নথি প্রতি কথিত রেটচার্ট, পটিয়ার প্রকল্পে কোটি টাকার লেনদেনের অভিযোগ; কক্সবাজারে বিলাসবহুল বাড়ি ও সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন

এলএ শাখায় কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ: দিপুর পর আলোচনায় দেলোয়ার

ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: রবিবার, ১১ অক্টোবর, ২০২৬, ৫:৩১ সন্ধ্যা
এলএ শাখায় কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ: দিপুর পর আলোচনায় দেলোয়ার

চট্টগ্রাম অফিস: সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য ভূমি অধিগ্রহণ করা হয় জনস্বার্থে। অথচ সেই জমির ক্ষতিপূরণের অর্থ পেতে গিয়ে ভূমিমালিকদের কমিশন, মধ্যস্থতাকারী ও দীর্ঘসূত্রতার চাপে পড়তে হচ্ছে—এমন অভিযোগ উঠেছে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ (এলএ) শাখাকে ঘিরে। পটিয়ার পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকল্প থেকে শুরু করে কালুরঘাট ওয়াসা ও মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলের ভূমি অধিগ্রহণ কার্যক্রম—বিভিন্ন প্রকল্পে ক্ষতিপূরণের অর্থ ছাড়, নথি যাচাই ও চেকসংক্রান্ত কার্যক্রমে কথিত কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ সামনে এসেছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রে উঠে এসেছে এলএ শাখার সার্ভেয়ার মো. দেলোয়ার হোসেনের নাম।

ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মচারীর অভিযোগ, জমির কাগজপত্র যাচাই, ক্ষতিপূরণসংক্রান্ত প্রতিবেদন তৈরি এবং চেক পাওয়ার প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে একটি মধ্যস্থতাকারী চক্র সক্রিয় রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, নথিপত্রে জটিলতা থাকলে কমিশনের হার আরও বেড়ে যায়। কেউ কেউ দাবি করেছেন, কাগজপত্রে ত্রুটি থাকলে ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ এবং স্বাভাবিক থাকলে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন চাওয়া হয়।

পটিয়ার তিন মৌজায় কোটি টাকার কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ

পটিয়ার গৈরালা, নাইখান ও জঙ্গলখাইন মৌজায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে ভূমি অধিগ্রহণ কার্যক্রমে সার্ভেয়ার মো. দেলোয়ার হোসেনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কয়েকজন অভিযোগকারী। তাঁদের ভাষ্য, প্রায় এক বছর আগে ওই প্রকল্পের কার্যক্রম তদারকির দায়িত্বে থাকার সময় ভূমিমালিকদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং ক্ষতিপূরণসংক্রান্ত কাজ এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে নিম্ন শ্রেণির কয়েকজন কর্মচারীকে ব্যবহার করা হতো বলে তাঁরা অভিযোগ পেয়েছেন।

অভিযোগকারীদের দাবি, প্রকল্পটিকে কেন্দ্র করে দুই থেকে তিন কোটি টাকা পর্যন্ত কমিশন আদায়ের ঘটনা ঘটেছে। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কয়েকজন নিম্ন শ্রেণির কর্মচারীও এ বিষয়ে অভিযোগের কথা অনুসন্ধানী দলের কাছে স্বীকার করেছেন বলে প্রতিবেদক জানিয়েছেন।

ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে মালিকানা, জমির শ্রেণি, রেকর্ড ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই করা নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অংশ। কিন্তু এই প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে যদি কোনো কর্মচারী বা মধ্যস্থতাকারী অর্থ দাবি করেন, তাহলে তা সরকারি সেবার স্বচ্ছতা ও ভূমিমালিকদের ন্যায্য অধিকার নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে।

কালুরঘাট ওয়াসা প্রকল্প: ক্ষতিপূরণের চেক পেতে কমিশনের প্রলোভনের অভিযোগ

কালুরঘাট ওয়াসা প্রকল্পে জমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ পেতে গিয়ে দুই ভাইয়ের ভোগান্তির অভিযোগও সামনে এসেছে। অভিযোগকারীদের একজনের ভাষ্য, তাঁদের জমির অংশবিশেষ অধিগ্রহণ করা হলেও চেকসংক্রান্ত কার্যক্রমে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়েছে। দ্রুত ক্ষতিপূরণের অর্থ পাওয়ার আশায় তাঁরা সংশ্লিষ্ট সার্ভেয়ার ও মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করেন।

ওই ভূমিমালিকের অভিযোগ, দুই ভাইয়ের কাছে পৃথকভাবে কমিশনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তাঁর দাবি, একজনকে ৩০ শতাংশ কমিশন দেওয়ার বিনিময়ে পুরো জমি তাঁর নামে অধিগ্রহণ করে দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়। অন্য ভাইয়ের কাছেও আরও বেশি কমিশন চাওয়ার প্রলোভন দেখানো হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগের কারণে ক্ষতিপূরণ আটকে যাওয়ার আশঙ্কায় কয়েকজন ভুক্তভোগী নিজেদের পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি।

মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চল: চেকসংক্রান্ত কার্যক্রমেও প্রশ্ন

মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলের ভূমি অধিগ্রহণের চেকসংক্রান্ত কার্যক্রমেও দেলোয়ার হোসেনের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে অভিযোগকারীরা প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের বক্তব্য, ক্ষতিপূরণ পাওয়ার প্রক্রিয়ায় নথি যাচাই ও সংশ্লিষ্ট দাপ্তরিক কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে মধ্যস্থতাকারীদের তৎপরতা রয়েছে।

ভালো প্রকল্পে দায়িত্ব পাওয়া নিয়ে প্রশ্ন, সম্পদের উৎস অনুসন্ধানের দাবি তুলেছেন ভুক্তভোগীগণ।

এলএ শাখার কয়েকজন নিম্ন শ্রেণির কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে অনুসন্ধানী দলের কাছে দাবি করেছেন, ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা (এলও)-এর সঙ্গে দেলোয়ার হোসেনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকায় তিনি বিভিন্ন প্রকল্পে দায়িত্ব পাওয়ার সুযোগ পান। তাঁদের কেউ কেউ এলও ও সার্ভেয়ারের মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে কথিত কমিশন বাণিজ্য পরিচালিত হওয়ার অভিযোগও করেছেন।

অনুসন্ধানী দলের কাছে আসা অভিযোগে দেলোয়ার হোসেনের নিজ জেলা কক্সবাজারে বিলাসবহুল বাড়ি নির্মাণ এবং নামে-বেনামে সম্পদ গড়ে তোলার বিষয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। খাতুনগঞ্জ ও আছাদগঞ্জের বিভিন্ন পাইকারি ব্যবসাকেন্দ্রে কোটি কোটি টাকা দাদন হিসেবে বিনিয়োগ করে নিয়মিত আয় করার দাবিও সামনে এসেছে।

জানা যায়, দেলোয়ার উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে সখ্যতা গড়ে তুলে সবসময় ভালো প্রজেক্টগুলোতে দায়িত্ব পেয়ে থাকেন। ইতিপূর্বে সে বিগত সরকারের দুই সংসদ সদস্য সাইমুম সরোয়ার কমল এবং মাহবুবুর রহমান এর দাপট দেখিয়ে ভালো জায়গায় পোস্টিং নিতো। উপরের মহলের কর্মকর্তারা তার মাধ্যমে ঘুষের টাকা পায় বিধায় সে কাউকে পাত্তা দেয় না। দাপট দেখিয়ে বেড়ায় সবসময়।

দিপুর বদলির পরও কি অনিয়মের অভিযোগ থামেনি?

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের এলএ শাখায় এর আগে মো. আবু ইউসুফ ইফতেখার দিপুর বিরুদ্ধে ঘুষ লেনদেন ও ভূমিমালিকদের হয়রানির অভিযোগ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, তাঁকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের এলএ শাখায় সংযুক্ত করে বদলির আদেশ দেওয়া হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, দিপুর পর দেলোয়ারকে ঘিরে একই ধরনের কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ সামনে এসেছে।

বক্তব্য জানতে চাইলে কী বললেন দেলোয়ার?

সার্ভেয়ার মো. দেলোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রতিবেদকের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। তিনি তথ্য অধিকার আইনে লিখিত আবেদন করার পরামর্শ দেন এবং অন্যথায় ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলতে বলেন। পরে একাধিকবার ফোন করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়েও জবাব পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদক জানান।

ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস এলএ কর্মকর্তার

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সিনিয়র সহকারী কমিশনার (ভূমি অধিগ্রহণ শাখা) মো. আনিছুর রহমান খান মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “অভিযোগ পেলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

তদন্তের দাবি: অভিযোগের সত্যতা যাচাই হবে কবে?

পটিয়ার গৈরালা, নাইখান ও জঙ্গলখাইন মৌজা, কালুরঘাট ওয়াসা প্রকল্প এবং মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলের ভূমি অধিগ্রহণ কার্যক্রম ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের মতে, শুধু মৌখিক অনুসন্ধান নয়, বরং প্রকল্পভিত্তিক নথি যাচাই, ক্ষতিপূরণ প্রদানের সময়রেখা পর্যালোচনা, ভূমিমালিকদের গোপনীয়তা রক্ষা করে সাক্ষ্য গ্রহণ এবং আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন ও বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের পাশাপাশি অভিযোগের ধরন ও প্রমাণের ভিত্তিতে দুর্নীতি দমন কমিশনেরও বিষয়টি খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং অভিযোগের ভিত্তি না পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায়মুক্তি নিশ্চিত করা—দুটিই ন্যায়সংগত প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অংশ।

ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ কোনো অনুগ্রহ নয়; এটি আইন অনুযায়ী ভূমিমালিকের প্রাপ্য অর্থ। সেই অর্থ পেতে কমিশন দেওয়ার অভিযোগ যদি সত্য হয়, তাহলে তা শুধু আর্থিক অনিয়ম নয়, জনস্বার্থে পরিচালিত উন্নয়ন কার্যক্রমের প্রতি মানুষের আস্থারও সংকট।

দ্বিতীয় পর্বে: এলএ শাখার কথিত কমিশন বাণিজ্যের নেপথ্যে কারা?

Feb2
Feb2