খুঁজুন
শনিবার, ৯ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৬শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শত শত পরিবার আজও আছে অপেক্ষায়

ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: শুক্রবার, ৩০ আগস্ট, ২০২৪, ৮:৪২ পূর্বাহ্ণ
শত শত পরিবার আজও আছে অপেক্ষায়

২০১৩ সালের ৬ ডিসেম্বর। অগ্রহায়ণের হালকা শীতের রাত। রাজধানীর দক্ষিণখানের হাজী মার্কেটের সামনে থেকে সাদা পোশাকের কয়েক ব্যক্তি ডিবি পরিচয়ে তুলে নেয় তেজগাঁও সরকারি কলেজ ছাত্রদলের যুগ্ম সম্পাদক তরিকুল ইসলাম ঝন্টুকে। ছেলে রাতে আর বাড়ি ফেরেনি। বাবা নুর মোহাম্মদ খান বুঝতে পারেননি ছেলের ভাগ্যে কী ঘটেছে। ভেবেছিলেন, সরকারবিরোধী রাজনীতি করা ছেলের নিয়তিতে জেল নির্ধারিত। কিন্তু থানা, আদালত, কারাগার কোথাও ঝন্টুর সন্ধান না পেয়ে বুঝতে পারেন, তাঁর আদরের সন্তানকে গুম করা হয়েছে।

ছেলেকে ফিরে পেতে পুলিশ, র‍্যাব, ডিবি কর্মকর্তাদের দ্বারে দ্বারে বছরের পর বছর ঘুরেছেন নুর মোহাম্মদ খান। তীব্র মনোকষ্ট নিয়ে তিনি ২০১৬ সালে মারা যান। আর ঝন্টুর মা হাসিনা বেগম ১১ বছর পরও রাত জেগে থাকেন ছেলের অপেক্ষায়। দরজায় শব্দ হলে ভাবেন, এই বুঝি ছেলে এলো!

ঝন্টু ফিরে এসে যদি মাকে খুঁজে না পান– এই শঙ্কায় ভাড়া বাসা বদল করেননি হাসিনা বেগম। ঝন্টুর ছোট ভাই সাইফুল ইসলাম মিঠু সমকালকে বলেন, সেদিন রাত সাড়ে ১০টার দিকে বাসার সামনে লন্ড্রিতে গিয়েছিলেন তাঁর ভাই। দুটি সাদা মাইক্রোবাসে আসা ব্যক্তিরা ডিবি পরিচয়ে ঝন্টুকে গাড়িতে তোলে। ওই রাতে ঝন্টুকে তুলে নেওয়ার ঘটনা জানতে পারেননি। বাসায় না ফেরায় ভেবেছিলেন, গ্রেপ্তার এড়াতে হয়তো কারও বাসায় আশ্রয় নিয়েছেন। পরদিন ওই দোকানি জানান, রাতে ঝন্টুকে তুলে নিয়ে গেছে পুলিশ। কিন্তু র‍্যাব, ডিবিসহ পুলিশের সব ইউনিট ঝন্টুকে আটকের কথা অস্বীকার করে। তাঁকে আদালতে তোলা হবে– এ আশায় কয়েকদিন আদালতে যান বাবা-মা। সেখানে না পেয়ে ২০১৩ সালের ১০ ডিসেম্বর দক্ষিণখান থানায় জিডি (নম্বর ৪৩৬) করেন হাসিনা বেগম। ১৩ ডিসেম্বর সংবাদ সম্মেলন করেন। কিন্তু পুলিশ কখনোই সহায়তা করেনি। উল্টো হয়রানি করেছে। শুধু ঝন্টু নন, শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে গুম হয়েছিলেন অন্তত ৬৭৭ জন। তাদের বাবা-মা, পরিবার-স্বজন প্রতিদিন প্রহর গোনেন কখন ফিরবে তাদের প্রিয়জন।

এশিয়ান হিউম্যান রাইটস কমিশনের হিসাবে, গত বছরের ৩০ আগস্ট পর্যন্ত নিখোঁজ ছিলেন অন্তত ১৫৩ জন। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার কর্তৃত্ববাদী শাসনের পতনের পর তিনজন ফিরেছেন পাঁচ থেকে আট বছর নিখোঁজ থাকার পর। এ হিসাবে গুমের শিকার অন্তত দেড়শ জন এখনও নিখোঁজ।

আগে ফেরত আসা ব্যক্তিরা মুখ না খুললেও এখন জানাচ্ছেন শেখ হাসিনার আমলে কীভাবে ভিন্নমতের মানুষ, বিশেষ করে বিএনপি এবং জামায়াতের নেতাকর্মীকে তুলে নিয়ে গোপন বন্দিশালায় মাসের পর মাস আটকে রাখা হতো।

গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্বজনরা অপেক্ষায় আছেন এখনও। নিয়মিত কর্মসূচি পালন করে চলেছেন। এরই মধ্যে দেখা করেছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে।

অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকার গুমের ঘটনা উদ্ঘাটন করে ৪৫ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বিচারপতি মো. মইনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে তদন্ত কমিশন করেছে। গতকাল সই করেছে জাতিসংঘের গুমবিরোধী সনদে।

এমন পরিস্থিতির মধ্যেই আজ শুক্রবার বিশ্বজুড়ে পালিত হবে গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণে আন্তর্জাতিক দিবস। এ উপলক্ষে আজ মানববন্ধন, সমাবেশসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করবে গুমের শিকার স্বজনের সংগঠন ‘মায়ের ডাক’।

মোকাদ্দেসকে কোথায় রেখেছিল, এটুকুই জানতে চান বাবা

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের দুই নেতা শাহ মো. ওয়ালীউল্লাহ ও মোকাদ্দেস আলীকে ২০১২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি রাতে তুলে নিয়ে যায় র‍্যাবের পোশাক পরা এবং সাদা পোশাকধারী কয়েক ব্যক্তি। উচ্চ আদালতে রিটেও সন্ধান মেলেনি তাদের। আওয়ামী লীগ শাসনামলে কোণঠাসা এবং অনেকটাই নিষিদ্ধ থাকায় গুম হওয়া জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীর বিষয়টি খুব একটা আলোচনায় আসেনি।

পিরোজপুর সদরের মোকাদ্দেস পড়তেন তখন অনার্স শেষ বর্ষে। ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ফাইনাল পরীক্ষা শুরুর কথা ছিল। তাই ৪ ফেব্রুয়ারি রাতে সহপাঠী ওয়ালীউল্লাহকে নিয়ে ঢাকার গাবতলী থেকে হানিফ পরিবহনের বাসে চড়েন। মোকাদ্দেসের বাবা আবদুল হালিম সমকালকে বলেছেন, গাড়ির নম্বর ছিল ৩৭৫০। বাসটি আশুলিয়ার নবীনগর পৌঁছানোর পর র‍্যাব গাড়ি থামার সংকেত দেয়। র‍্যাব সদস্যরা বাসে উঠে মোকাদ্দেস ও ওয়ালীউল্লাহকে নামিয়ে নিয়ে যান। সুপারভাইজার আমাদের পরে জানান, একজন র‍্যাব সদস্যের বুকের নেমপ্লেটে লেখা ছিল ‌‘জামান’। গাড়িতে লেখা ছিল ‌‘র‍্যাব-৪’।

আবদুল হালিম বলেন, ৬ ফেব্রুয়ারি থেকে পরের ২১ দিন কুষ্টিয়া ও ঢাকায় ছেলেকে খুঁজি। এর পর আশুলিয়া থানায় জিডি করি। হাইকোর্টে রিট করি। পুলিশ, র‍্যাব, ডিবি, ডিজিএফআইসহ ৯টি সরকারি সংস্থাকে সাত দিনের মধ্যে মোকাদ্দেস ও ওয়ালীউল্লাহর অবস্থান জানাতে আদালত নির্দেশ দেন। কিন্তু তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম আদালতে গিয়ে এ আদেশ পাল্টে ফেলেন। কারণ, শেখ হাসিনা সরাসরি জড়িত ছিলেন এসব গুমে।

আবদুল হালিম বলেন, মোকাদ্দেসের মা আয়েশা সিদ্দীকা এখনও ছেলের জন্য পথ চেয়ে রয়েছেন। হয়তো তাঁর ছেলে আর নেই। তাই অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে আবদুল হালিমের আরজি– পুলিশ, ডিজিএফআই, এনএসআইসহ বিভিন্ন সংস্থার যেসব গোপন কারাগার ছিল, সেগুলো তাঁকে দেখতে দেওয়া হোক।

কেন এই আরজি– প্রশ্নে আবদুল হালিম বলেন, ‘আমি একটু দেখতে চাই, আমার ছেলেটাকে কোথায় রেখেছিল। আমার ছেলেটার সঙ্গে কী করেছিল।’

গুমের ঘটনা তদন্তে গঠিত কমিশনে পুরোপুরি ভরসা পাচ্ছেন না বলে জানিয়েছেন আবদুল হালিম। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ আমলেও যখন আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ত, তখন বাড়িতে পুলিশ এসে খোঁজ নিত। জানতে চাইত, মোকাদ্দেসের সঙ্গে কারও বিরোধ ছিল কিনা, ছেলেকে অপহরণ করতে পারে বলে কাউকে সন্দেহ করি কিনা। তারা সব জেনেও প্রশ্ন করে কষ্টটাকে আরও বাড়িয়ে তুলত। কমিশন যেন একই কাজ না করে। দীর্ঘ সময় না নিয়ে আমাদের প্রতি যেন ন্যায়বিচার করে। আমার ছেলেটার সঙ্গে আসলে কী হয়েছে, তা যেন জানায়।

সাহায্য না করে খারাপ আচরণ করেন ‘ডিবি হারুন’

২০১৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অবরোধ চলাকালে গাজীপুর থেকে নিখোঁজ হন ঢাকার পল্লবী থানা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক নূর আলম। গ্রেপ্তার হতে পারেন শঙ্কায় নূর আলম সপরিবারে গাজীপুরে ভাইয়ের বাসায় ছিলেন। তাঁর স্ত্রী রিনা বেগম জানান, মধ্যরাতে সাদা মাইক্রোবাসে ১০ জন পোশাকধারী পুলিশ আসে। নূর আলমের বড় ভাই নুরুল ইসলাম দরজা খুলে দেন। তখন তিনি ও তাঁর স্বামী ঘুমিয়ে ছিলেন। পুলিশ ঘরে ঢুকে নূর আলমকে বিছানা থেকে টেনে দরজার দিকে নিয়ে যেতে থাকে। কোথায় নিচ্ছেন– জিজ্ঞেস করলে জয়দেবপুর থানায় যোগাযোগ করতে বলে।

রিনা বেগম জানান, পরদিন সকালে থানা থেকে বলা হয়, নূর আলম নামে কাউকে আটক করা হয়নি। পল্লবী থানাও একই উত্তর দেয়। না পেয়ে জয়দেবপুর থানায় জিডি করেন রিনা বেগম। ১৭ ফেব্রুয়ারি মামলাও করেন। কিন্তু পুলিশ নিয়ে গেছে– এ কথা লিখতে পারেননি এজাহারে।

২০১৫ সালে গাজীপুরে এসপি ছিলেন বিতর্কিত পুলিশ কর্মকর্তা হারুন-অর-রশিদ। স্বামীর খোঁজে তাঁর কাছে গিয়েছিলেন রিনা বেগম। কিন্তু সাহায্য না করে খারাপ আচরণ করেন হারুন। দুই বছর মামলা চলার পর পুলিশ চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছে। এতে গুমের কথা অস্বীকার করা হয়েছে।

ব্যবস্থা না নিয়ে তাচ্ছিল্য করত সরকার

জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের গুমবিষয়ক ওয়ার্কিং গ্রুপ ২০২২ সালের আগস্টে নিখোঁজ ৭৬ তালিকা দিয়েছিল শেখ হাসিনার সরকারকে। মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার মিশেল ব্যাচেলেত ঢাকা সফরে এসে এ তালিকা নিয়ে কথা বলেছিলেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সঙ্গে।

তখন সরকারের তরফ থেকে গুমের অভিযোগ বরাবরের মতো অস্বীকার করা হয়। জানায়, ১০ জনের খোঁজ পাওয়া গেছে। বাকিদের মধ্যে ১০ জনকে খুঁজে পেতে পুলিশ সহযোগিতা করতে চাইলেও তাদের স্বজনের কাছ থেকে সাড়া পাওয়া যায়নি। বাকি ৫৬ জন ‘পলাতক’। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একাধিকবার বিদ্রূপ করে বলেছিলেন, এই ব্যক্তিরা মামলার ভয়ে পালিয়ে রয়েছেন। আবার কখনও বলেন, তারা অবৈধ পথে বিদেশ যেতে গিয়ে ভূমধ্যসাগরে ডুবে মরেছে।

যে ১০ জনকে খুঁজে পেতে পুলিশকে সহযোগিতা করেছে বলে দাবি করেছিল আওয়ামী লীগ সরকার, তাদের একজন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা মোকাদ্দেস আলী। তাঁর বাবা আবদুল হালিম বলেন, অবান্তর প্রশ্ন করা ছাড়া কিছুই করেনি পুলিশ।

এখনও কত নিখোঁজ

আওয়ামী লীগ সরকারের হিসাব ধরলে, এখনও নিখোঁজ রয়েছেন ৬৩ জন। মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের হিসাবে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুম হয়েছেন ৬৭৭ জন। অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান গতকাল উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠক শেষে বলেন, এখনও ৭০০ মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজ ব্যক্তিদের তালিকা করা হবে।

বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক এম ইলিয়াস আলী ও তাঁর গাড়িচালক, সাবেক এমপি সাইফুল ইসলাম হীরুসহ অর্ধশত এখনও নিখোঁজ। ছাত্রদলের ১৯ নেতাকর্মী এবং ছাত্রশিবিরের পাঁচ নেতা এখনও নিখোঁজ। জামায়াতের চার নেতাকর্মীর দু’জন ফিরেছেন। নিখোঁজ সবাইকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে ধরে নিয়ে গিয়েছিল।
আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) জানিয়ছে, ২০০৭ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ৬২৯ জন গুমের শিকার হয়েছেন বলেও জানিয়েছে আসক। তাদের মধ্যে লাশ উদ্ধার হয়েছে ৭৮ জনের। ছেড়ে দেওয়া হয় ৫৯ জনকে। পরবর্তী সময়ে ৭৩ জনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। বাকিদের সন্ধান মেলেনি।

আন্তর্জাতিক আদালতে মামলার প্রস্তুতি
অন্তর্বর্তী সরকার তদন্ত কমিশন গঠন করলেও গুমের অপরাধে শেখ হাসিনাকে বিচারের মুখোমুখি করতে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করার কথা জানিয়েছেন বিএনপি নেতা সৈয়দ সাদাত আহমেদ। ২০১৭ সালে পুলিশ পরিচয়ে তুলে নিয়ে চার মাস গোপন বন্দিশালায় আটকে রেখে নির্যাতন চালানো হয়েছে তাঁর ওপর।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা এবিএন গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সাবেক সেনা কর্মকর্তার ছেলে সৈয়দ সাদাত সমকালকে জানান, বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের সঙ্গে আলোচনা করে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

এখন সরব মানবাধিকার কমিশন
শেখ হাসিনার আমলে গুম নিয়ে কিছু না বললেও আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর সরব হয়েছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন। সংস্থাটির চেয়ারম্যান ড. কামালউদ্দিন আহমেদ বলেন, কোনো ব্যক্তিকে জোরপূর্বক তুলে নেওয়া মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এর জন্য দায়ী। শুনেছি নির্যাতনের জন্য ‘আয়নাঘর’ নামের বন্দিশালা ছিল। সেখানে রাষ্ট্রের বিভিন্ন বাহিনী মানুষকে ধরে নিয়ে দীর্ঘদিন আটকে রাখত। কিছু লোক বের হয়ে এসেছে। নিখোঁজ ব্যক্তির স্বজনদের আর্তনাদ দেখেছি।

কামালউদ্দিন আহমেদের ভাষ্য, আওয়ামী লীগ আমলে কমিশনের পক্ষ থেকে গুম ও নিখোঁজ ব্যক্তিদের সম্পর্কে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু তারা সদুত্তর দিতে পারেনি।

Feb2

নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসের মাধ্যমে গড়ে উঠবে ‘নতুন বাংলাদেশ’: ডিসি জাহিদ

ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: শুক্রবার, ৮ মে, ২০২৬, ১০:২৩ অপরাহ্ণ
নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসের মাধ্যমে গড়ে উঠবে ‘নতুন বাংলাদেশ’: ডিসি জাহিদ

তরুণ প্রজন্মকে খেলাধুলা ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে মাদক ও অপরাধমুক্ত সমাজ গঠনে সম্পৃক্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। তিনি বলেছেন, “নতুন বাংলাদেশ” গড়ার লক্ষ্যে সরকার যে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ তারই একটি দূরদর্শী উদ্যোগ।

শুক্রবার (৮ মে) “নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস-২০২৬” এর চট্টগ্রাম জেলা পর্বের সপ্তম দিনের বিভিন্ন ইভেন্টের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম বলেন,মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সবচেয়ে উজ্জ্বল মাইলফলক স্থাপিত হয়েছে “নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস”-এর এই যাত্রার মাধ্যমে। আমরা এই আয়োজনের মাধ্যমে একটি দক্ষ, প্রত্যয়শীল ও দেশপ্রেমিক জাতি গঠন করতে চাই—যে জাতি নিজে সুস্থ থাকবে এবং একটি সুস্থ সমাজ গড়ে তুলবে।

খেলাধুলা শুধু শারীরিক সুস্থতাই নিশ্চিত করে না, এটি মানসিক বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই স্পোর্টস কার্যক্রমের মাধ্যমে আমরা আমাদের নতুন প্রজন্মকে গড়ে তুলতে চাই।

তিনি আরো বলেন, খেলাধুলা আমাদের শেখায় কীভাবে চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে হয়, কীভাবে পরাজয় মেনে নিতে হয় এবং কীভাবে সেই পরাজয় থেকে আবার জয়ের পথে ফিরে আসতে হয়। আমরা বিশ্বাস করি, একজন মানুষ সবসময় জয়ী হতে পারে না; কিন্তু জয়ী হতে হলে তাকে প্রতিযোগিতার মনোভাব ধরে রাখতে হবে।

তিনি বলেন,আমরা মনে করি না যে সবাইকে শুধু ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা অফিসারই হতে হবে। পৃথিবীতে এমন অনেক মানুষ আছেন, যারা খেলাধুলার মাধ্যমে নিজেদের দেশকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিত করে তুলেছেন। আমরা ব্রায়ান লারাকে চিনি, শচীন টেন্ডুলকারকে চিনি, মেসি, রোনালদো ও ম্যারাডোনাকে চিনি—কারণ তাঁরা তাঁদের দেশকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরেছেন।
আমরা চাই, আমাদের আগামী প্রজন্মের প্রতিটি সন্তানও একদিন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করুক। আর সে জন্য প্রয়োজন কঠোর পরিশ্রম ও অধ্যবসায়। কঠোর পরিশ্রম এবং অবিচল প্রচেষ্টা ছাড়া কোনো সমাজ বা রাষ্ট্রের পরিবর্তন সম্ভব নয়,যোগ করেন জেলা প্রশাসক।

জাহিদুল ইসলাম বলেন, আমাদের শিক্ষক ও অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান থাকবে—আপনারা সন্তানদের তাদের স্বপ্ন অনুযায়ী বেড়ে উঠতে সহায়তা করুন। তারা কোন বিষয়ে আগ্রহী, কোন পথে এগোতে চায়, সেটি গুরুত্ব দিয়ে তাদের উৎসাহ দিন।

জেলা প্রশাসক বলেন, রাষ্ট্রের উন্নয়নের অনেকগুলো দিক রয়েছে। আমরা সব ক্ষেত্রেই বাংলাদেশকে বিকশিত করতে চাই এবং মেধা ও যোগ্যতার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নেতৃত্ব দিতে চাই। আজকের এই উদ্যোগ সেই প্রতিশ্রুতিরই একটি অংশ।

জাহিদুল ইসলাম বলেন, আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি এমন একটি সুচিন্তিত, প্রত্যয়শীল ও সময়োপযোগী উদ্যোগ গ্রহণ করার জন্য। আমরা বিশ্বাস করি, “নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস”-এর মাধ্যমে গড়ে ওঠা নতুন প্রজন্ম একদিন বাংলাদেশের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করবে এবং দেশকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাবে।

চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম
বলেন, নিয়মিত খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ তরুণদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে এটি যুবসমাজকে ইতিবাচক ও সৃজনশীল ধারায় সম্পৃক্ত রাখতে সহায়তা করে।

এদিন সকালে চট্টগ্রাম জেলা স্টেডিয়ামে অ্যাথলেটিক্স, সিজেকেএস মিলনায়তনে দাবা, সিজেকেএস জিমনেসিয়ামে মার্শাল আর্ট এবং সিজেকেএস সুইমিং পুলে সাঁতার প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। পরে জেলা স্টেডিয়ামে চারটি ইভেন্টের চূড়ান্ত প্রতিযোগিতা শেষে পুরস্কার বিতরণ করা হয়।

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. শরীফ উদ্দিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম এবং চট্টগ্রাম জেলা ক্রীড়া সংস্থার অ্যাডহক কমিটির সদস্যসচিব হাজী মোহাম্মদ সালাউদ্দিন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন জেলা ক্রীড়া কর্মকর্তা আবদুল বারী।

অ্যাথলেটিক্সের ১০০ মিটার দৌড়ে বালক বিভাগে বায়েজিদ থানার মোহাম্মদ জাওয়াদ কাদের এবং বালিকা বিভাগে ফটিকছড়ি উপজেলার প্রেমা চৌধুরী প্রথম হয়ে “নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস-২০২৬” এর দ্রুততম বালক ও বালিকার গৌরব অর্জন করেন।

অনুষ্ঠান শেষে অতিথিরা বিভিন্ন ইভেন্টে বিজয়ীদের মধ্যে মেডেল ও সনদ বিতরণ করেন।

এদিকে, প্রতিযোগিতার ফুটবল ও ক্রিকেটের বালক-বালিকা বিভাগের ফাইনাল শনিবার সকালে অনুষ্ঠিত হবে। সকাল ১০টায় চট্টগ্রাম জেলা স্টেডিয়ামে ফুটবলের ফাইনাল এবং সাগরিকা মহিলা কমপ্লেক্স ও সাগরিকা আন্তর্জাতিক স্টেডিয়াম সংলগ্ন মাঠে ক্রিকেটের ফাইনাল অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ফাইনাল শেষে জেলা স্টেডিয়ামে বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করা হবে।

রবীন্দ্রনাথ আমাদের শিখিয়েছেন সুন্দরকে ভালোবাসতে, অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে: জেলা প্রশাসক

ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: শুক্রবার, ৮ মে, ২০২৬, ১০:১৪ অপরাহ্ণ
রবীন্দ্রনাথ আমাদের শিখিয়েছেন সুন্দরকে ভালোবাসতে, অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে: জেলা প্রশাসক

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর ১৬৫তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে চট্টগ্রামে আলোচনা সভা, পুরস্কার বিতরণ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। “শান্তি ও মানবতার কবি রবীন্দ্রনাথ” প্রতিপাদ্যে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে কবিগুরুর সাহিত্য, মানবতা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা নিয়ে আলোচনা করেন অতিথিরা।

বুধবার (৮ মে) বিকেলে জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম বিভাগের কমিশনার ড. মোঃ জিয়াউদ্দীন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক চট্টগ্রাম মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা।

বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস্) মুহাম্মদ ফয়সাল আহম্মেদ এবং অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) চট্টগ্রাম মোঃ শরীফ উদ্দিন।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে কমিশনার ড. মোঃ জিয়াউদ্দীন বলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো গুণী কবিকে নিয়ে কথা বলার মতো সাহিত্যজ্ঞান তাঁর নেই। তিনি বলেন, “চট্টগ্রাম শুধু বাণিজ্যের নগরী নয়; চট্টগ্রামের মানুষ রবীন্দ্রসংগীত গায়, বিশ্বকবির কবিতা আবৃত্তি করে। এই সাংস্কৃতিক চর্চাই আমাদের আত্মিক শক্তির জায়গা।” তিনি কবিগুরুর জন্মবার্ষিকীর শুভেচ্ছা জানান।

সভাপতির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, “কবিগুরু, বিশ্বকবি, গুরুদেব—যে নামেই আমরা তাঁকে ডাকি না কেন, তা যেন কম হয়ে যায়।” তিনি বলেন, রবীন্দ্রনাথের গান মানুষকে অনুভূতির এক ভিন্ন জগতে নিয়ে যায়। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন সুন্দরকে কীভাবে ভালোবাসতে হয়, কাব্যে কীভাবে ছন্দ আনতে হয় এবং গদ্যে কীভাবে বৈশ্বিক নান্দনিকতা তুলে ধরতে হয়।

জেলা প্রশাসক আরও বলেন, একজন কবি হয়েও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সোচ্চার ছিলেন। জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে তিনি ব্রিটিশদের দেওয়া নাইটহুড উপাধি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর সেই সাহস, মানবিকতা ও ন্যায়বোধ আমাদের ধারণ করতে হবে। বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে

তিনি কবিগুরুর উদ্ধৃতি তুলে ধরে বলেন, মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার মানবিকতা। তিনি প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন, বিশ্বকবির মানবিক আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে সবাই একটি সুন্দর সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখবেন।

আলোচনা সভা শেষে নাচ, গান ও আবৃত্তি প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করেন অতিথিবৃন্দ। পরবর্তীতে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রসংগীত, নৃত্য ও কবিতা আবৃত্তি পরিবেশিত হলে উপস্থিত অতিথিবৃন্দ ও দর্শকরা তা উপভোগ করেন এবং আয়োজকদের ধন্যবাদ জানান।

শাক বিক্রেতার গুলিবিদ্ধ মেয়ে রেশমাকে দেখতে হাসপাতালে ছুটলেন মানবিক ডিসি জাহিদ

ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: শুক্রবার, ৮ মে, ২০২৬, ৮:৩১ অপরাহ্ণ
শাক বিক্রেতার গুলিবিদ্ধ মেয়ে রেশমাকে দেখতে হাসপাতালে ছুটলেন মানবিক ডিসি জাহিদ

আইসিইউর দরজার সামনে তখন নীরব আতঙ্ক। ভেতরে লাইফ সাপোর্টে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে ১২ বছরের এক শিশু। চোখের নিচ দিয়ে ঢুকে যাওয়া গুলি তার মস্তিষ্কের বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। পাশে কান্নায় ভেঙে পড়া পরিবার। হাসপাতালের করিডোরজুড়ে উৎকণ্ঠা আর অসহায় অপেক্ষা।

ঠিক এমন সময় সেখানে উপস্থিত হন সারা দেশে মানবিক ডিসি হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়, কোনো প্রটোকল নয়—একজন প্রশাসক নয়, যেন একজন অভিভাবক হিসেবেই তিনি ছুটে যান গুলিবিদ্ধ শিশু রেশমা আক্তারের শয্যার পাশে।

চট্টগ্রাম নগরীর বায়েজিদ থানাধীন রৌফাবাদ শহীদ মিনার গলি এলাকায় গতকাল বৃহস্পতিবার
রাত আনুমানিক ৯টা ৫০ মিনিটে ৫ থেকে ৬ জন মুখোশধারী সন্ত্রাসী যুবক হাসান ওরফে রাজুকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। এতে হাসান ঘটনাস্থলেই নিহত হন। আর সেই গোলাগুলির শিকার হয় পথচারী নিরীহ শিশু রেশমা আক্তার। পরিবারের জন্য পান আনতে বাসা থেকে বের হয়েছিল সে।

গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাকে দ্রুত নগরীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে তাকে আইসিইউতে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়।

ঘটনার খবর পেয়ে আজ শুক্রবার (৮ মে) হাসপাতালে যান জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম। সঙ্গে ছিলেন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ মাহবুবুল হক। আইসিইউতে থাকা শিশুটির শারীরিক অবস্থার খোঁজ নেন তিনি। চিকিৎসকদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কথা বলেন। নিজে হাতে রেশমার সিটি স্ক্যান রিপোর্টও দেখেন।

চিকিৎসকেরা তাকে জানান, শিশুটির অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন। গুলিটি চোখের ভেতর দিয়ে ঢুকে মস্তিষ্কে মারাত্মক ক্ষতি করেছে। কথাগুলো শুনে দৃশ্যত আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন জেলা প্রশাসক।

হাসপাতালে উপস্থিত কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, রেশমার মায়ের কান্না শুনে কিছু সময় নীরবে দাঁড়িয়ে ছিলেন জেলা প্রশাসক। পরে পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দেন এবং তাদের আর্থিক সংকটের বিষয়টি জানতে পেরে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক নগদ আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন।

তবে সেখানে গিয়ে শুধু সহানুভূতি প্রকাশ করেই থেমে থাকেননি তিনি। চিকিৎসকদের উদ্দেশে বলেন, শিশুটির চিকিৎসায় যেন কোনো ধরনের অবহেলা না হয়। সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার অনুরোধ জানান তিনি।

জেলা প্রশাসক সাংবাদিকদের বলেন, “একজন নিরীহ শিশুর এভাবে সন্ত্রাসের শিকার হওয়া অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। এই ঘটনা মানবিকভাবে আমাদের সবাইকে নাড়া দিয়েছে। কোনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডকেই ছাড় দেওয়া হবে না।”

তিনি আরও বলেন, “ঘটনার খবর পাওয়ার পর থেকেই আমি নিয়মিত খোঁজখবর নিচ্ছি। এটি অবশ্যই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির একটি ঘটনা। বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও পুলিশ সুপারের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কাজ করছে। যারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে, তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার জন্য আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করছি।”

চট্টগ্রামে সন্ত্রাস ও অস্ত্রধারী অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথাও পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।

তিনি বলেন,“যেভাবে জঙ্গল সলিমপুরে অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে অপরাধীদের বিতাড়িত করে একসময়কার অপরাধের অভয়ারণ্যকে প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে, ঠিক একইভাবে এ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

রেশমার পরিবারের আর্থিক দুরবস্থার কথাও তুলে ধরেন জেলা প্রশাসক। তিনি বলেন, শিশুটির বাবা মোঃ রিয়াজ আহমেদ একজন প্রতিবন্ধী ও অত্যন্ত অসহায় মানুষ। পান বিক্রি করে তিনি পাঁচ সন্তানের সংসার চালান। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।

কিন্তু রেশমার জন্য জেলা প্রশাসকের ব্যস্ততা সেখানেই শেষ হয়নি। পরবর্তীতে শিশুটির শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হলে চিকিৎসকেরা তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেন। বিষয়টি জানামাত্র জেলা প্রশাসক নিজেই ফোন করেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দীনকে।

তিনি অনুরোধ জানান, শিশুটিকে দ্রুত আইসিইউতে ভর্তি করে জরুরি অপারেশনের ব্যবস্থা করতে।

একই সঙ্গে রেশমার ভাই মো. এজাজ হোসেনের সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করেন তিনি। অ্যাম্বুলেন্সে থাকায় ফোন রিসিভ করতে না পারলেও পরে জেলা প্রশাসকের স্টাফ অফিসার তাকে ফোন করে জানান, ডিসি ইতিমধ্যেই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং রেশমার চিকিৎসায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দীন বলেন, “জেলা প্রশাসক নিজেও হাসপাতাল পরিচালনা কমিটির একজন সদস্য। তিনি বিভিন্ন সময় দরিদ্র ও অসহায় রোগীদের জন্য ফোন করে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে চিকিৎসার অনুরোধ করেন। আজও রেশমার সুচিকিৎসার জন্য ফোন করেছেন। আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে শিশুটির চিকিৎসা করব।”

রেশমার ভাই মো. এজাজ হোসেন বলেন, “একজন জেলা প্রশাসক ছুটির দিনেও আমাদের মতো সাধারণ পরিবারের পাশে দাঁড়াতে সরাসরি হাসপাতালে এসেছেন। শুধু আর্থিক সহায়তা দিয়েই দায়িত্ব শেষ করেননি, পরে আবার ফোন করে চিকিৎসার খোঁজ নিয়েছেন। তিনি সত্যিই একজন মানবিক জেলা প্রশাসক।”

বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামোয় জেলা প্রশাসকের পদ সাধারণত ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের প্রতীক হিসেবেই বেশি পরিচিত। তবে চট্টগ্রামের এই ঘটনায় উঠে এসেছে ভিন্ন এক চিত্র—একজন প্রশাসক, যিনি আহত এক শিশুর শয্যার পাশে দাঁড়িয়ে শুধু দায়িত্বই পালন করেননি, মানবিকতারও পরিচয় দিয়েছেন।

রক্তাক্ত রেশমার হাসপাতালের বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে হয়তো তিনি একটি শিশুর জীবন ফিরিয়ে দেওয়ার নিশ্চয়তা দিতে পারেননি। কিন্তু অন্তত এই বার্তাটি তিনি দিয়েছেন—রাষ্ট্রের দরজা সাধারণ মানুষের জন্য এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি।