এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে গণধর্ষণ, চাঁদাবাজি ও অস্ত্র আইনের মামলার নতুন করে অভিযোগ গঠন করা হবে
শনিবার (২৫ সেপ্টেম্বর) সিলেটের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ঐতিহ্যে কলঙ্কের দাগ লাগার এক বছর পূর্ণ হয়েছে। গত বছরের এদিন সন্ধ্যায় সিলেটসহ দেশ-বিদেশে আলোচিত সমালোচিত এমসি (মুরারিচাঁদ) কলেজ ছাত্রাবাসে স্বামীকে বেঁধে রেখে স্ত্রীকে (১৯) গণধর্ষণের ঘটনাটি ঘটেছিল।এ গণধর্ষণের ঘটনার দুটি মামলা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে প্রেরণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এজন্য ইতিমধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি প্রস্তাবও পাঠানো হয়েছে। উচ্চ আদালতের আদেশে কলেজ ছাত্রাবাসে গণধর্ষণ, চাঁদাবাজি ও অস্ত্র আইনের দুটি মামলার বিচার কার্যক্রম একই আদালতে এক সাথে চলবে। সেই সাথে নতুন করে গঠন করা হবে মামলার অভিযোগও। তবে আগামী ধার্য তারিখে কোন আদালতে নতুন করে অভিযোগ গঠন করা হবে তা এখনো নিশ্চিত নয়।এ মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসএমািপর শাহপরান থানার পরিদর্শক (তদন্ত) ইন্দ্রনীল ভট্টাচার্য্য রাজন ঘটনার ২ মাস ৮ দিন পর ১৭ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্রটি আদালতে জমা দেন। গ্রেপ্তারকৃত ৮ আসামি রিমান্ড শেষে দায় স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন। এ ৮ আসামির মধ্যে সাইফুর রহমান, শাহ মাহবুবুর রহমান রনি, তারেকুল ইসলাম তারেক ও অর্জুন লস্কর, মিজবাহুল ইসলাম রাজন ও আইনুদ্দিন ১৯ বছর বয়সী গৃহবধূকে গণধর্ষণে সরাসারি অংশগ্রহণ করে। রবিউল ইসলাম ও মাহফুজুর রহমান মাসুম ধর্ষণে সহযোগিতা করেন। আসামিরা সকলেই ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিল। বর্তমানে সব আসামি সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক রয়েছে।
মামলার বাদীপক্ষ সূত্রে জানা যায়, এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে আলোচিত গণধর্ষণের ঘটনার বিচার কার্যক্রম কম সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করার জন্যে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে মামলা দুটি প্রেরণের সিদ্ধান্ত নেয় এ সংক্রান্ত জেলা কমিটি। গত ফেব্রুয়ারি মাসে একটি প্রস্তাবনা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। বর্তমানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার অপেক্ষায় রয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।এ বিষয়ে বাদীপক্ষের আইনজীবী এডভোকেট শহিদুজ্জামান চৌধুরী জানান, কয়েক মাস আগে মামলা দু’টি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে প্রেরণের জন্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়। আমরা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরবর্তী নির্দেশনার অপেক্ষায় রয়েছি। উচ্চ আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী গণধর্ষণ, চাঁদাবাজি ও অস্ত্র আইনের দু’টি মামলার বিচার চলবে একই সাথে ও একই আদালতে। তাই নতুন করে অভিযোগ গঠন করতে হবে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিশেষ পিপি এডভোকেট রাশিদা সাঈদা খানম উচ্চ আদালতের আদেশের ফলে নতুন করে অভিযোগ গঠন করার কথা নিশ্চিত করেন। তবে দ্রত বিচার ট্রাইব্যুালে মামলা দুটি প্রেরণের ব্যাপারে তার কাছে কোনো তথ্য নেই বলে জানান।বাদীপক্ষের আইনজীবী জানান, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের কোনো মামলায় একই সাথে দন্ডবিধি আইনের ধারা থাকলে মামলার বিচার একই আদালতে চলতে পারে। এক সাথে বিচার কার্যক্রম চলতে কোনো বাধা নেই। কিন্তু একই ঘটনায় পুলিশের দুটি অভিযোগপত্র দেওয়ায় বাদীপক্ষের সন্দেহ সৃষ্টি হয়। এতে ন্যায় বিচার ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সাক্ষীদের জন্যও বিষয়টি বিড়ম্বনার। আলোচিত এ মামলার সাক্ষীরা দুই আদালতে দুদিন আসবেন কিনা এ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন বাদীপক্ষ। ধর্ষণকারীরা সকলেই নানাভাবে প্রভাবশালী। এ জন্য বাদীপক্ষ উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হন। আগামী ১৩ অক্টোবর বুধবার মামলার পরবর্তী তারিখ নির্ধারন কার হয়েছে। তবে ওই দিন কোন আদালতে অভিযোগ গঠন করা হবে তা এখনো নিশ্চিত নয়।
জানা যায়, ছাত্রাবাসে গণধর্ষণের ঘটনার পর ১ ও ৩ অক্টোবর গ্রেপ্তারকৃত ৮ জনের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়। আদালতের আদেশের পর ওসমানীর ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টাওে ৮ আসামির ডিএনএ সংগ্রহ করে ঢাকায় সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবে প্রেরণ করে পুলিশ। নমুনা সংগ্রহের প্রায় ২ মাস পর ৩০ নভেম্বর আদালতের মাধ্যমে তদন্তকারী কর্মকর্তার নিকট ডিএনএ রিপোর্ট এসে পৌছে। ডিএনএ রিপোর্টে ছাত্রলীগ নেতা সাইফুর রহমান, তারেকুল ইসলাম তারেক, অর্জুন লস্কর ও মাহবুবুর রহমান রনির ডিএনএ ম্যাচিং পাওয়া যায়। আর আইনুদ্দিন ও মিসবাহ উদ্দিন রাজনের ডিএনএ মিক্সিং পাওয়ায় তাদের বিরুদ্ধেও ধর্ষণের অভিযোগ প্রমাণিত হয়। ডিএনএ রিপোর্টের ফলে নিশ্চিত হওয়া যায়, এ ৬ জনই গৃহবধূকে ধর্ষণ করেছিল। আইনুদ্দিন ও মিসবাহ ধর্ষণের সময় কিছু ব্যবহার করায় ম্যাচিং এর বদলে রিপোর্টে মিক্সিং পাওয়া গেছে। বাকী ৪ জন কোনো কিছু ব্যবহার না করে সরাসরি ধর্ষণ করেছিল। গত ২৪ জানুয়ারি আদালতে এ দুটি মামলার বিচার কাজ একসঙ্গে শুরু করার আবেদন করেছিলেন বাদীপক্ষ। শুনানি শেষে বিচারক আবেদনটি খারিজ করে দেন। এরপরই বাদীপক্ষ মামলা দুটির বিচার কার্যক্রম একই আদালতে সম্পন্ন করার জন্য জানুয়ারি মাসেই উচ্চ আদালতে একটি ফৌজদারি বিবিধ মামলা করেন। ফৌজধারি বিবিধ মামলা নং- ৮৯৫২/২০২১। গত ৭ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্টের বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের ভার্চ্যুয়াল বেঞ্চ এ মামলার শুনানি করেন। বাদী পক্ষে ব্যারিস্টার আব্দুল কাইয়ূম লিটন, এডভোকেট সাব্রিনা জারিন ও রাষ্ট্রপক্ষে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সরওয়ার হোসেন বাপ্পি, সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মাওদুদা বেগম ও হাসিনা মমতাজ শুনানিতে অংশ নেন। শুনানি শেষে আদালত মামলা দুটির বিচার কার্যক্রম একসাথে একই আদালতে সম্পন্নের আদেশ দেন।আলোচিত এ গণধর্ষণের ঘটনার মামলার আসামিরা হলো- বালাগঞ্জ উপজেলার চান্দাইপাড়ার তাহিদ মিয়ার পুত্র সাইফুর রহমান (২৮), হবিগঞ্জ জেলার সদর উপজেলার বাগুনীপাড়ার শাহ জাহাঙ্গির মিয়ার পুত্র শাহ মো মাহবুবুর রহমান রনি (২৫), দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার উমেদনগরের মৃত রফিকুল ইসলামের পুত্র তারেকুল ইসলাম তারেক (২৮), জকিগঞ্জের আটগ্রামের মৃত অমলেন্দু লস্কর কানুর পুত্র অর্জুন লস্কর (২৬), দিরাই উপজেলার বড়নগদীপুরের দেলোয়ার হোসেনের পুত্র রবিউল ইসলাম (২৫), কানাইঘাট উপজেলার লামা দলইকান্দির (গাছবাড়ী) সালিক আহমদেও পুত্র মাহফুজুর রহমান মাসুম (২৫), সিলেট নগরের গোলাপবাগ আবাসিক এলাকার (বাসা নং-৭৬) মৃত সোনা মিয়ার পুত্র আইনুদ্দিন আইনুল (২৬) ও বিয়ানীবাজার উপজেলার নটেশ্বর গ্রামের মৃত ফয়জুল ইসলামের পুত্র মিজবাউল ইসলাম রাজনকে (২৭) অভিযুক্ত করে দন্ডবিধির ৩৪২/৩২৩/৩৭৯/৩৮৫/৩৪ ধারা তৎসহ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০(সংশোধনী, ২০০৩) এর /৭/৯/(৩)৩০ ধারায় অভিযোগপত্র গত বছরের ৩ ডিসেম্বর আদালতে জমা দেয় পুলিশ। এতে ৫২ জনকে সাক্ষী রাখা হয়।
উল্লেখ্য, গত বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর সিলেটের এমসি কলেজ ছাত্রবাসে স্বামীকে আটকে রেখে গৃহবধূ (১৯)’কে দলবদ্ধ ধর্ষণ করা হয়। এ ঘটনায় ৬ জনকে আসামি করে ওইদিন রাতেই মহানগর পুলিশের শাহপরাণ (রহ.) থানায় নির্যাতিতা নারীর স্বামী বাদী হয়ে মামলা (নং-২১/২৬.০৯.২০২১) করেন। এ মামলায় আরও ২/৩ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়। পুলিশ ও র্যাব ৭২ ঘণ্টার মধ্যে সিলেটের সীমান্তসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে এজাহারভূক্ত ছয় আসামিসহ আটজনকে গ্রেফতার করে। গত ২৯ নভেম্বর দুই মাস পর আসামিদের ডিএনএ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। তাতে ধর্ষণের প্রমাণ মিলেছে বলে জানানো হয়।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত ২৫ সেপ্টেম্বর বিকেলে স্বামীকে নিয়ে শাহপরান (র.) মাজারে বেড়াতে গিয়েছিলেন নির্যাতনের শিকার গৃহবধূ (১৯)। ফেরার সময় তারা গাড়ি থামিয়ে ছিলেন নগরের টিলাগড় এলাকার এমসি কলেজের প্রধান ফটকের সামনে। স্ত্রীকে প্রাইভেটকারের ভিতর রেখে স্বামী পাশ্ববর্তী দোকানে গিয়ে ছিলেন। ওইসময় প্রাইভেটকারটি ঘিরে ধরে কয়েকজন তরুণ। প্রাইভেটকারসহ ওই দম্পতিকে তারা নিয়ে যায় বালুচর এলাকায় এমসি কলেজ ছাত্রাবাসের ভেতরে। সেখানে স্বামীর সামনেই গাড়ীর ভেতরে সংঘবদ্ধভাবে তরুণীকে ধর্ষণ করে ৬ তরুণ। পরে তাদের মারধর করে টাকা ও স্বর্ণালংকার ছিনিয়ে নেয় ধর্ষকরা। আরও টাকার জন্য আটকে রাখে তাদের গাড়িও। এ ঘটনার পর আসামিরা পালিয়ে গেলেও ৩ দিনের মধ্যে ৬ আসামিসহ সন্দেহভাজন আরও ২ জনকে সিলেটের সীমান্তবর্তী এলাকাসহ বিভিন্ন স্থান থেকে গ্রেপ্তার করে র্যাব ও পুলিশ। সন্দেহভাজন দুই গ্রেপ্তারকৃত হলেন, আইনুদ্দিন ওরফে আইনুল ও মিসবাউল ইসলাম রাজন মিয়া। গ্রেপ্তারের পর তাদের প্রত্যেককে ৫ দিন করে রিমান্ডে নেয় পুলিশ। রিমান্ড শেষে সকলেই দায় স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন। রিমান্ড শেষে তাদের আদালতে হাজির করা হলে তারা সবাই স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। গণধর্ষণের এ ঘটনার পর কলেজ কর্তৃপক্ষ থেকে ২৬ অক্টোবর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এছাড়া গৃহবধূকে গণধর্ষণের ঘটনায় জড়িত চার আসামির ছাত্রত্ব এবং সনদ বাতিল করেছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। পাশাপাশি তাদের স্থায়ীভাবে এমসি কলেজ থেকে বহিষ্কারও করা হয়েছে। এর আগে ঘটনার কয়েক দিন পর শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে গণধর্ষণের ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি এমসি কলেজে তদন্ত করতে আসে। তদন্ত শেষে তারা তাদের প্রতিবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছেন। তাছাড়াও এ ঘটনায় কলেজের অধ্যক্ষ সালেহ আহমেদ ও হোস্টেল সুপার জীবন কৃষ্ণ আচার্য্যরে বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। চলতি বছরের ২ জুন দায়িত্বে অবহেলার কারণে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলেন উচ্চ আদালত। বিচারপতি মো মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি মো. কামরুল হোসেন মোল্লার সমন্বয়ে গঠিত ভার্চ্যুয়াল হাইকোর্ট বেঞ্চ এ নির্দেশ দেন। দীর্ঘ ১২৯ বছরের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মুরারিচাঁদ কলেজ (এমসি) কলঙ্কিত করেছে তারা।


আপনার মতামত লিখুন