অস্তিত্বহীন ফাজিলপুর ঘাটের ইজারা নিয়ে জনমনে অসন্তোষ বছরে মোটা অংকের চাঁদা আদায়
তাহেরপুর থেকে ফিরে ঘাটের কোনো অস্তিত্ব নেই, তবে আছে ইজারা। এলাকাবাসি জানান গত ২০ বছর আগে ছিল তাহিরপুরের রক্তি নদীর তীরে ফাজিলপুর খেয়া ঘাটটি। তবে এখনও আছে কাগজে-কলমে, যার কারণে ইজারা দেওয়া হয়। এ অস্তিত্বহীন ঘাটের ইজারা বাতিল করতে বিগত বছরে একাধিকবার মানববন্ধনও করেছেন এলাকাবাসি। তবে এখনও বাতিল হয়নি অস্তিত্বহীন ঘাটের ইজারা। কোনো প্রকার রশিদ ছাড়াই নৌকা থেকে আদায় করা হয় টাকা ,স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, এ ঘাটে প্রতিদিন কমপক্ষে ১৫০টি নৌকা থেকে গড়ে ১ হাজার ৫০০ টাকা করে নেওয়া হয় চাঁদা। এ হিসেবে প্রতি বছরে চাঁদা ওঠে কমপক্ষে ৮ কোটি ২৫ লাখ টাকা। এ চাঁদাবাজির বৈধতা পেতে নেওয়া হয় অস্তিত্বহীন ঘাটের ইজারা। আর ইজারা নেন আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতারা মিলে। এ ঘাটে এখন আর কেউ স্বেচ্ছায় নৌকা ভেড়ান না, কিন্তু জোর করে নৌকা ভেড়াতে বাধ্য করা হয়। না হলে মাঝনদীতে নৌকা আটকে রাখা হয়। আর এভাবেই এখানে নৌকা ঘাটের নামে আদায় করা হচ্ছে চাঁদা। বর্তমানে যাদুকাটা নদীর লাউড়েরগড় মহাল থেকে বালু ও পাথর বোঝাই করে নৌযান ফাজিলপুর দিয়ে চলাচল করছে।জানা যায়- চলতি বাংলা সালের জন্য ৩১ লাখ টাকায় অস্তিত্বহীন ঘাটের ইজারা নিয়েছেন উজান তাহিরপুর গ্রামের মৃত আলী নুরের ছেলে মঈনুল হক। তার সঙ্গে আরো ৭ জন আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের নেতা জড়িত, আছেন বিএনপির কর্মীও। আর এদের পিছনে রয়েছেন তাহিরপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের বর্তমান সভাপতি ও এক সাংগঠনিক সম্পাদক। গত বুধবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, রক্তি নদীর পশ্চিম পাড় ফাজিলপুর আর পূর্ব পাড় বড়খলা। বর্তমানে টোল আদায় করা হচ্ছে বড়খলা থেকে। তবে পশ্চিম পাড়ে ঘাটের কোনো অস্তিত্ব নেই। সেই সাথে এ ঘাটের নৌকা ভিড়ানোর কোনো ধরনের প্রয়োজনীয়তা চোখে পড়েনি।
এসময় নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এ নদী দিয়ে চলাচলকারী একাধিক নৌকা মালিক ও শ্রমিকেরা জানান, ফাজিলপুরে তাদের নৌকা কোনো কারণেই ভিড়াতে হয় না। তবে মাঝনদীতে বালু-পাথর বোঝাই নৌকা আটকিয়ে টাকা আদায় করা হয়। টাকা না দিলে নৌকা আটক করে রাখে ইজারাদারের লোকজন। এসময় তারা খারাপ ভাষায় গালাগলি ও মারধর করে। স্থানীয় বালুপাথর ব্যবসায়ী নজির আহমদ জানান, এ নদীতে চলতি নৌকা থেকে টাকা আদায় করা অবৈধ। নৌকা ঘাটে ভিড়ায়ে মাল লোড-আনলোড করলে টাকা আদায় করা বৈধ। তবে অনেক বছর আগে ফাজিলপুরে লোড-আনলোড হতো, কিন্তু দীর্ঘ ২০ বছর ধরে এখানে নৌকা থেকে বালুপাথর লোড-আনলোড হয় না। একটি নৌকাও ফাজিলপুরে ভিড়ানোর প্রয়োজন পড়ে না।এ নদী দিয়ে চলাচলকারী বেশির ভাগ বড় নৌকা বাজিতপুর নৌপরিবহন বহুমুখী সমবায় সমিতি লিমিটেডের। এ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোশাররফ হোসেন বলেন, নৌকা মালিক শ্রমিকরা দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা করছি এ চাঁদাবাজি বন্ধ করতে, কিন্তু এলাকার স্থানীয় কয়েকজন লোকের কারণে বন্ধ হচ্ছে না। অচিরেই আমরা এ চাঁদাবাজি বন্ধের আন্দোলনে নামবো। এ ঘাটটি বন্ধ করলে নৌযান চালক ও মালিকরা স্বস্তি পাবে।ফাজিলপুর-আনোয়ারপুর ক্রাশার মিল শ্রমিক সর্দার সমবায় সমিতির সভাপতি ফেরদৌস আলম বলেন, এই ঘাটের ইজারার প্রয়োজনীয়তা গত ২০বছর আগে ছিল। এখন অস্তিত্বহীন ঘাটের ইজারা দেওয়ার কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই। এখানে ইচ্ছে মতো বালুপাথর বোঝাই নৌকা থেকে টাকা আদায় করা হচ্ছে। চলন্ত নৌকা থামিয়ে টোল আদায়ের নামে চাঁদাবাজি চলে। কোনো প্রকার রশিদ ছাড়াই তারা এ চাঁদা আদায় করা হচ্ছে।যাদুকাটা নৌযান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিক মিয়া বলেন, এ ঘাটটি উঠে গেলে এ নদী দিয়ে চলাচলকারী নৌকা ও শ্রমিকদের জন্য ভালো হয়। প্রতিদিন বড় ও মাঝারি মিলে প্রায় দেড় শতাধিক নৌকা প্রতিদিন এই নদী দিয়ে চলাচল করে।
ইজারাদার মঈনুল হক বলেন, বৈধ ইজারাদার হিসেবে টোল আদায় করছি। রশিদ দিয়েই টাকা নেওয়া হচ্ছে নৌকা থেকে। উপজেলা প্রশাসন আমাদের বৈধ ইজারা দিয়েছে। তবে মাঝনদীতে বালু-পাথর বোঝাই নৌকা আটকিয়ে টাকা আদায় করার বিষয়টি অস্বীকার করেন তিনি।তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রায়হান কবির বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সব প্রক্রিয়া মেনে ফাজিলপুর নৌকাঘাট হিসেবে এটি ইজারা হচ্ছে। এ নৌকাঘাটে নৌকা ভেড়ালে টোল আদায় করা যাবে। নৌকা না ভিড়ালে টোল আদায় করার কোনো নিয়ম নেই। অতিরিক্ত টোল আদায় বা ইজারার প্রয়োজনীয়তা আছে কি না এ বিষয়ে প্রশাসনকে জানালে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


আপনার মতামত লিখুন