খুঁজুন
সোমবার, ৯ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৬শে মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

অর্থ পাচারের ভয়ংকর মাধ্যম হুন্ডি! বাড়ছে পাচারকারীদের দৌরাত্ম্যে

ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: শনিবার, ১৯ অক্টোবর, ২০১৯, ৫:০৭ অপরাহ্ণ
অর্থ পাচারের ভয়ংকর মাধ্যম হুন্ডি! বাড়ছে পাচারকারীদের দৌরাত্ম্যে

সাম্প্রতিক সময়ে দেশে হুন্ডি ও অবৈধ পথে ডলার পাচারের ঘটনা বাড়ছে। আর এই হুন্ডি অর্থ পাচারের একটি ভয়ংকর মাধ্যম। যে মাধ্যমে অবৈধ পথে দেশের টাকা পাচার হচ্ছে। হুন্ডিতে মূলত এজেন্টের মাধ্যমে টাকা লেনদেন হয়। এটি পুরোপুরি চলে বিশ্বাসের ওপর। এখানে কোনো কাগজপত্রের লেনদেন হয় না।

এ প্রক্রিয়ায় টাকা পাচার হওয়ায় পাচারকারীদের শনাক্ত করা খুবই কঠিন কাজ। এছাড়া হুন্ডির মাধ্যমে টাকা স্থানান্তরে খরচও আবার তুলনামূলক কম। এ কারণেই পাচারকারীরা হুন্ডিকেই পছন্দ করে বেশি। ঢাকা, চট্টগ্রামসহ গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাচারে রয়েছে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে দেশ থেকে প্রতিবছর টাকা পাচার হচ্ছে। দেশের পাশাপাশি বিদেশেও গড়ে উঠেছে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক।

বিদেশ গমন, চিকিৎসা ব্যয় মেটানো, ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা, বৈদেশিক কেনাকাটা থেকে শুরু করে জীবনযাত্রার নানাক্ষেত্র এখন হুন্ডি ও অবৈধ ডলার পাচারের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে পড়েছে। এসব টাকা হুন্ডি ব্যবসায়ীরা সোনাসহ বিভিন্ন চোরাচালানে ব্যবহার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

গোয়েন্দা সংস্থার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বেশিরভাগ মানিচেঞ্জার প্রতিষ্ঠানকে সোনা চোরাচালানে অর্থের জোগানদাতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। দেশ থেকে হুন্ডির মাধ্যমে তারা ডলার পাচার করছে বলেও উল্লেখ করা হয় ওই প্রতিবেদনে। প্রবাসী বাংলাদেশীদের একটি অংশ বৈদেশিক মুদ্রা পাঠায় হুন্ডির মাধ্যমে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, চট্টপ্রামে বছরে প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা আসে হুন্ডির মাধ্যমে। হুন্ডির ইতিহাস সম্পর্কে যতটুকু জানা যায় তাতে দেখা যায়, মুঘল অর্থনীতির অধীনে বিকশিত হওয়া একটি অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থ লেনদেনপত্র হলো হুন্ডি। এটি ব্যক্তিপর্যায়ে অর্থ প্রেরণের একটি কৌশল হলেও মুঘল সাম্রাজ্যের রাজস্ব কর্মকর্তারা এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে অর্থ প্রেরণের জন্য প্রায়ই হুন্ডি ব্যবহার করতেন। সে সময় মুঘল সাম্রাজ্যের প্রায় সর্বত্রই হুন্ডি ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল।

হুন্ডি বলতে সাধারণত বাণিজ্য ও ঋণ লেনদেনের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত আর্থিক দলিলগুলোকে বোঝানো হতো। কৌশলগতভাবে বলা হয়ে থাকে, হুন্ডি বলতে এমন একটি লিখিত শর্তহীন আদেশকে বোঝানো হয়ে থাকে, যা এক ব্যক্তির নির্দেশ অনুযায়ী অন্য এক ব্যক্তি লিপিবদ্ধ করে থাকেন এবং নির্দেশনামায় উল্লেখিত ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করা হয়ে থাকে। বর্তমান সময়ে দেশে-বিদেশে অবস্থানরত কিছু অসৎ ব্যবসায়ী হুন্ডির মাধ্যমে দেশের অর্থনীতির ব্যাপক ক্ষতি করে চলেছে।

এদিকে সাম্প্রতিক সময়ে সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী দেখা যায়, বিশ্বের নামিদামি সব জুয়ার আসরেও দেশ থেকে টাকা যাচ্ছে হুন্ডিতে। শীর্ষস্থানীয় জুয়াড়িরা হংকং, লন্ডন, যুক্তরাষ্ট্র, সিঙ্গাপুর, ফিলিপাইন থেকে শুরু করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ক্যাসিনোয় দুই হাতে টাকা ব্যয় করে যাচ্ছেন। তথ্যপ্রযুক্তি মাধ্যম ছাড়াও হুন্ডিতেও বিপুল অঙ্কের টাকা পাচার করে নিচ্ছে তারা বিদেশের ক্যাসিনোয়।

সংবাদ মাধ্যমের প্রকাশিত সংবাদ মতে, লন্ডনের গ্রসভেনর ভিক্টোরিয়া ক্যাসিনো, পাম বিচ ক্যাসিনো, ক্রকফোর্ডস, গোল্ডেন নাগেট, বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্যাসিনো হংকংয়ের ভেনটিয়ান ম্যাকাওসহ উইন ম্যাকাও, গ্রান্ড লিসবোয়া ও স্যান্ডস ম্যাকাওয়ে জুয়াড়িদের উপস্থিতিতে প্রবাসী বাংলাদেশিরাও হতবাক হন। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের দামি ক্যাসিনো লাস ভেগাসের নাভেদা, নিউজার্সির আটলান্টিক সিটি, শিকাগোর ইলিয়নস, মিশিগানের ডেটরয়েটেও বাংলাদেশি জুয়াড়িরা পাল্টা দিয়ে বড় বড় দানে জুয়া খেলেন। আর জুয়াড়িরা জুয়ার এসব টাকা নিচ্ছেন হুন্ডিতে।

এছাড়া বিদেশি নিয়োগের নামেও দেশের বিভিন্ন ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের যোগসাজশে টাকা পাচার হচ্ছে। মোট আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ৮.৮ শতাংশ অর্থ পাচার হয়ে যায়। যা দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির বিবেচনাতে ভয়ঙ্কর।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর দেশের অর্থনীতিবিদদের নিয়ে আলাপ-আলোচনা করে তাদের পরামর্শক্রমে ১৯৭৪ সালে ‘ওয়েজ আর্নার্স স্কিম’ চালু করা হয় এবং তখন থেকে দেশে বৈদেশিক মুদ্রা আসার প্রবণতা বাড়তে থাকে।

১৯৭৪-৭৫ সালে বিদেশ থেকে প্রবাসীদের প্রেরিত মোট অর্থ ছিল ১১.৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার আস্তে আস্তে সমৃদ্ধ হতে থাকে। নিজেদের বেকারত্ব থেকে মুক্তি পেতে এবং আয়ের উৎস বের করতে বিপুলসংখ্যক মানুষ কুয়েত, মালয়েশিয়া, আমেরিকা, যুক্তরাজ্য, সৌদি আরব, মালদ্বীপ, লিবিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যেতে আরম্ভ করেন। তাদের হাড়ভাঙা পরিশ্রমের ফলে দেশে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আসতে শুরু হয়।

তখন কিছু বৈধ লাইসেন্সধারী বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তাদের মাধ্যমে ব্যাংকে নিলাম পদ্ধতি চালু ছিল। প্রতিদিন নিলামে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারদর ওঠানামা করত। এতে একদিকে যেমন প্রবাসীদের বেনিফিশিয়ারিরা তাদের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যাংকে নিজের হিসাবে জমা রেখে সুবিধামতো সময় বিক্রি করতে পারতেন, অন্যদিকে ব্যাংক ফ্লোরে নিলামেও বিক্রি করার সুবিধা ভোগ করতেন। এভাবে বেশি করে বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আসার ফলে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা সমৃদ্ধ হতে থাকে।

দেশের উন্নয়নমূলক কাজে এ মুদ্রার ব্যবহার হতো। এছাড়া বেশকিছু শিক্ষিত যুবক এ ব্যবসার মাধ্যমে তাদের পরিবার-পরিজন নিয়ে সুখে-শান্তিতে দিন কাটাতে পারতেন। এভাবে দেখা যায়, সরকার প্রবর্তিত ‘ওয়েজ আর্নার্স স্কিম’ দেশ-বিদেশে জনপ্রিয়তা লাভ করে। মানুষের আগ্রহও ক্রমে এ স্কিমে বাড়তে থাকে। কিন্তু পরবর্তী পর্যায়ে এক অশুভ চক্র এ সহজ প্রথার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করে। এতে দেশে বৈদেশিক মুদ্রা আসা কমতে থাকে। হুন্ডি ব্যবসায়ীরা তৎপর হয়ে ওঠে। দেশ বঞ্চিত হতে থাকে কোটি কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা থেকে।

এক সমীক্ষা অনুযায়ী, হুন্ডি ব্যবসায়ীরা দেশের ব্যাংকের সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব নিয়ে বিদেশে তাদের কার্যক্রম চালাতে থাকে। সহজে বাড়িতে টাকা পৌঁছে দেওয়ার নিশ্চয়তা দিতে থাকে প্রবাসীদের। বিদেশের যেসব শহরে বাংলাদেশিদের অবস্থান বেশি, সেসব স্থানে তারা ব্যাংকের মতোই বুথ খুলে বৈদেশিক মুদ্রা বাংলাদেশিদের কাছ থেকে নিয়ে তার বিপরীতে সাংকেতিক চিহ্নসংবলিত ‘টুকা’ ইস্যু করার কাজ করে। এ টুকাই বাংলাদেশে তাদের টাকা পাওয়ার নিশ্চয়তা প্রদানের নিদর্শন হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বিদেশিদের বেতন, ফি বাবদ প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে হুন্ডিতে পাচার হয়ে যাচ্ছে অনেক টাকা।

দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য হুন্ডি ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করা এখন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব ব্যবসায়ীর কারণে বাংলাদেশ প্রতি বছর অনেক রাজস্ব হারাচ্ছে। এ ব্যবসা দীর্ঘদিন থেকে দেশের অর্থনীতির ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করে চলেছে।

হুন্ডি ও ডলার পাচারের ব্যবসার সঙ্গে যারা জড়িত আছেন বলে অভিযোগ পাওয়া যায়, তাদের ব্যাপারে নিরপেক্ষ তদন্ত করে যথাযথ শাস্তির ব্যবস্থা দেশের প্রতিটি সচেতন নাগরিকের একান্ত প্রত্যাশা। বাংলাদেশ থেকে বিদেশে টাকা পাচারের এটি হলো খণ্ডচিত্র। এমন অসংখ্য পদ্ধতিতে দেশ থেকে টাকা পাচার হচ্ছে প্রতিনিয়ত। হুন্ডির মাধ্যমে যেমন পাচার হচ্ছে টাকা, তেমনি বিদেশি নাগরিকদের চাকরি দেওয়া বা কনসালটেন্ট নিয়োগের নামেও অর্থ পাচার হচ্ছে। সেকেন্ড হোমের সুবিধা নিয়েও দেশ থেকে টাকা পাচার হচ্ছে। আর এসব অর্থ পাচারকারীকে দেখানো হচ্ছে ঋণখেলাপি হিসেবে।

জানা গেছে, দেশের অন্যতম আর্থিক কেলেঙ্কারিগুলোর মধ্যে একটি হলো শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি। এর পরে রয়েছে, একের পর এক রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ লোপাট। হলমার্ক, বেসিক ব্যাংকসহ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংগুলোতে একের পর এক কেলেঙ্কারি। দেশ থেকে অর্থ পাচার ও সর্বশেষ বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে রিজার্ভের অর্থ চুরি।

রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে যারা অর্থসম্পদ গড়েন, তারাই মূলত এ টাকা পাচার করেন। পাশাপাশি দেশের শিল্পোদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের একটি অংশ নিজেদের পরিবার এবং সন্তানদের নিরাপত্তা ও নিশ্চয়তার জন্য বিভিন্নভাবে অর্থ বাইরে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। আর প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের অর্থ বৈদেশিক মুদ্রায় দেশে না পাঠিয়ে বিদেশেই সেগুলো রেখে দিয়ে দেশ থেকে টাকা পরিশোধের মাধ্যমে, পণ্যের চোরাচালানের মাধ্যমে, নগদ আকারে বৈদেশিক মুদ্রা বা টাকা স্থানান্তর করার মাধ্যমে দেশ থেকে টাকা পাচার হচ্ছে। যখন প্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমিক কর্মীদের নানা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। যখন প্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমিক কর্মীদের পাঠানো অর্থে দেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ছে, অর্থনীতির চাকা ঘুরছে, তখন অন্য এক শ্রেণির লোক ব্যাংক লোপাট করে, দুর্নীতি ও লুটপাট করে অর্থ পাচার করছেন, ব্যবসায়ী, রাজনীতিক, আমলা যারাই অর্থ পাচারের সঙ্গে যুক্ত থাকুন না কেন, তারা দেশের অর্থনীতিকে চরম অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। তাদের প্রতি সদয় হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

বিদেশে অবৈধভাবে অর্থ পাচারকারীদের চরম দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করার পাশাপাশি দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নয়ন, অনিয়ম দুর্নীতি, নৈরাজ্য বিশৃঙ্খলা দূর করে সুশাসন নিশ্চিত করণের মাধ্যমে দেশে বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টিতে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া জরুরি।

অর্থনীতিতে যে শঙ্কা ও অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে বিদেশে লাগামহীন অর্থ পাচারের মাধ্যমে তা কাটিয়ে উঠতে না পারলে বাংলাদেশের অগ্রগতির যে ধারা সৃষ্টি হয়েছে তা মাঝ পথে থেমে যেতে পারে। দেশের টাকা দেশে থাকবে, বিনিয়োগ হবে, অর্থনীতি আরো চাঙ্গা হবে, গতিশীল হবে অগ্রগতির চাকা, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

এভাবে নন-ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাচারের প্রধান একটি উপায় হিসেবে ব্যবহৃত হয় হুন্ডি। তাই হুন্ডি ব্যবসা বন্ধ করতে জনসাধারণের সচেতনতা বাড়ানো একান্ত প্রয়োজন। পাশাপশি হুন্ডির সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া প্রয়োজন।

নুর মোহাম্মদ রানা

প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট, সাংবাদিক।

Feb2

ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে এই সরকারের আমলে চুক্তি হচ্ছে না: আশিক চৌধুরী

ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: রবিবার, ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১০:১০ অপরাহ্ণ
ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে এই সরকারের আমলে চুক্তি হচ্ছে না: আশিক চৌধুরী

চট্টগ্রাম বন্দরের নিউ মুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনএমসিটি) প্রকল্পের বিষয়ে ডিপি ওয়ার্ল্ড খসড়া কনসেশন চুক্তি (ড্রাফট কনসেশন অ্যাগ্রিমেন্ট) পর্যালোচনার জন্য আরও সময় চেয়েছে বলে জানান বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন।

তিনি বলেন, বর্তমান সময়সূচিতে হাতে রয়েছে মাত্র দুই কার্যদিবস। এ অবস্থায় আলোচনাটি আসন্ন নির্বাচন পেরিয়ে পরবর্তী সরকারের সময়েও চলতে পারে।

রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা জানান।

তিনি বলেন, চলমান আলোচনার অগ্রগতিতে সন্তোষ প্রকাশ করেছে বৈশ্বিক বন্দর অপারেটর ডিপি ওয়ার্ল্ড। প্রতিষ্ঠানটি আলোচনার বর্তমান ধারাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে। অংশীদারিত্ব সঠিক পথেই এগোবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছে।

আশিক মাহমুদ বলেন, এনএমসিটি প্রকল্পটি সরকার টু সরকার (জিটুজি) কাঠামোর আওতায় বাস্তবায়িত হচ্ছে, যা দুই দেশের সরকারের মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) থেকে উদ্ভূত। এই প্রকল্পভিত্তিক অংশীদারিত্বে প্রধান সংশ্লিষ্ট সংস্থা হলো চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (সিপিএ) ও ডিপি ওয়ার্ল্ড।

পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) কর্তৃপক্ষ আলোচনাকে সহজ ও কার্যকর করতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকলেও তারা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী নয়— এ কথা উল্লেখ করে আশিক চৌধুরী বলেন, চুক্তি সম্পাদনকারী কর্তৃপক্ষকে পুরো প্রক্রিয়ায় সহায়তা করাই তাদের ভূমিকা।

তিনি আরও জানান, ২০১৯ সালে শুরু হওয়া এনএমসিটি প্রকল্পটি গত এক মাসে আলোচনার একটি চূড়ান্ত ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধাপে প্রবেশ করেছে। সরকারের বিভিন্ন স্তরে বর্তমানে এসব আলোচনা চলমান রয়েছে, যাতে সফলভাবে প্রকল্পটি চূড়ান্ত করা যায়।

আশিক চৌধুরী বলেন, স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণ এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য বাংলাদেশের বন্দর সক্ষমতা ও অবকাঠামোর উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি।

তিনি বলেন, বন্দর উন্নয়নের মতো জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে রাজনৈতিক ঐকমত্য থাকা প্রয়োজন। কিন্তু বাস্তবে অনেক সময় কেবল বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা করা হয়, যা দেশের অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করে।

আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ অগ্রগতি দেখা যাবে— এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ভবিষ্যৎ সরকারগুলো বিদ্যমান প্রকল্প পরিকল্পনার ধারাবাহিকতা বজায় রাখবে বলে তিনি আশাবাদী।

সংবাদ সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম উপস্থিত ছিলেন।

নিজের বিরুদ্ধে ডাকা বিক্ষোভে হাজির খোদ নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী

ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: রবিবার, ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১০:০৫ অপরাহ্ণ
নিজের বিরুদ্ধে ডাকা বিক্ষোভে হাজির খোদ নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী

রাজধানীতে নিজের বিরুদ্ধে ডাকা এক বিক্ষোভ কর্মসূচিতে সশরীরে উপস্থিত হয়ে সবাইকে চমকে দিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক ও ঢাকা-৮ আসনের প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী।

রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে এমন ঘটনার সাক্ষী হয় উপস্থিত জনতা ও সংবাদকর্মীরা।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হেফাজতে ইসলামের সাবেক মহাসচিব ও আমির আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীকে নিয়ে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর মিথ্যাচার ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যের প্রতিবাদে বিক্ষোভ সমাবেশের ডাক দেওয়া হয়েছিল। বাদ আসর বায়তুল মোকাররম উত্তর গেটে আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী স্মৃতি সংসদ কর্তৃক আয়োজিত এই বিক্ষোভ শুরু হয়। যখন সবাই স্লোগানের প্রস্তুতি নিচ্ছিল, ঠিক তখনই সেখানে হাজির হন নাসীরুদ্দীন নিজেই।

পরে তিনি উপস্থিত সবার কাছে নিজের বক্তব্যের জন্য ক্ষমা ও দুঃখ প্রকাশ করেন। পরে সমাবেশস্থলের সামনেই তাকে অবস্থান নিতে দেখা যায়। সেখানে তাকে বক্তব্য দিতেও দেখা গেছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই ঘটনার ছবি দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। কেউ কেউ একে নাসীরুদ্দীনের ‘রাজনৈতিক স্ট্যান্ট’ হিসেবে দেখছেন, আবার অনেকে তার এই সাহস ও ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধাকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছেন।

যদিও পরে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ফেসবুকে নিজের আইডিতে এক পোস্টে লেখেন, ‘‘আমার কথায় বা আচরণে যারা মনঃকষ্ট পেয়ে থাকেন, তাদের কাছে আমি আন্তরিকভাবে নিঃশর্ত দুঃখ প্রকাশ করছি।’’

ভোট ঘিরে চট্টগ্রামে নিরপেক্ষতা ও আস্থার পরিবেশ তৈরি হয়েছে: ডিসি জাহিদ

ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: রবিবার, ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৭:২৫ অপরাহ্ণ
ভোট ঘিরে চট্টগ্রামে নিরপেক্ষতা ও আস্থার পরিবেশ তৈরি হয়েছে: ডিসি জাহিদ

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেছেন, দায়িত্ব শতভাগ নিরপেক্ষতা ও দক্ষতার সঙ্গে পালন করে রাষ্ট্রকে একটি ফ্রি, ফেয়ার ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দেওয়া হবে।

আজ রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজের সম্মেলন কক্ষে চট্টগ্রাম জেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভায় তিনি এ আশ্বাস দেন।

অতীতে বিভিন্ন নির্বাচনে সরকারি কর্মচারীদের বিরুদ্ধে পক্ষপাতমূলক আচরণের অভিযোগের প্রসঙ্গ টেনে জেলা প্রশাসক বলেন, অতীতে মানুষ সরকারি কর্মচারীদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। রাষ্ট্রের কোষাগার থেকে বেতন নেওয়া সত্ত্বেও প্রত্যাশিত নির্বাচন দিতে না পারার অভিযোগ উঠেছে। তবে এবার সেই আস্থার সংকট দূর করতে প্রশাসন দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।

তিনি বলেন, সরকারি কর্মচারীরা পক্ষপাতদুষ্ট—এমন অভিযোগে তারা বারবার আহত হয়েছেন। এবার মাঠপর্যায়ে কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করতে চান যে প্রশাসন সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ। সরকার যে নির্দেশনা দিয়েছে, সেটির আলোকে দায়িত্ব পালনের মাধ্যমেই এই নিরপেক্ষতা প্রমাণ করা হবে।

বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ ও সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করে মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম বলেন, সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে, কিন্তু এই মুহূর্তে সেগুলো দেখার কোনো সুযোগ নেই। বিশ্ব যেভাবে বাংলাদেশের দিকে তাকিয়ে আছে, সেখানে দেশের ও প্রশাসনের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করাই এখন প্রধান লক্ষ্য।

অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতে প্রশাসনের সর্বস্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দিন-রাত পরিশ্রম করছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, মাঠপর্যায়ে নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে।প্রত্যেকটি এলাকা ঘুরে মানুষের মধ্যে আস্থার পরিবেশ তৈরির চেষ্টা চলছে। মাঠে থাকা কর্মকর্তাদের জনগণের সঙ্গে আরও বেশি যোগাযোগ রেখে ভয় ও আতঙ্ক দূর করার আহ্বান জানান তিনি।

সভায় উপস্থিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের উদ্দেশে জেলা প্রশাসক বলেন, প্রশাসনের দায়িত্বশীল অবস্থানে থাকা কর্মকর্তারা একটি প্রিভিলেজড অবস্থানে রয়েছেন। অতীতে ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ কিংবা সাম্প্রতিক গণ-আন্দোলনে অংশ নেওয়ার সুযোগ না থাকলেও এখন একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ার দায়িত্ব তাঁদের সামনে এসেছে।

তিনি বলেন, নির্বাচনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা অংশ নিয়েছেন—কেউ জয়ী হবেন, কেউ পরাজিত হবেন। তবে প্রশাসনের লক্ষ্য কোনো ব্যক্তি বা দল নয়; লক্ষ্য হলো বাংলাদেশ ও জনগণের জয় নিশ্চিত করা।

নির্বাচন ঘনিয়ে আসার কথা উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক বলেন, এই নির্বাচনকে কেবল একটি আনুষ্ঠানিক নির্বাচন হিসেবে দেখলে চলবে না। পর্যাপ্ত ভোটার উপস্থিতি নিশ্চিত না হলে নির্বাচন আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হবে না এবং এত আয়োজন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে।

নাগরিকদের প্রতি শতভাগ দায়িত্বশীল আচরণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, নাগরিকদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব প্রশাসনের ওপর ন্যস্ত। যে কোনো কেন্দ্রে কোনো ঘটনা ঘটলে পাঁচ মিনিটের মধ্যে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

চট্টগ্রামের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে সন্তোষ প্রকাশ করে জেলা প্রশাসক বলেন, ডিজিএফআই, এনএসআই, পুলিশসহ সব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় জেলার বর্তমান স্থিতিশীল পরিবেশ বজায় রাখা সম্ভব হয়েছে।

শেষে তিনি বলেন, প্রশাসনের লক্ষ্য একটি উৎসবমুখর পরিবেশে গ্রহণযোগ্য ভোট আয়োজন করা। মানুষের আস্থা ফিরে আসছে, যা সবার সম্মিলিত পরিশ্রমের ফল। স্বল্প সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়ে জাতিকে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

সভা শুরুর পরেই জেলা প্রশাসক আগত সকল প্রতিনিধির নিকট থেকে জেলার সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত হওয়া হন। পরবর্তীতে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে নির্বাচন কেন্দ্রিক প্রস্তুতি, নিরাপত্তা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিতকরণ বিষয়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধিদের সাথে বিস্তারিত মতবিনিময় করেন তিনি।

মতবিনিময়ের শুরুতেই তিনি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধিদের নিকট জানতে চান—নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থার পরিবেশ তৈরি হয়েছে কিনা এবং প্রশাসন নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করছে কিনা সে বিষয়ে মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র কী।

সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. সিরাজুল ইসলাম, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ মাহবুবুল হক, লেফটেন্যান্ট কমান্ডার শামিম, এনএসআইয়ের উপ-পরিচালক মো. সফিকুর রহমানসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ।