১৮ বছর পর মিথ্যা মামলা থেকে অব্যাহতি
অপরাধ না করেও পুলিশ আর আইনজীবীর ভুলে আসামি হয়ে দুইমাস কারাভোগ করাসহ ১৮ বছর ধরে আদালতের বারান্দায় ঘুরতে থাকা বাবলু শেখকে মামলা থেকে অব্যাহতির আদেশ দিয়েছেন আদালত।
এ ঘটনায় দায়ী তদন্তকারী দুই পুলিশ ও তৎকালীন ওসির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেবার জন্য আইজিপিকে নির্দেশও দেয় আদালত। একই সঙ্গে বাবলু শেখকে ক্ষতিপুরণ দিতে বলা হয়েছে।
এছাড়া দায়ী আইনজীবীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবার জন্য আইনজীবী সমিতির নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
বাবলু শেখের বর্তমান আইনজীবী এ্যাড. শামীম উদ্দীন জানান, গত ২২ সেপ্টেম্বর বাবুল শেখের আপীল শুনানির রায়ের দিন ধার্য ছিল। কিন্তু সেদিন দুপুরে নাটোরের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ সাইফুর রহমান সিদ্দিকী মামলার নথিপত্র পর্যালোচনা করে জানান, বাবলু শেখের বিষয়টি আলোচিত ঘটনা হওয়ায় তা অধিক পর্যালোচনা করা হবে। তাই ২৯ সেপ্টেম্বর পর্যবেক্ষণসহ রায়ের দিন ধার্য করেন তিনি। কিন্তু ঐ তারিখে নাটোর জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্য মোজাম্মেল হকের মৃত্যুর কারণে ফুল কোর্ট রেফারেন্স ঘোষণা হওয়ায় আদালতের সকল কার্যক্রম স্থগিত হয়। ফলে বাবলু শেখের মামলার রায়ের দিনক্ষণ পিছিয়ে যায়। পরবর্তীতে মামলার নথিপত্র পর্যালোচনা করে আদালত ১৭ অক্টোবর আপীল শুনানির রায়ের দিন ধার্য করে।
বিচারক তাঁর রায়ের পর্যবেক্ষণে বলেন, বাবলু শেখ বহুল আলোচিত ‘জজ মিয়া’ ও ‘জাহালম’–এর প্রতিচ্ছবি। তিনি বংশ পরম্পরায় একজন মুসলমান হলেও সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা শ্রী বাবু হিসেবে তাঁকে গ্রেপ্তার করে দায়িত্বে চরম অবহেলা করেছেন। গ্রেপ্তারের পর থানায় নিয়ে গেলে সদর থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আসামিকে পরীক্ষা না করেই চালান বইয়ে স্বাক্ষর করে অন্যায় করেছেন। যদিও আদালতের নথিতে রহস্যজনকভাবে ওই চালানের কপি সংযুক্ত নেই। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট আদালতও কোনো পদক্ষেপ নেননি।
বিচারক মোহাম্মদ সাইফুর রহমান সিদ্দিক বলেন, অভিযোগপত্র দেওয়ার সময় তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই মোমিনুল ইসলাম ও এসআই হেলেনা পারভিন ভুল আসামি গ্রেপ্তারের বিষয়টি যাচাই-বাছাই করেননি। পরবর্তী সময়ে নিযুক্ত আইনজীবীরা বিষয়টি জানলেও সে ব্যাপারে আদালতে প্রতিকার চেয়ে তথ্য-প্রমাণসহ দরখাস্ত করেননি। তাঁরা ভুল নামেই বাবলু শেখের জামিন করেছেন। শুনানির সময় আইনজীবীদের পক্ষ থেকে তথ্যপ্রমাণ দাখিল করার কথা বলা হলেও সে মর্মে কাগজপত্র নথিতে পাওয়া যায়নি। আদালত একটি আদেশে ভুল ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দিলেও এসআই হেলেনা পারভিন তদন্ত প্রতিবেদন এখনো আদালতে জমা দেননি। আদালতও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেননি। বিচার চলাকালে আসামিকে পরীক্ষা না করে তড়িঘড়ি করে রায় দেওয়ার সমালোচনা করেন এই বিচারক।
বাবলু শেখ বলেন, ‘১৮ বছর পর আদালত আমাকে অব্যাহতি দিয়েছে। আমি এতে চরম খুশি।’
উল্লেখ্য, ২০০১ সালের ১৫ এপ্রিল নাটোর সদর উপজেলার গাঙ্গইল গ্রামে একটি মারামারির মামলার আসামি শ্রী বাবুর পরিবর্তে সিংড়া উপজেলার আঁচলকোট গ্রামের বাবলু শেখকে গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করে পুলিশ।
এরপর তৎকালীন আইনজীবী লুৎফর রহমান বাবু শ্রী বাবু নামেই বাবলু শেখের জমিন করান । সে থেকে বাবুল শেখ হয়ে যান শ্রী বাবু।
দু’দফায় দুইমাস কারাভোগের পর ১৮ বছর ধরে হতদরিদ্র বাবলু শেখ নিজের সঠিক পরিচয় জানাতে ঘুরে বেড়িয়েছেন আদালতের বারান্দায়।
এ নিয়ে গত ১৮ ও ২০ সেপ্টেম্বর দেশের একটি বেসরকারি টেলিভিশনে দুটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রচার হলে তা ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। পরে বাবলু শেখের পাশে দাঁড়ায় আইনজীবী ও জনপ্রতিনিধিসহ সর্বস্তরের মানুষ।


আপনার মতামত লিখুন