মানবিক প্রশাসনের অনন্য দৃষ্টান্ত চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক জাহিদ
বাবার হাতে মেয়ের চিকিৎসার কাগজপত্র। মেয়ের হাতে ক্যানসারে আক্রান্ত মায়ের পরীক্ষার প্রতিবেদন। কেউ এসেছেন অসুস্থ স্ত্রীর চিকিৎসার খরচ জোগাতে না পেরে। কারও কাঁধে চাকরি হারানোর পর জমে ওঠা ঋণের বোঝা। তারা এসেছেন চট্টগ্রামের নানা প্রান্ত থেকে। কেউ আবার আসতে পারেননি-হাজার মাইল দূরে প্রবাসে বসেই যুক্ত হয়েছেন। তাঁদের উদ্বেগ দেশে ফেলে আসা জমি, বাড়ি আর সম্পত্তি নিয়ে। মানুষ আলাদা, সংকটও আলাদা।
তবে আজ বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) তাদের সবার গন্তব্য ছিল এক-চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের সাপ্তাহিক গণশুনানি। বেলা ১১টা, জেলা প্রশাসনের সম্মেলন কক্ষ তখন সাহায্যপ্রার্থী ও সেবাপ্রত্যাশীদের ভিড়ে সরগরম। গণশুনানীতে উপচে পড়া ভিড়ে সামনে বসে উপস্থিত সকলের কথা শুনেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। ডিসির সামনে একে একে এসে বসছেন মানুষ। কেউ খুলে দিচ্ছেন চিকিৎসার ফাইল, কেউ জমির দলিল। কেউ বলছেন অসুস্থতার কথা, কেউ সংসারের টানাপোড়েনের গল্প। জেলা প্রশাসক শুনছেন। কখনো কাগজপত্র দেখছেন, কখনো সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে ডাকছেন। চিকিৎসা ও জীবিকার সংকটে থাকা মানুষকে দেওয়া হচ্ছে আর্থিক সহায়তা। জমি ও সম্পত্তি নিয়ে অভিযোগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দেওয়া হচ্ছে তদন্ত ও ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ। এদিন সরাসরি গণশুনানিতে এসেছিলেন দুই শতাধিক মানুষ। অনলাইনে নেদারল্যান্ডস, ওমান, দুবাই ও কুয়েত থেকে যুক্ত হন আরও চার প্রবাসী।
পূর্ব বাকলিয়া থেকে আসা এক বাবার সব দুশ্চিন্তা এখন তাঁর অসুস্থ মেয়েকে ঘিরে। আয় সামান্য। স্ত্রীও সন্তান প্রসবের পর থেকে অসুস্থ। একদিকে স্ত্রীর অসুস্থতা, অন্যদিকে মেয়ের চিকিৎসা-দুইয়ের খরচ টানতে গিয়ে পরিবারটির সামর্থ্য প্রায় শেষ। তারপরও মেয়ের চিকিৎসা তো থামিয়ে রাখা যায় না। তাই চিকিৎসার কাগজপত্র হাতে নিয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে এসেছিলেন তিনি। নিজের অবস্থার কথা খুলে বলেন। কাগজপত্র দেখেন জেলা প্রশাসক। এরপর মেয়ের চিকিৎসার জন্য তাকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়।
আব্দুল্লাহ আল মামুনের আবেদনপত্রের একটি বাক্যই যেন তাঁর সংকটের পুরো গল্প বলে দেয়-‘ঋণগ্রস্ত থেকে বাঁচিয়ে, আমি এবং আমার পরিবারকে টিকে রাখুন।’২০২২ সালে চাকরি হারান তিনি। এরপর থেকেই বাড়তে থাকে আর্থিক সংকট। সংসার চালানো, সন্তানদের পড়াশোনা ও দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে ঋণ করতে হয়েছে। পরিবারের একজনের ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি চট্টগ্রাে (ইউএসটিসি) পড়াশোনার খরচও রয়েছে। আয় সীমিত। কিন্তু সংসারের ব্যয় আর ঋণের কিস্তি থেমে নেই। গণশুনানিতে নিজের সেই অসহায়তার কথাই তুলে ধরেন আব্দুল্লাহ আল মামুন। তাঁর আবেদন বিবেচনায় আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়।
অমলা দাস এসেছিলেন নিজের চিকিৎসার জন্য সহায়তা চাইতে। সঙ্গে এনেছিলেন চিকিৎসার কাগজপত্র। তাঁর আলট্রাসনোগ্রাম প্রতিবেদনে লিভার বড় হয়ে যাওয়া, গ্রেড-২ ফ্যাটি লিভার ও সিস্টাইটিসের কথা উল্লেখ রয়েছে। চিকিৎসা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা আর নিয়মিত ওষুধ-সব মিলিয়ে ব্যয় বহন করা পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। জেলা প্রশাসকের কাছে সেই কথাই বলেন অমলা। তাঁকেও দেওয়া হয় আর্থিক সহায়তা।
হাটহাজারী থেকে আসা আরেক ব্যক্তির দুশ্চিন্তা তার অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়ে। দীর্ঘদিনের চিকিৎসা, পরীক্ষা ও ওষুধের খরচ বহন করতে গিয়ে আর্থিক সংকটে পড়েছেন তিনি। স্ত্রীর চিকিৎসা চালিয়ে নিতে আড়াই লাখ টাকা সহায়তা চেয়েছিলেন। হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় হয়ে আবেদনটি জেলা প্রশাসকের কাছে আসে। গণশুনানিতে তার কথা শুনে তাৎক্ষণিক আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। মানসী দত্তের হাতে ছিল মা লক্ষ্মী দত্তের চিকিৎসার কাগজপত্র। মা ক্যানসারে আক্রান্ত। চিকিৎসা ও কেমোথেরাপির ব্যয় বহন করতে গিয়ে পরিবারটি আর্থিক সংকটে পড়েছে। এভারকেয়ার হাসপাতাল চট্টগ্রামের হিস্টোপ্যাথলজি প্রতিবেদনে লক্ষ্মী দত্তের বাম টনসিলের বায়োপসিতে ‘লিম্ফোপ্রোলিফারেটিভ ডিজঅর্ডার, ফেভারস নন-হজকিন লিম্ফোমা’ উল্লেখ রয়েছে। সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুরে খাজা ইউনুস আলী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালেও তার চিকিৎসা হয়েছে বলে আবেদনে জানানো হয়। মায়ের চিকিৎসা যেন অর্থেওরঅভাবে থেমে না যায়-এই আবেদন নিয়েই এসেছিলেন মানসী। তার কথা শুনে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়।
রাউজান থেকে আসা আরেক ব্যক্তিও দীর্ঘদিনের অসুস্থতার চিকিৎসা চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন। চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে সংসারের দৈনন্দিন ব্যয় চালানোও কঠিন হয়ে পড়েছে তার। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় হয়ে তার আবেদন এসেছিল জেলা প্রশাসকের কাছে। সঙ্গে ছিল চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্রসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র। গণশুনানিতে তাঁকেও দেওয়া হয় আর্থিক সহায়তা।
সম্মেলনকক্ষে যখন একের পর এক মানুষ তাদের সমস্যার কথা বলছিলেন, তখন পর্দায় যুক্ত হন বিদেশে থাকা চট্টগ্রামের চার বাসিন্দা। দেশ থেকে তারা হাজার মাইল দূরে। কিন্তু দুশ্চিন্তা পড়ে আছে দেশে-নিজেদের জমি, বাড়ি আর সম্পত্তি নিয়ে।
নেদারল্যান্ডস প্রবাসী হাটহাজারীর নাছের ইসলামের অভিযোগ, তাঁর মা ছকিনা খাতুনের কাছ থেকে হেবা সূত্রে পাওয়া সম্পত্তির বিপরীতে মোহাম্মদ ইব্রাহীম অবৈধভাবে নামজারি খতিয়ান সৃষ্টি করেছেন। সহকারী কমিশনার (ভূমি), হাটহাজারীর কাছে আবেদন করেও দীর্ঘদিন সমাধান না পাওয়ায় এবার সরাসরি জেলা প্রশাসকের হস্তক্ষেপ চান তিনি।
ওমান প্রবাসী মিরসরাইয়ের মোহাম্মদ মোস্তফার অভিযোগ, প্রতিবেশী জাফর উল্লাহ ও তার সহযোগীরা তাঁর কেনা সম্পত্তি দখলের চেষ্টা করছেন। পরিবারের সদস্যদের ভয়ভীতি ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগও করেন তিনি। স্থানীয়ভাবে বৈঠক করেও সমস্যার সমাধান হয়নি বলে জানান মোস্তফা।
দুবাই প্রবাসী ফটিকছড়ির মামুনুল হকের অভিযোগ, তার মালিকানাধীন জায়গা তার ভাতিজা মাসুদ জোর করে দখল করে ভাড়া দিয়েছেন। পরিবারের সদস্যদেরও হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। এর আগে উপজেলা প্রশাসনের তদন্তের পর জায়গা বুঝিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। পরে উপজেলা প্রশাসনের পরামর্শে আদালতে মামলা ও থানায় সাধারণ ডায়েরিও করেছেন মামুনুল হক। এরপরও বিরোধের নিষ্পত্তি হয়নি বলে জানান তিনি।
কুয়েত প্রবাসী হাটহাজারীর মোহাম্মদ ফোরকানের দুশ্চিন্তা তার কেনা একটি ভবন নিয়ে। ভবনটি দেখাশোনার জন্য বোন শিরু আক্তার ও রাসু আক্তারকে সেখানে থাকতে দিয়েছিলেন তিনি। তার অভিযোগ, শিরু আক্তার, মোঃ রশেদ, রোকসানা ও রাসু এখন ভবনটি দখলের চেষ্টা করছেন। তার তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীকেও সেখানে থাকার সুযোগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
প্রবাসীদের চারটি অভিযোগই শোনেন জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা। এরপর সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বিষয়গুলো তদন্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে বলেন।
শুধু ব্যবস্থা নিলেই হবে না-কী ব্যবস্থা নেওয়া হলো, তার অগ্রগতি ও ফলাফলও যেন অভিযোগকারীরা জানতে পারেন, সেই নির্দেশও দেন তিনি। গণশুনানি শেষ হতে হতে অনেকের হাতের আবেদনপত্র তখন প্রশাসনের কর্মকর্তাদের কাছে। কারও মুখে স্বস্তি, কারও অপেক্ষা সমস্যার স্থায়ী সমাধানের। এদিন শারীরিকভাবে অসুস্থ ও অসহায় ২২ ব্যক্তিকে চিকিৎসা ও জীবিকায়নের জন্য জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে আর্থিক অনুদান দেওয়া হয়। সহায়তার প্রয়োজনও একেকজনের একেক রকম। কারও চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হবে, কারও সংসারের চাকা সচল রাখতে হবে। এক দিনের আর্থিক সহায়তায় ক্যানসারের চিকিৎসা শেষ হবে না। দীর্ঘদিনের ঋণও মিটবে না। জমি নিয়ে বছরের বিরোধেরও এক দিনে নিষ্পত্তি সম্ভব নয়। তারপরও বিপদের সময়ে নিজের সমস্যার কথা সরাসরি বলার একটি জায়গা পেয়েছেন মানুষগুলো। কেউ পেয়েছেন তাৎক্ষণিক আর্থিক সহায়তা, কেউ পেয়েছেন তাঁর অভিযোগ তদন্তের আশ্বাস ও নির্দেশনা। এদিন রোবোটিক্স অলিম্পিয়াডে অংশ নিতে যাওয়া এক মেধাবী শিক্ষার্থীকেও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্পন্সরশীপ দেওয়া হয়। সরকারি দপ্তরে প্রতিদিন অসংখ্য আবেদন জমা পড়ে। সঙ্গে থাকে জাতীয় পরিচয়পত্রের অনুলিপি, সুপারিশপত্র, চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র, আলট্রাসনোগ্রাম, হিস্টোপ্যাথলজি প্রতিবেদন কিংবা জমির দলিল।
কাগজে সেগুলো একেকটি আবেদন বা ফাইল। কিন্তু বুধবার চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের সম্মেলনকক্ষে সেই ফাইলগুলোর পেছনের মানুষগুলোই সামনে এসেছিলেন। সেখানে একজন বাবা ছিলেন, যিনি মেয়ের চিকিৎসা বন্ধ করতে চান না। একজন মেয়ে ছিলেন, যিনি ক্যানসারে আক্রান্ত মায়ের চিকিৎসা চালিয়ে যেতে চান। একজন স্বামী ছিলেন, যাঁর সামর্থ্য ফুরিয়ে আসছে স্ত্রীর চিকিৎসার খরচ মেটাতে মেটাতে। ছিলেন চাকরি হারিয়ে ঋণের বোঝায় বিপর্যস্তএকজন মানুষ। আর হাজার মাইল দূরে বসে চার প্রবাসী বলেছিলেন দেশে ফেলে আসা জমি ও বাড়ি নিয়ে তাঁদের উদ্বেগের কথা। তাদের সবার কথা একে একে শুনেছেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। যেখানে সম্ভব, তাৎক্ষণিক সহায়তা দিয়েছেন। যেখানে তদন্ত প্রয়োজন, সেখানে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দিয়েছেন। দিন শেষে সব সমস্যার সমাধান হয়নি। চিকিৎসার পুরো খরচ জোগাড় হয়নি, ঋণের বোঝা শেষ হয়নি, জমির বিরোধেরও চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি। তবে মানুষগুলো অন্তত এটুকু নিয়ে ফিরেছেন-প্রশাসনের কাছে তাদের কথা বলার জায়গা আছে, আর সেই কথা শোনারও কেউ আছেন। গণশুনানির মানবিকতাও হয়তো এখানেই-ফাইল নয়, ফাইলের ওপাশে থাকা মানুষটিকে দেখা।



আপনার মতামত লিখুন