আজ জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস
অন্ধকারাচ্ছন্ন এক জনপদের আলোরপ্রদীপ উপকূলীয় পাবলিক লাইব্রেরী
অন্ধকারাচ্ছন্ন এক জনপদের আলোরপ্রদীপ উপকূলীয় পাবলিক লাইব্রেরী
চট্টগ্রাম শহর থেকে প্রায় ৬৩ কিলোমিটার দুরত্বে বাঁশখালী উপজেলার ছনুয়া ইউনিয়নের সাগরতীরবর্তী এক অজপাড়া গ্রাম খুদুকখালী। বঙ্গোপসাগরের তীর বেয়ে বয়ে যাওয়া এই গ্রামে গড়ে উঠেছে নারীদের আশা জাগানিয়া এক গণপাঠাগার। এই পাঠাগার থেকে নারীরা আলোর স্বপ্ন বুনেন, ভবিষ্যতের গন্তব্য খোঁজেন, জ্ঞান আহরণের মধ্য দিয়ে নারীরা বেঁচে নেন আগামীর পথে। খোঁজে পান আলোর দিশা। যে গ্রামটির মেয়েরা কখনো পাঠ্যবই ছাড়া ভিন্ন কোন বই দেখতে পায়নি, একটি পাঠাগারের বদৌলতে পুরো ইউনিয়নের শতশত নারী এখন হাতের নাগালে পেয়েছে হাজারো বই। হাজারো বইয়ের মাঝখানে বসে জ্ঞান আহরণের সুযোগ লাভ করেছে অজপাড়া গ্রামের শত নারী। পাঠাগারটি এখন নারীদের জন্য একটি স্বপ্নের বাতিঘর হিসেবে সমাদৃত। নারী জাগরণের আলোচিত এই গ্রন্থাগারটি হচ্ছে উপকূলীয় পাবলিক লাইব্রেরী।

২০১০ সালের ২৯ এপ্রিল এই অন্ধকার জনপদে জ্ঞানের প্রদীপ জ্বালানোর প্রত্যয় নিয়ে ছোট একটি কক্ষ থেকে যাত্রা শুরু করে এই গণপাঠাগার। ১০ টি বই, একটি টেবিল আর ৪ টি চেয়ার নিয়ে যাত্রা শুরু করা গণপাঠাগারটি এখন রূপ নিয়েছে উপকূলের এক সমৃদ্ধশালী আলোকিত বাতিঘর হিসেবে। ‘অন্ধকারে আলোর প্রদীপ’ এই শ্লোগানকে ধারণ করে এক যুগ আগে যাত্রাকরা গণপাঠাগারটি এখন অন্ধকারাচ্ছন্ন জনপদের একটি আলোর প্রদীপ।

পাঠাগারে পুরুষের চেয়ে নারী পাঠকের উপস্থিতি বেশি। প্রতিদিন ২ টার পর পাঠাগারের পার্শ¦বর্তী গ্রাম থেকে দলবদ্ধ হয়ে নারীরা পাঠাগারে ছুটে আসেন। বিদ্যালয় ছুটি শেষে বিকাল ৪ টার পর শিক্ষার্থীরাও পাঠাগারে বই পড়তে আসেন। নিবন্ধিত সদস্যরা এই পাঠাগার থেকে অনেক সুযোগ সুবিধা পেয়ে থাকেন।
পাঠাগারের সদস্য কলি আকতার জানান, আমরা পাঠাগার থেকে নিয়মিত বই ধার নিয়ে বাড়িতে পড়ি। কিছুদিন পর পর আমরা এখান থেকে শিক্ষাসামগ্রী উপহার পাই। আমরা খুবই আনন্দিত নিজের গ্রামে একটি নান্দনিক পাঠাগার পেয়ে।
পাঠাগারের গ্রন্থাগারিক জোবাইদা খানম জানান, আমাদের পাঠাগার প্রতিদিন ২ টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সবার জন্য উন্মুক্ত থাকে। তিনি জানান, লাইব্রেরীতে বর্তমানে নিবন্ধিত সদস্য সংখ্যা প্রায় তিন শতাধিক। প্রতিদিন গড়ে ৩০/৩৫ জন পাঠক লাইব্রেরীতে বই পড়তে আসেন।

লাইব্রেরীর সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম মোহাম্মদ হাবিব জানান, উপকূলীয় পাবলিক লাইব্রেরী এলাকার জন্য একটি আলোকিত বাতিঘর। গ্রামের সব শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও বইপ্রেমী মানুষের জন্য এটি জ্ঞানার্জনের জন্য একটি নিরিবিলি প্রতিষ্ঠান। তিনি আরও জানান, পাঠকের তুলনায় গ্রন্থাগারে এখনো বইয়ের সংখ্যা কম। তিনি আরো বলেন, অন্য দশটি গ্রন্থাগারের চেয়ে আমাদের গ্রন্থাগারে পাঠকের উপস্থিতি অনেক বেশি তবে পাঠকের চাহিদার তুলনায় বইয়ের সংখ্যা কম।
জানা যায়, বর্তমানে পাঠাগারের জমির পরিমাণ ২২ শতক। পাঠাগারের নিজস্ব ভূমিতে গড়ে উঠেছে দ্বিতল বিশিষ্ট গ্রন্থাগার ভবন। সরকারি বেসরকারি অনুদানের অর্থে গড়ে উঠা এই গণপাঠাগারের ভেতরের দশ্যও নান্দনিকতায় ভরা।
আছে সাড়ে ৪ হাজারেরও অধিক বই। ইতিহাস, ঐতিহ্য, মুক্তিযুদ্ধ , ধর্মীয়, সাহিত্য ও বিজ্ঞানসম্মত বই দীর্ঘদিন ধরে সংগ্রহ করে আসছে পাঠাগার কর্তৃপক্ষ। আর এসব বই সংগ্রহের পিছনে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে দেশের সপ্রতিষ্ঠিত লেখক, সাংবাদিক, কবি ও সাহিত্যানুরাগীরা।
২০১০ সালে প্রতিষ্ঠা লাভের পাঠাগারটি ২০১৭ সালে গণগ্রন্থাগার অধিদফতর থেকে তালিকাভুক্ত সনদ লাভ করে। ২০১৭ সাল থেকে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র থেকে অনুদান বই ও উপহার পেয়েছে কয়েকবার।
এই গ্রন্থাগারের ভূমিদাতা—প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক গণমাধ্যমকর্মী সাঈফী আনোয়ারুল আজিম জানান, ২০১০ সালে এলাকার স্থানীয় একটি সাইক্লোন সেল্টারে চারটি চেয়ার একটি টেবিল আর একটি বুক সেলফ নিয়ে লাইব্রেরীর কার্যক্রম করি। সাইক্লোন সেল্টারে ১ বছর লাইব্রেরীর কার্যক্রম চালানোর পর শুরু হয় লাইব্রেরীকে স্থায়ী রূপদানের লক্ষে আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করি। পরবর্তীতে ২০১৫ সালে লাইব্রেরীর নামে ক্রয় করা হয় ২২ শতক জমি। বর্তমানে ক্রয়কৃত জমির উপর নির্মিত গ্রন্থাগারে পরিচালিত হচ্ছে যাবতীয় পাঠ কার্যক্রম। তিনি বলেন, আমরা অনেক প্রতিকূলতা পেরিয়ে এই গ্রন্থাগারকে স্থায়ী প্রতিষ্ঠান হিসেবে রূপদান করেছি। আমাদের লাইব্রেরী বর্তমানে উপকূলের বাতিঘর হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছে।
২৪ঘণ্টা.জেআর


আপনার মতামত লিখুন