ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সব সম্প্রদায়ের মানুষের সহাবস্থান, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সম্মিলিত প্রচেষ্টায় চট্টগ্রামকে একটি নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন, সুস্থ ও সম্প্রীতির নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন।
তিনি বলেন, এই শহর আমাদের সবার। এই শহরকে ভালোবাসতে হবে, নিজের শহর হিসেবে ধারণ করতে হবে। হিন্দু, বৌদ্ধ, মুসলিম, খ্রিস্টান সবাই মিলে আমরা এই শহরকে নিরাপদ ও সুন্দর রাখব। চট্টগ্রামকে ক্লিন, গ্রিন, হেলদি ও সেফ সিটি হিসেবে গড়ে তুলতে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।
তিনি রবিবার সন্ধ্যায় চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক জেএম সেন হলে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ চট্টগ্রাম মহানগরের উদ্যোগে আয়োজিত শুভ মহালয়া ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন।
মেয়র বলেন, তিনি এমন একটি নিরাপদ শহরের স্বপ্ন দেখেন, যেখানে ধর্মীয় পরিচয় বা বর্ণের ভিন্নতা মানুষের মধ্যে কোনো বিভেদ সৃষ্টি করবে না। সবাই সমান মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিয়ে বসবাস করবে। কবির সাম্যের বাণী উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, “গাহি সাম্যের গান” যেখানে হিন্দু, বৌদ্ধ, মুসলিম ও খ্রিস্টানসহ সব সম্প্রদায়ের মানুষ ঐক্যবদ্ধ থাকবে। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা ও সম্প্রীতির বন্ধন দৃঢ় করার মাধ্যমে একটি মানবিক ও বাসযোগ্য নগরী গড়ে তোলা সম্ভব।
ডা. শাহাদাত বলেন, গীতিনাট্য থেকে যে শিক্ষা পাওয়া যায়, তা হলো “দুষ্টের দমন, শিষ্টের লালন।” অন্যায়, অপরাধ ও অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হবে, অন্যায়কারী যে দলেরই হোক না কেন। একই সঙ্গে সমাজের ভালো মানুষ, সৎ ও মানবিক ব্যক্তিদের মূল্যায়ন এবং উৎসাহিত করতে হবে। চিকিৎসা, শিক্ষা, সংস্কৃতি, মুক্তিযুদ্ধসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে যাঁরা সমাজের উন্নয়নে অবদান রাখছেন, তাঁদের সম্মান জানানো জরুরি। একটি সুন্দর সমাজ গঠনে ভালো কাজের স্বীকৃতি এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মেয়র বলেন, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের দরজা নগরবাসীর জন্য সব সময় খোলা থাকবে। নগরবাসীর সেবক হিসেবে তিনি মানুষের সমস্যা শুনতে এবং সাধ্যমতো সমাধানে কাজ করতে চান। শহরের যেকোনো সমস্যা ও নাগরিক প্রয়োজনে সিটি করপোরেশনের সঙ্গে যোগাযোগ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, জনপ্রতিনিধি হিসেবে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নাগরিক সেবা প্রদান করা তাঁদের দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে সবাইকে আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করতে হবে।
চট্টগ্রামকে নিজের শহর হিসেবে ধারণ করার আহ্বান জানিয়ে মেয়র বলেন, এই নগরীর সঙ্গে আমাদের পূর্বপুরুষের স্মৃতি, শিকড় ও ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে। এখানেই আমাদের পূর্বপুরুষেরা বসবাস করেছেন, এখানেই বর্তমান প্রজন্মের জীবন জীবিকা এবং এখানেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বেড়ে ওঠা। তাই শহরকে আপন করে নিতে হবে। নগরীর উন্নয়ন, পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব শুধু সিটি করপোরেশনের নয়, প্রতিটি নাগরিকেরও রয়েছে সমান দায়িত্ব।
মেয়র বলেন, সম্প্রতি পতেঙ্গা এলাকায় প্রায় দুই থেকে তিন কিলোমিটার দীর্ঘ সাইকেল ট্র্যাক তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু সেখানে কেউ যানবাহন পার্কিং করলে কিংবা নির্ধারিত ব্যবস্থার অপব্যবহার করলে নগরীর উন্নয়ন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়। জনস্বার্থে নির্মিত অবকাঠামো রক্ষা করা এবং সেগুলোর যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা নাগরিকদের দায়িত্ব। বিদেশে গেলে অনেকে যেখানে সেখানে ময়লা ফেলেন না, বরং পকেটে বা সঙ্গে রেখে নির্ধারিত ডাস্টবিনে ফেলেন। অথচ নিজ শহরে অনেকেই সেই সচেতনতা দেখান না। এই মানসিকতার পরিবর্তন ঘটাতে হবে। যত্রতত্র ময়লা আবর্জনা না ফেলে নির্ধারিত স্থানে ফেলতে হবে এবং পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
মেয়র বলেন, ডেঙ্গুর বিস্তার রোধে সিটি করপোরেশন বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করলেও নাগরিকদের অসচেতনতার কারণে অনেক সময় মশার প্রজননস্থল তৈরি হয়। ডাবের খোসা, প্লাস্টিকের বোতল, পরিত্যক্ত পাত্র, ফুলের টব ও ছাদে জমে থাকা পানি এডিস মশার বংশবিস্তারের সুযোগ সৃষ্টি করে। তাই বাসাবাড়ির আঙিনা, ছাদ ও আশপাশ নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে হবে। কোথাও পানি জমতে দেওয়া যাবে না। প্রতি তিন দিনে অন্তত একবার জমে থাকা পানি অপসারণের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। নাগরিকদের সচেতনতা ও সহযোগিতা ছাড়া ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ পুরোপুরি সফল করা সম্ভব নয়।
চট্টগ্রাম মহানগর পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক অর্পণ কান্তি ব্যানার্জীর সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট নিখিল নাথের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। সম্মানিত অতিথি ছিলেন হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ট্রাস্টি রাজীব ধর তমাল, পরিষদের সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট চন্দন তালুকদার, সহসভাপতি দিলীপ ঘোষ ও বিপ্লব চৌধুরী। উপস্থিত ছিলেন পরিষদের অর্থ সম্পাদক সুকান্ত মহাজন টুটুল, সাংগঠনিক সম্পাদক অঞ্জন দত্ত, সম্পাদক মণ্ডলীর সদস্য অ্যাডভোকেট তপন দাশ, প্রিয়তোষ ঘোষ রতন, দীপংকর দেবনাথ, রাধা রাণী দেবী, রিপন রায় চৌধুরী, শুভজিৎ দাশ, অ্যাডভোকেট রাজেশ বিশ্বাস, মৌসুমি চৌধুরী, অমিত ঘোষ, সবুজ দাশ, কার্যনির্বাহী সদস্য ডা. নেহেরু লাল ধর, অ্যাডভোকেট শ্যামল চৌধুরী, রাসেল দত্ত, বৃষ্টি বৈদ্য, সোমা দাশ প্রমুখ।

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: সোমবার, ১২ অক্টোবর, ২০২৬ । ৬:৫৬ সন্ধ্যা