২৪ ঘন্টা নিউজ
সোমবার ২ নভেম্বর ২০২৬ www.24ghonta.news১৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ২২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি

অভিনয় থেকে ব্যবসা, শাহরুখের সাড়ে ১৩ হাজার কোটি টাকার সাম্রাজ্য

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: সোমবার, ২ নভেম্বর, ২০২৬ । ১০:২৩ সকাল

বলিউডের বাদশাহ হিসেবে পরিচিত শাহরুখ খান। দীর্ঘ অভিনয়জীবনে তার ঝুলিতে জমেছে অসংখ্য ব্যবসাসফল সিনেমা। তবে পর্দার এই জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে তিনি গড়ে তুলেছেন বহুমুখী ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য। চলচ্চিত্র প্রযোজনা থেকে শুরু করে ভিএফএক্স প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট, বিজ্ঞাপন ও বিলাসবহুল সম্পত্তি—বিভিন্ন খাতে ছড়িয়ে রয়েছে তার বিনিয়োগ।

হুরুন ইন্ডিয়া রিচ লিস্ট ২০২৬-এর হিসাবে, শাহরুখ খানের মোট সম্পদের আনুমানিক মূল্য ১০ হাজার কোটি রুপি। বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। এই সম্পদমূল্য নিয়ে তিনি ভারতের সবচেয়ে ধনী অভিনেতার অবস্থানে রয়েছেন। তবে এটি কোনো নিরীক্ষিত আর্থিক হিসাব নয়; বিভিন্ন ব্যবসায়িক মালিকানা ও সম্পদের আনুমানিক বাজারমূল্য বিবেচনায় তৈরি করা হয়েছে।

অবশ্য গত বছরের তুলনায় তার সম্পদের মূল্যায়ন কমেছে। ২০২৫ সালে তার সম্পদের পরিমাণ ধরা হয়েছিল ১২ হাজার ৪৯০ কোটি রুপি। এক বছরের ব্যবধানে তা কমেছে প্রায় ২ হাজার ৪৯০ কোটি রুপি।

অভিনয় ছিল শুরু, লক্ষ্য ছিল আরও বড়

১৯৬৫ সালের ২ নভেম্বর দিল্লিতে জন্ম শাহরুখ খানের। টেলিভিশনে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে বিনোদনজগতে তার যাত্রা শুরু। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে মুম্বাইয়ে এসে চলচ্চিত্রে কাজ শুরু করেন। ১৯৯২ সালে ‘দিওয়ানা’ সিনেমার মাধ্যমে বড় পর্দায় পরিচিতি পান তিনি।

এরপর ‘বাজিগর’, ‘ডর’, ‘দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে’, ‘দিল তো পাগল হ্যায়’ ও ‘কুছ কুছ হোতা হ্যায়’-এর মতো সিনেমা তাকে বলিউডের শীর্ষ তারকায় পরিণত করে। জনপ্রিয়তার সঙ্গে বাড়তে থাকে পারিশ্রমিকও। কিন্তু শুধু অভিনয়ের আয়ের ওপর নির্ভর না করে সেই অর্থকে ব্যবসায়িক বিনিয়োগে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা করেন তিনি।

প্রযোজনা ব্যবসায় ধাক্কা খেয়েও থামেননি

শাহরুখের প্রযোজনা ব্যবসার প্রথম অধ্যায় শুরু হয় ১৯৯৯ সালে। অভিনেত্রী জুহি চাওলা ও পরিচালক আজিজ মির্জাকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন ‘ড্রিমজ আনলিমিটেড’। ২০০০ সালে প্রতিষ্ঠানটির প্রথম সিনেমা ‘ফির ভি দিল হ্যায় হিন্দুস্তানি’ মুক্তি পেলেও বক্স অফিসে প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। পরের বছর ‘অশোকা’ও বড় ব্যবসায়িক সাফল্য পায়নি।

তবে প্রাথমিক ব্যর্থতা তাকে দমাতে পারেনি। ২০০২ সালে স্ত্রী গৌরী খানকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন ‘রেড চিলিজ এন্টারটেইনমেন্ট’। পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠানটি তার ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হয়ে ওঠে।

‘ম্যায় হু না’, ‘ওম শান্তি ওম’, ‘চেন্নাই এক্সপ্রেস’, ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার’, ‘দিলওয়ালে’ ও ‘জওয়ান’-এর মতো সিনেমার সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির নাম জড়িয়ে আছে। প্রযোজনার পাশাপাশি চলচ্চিত্র পরিবেশনা, স্বত্ব ব্যবস্থাপনা ও পোস্ট-প্রোডাকশনের কাজও করে প্রতিষ্ঠানটি। ফলে সিনেমার টিকিট বিক্রির বাইরেও বিভিন্ন বাণিজ্যিক কার্যক্রম থেকে আয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

সিনেমার প্রযুক্তিও আয়ের উৎস

শাহরুখের ব্যবসায়িক পরিকল্পনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ রেড চিলিজ ভিএফএক্স। চলচ্চিত্রে ভিজ্যুয়াল ইফেক্টসের ক্রমবর্ধমান চাহিদাকে কাজে লাগিয়ে এই প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে।

‘রা.ওয়ান’, ‘ফ্যান’ ও ‘জিরো’র মতো চলচ্চিত্রে ভিএফএক্সের কাজ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। নিজেদের প্রযোজনার সিনেমার পাশাপাশি অন্য চলচ্চিত্রের প্রযুক্তিগত কাজেও যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ একজন অভিনেতা ও প্রযোজক হওয়ার পাশাপাশি চলচ্চিত্রের প্রযুক্তিগত ব্যবসাতেও অবস্থান তৈরি করেছেন শাহরুখ।

২৬২ কোটি রুপির বিনিয়োগ থেকে আইপিএল সাম্রাজ্য

ক্রিকেটেও শাহরুখের বিনিয়োগ বড় সাফল্যের গল্প। ২০০৮ সালে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের প্রথম আসরের আগে জুহি চাওলা ও তার স্বামী জয় মেহতার সঙ্গে কলকাতা নাইট রাইডার্সের মালিকানায় যুক্ত হন তিনি। দলটি কেনার জন্য সে সময় প্রায় ২৬২ কোটি রুপি বিনিয়োগের কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে আসে।

প্রথম দিকে মাঠের পারফরম্যান্স খুব একটা ভালো না হলেও পরে দলটি সাফল্যের মুখ দেখে। ২০১২ সালে প্রথমবার আইপিএল শিরোপা জেতে কলকাতা নাইট রাইডার্স। এরপর ২০১৪ ও ২০২৪ সালেও শিরোপা জেতে দলটি।

এই বিনিয়োগের পরিধি এখন আইপিএল ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটেও বিস্তৃত। নাইট রাইডার্স ব্র্যান্ডের অধীনে ক্যারিবীয় প্রিমিয়ার লিগের ত্রিনবাগো নাইট রাইডার্স এবং যুক্তরাষ্ট্রের মেজর লিগ ক্রিকেটের লস অ্যাঞ্জেলেস নাইট রাইডার্সের মতো দল যুক্ত হয়েছে।

তারকাখ্যাতি থেকেও কোটি কোটি রুপির মূল্য

বিজ্ঞাপনজগতে শাহরুখের জনপ্রিয়তা তার সম্পদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। গাড়ি, পানীয়, প্রযুক্তিপণ্য, ব্যাংকিং ও টেলিযোগাযোগসহ বিভিন্ন খাতের প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনে কাজ করেছেন তিনি।

দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে প্রকাশিত কোলর ইন্ডিয়ার ২০২৫ সালের সেলিব্রিটি ব্র্যান্ডমূল্য মূল্যায়নে শাহরুখের ব্র্যান্ডমূল্য দেখানো হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৬৯৪ কোটি রুপি। এই অঙ্ক তার ব্যক্তিগত সম্পদ নয়; বরং বিজ্ঞাপন ও বাজারে তার তারকাখ্যাতির বাণিজ্যিক মূল্য।

দেশ-বিদেশে বিলাসবহুল সম্পত্তি

শাহরুখের সম্পদের অন্যতম আলোচিত অংশ মুম্বাইয়ের বান্দ্রায় অবস্থিত বাড়ি ‘মান্নাত’। সমুদ্রের দিকে মুখ করা এই বাড়িটি তার পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছে। বাড়িটির সংস্কার ও অভ্যন্তরীণ নকশার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন স্ত্রী গৌরী খান।

এ ছাড়া দুবাইয়ের পাম জুমেইরায় তার বিলাসবহুল ভিলা রয়েছে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। লন্ডন ও ভারতের আলিবাগেও তার সম্পত্তি থাকার তথ্য বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এসেছে।

পরিবারের সদস্যরাও বিনোদন ব্যবসায়

শাহরুখের ব্যবসায়িক কার্যক্রমে স্ত্রী গৌরী খানের অংশগ্রহণ দীর্ঘদিনের। রেড চিলিজ এন্টারটেইনমেন্টের পাশাপাশি তিনি নিজস্ব ইন্টেরিয়র ডিজাইন প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন।

ছেলে আরিয়ান খানও বিনোদন ব্যবসায় যুক্ত হয়েছেন। ২০২৫ সালে নেটফ্লিক্সে মুক্তি পাওয়া ‘দ্য ব্যাডস অব বলিউড’ দিয়ে পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন তিনি। মেয়ে সুহানা খানও অভিনয়জগতে যাত্রা শুরু করেছেন।

সম্পদের হিসাব কমলেও অবস্থান শীর্ষে

হুরুনের হিসাবে এক বছরে শাহরুখের সম্পদের মূল্যায়ন প্রায় ২ হাজার ৪৯০ কোটি রুপি কমেছে। ২০২৫ সালের ১২ হাজার ৪৯০ কোটি রুপি থেকে ২০২৬ সালে তা নেমে এসেছে ১০ হাজার কোটি রুপিতে। তবে এই পরিবর্তনকে সরাসরি অর্থ হারানোর হিসাব বলা যাবে না। সম্পদ ও ব্যবসায়িক বিনিয়োগের বাজারমূল্য পরিবর্তনের কারণেও এমন পার্থক্য হতে পারে।

শাহরুখ খানের সম্পদ গড়ার কৌশলে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, তিনি নিজের তারকাখ্যাতিকে একাধিক ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে কাজে লাগিয়েছেন। অভিনয় থেকে শুরু হওয়া যাত্রা তাকে নিয়ে গেছে প্রযোজনা, প্রযুক্তি, ক্রিকেট ও বিজ্ঞাপনের বিশাল বাজারে। তাই তার পরিচয় এখন শুধু বলিউডের জনপ্রিয় নায়ক নয়, একজন সফল বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ী হিসেবেও।

জেআই/

প্রকাশক ও সম্পাদক : নূর মোহাম্মদ রানা
ঠিকানা:৯২ মোমিন রোড, শাহ আনিস মার্কেট (৪র্থ তলা), চেরাগী পাহাড়, চট্টগ্রাম।
মোবাইল:০১৯৭৪৪৬৮১৭৬ / ০১৮১৭৭১৭১৩১
ইমেইল:[email protected]

প্রিন্ট করুন