এ দুঃসময়ে রাতদিন ছুটছেন বোয়ালখালীর দুই মানবিক কর্মকর্তা
বোয়ালখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আছিয়া খাতুন ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী।
পূজন সেন, বোয়ালখালী প্রতিনিধি : প্রাণঘাতি করোনা ভাইরাসের আঘাতে থমকে গেছে পুরো বিশ্ব। মৃত্যুর মিছিলে হাহাকার করছে প্রতিটি দেশ। করোনা ভাইরাসের ভয়াল থাবা বসাতে শুরু করেছে বাংলাদেশে।
চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার সহজ সরল মানুষগুলোকে এ ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে সুরক্ষিত রাখতে দিনরাত পরিশ্রম করে চলছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আছিয়া খাতুন ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী।
বৈশ্বিক মহামারিতে রূপ নেওয়া মরণঘাতি করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ, নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধে শুধুমাত্র দায়িত্ব বা কর্তব্যের খাতিরে নয় প্রাণের তাগিদে এ যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছেন এ দুই মানবিক কর্মকর্তা।
উপজেলার মানুষগুলোকে এ সংক্রমণ থেকে রক্ষায় স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষা প্রয়োজন। সেই চিন্তা থেকে সবার প্রথমে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৬০ পিস পিপিই ( পার্সোনাল প্রটেকশন ইকুইপমেন্ট) প্রদান করেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার আছিয়া খাতুন। এছাড়া তারই আহ্বানে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়, বিদ্যানন্দ ৮ পিস ও এস আলম ৫০ পিস পিপিই দিয়ে সহযোগীতা করেন।

প্রবাসীদের হোম কোয়ারান্টাইন নিশ্চিত করার পাশাপাশি মানুষকে সচেতন করা, স্বাস্থ্যবিধি মানতে বলা, জনসমাগম কমানো, অসহায় পরিবারগুলোকে খাদ্য সহায়তা প্রদান, দ্রব্যমূল্যের কৃত্রিম সংকট এবং ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণে উপজেলা নির্বাহী অফিসার আছিয়া খাতুন ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো.মোজাম্মেল হক চৌধুরী নিরলস কাজ করে চলেছেন। চষে বেড়াচ্ছেন উপজেলার প্রতিটি প্রত্যন্ত অঞ্চল। এসব কাজে করতে মোকাবেলা করতে হচ্ছে গুজব ও কুসংস্কারসহ নানা ধরণের প্রতিকূলতার সাথে।
তবে এ যুদ্ধ যে প্রতিটি নাগরিকের। তাই একাজে অন্যদেরও সম্পৃক্ত করতে লাগলেন নানাভাবে উৎসাহ প্রদানের মাধ্যমে। তাৎক্ষণিক খবরাখবর পেতে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রেখে চলছেন এলাকাবাসীর সাথে। একই সাথে দেশ বিদেশের খবরও রাখতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত।
গত বছরের ডিসেম্বরে চীনের উহানে ছড়িয়ে পড়ে কভিড-১৯ বা করোনা ভাইরাস। বাংলাদেশে ৮ মার্চ প্রথম করোনা আক্রান্ত শনাক্ত হয়। ২৬ মার্চ সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে সরকার। সেনাবাহিনী মাঠে নামে। ভালোই কাটছিলো দিন তবে গত বৃহস্পতিবার (১৪ এপ্রিল) রাতে বোয়ালখালী উপজেলার এক বৃদ্ধ শনাক্ত হন করোনা আক্রান্ত হিসেবে।
১৫ এপ্রিল ফেসবুক স্ট্যাটাসে সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী লিখেছেন, ” সাধারণ ছুটির পর সেনাবাহিনী মাঠে নামলে কাজ গতি আরো বেড়ে যায়। ১৪ এপ্রিল রাত ৯টায় যখন বাসায় ফিরি তখন পর্যন্ত মানসিক প্রশান্তি ছিলো যে বোয়ালখালী এখনো ‘করোনা’মুক্ত।”
‘কিছুক্ষণ পর যখন জানলাম (বোয়ালখালী উপজেলার এক ব্যক্তির শরীরে করোনা পজেটিভ) তখন একরাশ হতাশা ঘিরে ধরলো।’
উপজেলা নির্বাহী অফিসার আছিয়া খাতুন বলেন, নিজেদের ঝুঁকিও কম নেই এতে। ভাবতে হচ্ছে এ কাজে সম্পৃক্ত প্রতিটি কর্মকর্তা কর্মচারীদের কথাও। তাদেরও পরিবার পরিজন রয়েছে। এ সংক্রমণ প্রতিরোধ উপজেলা প্রশাসনের পক্ষে একা সম্ভব নয়, যতক্ষণ না আমরা প্রত্যেকে সচেতন না হই।
সরকার সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে সহযোগিতা করছে। নাগরিক হিসেবে প্রত্যেকেরও দায়িত্ব রয়েছে নিজের পরিবার ও সমাজের প্রতি।
বিনাকারণে ঘোরাফেরা বন্ধে, আইন অমান্য করায়, দ্রব্য মূল্য নিয়ন্ত্রণে বোয়ালখালীবাসীর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার মাধ্যমে বেশ কয়েকজনকে জরিমানাও করেছে উপজেলা প্রশাসনের এ দুই কর্মকর্তা। নিয়েছেন সামাজিক দূরত্ব মেনে খোলা মাঠে অস্থায়ী কাঁচাবাজার বসানো, উপজেলা পরিষদ, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও থানায় যাতায়াতকারীদের নিশ্চিতকরণে হাতধোয়ার বেসিন বসানো ও উপজেলায় ফায়ার সার্ভিস এবং পৌরসভার সহায়তায় জীবাণুনাশক ছিটানোসহ সামাজিক নানা উদ্যােগ। এছাড়া করোনা ভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে বেশ কয়েকটি কমিটিও গঠন করা হয় চৌকস পরিশ্রমী ব্যক্তিদের নিয়ে।
তারপরও যেন কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। এক শ্রেণির লোকজন বাইরে ঘোরাফেরা করছেন, আইনশৃংখলা বাহিনীর হাতে পড়লে নানান অজুহাত দিচ্ছেন অথবা ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে যাচ্ছেন। এতে ওই মানুষগুলো সংক্রমিত হতে পারেন এমন আশঙ্কায় ভুগছেন উপজেলার সচেতন নাগরিকরা।
গতকাল ১৮ এপ্রিল ফেসবুক লাইভে এসে এনিয়ে শঙ্কা আর হতাশার কথা শোনালেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো.মোজাম্মেল হক চৌধুরী।
ওইদিন সন্ধ্যায় তিনি ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেন, ‘মনে হচ্ছে সরকারের আদেশ অমান্য করে বাজারে বাজারে ঘোরা, আড্ডা দেওয়া, এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাওয়া, সেনা-পুলিশ-ম্যাজিস্ট্রেট দেখে পালিয়ে যাওয়া মানুষগুলোই সঠিক, আমরা বেঠিক। আমরাই মনে হয় বোকার মত পরিবার ও নিজের কথা না ভেবে রাস্তায় রাস্তায় হেঁটে চলেছি।’
উপজেলা নির্বাহী অফিসার আছিয়া খাতুন বলেন, করোনাভাইরাস নিয়ে সাধারণ মানুষ খুবই আতঙ্কিত। উপজেলা ও পৌরসভাসহ প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে ভ্যানচালক, রিক্সাচালক, শ্রমিক, খেটে খাওয়া মানুষ, ভিক্ষুক, অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়িদের মাঝে ত্রাণ সামগ্রী পৌঁছে দিচ্ছি।
তিনি বলেন, এই সংকটময় সময়ে পৌরসভার কাউন্সিলর, ইউনিয়নের চেয়ারম্যান, মেম্বার, সচিব, উদ্যোক্তা এবং গ্রাম পুলিশ অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। ত্রাণের তালিকা প্রস্তুত, বিতরণ, হোম কোয়ারান্টাইন নিশ্চিতকরণ সহ সকল কাজে সকলের সহযোগিতা পেয়েছি। তারা সকলেই রাত-দিন কাজ করে চলেছেন।
তিনি আরো বলেন, বোয়ালখালীবাসীকে ভালো ও নিরাপদে রাখতে আমার সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে কাজ করে যাচ্ছি। তবে বোয়ালখালীবাসী যদি আমাদের সহযোগিতা না করেন তাহলে সব চেষ্টা, কাজ বৃথা হয়ে যাবে। পাশাপাশি সকল ধরণের অভিযান অব্যাহত রেখেছি। সামনে রমজান। সেদিকেও আমার নজর আছে। নিয়মিত বাজার মনিটরিং অব্যাহত থাকবে।
সংকটময় এ মুহূর্তে সরকারের পাশাপাশি সবাইকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।


আপনার মতামত লিখুন