনদেন, স্বার্থেপরতা, ইনশাফ, ন্যায়নিষ্ঠতা, সবেই সম্পর্কে জানতে পারবে তার আপনজনও কাজের মানুষ তখন এটা অনুভব করা যাবে সেই মানুষ ভাল না মন্দ।
মানুষ বাহ্যিক যে আচরণ করে তা দেখলে মানুষকে খুব ভাল মনে হয়, এটা দিয়ে মানুষের ভাল মন্দ বিচার করা যাবে না। চলাফেরা অনেক কাজকর্মে মানুষের চারিত্রিক সনদ দরকার পরে তখন আমাদের ইউনিয়ন পরিষদে গেলে একজন লোক তাঁর চারিত্রিক সাটিফিকেট সংগ্রহ করতে পারবে? এই সনদের মূল্য কতটুকু তা সবাই জানে এই সাটিফিকেট দিয়ে মানুষ কে সমাজে কেউ বিচার করে না। এই সনদের মূল্য অর্থহীন।
মানুষ কে বিচার করলে ভাল মন্দ সাটিফিকেট দিলে তার আপনজন ও প্রতিবেশীদের সাথে ব্যবহার অন্যতম। মানুষের বাহ্যিক আচরণ ব্যবহার আর প্রতিবেশীদের সাথে ব্যবহারে এর মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য নিহিত। মানুষের এই দুইটি ব্যবহার এক পাল্লা ওজন করা যাবে না।
মানুষ সম্পর্কে আরো জানতে হলে তার সাথে লেনদের করলে খুব ভালভাবে জানা যাবে। কারন সমাজে অনেকে মানুষ ভাল বলে কিন্তু যারা তাদের সাথে লেনদেন করছে অথবা কিছুদিন অতিবাহিত করেছে তাঁরা তাঁদের কে ভাল বলতে নারাজ।
কারন একজন মানুষ ভাল করে চেনা যায় তার সাথে লেনদেন করলে বা তার সাথে কিছুদিন অতিবাহিত করলে। তখন তার সব দূর্বলতা বা কথাবার্তা কাছের মানুষ বা যার সাথে সে লেনদেন করছে তার কাছে ধরা পড়বে? কারন সমাজে মানুষ যারা ভাল মানুষ বলে স্বীকৃতি দেয় তাঁদের কাছে সেই উপরে উল্লেখিত দিক গুলো অনুপস্থিত থাকে।
সমাজে একশ্রেণী লোক বাস করে যারা নিজেদের মুখে নিজেকে ন্যায়বান ও মানুষের কল্যাণে কাজ করে থাকে বলে দাবি করলে তাঁদের সম্পর্কে অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে তার প্রতিবেশীদের সাথে আচার আচরন ব্যবহার ও সমাজে মানুষের সাথে লেনদেন কাজ কর্মগুলো তখন বুঝতে পারবেন সেই মানুষ কেমন? মানুষ নিজের মুখে অনেক ভাল মানুষ বলে থাকলে বাস্তবে দেখা যায় তাঁর কোন মিল খুজেঁ পাওয়া যাচ্ছে না।
যাদের কে মানুষ সমাজে শ্রদ্ধা করে তাদের করার পিছনে কিছু কারণ বিদ্যমান রয়েছে যেমন কিছু মানুষকে মানুষ টাকা পয়সা, প্রভাব, বংশধর, আধিপত্য কারণে বা সমাজে দূর্বল হওয়ার কারনে অন্যায় করলেও তাদের সম্পর্ক কিছু বলে না।
মানুষ বিভিন্ন কারনে ভয় করে। তখন তাদের আন্তরিক শ্রদ্ধা না করলে মুখে শ্রদ্ধা আর ভক্তি দেখায়। এই শ্রদ্ধার কোন সমাজে গ্রহণযোগ্যতা নেই। এই শ্রদ্ধার পিছনে অনেকগুলো কারণ নিহিত।
সমাজে বসবাস করলে অধিকাংশ মানুষকে সমাজে দেখা যায় নিজের পরিবার ও প্রতিবেশীদের সাথে আচার আচরণ ব্যবহার সন্তুষ্ট জনক নয় বাহ্যিক ব্যবহার গুলো ভদ্র ও নম্র হলেও প্রতিবেশী সাথে ভ্রাতৃত্ব সম্পর্ক ছিন্ন। একজন মানুষের বাড়িতে কিছুদিন থাকলে যে কোন জ্ঞানবান মানুষ তা অনুভব করতে পারবে দৈনন্দিন তার কাজ কর্মগুলো, সেই মানুষের কাছে তা ফুটে উঠবে।
যারা সমাজে দেশে বিদেশে সর্বসাধারণের কাছে সম্মান ও শ্রদ্ধা পেয়ে আসছে তাঁদের সম্পর্কে খুজ নিলে জানতে পারবেন তারা তাদের প্রতিবেশী, পরিবার ও সমাজের সকলের কাছে শ্রদ্ধার এক অন্যতম নজির স্থাপন করে আসছে। কারন যারা সমাজে পরিবারে কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্ব তাঁরা সর্বসাধারনের কাছে শ্রদ্ধা পেয়ে থাকে।
মানুষের বিপদ আপদে যারা প্রিয়জন, আত্মীয় স্বজনদের থেকে কাছের মানুষ যাদের কে বিপদ আপদে সবসময় কাছে পাওয়া যায় তাদের সাথে আচার ব্যবহার ভাল করা অত্যন্ত কর্তব্য। সেই মানুষের সাথে মানুষ স্বার্থে আঘাত বা সামাজিক বিভিন্ন কারণে তাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন।
আবার দেখা যায় যারা মানুষের চলাফেরা কোন আত্মীয় স্বজন, রক্ত সম্পর্ক না থাকলেও সেই মানুষ প্রিয়জনদের মত হয়ে থাকে অর্থাৎ মানুষের আচার ব্যবহারে কারনে রক্ত সম্পর্ক আত্মীয় স্বজন, প্রতিবেশীদের মাঝে দূরত্ব থাকলে বাহ্যিক ভাবে মানুষের সাথে সদ্ব্যবহার করার কারনে অনেকদূরে মানুষে কাছের প্রিয়জনদের মত পরিণত হয়।
সর্বোপরি যে বিষয়টি মানুষের মাঝে থাকতে হবে আর যা না থাকলে মানুষের মনুষ্যত্ব বোধ আর মানবতা হারিয়ে ফেলবে তা হল সমাজে সব মানুষের সাথে সদ্ব্যবহার করা এই ভাল ব্যবহার করতে হলে যদি প্রতিবন্ধকতা আসে অথবা নিজের স্বার্থের আঘাত হলেও ইনসাফের স্বার্থে ছাড়ের মনোভাব তৈরি করা।
মানুষ সম্পর্কে উল্লেখিত বিষয়টি নিশ্চিত না হয়ে মানুষকে ভাল স্বীকৃতি দেয়া বোধগম্য হবে না। সেই বিষয়টি জেনে ভাল বললে সমাজে ও সর্বসাধারণের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পাবে এবং মানুষ তা নির্দিধায় মেনে নিবে।
তাহলে সেই মানুষ সমাজে দেশে বিদেশে সব মানুষের কাছে দলমত নির্বিশেষ সম্মান ও শ্রদ্ধার ব্যক্তি হয়ে উঠবে। আর আত্মকেন্দ্রীক ও স্বার্থপরতা থেকে উর্ধ্বে উঠে জনকল্যানে নিবেদিত হতে পারাই সফল স্বার্থক জীবনের অংশ বিশেষ।
কেননা ভালো কাজের জন্য মানুষ মরেও অমরত্ব লাভ করে। তাই সমাজ ব্যবস্থায় এর প্রতিফলন ঘটাতে পারলেই সমাজ ও আরো সুন্দর হবে তাতে কোন সন্দেহ নাই। আসুন আমরা বাস্তব জীবনে আত্মকেন্দ্রীক ও স্বার্থপরতাকে পরিহার করে সৌহার্দ্য সম্প্রীতির বন্ধন গড়ি।
লেখক : কলামিষ্ট, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক।


আপনার মতামত লিখুন