বঙ্গবন্ধু টানেলে সর্বহারা সাড়ে ৪’শ পরিবার ক্ষতিপূরণ পায়নি
‘বাড়ি-ঘর বেয়াজ্ঞিন ভাঙি ফেলাইয়ি, বাপ দাদার ভিটামাটির উদ্দি টানেলর রাস্তা অইয়ি, কিন্তু আঁরা হন টেঁয়া পয়সা ন পাই, এহন ভারা বাসাত থাহি, দেশল্লাই মুক্তিযোদ্ধা গইরগি, আজিয়ে নিজের ঘর হারাই ফেল্লি, টেঁয়াল্লাই যাইলি হদে বউত অভিযোগ আছে’(‘ঘর বাড়ি তো গেছে, সঙ্গে গেছে ফসলী জমিও। দেশের জন্যই যুদ্ধে গিয়েছি, বৃদ্ধ বয়সে এসে দেশের স্বার্থে ভেঙে দেওয়া পৈত্রিক বাড়িঘর ছেড়ে উঠেছি ভাড়া ঘরে। নিজের ঘরের মাঝখান দিয়ে গেছে হাজার কোটি টাকার টানেল। ধ্বংস হয়ে গেছে স্বপ্ন গুলোও। কাজ শুরুর আগে ক্ষতিপূরণ পাওয়ার কথা থাকলেও এখন উদ্বোধনের বাকি এক মাস। পাইনি এখনও কোনো টাকা। টাকার আশায় বিভিন্ন ব্যাংকে হয়েছে লক্ষাধিক টাকার লোনও। জানি না কবে পাব সে ক্ষতিপূরণের টাকা।’ শুক্রবার সকালে কান্না জড়িত কন্ঠে এসব কথা বলছিলেন কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত বঙ্গবন্ধু টানেল প্রকল্পে অধিগ্রহণে ক্ষতিপুরণ না পাওয়া ক্ষতিগ্রস্থ মুক্তিযোদ্ধা ক্ষুদিরাম সিংহ।
শুধু তাই নয়, একই এলাকার রূপন সেন মাস্টার, শিমুল সেন, কায়সার উদ্দিন, ইসমাঈল তালুকদারসহ রয়েছে প্রায় সাড়ে ৪’শ পরিবার।
তবে টানেল কর্তৃপক্ষের দাবী অনেকের কাগজপত্র ও দলিল নিয়ে সমস্যা থাকার কারণে তারা ক্ষতিপূরণ নিতে পারেনি।
জানা যায়, কর্ণফুলী নদীর তলদেশে টানেল নির্মাণের কারণে আনোয়ারা প্রান্তে বারশত, বৈরাগ ও চাতরী ইউনিয়নের প্রায় এক হাজার পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়। ক্ষতিগ্রস্থ এসব পরিবারের অধিকাংশ তাদের ভিটা—মাটি হারিয়ে অনেকে ভাড়া বাসায় বসবাস করছেন।
তাদের মধ্যে অর্ধেকেরো বেশি পরিবার এখনো নানা জটিলতায় ক্ষতিপূরণ পায়নি। আগামী ডিসেম্বরে উদ্বোধন হতে যাচ্ছে টানেল। এরই মধ্যে আগামী ৩০ অক্টোবর ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ প্রদানের মেয়াদ শেষ হচ্ছে।
কিন্ত নানা জটিলতায় ক্ষতিপূরণ না পাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্থ এসব পরিবারের মাঝে ক্ষোভ বাড়ছে। তাদের দাবী করোনা মহামারির কারনে তারা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জোগাড় করতে পারেনি।
ক্ষতিগ্রস্থরা অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণের টাকা পাওয়ার মেয়াদ বৃদ্ধির জন্য স্থানীয় ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ এমপি,বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ,টানেল প্রকল্প পরিচালক ও উপ পরিচালক এবং জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত আবেদন করেছেন ।
ক্ষতিগ্রস্ত কায়সার উদ্দিন বলেন, করোনা মহামারির কারনে আমার বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরেও আমাদের ভিটামাটির প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জোগাড় করতে পারিনি। তাই ক্ষতিপূরণের মেয়াদ বাড়ানোর জন্য আমরা সরকারের কাছে আবেদ জানাচ্ছি।
স্থানীয় ইউপি সদস্য মোহাম্মদ মুছা তালুকদার বলেন, ১৯৭৯ থেকে ৮০ সাল পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য সরকার অধিগ্রহণ করে নামমাত্র ক্ষতিপূরণ দিয়ে শতাধিক মানুষকে করেছে ভূমিহীন ও নিঃস্ব। তারপরও আমরা জনস্বার্থে ও দেশের উন্নয়নের জন্য আমাদের পূর্ব পুরুষসহ আমরা নিরবে সহ্য করে যাই।
কিন্তু কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত টানেল সড়কের জন্য বৈরাগ, বন্দর ও বৈলচুড়া মৌজার ২০. ৪ হাজার ৩০ একর নাল, বাড়িসহ ভূমি অধিগ্রহণ করে এবং ক্ষতিপূরণ দিতে থাকে।
এমতাবস্থায় জনবান্ধব বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ জনগণের ন্যার্য্য অধিকার বিবেচনা করে ক্ষতিগ্রস্ত ভূমি মালিকদের পুর্ণবাসনের অতিরিক্ত মঞ্জুরি অর্থ প্রদানের কার্য্যক্রম গ্রহণ করেন। এতে করে ক্ষতিগ্রস্তরা নতুন করে স্বপ্ন দেখে টাকা পাওয়ার।
কিন্তু দুঃখের বিষয় অধিগ্রহণকৃত ভূমির অনেক মালিক দেশের বাইরে থাকা ও নাবালকদের গার্ডিয়ানশীপ নিযুক্ত
সংক্রান্ত জটিলতা এবং অধিগ্রহণকৃত সম্পত্তির প্রকৃত মালিকানা নিয়ে আদালতে মামলা মোকাদ্দমা চলমান থাকা
বৈরাগ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নোয়াব আলী বলেন, টানেলে ক্ষতিগ্রস্থ প্রায় সাড়ে চারশ পরিবার তাদের ক্ষতিপূরণ পায়নি। আগামী ৩০ আক্টোবর ক্ষতিপূরণ প্রদানের মেয়াদ শেষ হচ্ছে।
ক্ষতিগ্রস্থ পরিবার গুলোর পুন:বাসন না করে টানেল উদ্বোধন মানবতার কাছে প্রশ্ন থেকে যাবে। তাই এসব অসহায় লোকজনকে ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থার দাবী যাচ্ছি।
জানতে চাইলে কর্ণফুলী টানেল নির্মাণ প্রকল্প (প্রশাসন ও পূর্ণবাসন) উপ পরিচালক ড. অনুপম সাহা বলেন, ক্ষতিগ্রস্থরা নিজেদের সমস্যার কারণে ক্ষতিপূরণ হয়তো তোলতে পারছেনা, ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য আমাদের সব ধরণের সহযোগিতা থাকবে।
ক্ষতিপূরণের টাকা উত্তোলনের ৩০ শে অক্টোবর শেষ সময় হলেও আমাদের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে মেয়াদ বাড়ানোর অনুরোধ থাকবে।
২৪ ঘণ্টা / জেআর


আপনার মতামত লিখুন