লোহাগাড়ায় ইটভাটায় অভিযান বন্ধের নামে কোটি টাকা হাতিয়ে নিল বডি বিল্ডার হারুন!
এ. কে. আজাদ, লোহাগাড়া (চট্টগ্রাম) : তিনি পুলিশ কিংবা সিভিল প্রশাসনের কোন কর্মকর্তা-কর্মচারী নন, পরিবেশের দেখভাল করা সংশ্লিষ্ট দপ্তরেরও কেউ নন, আবার দেশের কোন আদালতের বিচারপতি, আইনজীবী কিংবা কর্মকর্তা-কর্মচারীও নন তিনি। ‘হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ’ নামের একটি মানবাধিকার সংগঠনের স্রেফ একজন সদস্য পরিচয়ে অবৈধ ইটভাটায় সরকারের চলমান অভিযান বন্ধ করার নামে চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় বিভিন্ন ইটভাটা মালিকের কাছ থেকে কোটি টাকার বেশী হাতিয়ে নিয়েছে প্রতারক হারুনুর রশিদ (৩২) ওরফে বডি বিল্ডার হারুন।
শুধু প্রতারনা নয়, হারুনের বিরুদ্ধে প্রতারণা ছাড়াও জাল দলিল তৈরি, অস্ত্র মামলা, পুলিশের ওপর হামলা, ডাকাতি, সরকারি সম্পত্তি চুরিসহ তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের অভিযোগে রয়েছে ১১ টি মামলা ।তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে আপন ভাই-বোনদের জায়গা-জমি জবর-দখলেরও। চাঁদার দাবীতে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে নানাভাবে হয়রানী করেছে এলাকার নিরহ লোক, ব্যবসায়ী, জনপ্রতিনিধিসহ প্রশাসনের কর্তাদেরও।
‘বডি বিল্ডার হারুন’ নাম শুনলেই যেন আঁতকিয়ে ওঠেন লোহাগাড়ার পুলিশ প্রশাসনের কর্তাব্যাক্তিরা। তার নানা অপরাধ কর্মকান্ডের কারনে লোহাগাড়ার প্রশাসন, ব্যবসায়ী, জনপ্রতিনিধি ও সাধারণ মানুষের কাছে এক ভয়ংকর ও আতংকের নাম হয়ে উঠেছে বডি বিল্ডার হারুন।
২৮ জানুয়ারী (বৃহস্পতিবার) রাতে লোহাগাড়ার বটতলী মোটর ষ্টেশনের একটি রেষ্টুরেন্টের হল রুমে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ঠিক এমনটিই জানালেন লোহাগাড়া উপজেলা ইটভাটা মালিক সমিতির সভাপতি আবিদুর রহমান মানু ও ভূক্তভোগীরা।
এসময় তাঁরা প্রতারক হারুনের দৃষ্টান্তমুলক শাস্তির দাবী করেন। লোহাগাড়া উপজেলা ব্রিক ফিল্ড মালিক সমিতি ও উপজেলার সচেতন নাগরিক সমাজ এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন।
প্রতারক হারুন চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার আধুনগর ইউনিয়নের সর্দানী পাড়ার মরহুম ছিদ্দিক আহমেদর পুত্র বলে জানা গেছে। তার বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের লোহাগাড়া থানা, পটিয়া থানা ও ঢাকার মতিঝিল থানায় সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজি, প্রতারনা, জাল-জালিয়াতি, পুলিশের ওপর হামলা, অস্ত্র আইন, চুরি ও ডাকাতিসহ বিভিন্ন অভিযোগে ১১টি মামলা রয়েছে বলে জানা গেছে।
লিখিত বক্তব্যে ব্রিক ফিল্ড মালিক সমিতির সভাপতি আবিদুর রহমান মানু জানান, হারুনের পেশা হচ্ছে এলাকার বিভিন্ন নিরীহ লোকজন এবং ব্যবসায়ীদের টার্গেট করে নানাভাবে ব্ল্যাকমেইল করে ফাঁদ পেতে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেয়া। তার অনেকগুলো সিমকার্ড রয়েছে যা নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করা হয়। লোহাগাড়ায় তার এসব সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজি ও ব্ল্যাকমেইল কর্মকাল্ড ফাঁস হয়ে গেলে বিগত ৫/৬ বছর পূর্বে সে এলাকা ত্যাগ করে ঢাকায় চলে যায়। সেখানে একটি কোম্পানিতে চাকুরীর পাশাপাশি একজন আইনজীবীর সাথে সখ্যতা গড়ে তুলে সেখানেও বিভিন্ন জাল-জালিয়াতি, প্রতারণা এবং ব্ল্যাকমেইল কর্মকাল্ড শুরু করে। এ সংক্রান্তে সে একটি সিন্ডিকেটও তৈরি করে। সে নিজেকে ‘হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ’ নামের একটি মানবাধিকার সংগঠনের সদস্য পরিচয়ে উচ্চ আদালতে মামলার ভয় দেখিয়ে বিভিন্নজন থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা চাঁদা আদায় করে আসছে। ঠিক তেমনি গেল বছরের ১৪ ডিসেম্বর উচ্চ আদালতে চট্টগ্রামের ইটভাটা বন্ধ সংক্রান্তে একটি রিট মামলা দায়েরের এক সপ্তাহ পূর্বে হারুনসহ ৪/৫ জন অজ্ঞাতনামা লোক লোহাগাড়ায় এসে প্রতি ইটভাটা মালিক থেকে দুই লক্ষ টাকা চাঁদা দাবি করেন। চাঁদা না দিলে উচ্চ আদালতে রিট মামলা দায়ের করে ইটভাটা বন্ধ করে দেয়ার হুমকিও দেয়। পরে ঠিকই গত ১৪ ডিসেম্বর লোহাগাড়াসহ চট্টগ্রামের সকল অবৈধ ইটভাটা বন্ধের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে রিট মামলা দায়ের করা হয়। এরপর চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের যৌথ টিম অভিযান চালিয়ে লোহাগাড়ার সাতটি ইটভাটা গুড়িয়ে দেয় এবং বেশ কয়েকটি ইটভাটা থেকে জরিমানা আদায় করেন। এরপর ইটভাটায় চলমান অভিযান বন্ধে লোহাগাড়ার প্রতিটি ইটভাটা থেকে ৫ লক্ষ টাকা করে চাঁদা দাবি করে হারুন। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকজন ইটভাটা মালিক থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়েও নিয়েছে হারুন।
লিখিত বক্তয্যে তিনি আরও জানান, গত ২৫ জানুযারী রাতে এ বহুল আলোচিত প্রতারক ও চাঁদাবাজ বডিবিল্ডার হারুনকে রাজধানী ঢাকার বাড্ডা লিংক রোডের শরিয়তপুর টাওয়ার থেকে গ্রেপ্তার করে মতিঝিল থানা পুলিশ। ওইদিন রাতেই মতিঝিল থানার এসআই শফিকুল ইসলাম বাদি হয়ে মতিঝিল থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলা নং ৩৩, ধারা-দণ্ডবিধি ৪০৬/৪২০/৫০৬/। পরদিন বুধবার তাকে ঢাকার সিএমএম আদালতে হাজির করে রিমান্ড চায় পুলিশ। আদালত দুদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। আগামী ৩১ জানুয়ারি রোববার তাকে রিমান্ডে নিয়ে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে বলে।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত হয়ে তার আপন বড় বোন ফরিদা বেগম সাংবাদিকদের জানান, দেশের প্রখ্যাত শিল্প প্রতিষ্টান নোমান গ্রুপ থেকে ঘর পাইয়ে দেয়ার নামে জালাল আহমেদ নামের এক ব্যাক্তি থেকে টাকা হাতিয়ে নেয় হারুন। সেটির প্রতিবাদ করায় তাঁর বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মিথ্যা ও কাল্পনিক অভিযোগ এনে অপপ্রচার চালায় সে। এখানে থেমে থাকেনি হারুন! আপন ভাই-বোনদের সম্পত্তি নিজেই জবর-দখল করে রেখেছে দীর্ঘদিন ধরে । পৈত্রিক জায়গা-জমির ভাগ চাইতে যাওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলাও দায়ের করেছেন।
এদিকে, চাঁদাবাজ ও প্রতারক বডিবিল্ডার হারুনের অত্যাচার-নির্যাতনে অতিষ্ঠ লোহাগাড়ার ইটভাটা মালিক ও ব্যবসায়ীরা শত কোটি টাকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবী করেন সংবাদ সম্মলনে। এছাড়া নুন্যতম সময়ও না দিয়ে তড়িঘড়ি করে ইটভাটা গুড়িয়ে দেয়ায় তাদের শেষ সম্বল ইটভাটা হারিয়ে পথে বসার উপক্রম হয়েছে।এ করোনাকালেও লাখ লাখ ইটভাটা শ্রমিক বর্তমানে কর্মহীন হয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে বলেও জানান তারা।
আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন লোহাগাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও লোহাগাড়া সদর ইউপি চেয়ারম্যান নুরুচ্ছাফা চৌধুরী, আধুনগর ইউপি চেয়ারম্যান মো :নাজিম উদ্দিন, ভূক্তভোগী বড়হাতিয়া ইউপি চেয়ারম্যান এমডি জুনাইদ চৌধুরী, উপজেলা ইটভাটা মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সারওয়ার উদ্দিন কোম্পানী, ইটভাটা মালিক হাজ্বী সৈয়দ আহমদ, বাহাদুর কোম্পানী, দেরাজ মিয়া, খোরশেদ আলম, ভুক্তভোগী ইউপি মেম্বার আব্দুল আলম,ও বডি বিল্ডার হারুনের বড়বোন ফরিদা বেগমসহ এলাকার বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ।


আপনার মতামত লিখুন