বিদেশি কার্যাদেশ হ্রাস : ভরা মৌসুমে চোখে ধোঁয়াশা দেখছেন পোশাক মালিকরা
পোশাক শিল্পে বিদেশী বায়ারদের দাম কমানোর চাপ, দেশে বিদ্যুৎ সংকট, একদিন করে কারখানার উৎপাদন বন্ধ রাখা ও সাব-কন্ট্রাক্ট কমে আসায় চরম বিপাকে সময় পার করছেন চট্টগ্রামসহ দেশের পোশাক শিল্প মালিকরা। রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে ইউরোপ-আমেরিকার বাজাওে পোশাকের চাহিদা কমায় আগের চেয়ে কমেছে বিদেশি কার্যাদেশ। সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর এ তিন মাস কার্যাদেশ নেয়ার মূল সময় পোশাক ব্যবসায়ীদের। আর্ন্তজাতিক বাজারে কার্যাদেশ কমে যাওয়াসহ দেশীয় নানা সংকটে ভরা মৌসুমে এসে চোখে ধোঁয়াশা দেখছেন কারখানা মালিকরা। চাপ সইতে না পেরে চলতি বছরেই ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছে তিন কারখানার মালিক। বেতনের দাবিতে রাস্তায় নেমে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছে দুই কারখানার শ্রমিকরা।
রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধের কারণে তৈরি হওয়া প্রভাব পড়েছে পোশাক খাতে। কার্যাদেশ কমে যাওয়ায় ওভেন ও নীট খাতে ২০ শতাংশের বেশি কার্যাদেশ কমেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে যে পরিমাণে পণ্য রপ্তানি হয় তার অর্ধেকই আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। ১৯৮০ সালে চট্টগ্রাম থেকেই পোশাক খাতের যাত্রা শুরু।
আশি ও নব্বইয়ের দশকে বেশ প্রসারিত হয় চট্টগ্রামের পোশাক খাত। তবে করোনার এই দেড় বছর বিগত ৪১ বছরের গতিতে ভাটা ফেলেছে। পোশাক খাতে নেমে এসেছে বিপর্যয়। সে সময় চট্টগ্রাম থেকেই বাতিল হয়েছে ৮ হাজার ৪শ কোটি টাকার রপ্তানি কার্যাদেশ।
বিজিএমইএর প্রথম সহ-সভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম বলেন, সেপ্টেম্বর-অক্টোবর-নভেম্বর এই তিন মাস আমাদের প্রচুর পরিমাণে অর্ডার আসার কথা। সেখানে আমাদের কার্যাদেশ অর্ধেকে অর্থাৎ ৫০ শতাংশে নেমে এসেছে। ইউরোপ-আমেরিকার বাজারে চাহিদা কমায় পোশাকের কার্যাদেশে ভাটা পড়েছে।
তার উপর ডিপোগুলো চার্জ বাড়িয়েছে, বায়াররা পণ্যের দাম কমানোর জন্য চাপ দিচ্ছে, আমাদের উৎপাদন খরচ বেড়েছে। সবমিলিয়ে পোশাক কারখানা এখন সংকটময় সময় পার করছে। এভাবে চলতে থাকলে শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতনসহ নিয়মিত ব্যয় মিটিয়ে টিকে থাকা আমাদের জন্য বড় রকমের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বর্তমানে সারাদেশে বিজিএমইএর সদস্যভূক্ত ৪ হাজার ৭শ কারখানার মধ্যে ২ হাজার ৭৩৪টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। বাকি ১ হাজার ৯৬৬টির মধ্যে আমদানি-রপ্তানি কাজে নিয়োজিত আছে মাত্র ১ হাজার ৬শ প্রতিষ্ঠান। এরমধ্যে বর্তমানে চট্টগ্রাম থেকে বিজিএমইএ’র নিবন্ধিত ৬৯৭টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বন্ধ রয়েছে ৩৮৯টি প্রতিষ্ঠান। বাকি ৩০৮টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আমদানি-রপ্তানির কাজ চালিয়ে যাচ্ছে ১৯০টি প্রতিষ্ঠান।
চট্টগ্রাম বন্দর সূত্র জানায়, গত বছরের ডিসেম্বরে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ৪৯০ কোটি ৭৮ লাখ ডলার পোশাক পণ্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয়েছে। অপরদিকে চলতি বছরের জানুয়ারিতে ৪৮৫ কোটি ৩ লাখ ৭১ হাজার ডলার, ফেব্রæয়ারিতে ৪২৯ কোটি ৪৬ লাখ ডলার, মার্চ মাসে ৪৭৬ কোটি ২৩ লাখ ডলার,
এপ্রিল মাসে ৪৭৪ কোটি ডলার ও জুন মাসে ৪৯১ কোটি ডলার ও জুলাই মাসে ৩৯৫ কোটি ডলার পোশাক পণ্য রপ্তানি হয়েছে ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন দেশে। তবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো ও বিদ্যুৎ সমস্যা প্রকট হওয়ার পর থেকেই কমতে শুরু করেছে রপ্তানি। জুলাই মাসের তুলনায় আগস্ট মাসে প্রায় ৯৬ কোটি ডলার রপ্তানি কমেছে।
বিগত দুই অর্থবছরে করোনাসহ নানা সমস্যার কারণে পোশাক রপ্তানিতে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারেননি ব্যবসায়ীরা। গত অর্থ বছরে ২ লাখ ৮৭ হাজার ১৩০ কোটি রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও অর্জন হয়েছিল ২ লাখ ৬৭ হাজার ৩২৫ কোটি টাকা। পাশাপাশি
তার আগের অর্থবছরে ৩ লাখ ২৪ হাজার ৭শ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে রপ্তানি হয়েছিল ২ লাখ ৩১ হাজার ১১৫ কোটি টাকার পণ্য।
চট্টগ্রাম বিজিএমইএ’র তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৫ সালে চট্টগ্রামে নিবন্ধিত ১৩৩টি পোশাক কারখানার মধ্যে ব্যবসা বন্ধ করে দেয় ৭টি কারখানার মালিক। ১০ বছরের ব্যবধানে ১৯৯৫ সালে ৩৫৯টি কারখানার মধ্যে ১৪টি, ২০০৫ সালে ৬৯৯টি কারখানার মধ্যে ৮৯টি ও ২০১৫ সালে ৭৫৬টি কারখানার মধ্যে বন্ধ হয়েছে ৩০১টি কারখানা। এর আগে গতবছর বিজিএমইএর নিবন্ধিত ৬৯৩টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বন্ধ হয়েছিল ৪শ কারখানা, মাত্র ২৯৩টি কারখানা উৎপাদনে ছিল।
চলতি বছরের প্রথম আট মাসে পূর্ব ঘোষণা ছাড়া ও শ্রমিকের মজুরি শোধ না করে বন্ধ হয় তিনটি প্রতিষ্ঠান। এরমধ্যে বোয়ালখালীর পূর্ব কালুরঘাটের চর খিদিরপুর এলাকায় অবস্থিত রিজেন্ট টেক্সটাইল কারখানায় গত ফেব্রæয়ারি মাস থেকে বন্ধ রয়েছে। গত ২২ আগস্ট চট্টগ্রামের সিডিএ আবাসিক এলাকার বেইস টেক্সটাইল ও ২৬ আগস্ট পূর্ব বাকলিয়ার রাজাখালি এলাকার নিড টেক্সটাইল সিটিজি লিমিটেড নামের কারখানা বন্ধ ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ।
পাশপাশি চলতি বছরের ২৩ মে নগরের পলিটেকনিকের চন্দ্রনগর এলাকার আনোয়ারা গার্মেন্টেসের ৬০ থেকে ৭০ জন শ্রমিক ও ৮ জুলাই একেখান প্যান ফেব্রিক্স গার্মেন্টস লিমিটেডের শ্রমিকরা বকেয়া বেতনের দাবিতে সড়ক অবরোধ করে।
জে-আর


আপনার মতামত লিখুন