খুঁজুন
, ,

বাঙালির জাতীয় জীবনে গৌরবময় ও ঐতিহ্যপূর্ণ দিন ২১ ফেব্রুয়ারি

ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: Monday, 17 February, 2020, 10:39 am
বাঙালির জাতীয় জীবনে গৌরবময় ও ঐতিহ্যপূর্ণ দিন ২১ ফেব্রুয়ারি

নজরুল ইসলাম তোফা:: বাংলা ভাষা বাংলাদেশের মানুষের মাতৃভাষা। এই মায়ের ভাষাকে রক্ষা করতে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছে বাঙালি জাতি। তাইতো ২১ ফেব্রুয়ারি বাঙালি জাতির চেতনার দিন, নবজাগরণের দিন।

কবিরাও বলেছে, ‘মায়ের ভাষা, সেরা ভাষা খোদার সেরা দান।’ মাতৃভাষা বা ভাষা হলো সাহিত্য ও সংস্কৃতির অন্যতম মাধ্যম। ইতিহাস এবং ঐতিহ্যের বাহন। শিল্পকর্ম ও অগ্রগতির ধারক। একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালির জাতীয় জীবনে এক গৌরবময় ও ঐতিহ্যবাহী দিন। বাঙালির জাতীয় জীবনের সকল চেতনার উৎস হচ্ছে এ দিনটি।

বাংলা ভাষাকেই রাষ্ট্রীয় ভাষার মর্যাদায় প্রতিষ্ঠা করার ঐতিহাসিক দিন এটি। “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি আমি কি ভুলিতে পারি।’’ এমন গান শুনলেই মনে হয় আমরা ১৯৫২ সালের সেই দিনটিতে ফিরে যাই। আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী রচিত এমন গান চির অম্লান হয়ে রবে। প্রত্যেক জাতির জীবনে বিরল কিছু স্মরণীয় দিন থাকে, ইংরেজিতে যাকে বলে- ‘রেড লেটার ডে’। সুতরাং একুশের ফেব্রুয়ারি দিনটা অনন্য স্বতন্ত্রতায় ইতিহাসের পাতায় পাতায় কালজয়ী সাক্ষী হয়েই থাকবে। এই দেশের সকল চিত্রশিল্পী, কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, সুরকার এবং গীতিকাররা একুশকে ধারণ করেছিল তাদের লেখায়, সুরে, কণ্ঠে আর শিল্পীর তুলিতে। আর সেসব গান, কবিতা বা শিল্পকর্ম আমাদের অনুপ্রেরণা দেয়। একুশকে সাথে নিয়ে সামনে এগিয়ে চলতে পথ দেখায়।

১৯৫২ সালে একুশে ফেব্রুয়ারির সময় একজন ভাষা সৈনিক:- মাহবুব উল আলম চৌধুরী একুশের কবিতা লিখে খুব আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। বলা যায় তিনিই অমর একুশের প্রথম কবিতার জনক। এই দিবসের তাৎপর্য উল্লেখ করে বিশিষ্ট ভাষা বিজ্ঞানী হুমায়ুন আজাদ বলে ছিল, ”আমি মুগ্ধ আমি প্রীত, আমাকে স্বীকৃতি দিয়েছে, আমার প্রাণের কথা আমার ভাষায় জানাতে পারব বলে আমার হৃদয় স্পন্দন বেড়েছে। সত্যিই গর্বিত আমি।’’ তাই তো ভাষা আন্দোলন জাতি গোষ্ঠীর সর্ব বৃৃৃহৎ চেতনার ইতিহাস। ভাষার অধিকার আদায়ের সেই রাজপথ রঞ্জিত করা ইতিহাস। এখন বাংলাদের বাংলা ভাষা আন্তর্জাতিক ভাবেই স্বীকৃত। একুশ এখন সমগ্র বিশ্বের। কিন্তু কেমন ছিল একুশের প্রথম প্রহর বা একুশের অগ্নিস্ফুলিঙ্গের প্রথম সেই বারুদের সংযোজন। আর তখনকার সেই বিদ্রোহের অনুষঙ্গটাই বা কি ছিল? তা ক্ষুদ্র পরিসরে আলোচনার চেষ্টা করা মাত্র। সেই দিনের প্রথম কিছু বা প্রথম সৃষ্টি কিংবা তার অবদানকে নিয়েই লেখা। আজকের তরুণ প্রজন্ম আগামী দিনের স্বপ্ন দেখতে পারে এই লেখাটি বিশ্লেষণ করে। আসলেই এ আলোচনায় অনেক দিকই চলে আসেতে পারে, সব কিছু তো তুলে ধরা সম্ভব হবে না। তবুও মৌলিক কিছু কথা না বললেই নয়।

এই ভাষার সঙ্গেই যেন সংশ্লিষ্ট জীবনবোধ, সাহিত্য-সংস্কৃতি স্বাতন্ত্র্য, জাতির আধ্মাতিক সত্তা সংরক্ষণের সংগ্রামের মূর্ত রূপ ছিল ২১ ফেব্রুয়ারি। বাংলাদেশের জনগণের কাছে তাই এমন দিনের গুরুত্বটা অবশ্যই হৃদয়গ্রাহী। প্রথমে এই ভাষার জন্যে এদেশের ছাত্ররাই যেন আন্দোলন চালিয়ে নিলেও পরবর্তীতে গোটা দেশবাসী ছাত্রদের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে ছিল। ফলে সেই সময়র ছাত্রদের মনোবল অনেক বেড়ে যায় এবং তারা সামনের দিকে দৃঢ় মনোবলে এগোতে শুরু করে। মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার আন্দোলনে সেই ছাত্রসমাজ ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি মিছিলও করে ছিল। পুলিশ মিছিলের উপর গুলী চালায়। এতে অনেকে নিহত হয়েছিল, আজ তাদেরকেই শহীদ বলা হয়। এ হত্যাযজ্ঞের জন্য ছাত্র সমাজসহ সকল শ্রেণীর মানুষেরা ভাষার আন্দোলনকে আরো বেগবান করে। ভাষার জন্যেই যেন আন্দোলনের প্রথম লিফলেট প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি গুলি বর্ষণের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে। লিফলেটটির আকার ছিল প্লেট অনুযায়ী ১/১৬। গুলি বর্ষণের অল্প কিছুক্ষণ পর পরই হাসান হাফিজুর রহমান, আমীর আলী সহ অনেকেই যেন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের উল্টোদিকে ক্যাপিটাল প্রেসে চলে যান। সেখানে গিয়ে হাসান হাফিজুর রহমান লিফলেটের খসড়া তৈরি করেন। দুই তিন ঘণ্টার মধ্যেই ‘মন্ত্রী মফিজউদ্দীনের আদেশে গুলি’ শীর্ষক লিফলেটটি ছাপার কাজ সম্পন্ন হয়েছিল। হাসান হাফিজুর রহমান লিফলেটটি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় আসেন। প্রায় দুই/তিন হাজার লিফলেট ছাপানো হয়েছিল। উৎসাহী ছাত্ররাই এমন লিফলেটগুলো চারদিকে ছড়িয়ে দিয়ে ছিল। বলা যায় যে, চকবাজার, নাজিরা বাজার এবং ঢাকার অন্য সব এলাকাতেও লিফলেটগুলো কর্মীদের মাধ্যমে ঐদিনই ছড়িয়ে দেয়া হয়েছিল। এই স্মৃতি মতো অনেক স্মৃতিই যেন আমাদের ভাষা আন্দোলনকে অমর ও অক্ষয় করে রেখেছে।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে সংঘটিত হত্যাকান্ডের খবর সারা দেশেই পৌঁছে যায়। অতঃপর পাকিস্তান সরকার বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়। ১৯৯৯ সালের ১৭ নবেম্বর ইউনেস্কো এর সাধারণ পরিষদের ৩০তম পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে বাংলাদেশসহ ২৭টি দেশের সমর্থন নিয়ে সর্বসম্মতভাবে একুশে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালি জাতির মাঝে যে চেতনার উন্মেষ হয়, তার চরম বিস্ফোরণ ঘটে ছিল ঊনসত্তর থেকেই একাত্তরে।বাংলাদেশের সমস্ত আন্দোলনের মূল চেতনা একুশে ফেব্রুয়ারি। তখন থেকেই বাঙালি উপলব্ধি করেছিল তার বাঙালি জাতীয়তাবোধ, তার সংস্কৃতির অতন্দ্র প্রহরী। এমন এই সংগ্রামী চেতনাই বাংলার সাংস্কৃতিক আন্দোলন ও রাজনৈতিক আন্দোলন এই দু’ধারাকে একসূত্রে গ্রথিত করে মুক্তি সংগ্রামের মোহনায় এনে দিয়েছে। আর এই পরিপ্রেক্ষিতেই ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের সৃষ্টি হয়েছে। একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালি জাতির জীবনে একটি গুরুত্ব পূর্ণ দিন। একুশের চেতনাই যেন বাঙালি জাতিকে দিয়েছে অন্যায় ও অবিচার, অত্যাচার এবং শোষণের বিরুদ্ধেই আপোষহীন সংগ্রামের প্রেরণা।একুশের প্রথম নাটক ‘কবর’, তা মুনীর চৌধুরী রচনা করেছিল। এমন এই ভাষা আন্দোলনে জড়িত থাকার অপরাধেই যেন ’৫২ সালে জেলে আটক ছিলেন মুনীর চৌধুরী সহ রণেশ দাশগুপ্ত। তাদের পাশাাপাশি অনেক লেখক বা সাংবাদিকরাও জেলে আটক হয়ে লাঞ্ছিত হয়েছিল। রণেশ দাশ গুপ্ত জেলের এক সেলে আটক, আর অন্য একটি সেলেই মুনীর চৌধুরীকে ভাষা আন্দোলনের ওপর একটি নাটক লিখে দেওয়ার অনুরোধ করে চিরকুট পাঠান। সে চিরকুটের লেখাটি ছিল- শহীদ দিবসে রাজবন্দিরাই নাটকটি মঞ্চায়ন করবেন, জেলে মঞ্চসজ্জা ও আলোর ব্যবস্থা করা যাবে না। এমন কথাগুলো কৌশলে মুনীর চৌধুরীকে বলা হয়, নাটকটি এমনভাবে লিখতে হবে, যাতে খুব সহজে কারাগারেই এটি অভিনয় করা যায়। মুনীর চৌধুরী ’৫৩ সালের ১৭ জানুয়ারি নাটকটি লিখে শেষ করেন। ওই বছরের একুশে ফেব্রুয়ারি, রাত- ১০টায় কারাকক্ষগুলোর বাতি নিভিয়ে দেওয়ার পর শুধুমাত্র হ্যারিকেনের আলো-আঁধারিতেই কবর নাটকটি মঞ্চস্থ হয়। অভিনয়ে অংশ নেন বন্দি নলিনী দাস, অজয় রায় প্রমুখ।

ভাষার আন্দোলনটি জাতীয়তাবাদেরই প্রথম উন্মেষ। আন্দোলনের প্রত্যক্ষ ফল ছিল বাঙালি জাতির আপন সত্তার উপলব্ধি এবং ঐক্যবদ্ধ হওবার প্রেরণা। এমন আন্দোলন বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতার আন্দোলনের অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষিত করে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সশস্ত্র সংগ্রামে লিপ্ত হওয়ার অনুপ্রেরণা দেয়। এমন আন্দোলনে প্রথম ছাপচিত্র অঙ্কন করেছিলেন বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী, বায়ান্নর ভাষাকর্মী- মুর্তজা বশীর। ছাপচিত্রটির শিরোনাম হলো ‘রক্তাক্ত একুশে’। মুর্তজা বশীর ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির ছাত্রহত্যার প্রত্যক্ষদর্শীও ছিলেন। শহীদ বরকতের রক্তে তার সাদা রুমাল রঞ্জিত হয়েছিল। প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে আঁকা তাঁর এমন ছাপচিত্রটিতে তিনি একুশের ঘটনা অঙ্কিত করেছিল। একজন গুলিবিদ্ধ ছাত্রনেতাকে একেঁছেন সেখানেই ফুটে উঠে- মিছিলে গুলি বর্ষণের ফলে পড়ে যান, তার স্লোগান সংবলিত প্ল্যাকার্ডটি পড়ে যায় এবং তার হাতে থাকা বইটিও মাটিতে পড়ে রক্তাক্ত হয়ে যায়। অমর একুশে আজও বাংলাদেশে শহীদ স্মরণে গ্রন্থমেলার আয়োজন করেই যেন মাতৃভাষার জন্যে বিভিন্ন শহীদ ও বুদ্ধিজীবীদেরকে স্মরণ করা হয়। অমর একুশে ফেব্রুয়ারির তাৎপর্য বিশ্লেষণে শুধু শহীদ দিবস কিংবা গ্রন্থমেলা পালনেই সরকার সীমাবদ্ধ থাকেনি, তাকে এই বাঙালির জাতীয় জীবনের সর্বত্র প্রভাব বিস্তারেও আগ্রহী ভূমিকা পালন করছে। একুশে ফেব্রুয়ারির পূর্ণ ইতিহাস কিন্তু সাধারণ ছাত্র-জনতার ইতিহাস। এমন এ ইতিহাসের নায়ক অথবা মহানায়ক তারাই। কোনো দল অথবা দলীয় নেতার নেতৃত্বে এর জন্ম হয়নি। এই দেশের চিন্তাবিদ-বুদ্ধিজীবীরা তাদের যুক্তিবাদী সৃজনশীল লেখনীর দ্বারা সমাজজীবনে এর ক্ষেত্র রচনা করেছিল। দেশের স্বাধীনচেতা মৃত্যুঞ্জয়ী তরুণরা সেই উর্বর ক্ষেত্রেই রক্তবীজ বপন করেছিল। ফলেই আজকের এই সোনালি ফসল। এই তরুণদের সংগ্রামী চেতনা সমগ্র সমাজে ছড়িয়ে পড়ে এবং গড়ে তোলে এক অজেয় শক্তি। তাই তো পরবর্তী সময়েই রাজনীতিতে প্রদান করে নতুন দ্যোতনা। সংস্কৃতির ক্ষেত্রেই যেন সৃষ্টি হয় এক নতুন শক্তি। সৃষ্টি হয় নতুন ইতিহাস। গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি ওই সব শহীদ এবং বীর যোদ্ধাদের রক্ত, অশ্রু ও ত্যাগের বিনিময়ে আমরা একুশে ফেব্রুয়ারির মতো এই স্মরণীয় দিবসটি লাভ করতে পেরেছি। এমন দিনের সৃষ্টিতে তরুণরা রক্তাক্ত অবদান রাখলেও এখন তা বিশ্বজনীন হয়ে উঠেছে।

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হলে শাসক চক্র বাঙালী জাতিকে দুর্বল করতেই বাংলার মাতৃভাষা বা মায়ের ভাষার উপর চক্রান্ত শুরু করে। এর প্রতিবাদে ১৯৫২ সালের শুরুতে মায়ের ভাষা রক্ষার আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে। আন্দোলন ঠেকানোর জন্য সরকার ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে ঢাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে। ‘রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই’ প্রাণের দাবীতে ২১ ফেব্রুয়ারি ছাত্র যুব সমাজ ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে রাজপথে মিছিল করে। এ মিছিলে পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালায়। সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার সহ নাম না জানা অনেকেই যেন সেই দিন শহিদ হয়েছিল। আর বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারিতে সংঘটিত হওয়া মর্মান্তিক হত্যাকান্ডের খবর সারাদেশে ছড়িয়ে পড়লে দেশবাসী প্রচন্ড বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। উপায় না দেখে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতেই বাধ্য হয়ে ছিল। একটু ইতিহাসের দিকে দৃষ্টি দিলে পরিস্কার ভাবে জানা যাবে, তা হলো পাকিস্তান সৃষ্টির পূর্বে আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় এর তৎকালীন উপাচার্য- ড. জিয়াউদ্দিন উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব উপস্থাপন করেছিল। আর পূর্ববঙ্গ থেকে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন এবং বাংলাকেই রাষ্ট্রভাষা করার দাবি উত্থাপন করেন। এইভাবেই যেন ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত। এ দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা বাংলা হওয়া সত্ত্বেও পাকিস্তান সৃষ্টির শুরু থেকেই উর্দুকে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চালিয়ে দেয়ার চক্রান্ত চলতে থাকে। ১৯৪৮ সালে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঘোষণা করেছিল উর্দু এবং উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। এর ফলেই তুমুল প্রতিবাদের ধ্বনি উচ্চারিত হয়েছিল। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ঘোষণার পর পরই এদেশের ভাষা আন্দোলন জোরদার হতে থাকে।

পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই শাসকগোষ্ঠী রাজনৈতিক, সামাজিক ক্ষেত্রে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমেই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানকে তাদের উপনিবেশ হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিল। এ উদ্দেশ্য সাধনের জন্যই বাঙালিদের মাতৃভাষার উপর চরম আঘাত হানে। পাকিস্তান সৃষ্টির পর পরই যেন রাষ্ট্র ভাষা আন্দোলন শুরু হলেও ১৯৫২ সালের রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নেই বাঙালি জাতি আন্দোলনে ঐক্যবদ্ধ হয়। কেউ কবিতা লিখে, কেউ গান বা নাটক লিখে, কেউ বা চলচ্চিত্র কিংবা চিত্রাঙ্কন করে। ভাষা আন্দোলনের গুরুত্বটা যে, এ সবের মাধ্যমেই এ দেশের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রামী শিক্ষা নিয়ে থাকে। এই আন্দোলনের মাধ্যমেই যেন জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে শাসকচক্রের প্রতিটি ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে দিতে সক্ষম হয়ে ছিল। জানা প্রয়োজন তা হলো, একুশে ফেব্রুয়ারির পরের দিন অর্থাৎ ২২ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত হয় একুশের প্রথম ক্রোড়পত্র এবং প্রথম অঙ্কিত চিত্র। ক্রোড়পত্র প্রকাশ করে ছিল তৎকালীন ‘দিলরুবা’ পত্রিকার প্রকাশক এবং এতে স্কেচ আঁকেন শিল্পী আমিনুল ইসলাম আর লেখেন ফয়েজ আহমদ এবং আবদুল্লাহ আল মুতী শরফুদ্দীন। সেই গুলোকে বিকেল পাঁচটার মধ্যে কাগজে ছাপা হয়ে যায় এবং পত্রিকার কর্মীরাই রাজপথে কাগজ গুলো বিলি করে ছিল। সেই দিন সন্ধ্যা ৬ টা থেকে কারফিউ ছিল বলে ৬ টার আগেই হাতে হাতে কাগজ বিলি করা হয়ে যায়। তাইতো ১৯৫২ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে প্রেরণা দিয়েছিল একুশ ফেব্রুয়ারির ভাষা আন্দোলনের রক্ত রাঙ্গা ইতিহাস। বলা যায় যে, সর্ববস্তরে মানুষ ও ছাত্র সমাজের তীক্ষ্ম মেধা দ্বারাই মাতৃভাষার জন্যে সংগ্রাম করেছিল। তাই স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত একুশে ফেব্রুয়ারি ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে গৃহীত হওয়ার ব্যাপারটি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গৌরবের। এখন আমাদের কর্তব্য বাংলা ভাষা চর্চার মাধ্যমে উন্নত জাতি হিসেবে নিজেকে দাঁড় করানো।

ভাষার জন্য জীবন দান এ বিরল আত্মত্যাগকে সম্মান জানাতে জাতিসংঘের সংস্থা ইউনেস্কো ২০০০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি প্রথম আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে সম্পূর্ণ ভাবে ঘোষণা করে বিশ্বের ১৮৮টি দেশে যথাযোগ্য মর্যাদায় এ দিনটিকে প্রতি বছর পালন করে আসছে। জাতিসংঘে এর আগেও ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর জাতি সংঘের সংস্থা ইউনেস্কো আনুষ্ঠানিক ভাবেই এই দিনটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা দেয়। বাংলাদেশ ইউনেস্কোর সাধারণ সম্মেলনের ৩০ তম অধিবেশনে এক পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাবটির খসড়াও পেশ করেছিল। বাংলাদেশকে সমর্থন জানায় ২৭টি দেশ। দেশ গুলো হলো:- সৌদি আরব, ওমান, বেনিন, শ্রীলঙ্কা, মিশর, রাশিয়া, বাহামা, ডেমিনিকান প্রজাতন্ত্র, বেলারুশ, ফিলিপাইন, কোতে দি আইভরি, ভারত, হুন্ডুরাস, গাম্বিয়া, মাইক্রোনেশিয় ফেডারেশন, ভানুয়াতু, ইন্দোনেশিয়া, পাপুয়া নিউগিনি, কমোরো দ্বিপপুঞ্জ, পাকিস্তান, ইরান, লিথুনিয়া, ইতালি, সিরিয়া, মালয়েশিয়া, স্লোভাকিয়া ও প্যারাগুয়ে। ইউনেস্কোর এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমেই যেন বাংলা ভাষা সহ বিশ্বের চার হাজার ভাষাও সম্মানিত হয়। ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তৎকালীন পাকিস্তান শাসনামলে বাঙালির মাঝে নবচেতনার জন্ম হয়। তা হচ্ছে স্বাধীকারের স্বপ্ন। এর পথ ধরেই যেন আসে বাঙালীর মুক্তি ও স্বাধীন বাংলাদেশ।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস মাতৃভাষার উন্নয়ন এবং বিস্তারে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলেই মনে করা যায়। আর মাতৃভাষার প্রতি অবশ্যই এই দেশের শ্রদ্ধাবোধ বাড়াবে। আজও তাই বাংলা ভাষা ও তার সাহিত্য এবং সংস্কৃতি একুশের চেতনায় যেন বিকশিত হচ্ছে। আজও তা অব্যাহত রবে নব নব রূপেই জাতির হৃদয়ে সাড়া দিবে। বাংলা ভাষার জন্যেই সেই সময় একুশের প্রথম গান রচনা করে বাঙালি জাতি হৃদয়কে পুলকিত করেছিল। ভাষাসৈনিক আ.ন.ম. গাজীউল হকের প্রথম গানটির প্রথম লাইন: ‘‘ভুলব না, ভুলব না, একুশে ফেব্রুয়ারি ভুলব না”। এমন ভাষা-আন্দোলনের সুচনার গান হিসেবে এটি সে সময়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল এবং আন্দোলনের মহা অস্ত্র হিসেবে কাজ করেছিল। গানটির সুর দেয়া হয়েছিল হিন্দি গান ‘দূর হাটো, দূর হাটো, ঐ দুনিয়াওয়ালে, হিন্দুস্তান হামারা হায়’ এর অনুকরণে। একুশের হত্যাকাণ্ডের পরপরই গাজীউল হকের এ গানটি ছিল ভাষাকর্মীদের প্রেরণার মন্ত্র। শুধুমাত্র রাজপথের আন্দোলনে নয়, জেলখানায় রাজবন্দিদের দুঃখ কষ্ট নিবারণে এবং তাদের মনোবল চাঙ্গা করতে এই গান ছিল প্রধান হাতিয়ার। ১৯৫৩ সালে একুশের প্রথম বার্ষিকীতে আরমানিটোলার ময়দানে আয়োজিত জনসভায় গানটি ১ম গাওয়া হয়। ভাষার জন্য সেসময় কারো অবদান কম ছিলনা। ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে যেন চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়ছিল।প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা জহির রায়হানের ‘জীবন থেকে নেয়া’ ছবির একটি অংশে প্রভাতফেরি ও শহীদ মিনারে ফুল দেওয়ার দৃশ্য রয়েছে। খালি পায়ে ফুল দিতে যাওয়ার সেই দৃশ্যে বিখ্যাত গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ এমন গানটি সম্পূর্ণ বাজানো হয় আবহসঙ্গীত হিসেবে। পরিশেষে বলতে চাই যে, বিশ্বের কোন দেশে কিন্তুু মাতৃভাষার জন্য এই ভাবে আন্দোলন হয়নি। সেদিক দিয়ে বাংলাভাষার একটি বিশেষ স্থান বিশ্বে আছে। যা‘সবার উর্ধ্বে। তাই আকাশ সংস্কৃতির প্রভাব কমিয়ে সরকারকে নিজ দেশের চ্যানেলগুলোর প্রতি সবাইকে বিশেষ করে ছাত্র-ছাত্রীদের আগ্রহ বাড়িয়ে তুলা সহ প্রত্যেক বছর বই মেলা বৃহৎ আকারে আয়োজন করেই- আমাদের বাংলাভাষা কিংবা মাতৃভাষাকে খুব শক্তিশালী করতে হবে। তাহলেই হয়তো একুশে ফেব্রুয়ারী “আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস“ বা দেশীয় একুশের বিভিন্ন উৎসব পালন করাটাও সার্থক হবে। ২১ ফেব্রুয়ারি আমাদের অহংকার। আমাদের সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যের ধারক। সুতরাং বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গেই একমত পোষণ করে বলাই যায়,-“সার্থক জনম আমার জন্মেছি এই দেশে। সার্থক জনম, মাগো, তোমায় ভালোবেসে”॥

লেখক:- নজরুল ইসলাম তোফা, টিভি ও মঞ্চ অভিনেতা, চিত্রশিল্পী, সাংবাদিক, কলামিষ্ট এবং প্রভাষক।

Feb2
Feb2

জলাবদ্ধতা নিরসনে সামষ্টিক সমাধান নিশ্চিত করা হবে: অর্থমন্ত্রী

ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: Friday, 9 October, 2026, 7:24 pm
জলাবদ্ধতা নিরসনে সামষ্টিক সমাধান নিশ্চিত করা হবে: অর্থমন্ত্রী

চট্টগ্রাম মহানগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে চলমান প্রকল্পগুলোর সমন্বিত বাস্তবায়ন, খালের দুই পাড়ে হাঁটার পথ ও সাইকেল ট্র্যাক নির্মাণ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর নিয়মিত সমন্বয় ও পর্যালোচনার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

তিনি বলেন, বিচ্ছিন্নভাবে ছোট ছোট প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিবর্তে নগরীর জলাবদ্ধতা সমস্যার স্থায়ী সমাধানে সামষ্টিক পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

শুক্রবার বিকেলে টাইগারপাসস্থ চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক) কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে চট্টগ্রাম মহানগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে করণীয় নির্ধারণে সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় বক্তব্য রাখেন চট্টগ্রাম-৮ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব এরশাদ উল্লাহ, চট্টগ্রাম-৯ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান, সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন, সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কন্সট্রাকশন বিগ্রেডের বিগ্রেড কমান্ডার বিগ্রেডিয়ার জেনারেল শামসুল আলম শামস, চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী সেলিম মোহাম্মদ জানে আলম, জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা।

অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, চট্টগ্রাম মহানগরীর জলাবদ্ধতা সমস্যার বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত কাজগুলো পর্যালোচনার পাশাপাশি যেসব কাজ এখনো বাকি রয়েছে, সেগুলো দ্রুত সম্পন্ন করার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে।

তিনি বলেন, বিভিন্ন সময়ে নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে একাধিক প্রকল্প নেওয়া হলেও সামগ্রিক পরিকল্পনা ও সমন্বয়ের অভাবে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। একটি প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার আগেই অন্য এলাকায় নতুন সমস্যা তৈরি হতে পারে। তাই বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের পরিবর্তে সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে জলাবদ্ধতা সমস্যার কার্যকর সমাধান নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি বলেন, নগরীর বড় খালগুলোর উন্নয়নের পাশাপাশি খালের দুই পাড়ে মানুষের হাঁটাচলার উপযোগী পথ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। যেখানে সুযোগ রয়েছে, সেখানে সাইকেল ট্র্যাক নির্মাণের বিষয়টিও চলমান ও ভবিষ্যৎ প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এর মাধ্যমে জলাবদ্ধতা নিরসনের পাশাপাশি নগরবাসীর হাঁটাচলা, সাইকেল চালানো, শরীরচর্চা ও অবসর কাটানোর সুযোগ সৃষ্টি হবে। খালকেন্দ্রিক উন্নয়নকে শুধু পানি নিষ্কাশনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে নগরবাসীর জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং পরিবেশবান্ধব নগর গড়ে তোলার অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

নগরীর পরিবেশ ও সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে বৃক্ষরোপণের ওপর গুরুত্বারোপ করে মন্ত্রী বলেন, যেখানে সুযোগ রয়েছে, সেখানে গাছ লাগাতে হবে। বৃক্ষরোপণ নগরীর সৌন্দর্য বৃদ্ধির পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং বায়ুদূষণ কমাতে সহায়ক হবে। জলাবদ্ধতা নিরসন, সবুজায়ন, হাঁটার পথ ও সাইকেল ট্র্যাক, সবকিছুকে সমন্বিতভাবে বিবেচনায় নিয়ে চট্টগ্রামকে আরও বাসযোগ্য নগরীতে পরিণত করার উদ্যোগ নিতে হবে।

মন্ত্রী আরও বলেন, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ), পানি উন্নয়ন বোর্ড, চট্টগ্রাম ওয়াসা, বন্দর কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানকে নিয়মিত সমন্বয় ও পর্যালোচনার মাধ্যমে কাজ করতে হবে। এ লক্ষ্যে প্রতি মাসে কাজের অগ্রগতি পর্যালোচনা করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নিয়মিত সমন্বয় নিশ্চিত করা গেলে প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থের অপচয় কমবে, কাজের গতি বাড়বে এবং নগরবাসীর দৈনন্দিন দুর্ভোগ কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।

সভায় চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, নগরীর নালা খাল পরিষ্কার ও জলাবদ্ধতা নিরসনে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সঙ্গে নিয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করা হচ্ছে। বর্ষার আগে নালা ও খালের উন্নয়ন ও পরিষ্কার কার্যক্রমের জন্য ৪৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়ায় তিনি অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান।

মেয়র বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয় নিশ্চিত করতে ইতোমধ্যে একাধিক সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ভবিষ্যতেও এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। যেসব খালের উন্নয়নকাজ সম্পন্ন হয়েছে, সেগুলো চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের কাছে হস্তান্তরের পর প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সহায়তা ও রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম সমন্বিতভাবে পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে।

তিনি বলেন, চট্টগ্রাম মহানগরীতে মোট ১৩০টি খাল চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি খালের কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে এবং আরও ৪১টি খাল উন্নয়নের জন্য প্রকল্প প্রণয়নের কাজ চলছে। প্রয়োজন অনুযায়ী অবশিষ্ট খালগুলোর উন্নয়নেও উদ্যোগ নেওয়া হবে। জলাবদ্ধতামুক্ত, পরিচ্ছন্ন ও পর্যটনবান্ধব চট্টগ্রাম গড়ে তুলতে খালগুলোর উন্নয়ন, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

মেয়র জানান, বিমানবন্দর এলাকায় ২ দশমিক ২ কিলোমিটারের বেশি দীর্ঘ সাইকেল ট্র্যাক নির্মাণ করা হয়েছে, যা দেশের প্রথম সাইকেল ট্র্যাক হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। ভবিষ্যতে খালকেন্দ্রিক উন্নয়ন প্রকল্পের সঙ্গে হাঁটার পথ ও সাইকেল ট্র্যাক যুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে। এর মাধ্যমে জলাবদ্ধতা নিরসনের পাশাপাশি নগরীর সৌন্দর্য বৃদ্ধি এবং নাগরিকদের চলাচলের সুযোগ সম্প্রসারিত হবে।

চট্টগ্রাম-৮ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব এরশাদ উল্লাহ বলেন, আমার নির্বাচনী এলাকার কিছু স্থানে ভারী বৃষ্টিপাতের পর দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকার পেছনে ড্রেনেজ ব্যবস্থার প্রতিবন্ধকতা ও পানি নিষ্কাশনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

তিনি বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে ড্রেনেজ ব্যবস্থা, খাল এবং পানি সংরক্ষণের স্থানগুলোকে সমন্বিতভাবে ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি পানি নিষ্কাশনের পথে প্রতিবন্ধকতা দূর করা এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

সভায় চট্টগ্রাম-৯ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান বলেন, চট্টগ্রাম নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার মধ্যে সমন্বয় আরও বাড়াতে হবে। সিডিএ, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন, পানি উন্নয়ন বোর্ড, চট্টগ্রাম ওয়াসাসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজ নিজ দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। তাহলেই চলমান প্রকল্পগুলোর সুফল দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখা সম্ভব হবে।

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন বলেন, নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে বিচ্ছিন্ন প্রকল্পের পরিবর্তে সমন্বিত ও সামষ্টিক সমাধান নিশ্চিত করা জরুরি। চট্টগ্রাম মহানগরীর ১৩০টি খালের মধ্যে ৩৭টি সংস্কার করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, পানি প্রবাহ স্বাভাবিক রাখা এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে অবশিষ্ট খালগুলোতেও প্রয়োজন অনুযায়ী সংস্কারকাজ করতে হবে।

তিনি বলেন, নগরীতে স্থাপিত স্লুইসগেট ও রেগুলেটরগুলোর কার্যকর পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে বিশেষ প্রকল্প গ্রহণ করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে দক্ষ প্রকৌশল প্রতিষ্ঠানকে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে।

আউটার রিং রোড প্রকল্পের অগ্রগতি তুলে ধরে সিডিএ চেয়ারম্যান বলেন, কালুরঘাট পর্যন্ত প্রকল্পের প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করার আশা করা হচ্ছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে নদীর তীরবর্তী এলাকার সৌন্দর্য বৃদ্ধি এবং নগরবাসীর বিনোদনের সুযোগ সম্প্রসারিত হবে।

সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কন্সট্রাকশন বিগ্রেডের বিগ্রেড কমান্ডার বিগ্রেডিয়ার জেনারেল শামছুল আলম শামস বলেন, চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে চলমান প্রকল্প প্রায় শেষের পথে। প্রকল্পটি শেষ হলে নগরীর জলাবদ্ধতা অনেকাংশে হ্রাস পাবে। তবে, প্রকল্পের বাহিরে থাকা খালগুলোও খনন করতে হবে এবং সংস্কারের পর রক্ষণাবেক্ষণে জোর দিতে হবে।

জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, চট্টগ্রাম মহানগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে পাম্প ও স্লুইসগেট স্থাপন করলেই হবে না, এগুলোর কার্যকর পরিচালনা ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। সাম্প্রতিক বন্যায় সাতকানিয়া ও বাঁশখালীতে মানুষ ও যানবাহনের আশ্রয়ের উপযোগী উঁচু জায়গার সংকট দেখা গেছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রতিটি ইউনিয়নে অন্তত এক কিলোমিটার রাস্তা তুলনামূলক উঁচু করে নির্মাণের প্রস্তাব দেন তিনি। তাঁর মতে, এ ধরনের অবকাঠামো বন্যার সময় মানুষ ও গবাদিপশুর আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী হেলিকপ্টার অবতরণ এবং সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার সুযোগও রাখা যেতে পারে। এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদে সুপারিশ পাঠানো হয়েছে বলেও জানান জেলা প্রশাসক।

চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী সেলিম মোহাম্মদ জানে আলম বলেন, নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে স্লুইসগেট ও রেগুলেটর পরিচালনা এবং রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দক্ষ প্রকৌশল প্রতিষ্ঠানকে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে কার্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

জলাবদ্ধতা নিরসনে নগরীর দুপাশে অন্তত দুটি সংযোগকারী ‘ক্রস খাল’ নির্মাণের প্রস্তাব দিয়ে ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, মহেশখাল সম্প্রসারণসহ এ ধরনের খাল নির্মাণ ও সংযোগ নিশ্চিত করা গেলে পানি নিষ্কাশনের সক্ষমতা বাড়তে পারে। পাশাপাশি নৌচলাচলের সুযোগও সৃষ্টি হতে পারে। তিনি আরও বলেন, খালের পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়া রোধে ভবিষ্যতে সেতু নির্মাণের ক্ষেত্রে আর্চ ব্রিজের নকশা বিবেচনা করা প্রয়োজন।

নগরীর পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রসঙ্গে তিনি জানান, হালিশহরে সুয়ারেজ প্রকল্পের কাজ আগামী বছর শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে গৃহস্থালি বর্জ্যপানি সরাসরি ড্রেনে যাওয়ার প্রবণতা কমবে এবং নগরীর পরিবেশ উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

দীর্ঘমেয়াদি পানি সরবরাহ পরিকল্পনার বিষয়ে ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, আগামী ১০০ বছরের চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে পানি উন্নয়ন প্রকল্পের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। বাণিজ্যিক এলাকার জন্য সরকারি বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) ভিত্তিতে দৈনিক ১০০ কোটি লিটার পানি শোধনের একটি প্রকল্প গ্রহণের কথাও তিনি উল্লেখ করেন।

এতে আরো বক্তব্য রাখেন সিএমপি কমিশনার হাসান মোহাম্মদ শওকত আলী, অতি: বিভাগীয় কমিশনার মনোয়ারা বেগম, জলাবদ্ধতার মেগা প্রকল্প পরিচালক লে. কর্নেল মোহাম্মদ মহসিন, সিএমপির অতি: কমিশনার হোসাইন মোহাম্মদ কবির ভূইয়া, চসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও সচিব মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন, প্রধান প্রকৌশলী আনিসুর রহমান, প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন শামীম মোহাম্মদ খান, বন্দর কর্তৃপক্ষের চীফ হাইড্রোগ্রাপার কমান্ডার মো. ওবায়দুর রহমান, পানি উন্নয়ন বিভাগের প্রকল্প পরিচালক কর্নেল তারিকুল আলম, চসিকের খাল ও জলাবদ্ধতা বিশেষজ্ঞ শাহরিয়ার খালেদ, সিটি রেড ক্রিসেন্টের সাধারণ সম্পাদক গোলাম বাকি মাসুদ সহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তর ও সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন ।

দুর্গাপূজা সার্বজনীন উৎসব, সবাই মিলে বাংলাদেশ গড়তে চাই: আমীর খসরু

ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: Friday, 9 October, 2026, 7:14 pm
দুর্গাপূজা সার্বজনীন উৎসব, সবাই মিলে বাংলাদেশ গড়তে চাই: আমীর খসরু

দুর্গাপূজা এখন আর শুধু একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের উৎসব নয়, এটি বাংলাদেশের সার্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

তিনি বলেছেন, আমরা এমন একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়তে চাই, যেখানে সব মানুষের সমান অধিকার, সুযোগ-সুবিধা ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে। রাষ্ট্রের সুযোগ-সুবিধা সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছাতে হবে।

শুক্রবার (৯ অক্টোবর) বিকেলে নগরের জেএমসেন হলে চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের উদ্যোগে শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে উপহার বিতরণ অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, দুর্গাপূজা একটি ধর্মীয় উৎসব হলেও এটি বাংলাদেশের জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে। ছোটবেলা থেকেই তিনি পূজার আনন্দ ও উৎসবে অংশ নিয়েছেন। আমরা সবাই মিলে একটি দেশ গড়তে চাই। সেই দেশে কোনো বিশেষ গোষ্ঠী নয়, সবাই সমান সুযোগ পাবে। সবার অংশগ্রহণে রাষ্ট্র পরিচালিত হবে। অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়তে তারেক রহমান যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, আমরা সেদিকেই এগিয়ে যাচ্ছি।

সামাজিক সম্প্রীতি প্রসঙ্গে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, প্রতিটি সমাজেই কিছু দুষ্ট লোক থাকে। তারা যেন মানুষের মধ্যে বিদ্যমান সম্প্রীতি, ভালোবাসা ও ঐক্য নষ্ট করতে না পারে, সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে। এ জন্য সব সম্প্রদায়ের মানুষকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। এবার দুর্গাপূজার বেশ আগেই উৎসবের আমেজ তৈরি হয়েছে। মানুষের মধ্যে স্বস্তি, ভালোবাসা ও সম্প্রীতির পরিবেশ থাকলে এমন আনন্দ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ছড়িয়ে পড়ে। সরকার সেই পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে চায়। ছোটখাটো অসুবিধা থাকতে পারে। তবে সেগুলোকে বড় করে না দেখে দেশের সামনে থাকা সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দিতে হবে।

সভাপতি বক্তব্য চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের প্রশাসক
মোহাম্মদ মাহবুবের রহমান শামীম বলেন, চট্টগ্রামে যখন বন্যা হয়েছিল, তখন চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিল। দুর্যোগের সময় মানুষের পাশে থাকা যেমন আমাদের দায়িত্ব, তেমনি বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসবেও মানুষের পাশে থাকা আমাদের অঙ্গীকার। আজ সনাতন ধর্মাবলম্বীদের এই উৎসবের আয়োজনেও চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ আপনাদের পাশে রয়েছে। আমরা চাই, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই মিলেমিশে সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের বন্ধনে আবদ্ধ থাকুক। আসন্ন শারদীয় দুর্গাপূজা যেন নির্বিঘ্নে, শান্তিপূর্ণভাবে এবং আনন্দঘন উৎসবমুখর পরিবেশে উদ্‌যাপিত হয়, সেই প্রত্যাশা ব্যক্ত করছি। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, সবার সহযোগিতায় এবারের দুর্গাপূজা সম্প্রীতি ও আনন্দের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হবে।

চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের প্রশাসক মোহাম্মদ মাহবুবের রহমান শামীমের সভাপতিত্বে ও চট্টগ্রাম জেলা পরিষদে নির্বাহী কর্মকর্তা খোন্দকার মো. ইখতিয়ার উদ্দিন আরাফাতের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানের প্রধান বক্তার বক্তব্য রাখেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা.শাহাদাত হোসেন। বক্তব্য রাখেন চট্টগ্রাম-৮ আসনের সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ, চট্টগ্রাম-৯ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান, স্বাগত বক্তব্য রাখেন চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী চৌধুরী রওশন ইসলাম, চট্টগ্রাম ভারতীয় সহকারী হাইকমিশন শ্রী হরিশ কুমার, চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপি সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশেম বক্কর, শ্রী শ্রী জন্মাষ্টমী উদযাপন পরিষদ বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় কমিটির কার্যকরী সাধারণ সম্পাদক বিপ্লব দে পার্থ, আশীর্বাদক শংকর মঠ ও মিশনের অধ্যক্ষ শ্রীমৎ তপনানন্দ গিরি মহারাজ, শ্রীশ্রী জন্মাষ্টমী উদযাপন পরিষদ বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কমিটি সভাপতি অ্যাডভোকেট চন্দন তালুকদার, সাধারণ সম্পাদক লায়ন আর কে দাশ রুপু, বেসরকারি কারা পরিদর্শক উজ্জ্বল বরণ বিশ্বাস,হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ট্রাস্টি শ্রী রাজীব ধর তমাল ও চট্টগ্রাম মহানগর পূজা উদযাপন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট নিখিল কুমার নাথ।

এসময় উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন, স্থানীয় সরকার চট্টগ্রাম বিভাগের পরিচালক মনোয়ারা বেগম ও চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা প্রমুখ।

সাইকেল চালানো সুস্থ থাকার অন্যতম কার্যকর উপায়

ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: Friday, 9 October, 2026, 2:50 pm
সাইকেল চালানো সুস্থ থাকার অন্যতম কার্যকর উপায়

অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, সাইকেল চালানো শুধু যাতায়াতের মাধ্যম নয়, এটি সুস্থ থাকার অন্যতম কার্যকর উপায়। বিশ্বের অনেক দেশে মানুষ সাইকেলে করে কর্মস্থলে যাতায়াত করেন। সাইক্লিং পরিবেশবান্ধব এবং শারীরিক সুস্থতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই সাইকেল চালানোর জন্য নিরাপদ ও নির্দিষ্ট জায়গা তৈরি করা নাগরিকদের প্রতি সরকারের দায়িত্বের অংশ।

তিনি শুক্রবার (৯ অক্টোবর) দুপুরে চট্টগ্রাম বিমানবন্দর সড়কে (ভিআইপি রোড) বিমানবন্দর সড়কের উন্নয়ন ও বাংলাদেশের প্রথম সাইকেল ট্র্যাকের শুভ উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন।

নাগরিকদের সুস্বাস্থ্য, পরিবেশবান্ধব যাতায়াত ও উন্নত জীবনযাপনের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে চট্টগ্রাম নগরীতে বাংলাদেশের প্রথম সাইকেল ট্র্যাক চালু করেছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক)। বিমানবন্দর সড়কের উন্নয়ন ও সৌন্দর্যবর্ধন কার্যক্রমের অংশ হিসেবে নির্মিত এই সাইকেল ট্র্যাক নগরীর যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

অনুষ্ঠানে নগরবাসীর হাঁটাচলা, শরীরচর্চা ও বিনোদনের সুযোগ বাড়াতে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় সাইকেল ট্র্যাক ও ওয়াকওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনার কথা জানান আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে বাস্তবায়িত এ কর্মসূচিতে সভাপতিত্ব করেন চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। এতে বিশেষ অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম-৮ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব এরশাদ উল্লাহ, চট্টগ্রাম-৯ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান এবং চট্টগ্রাম-১২ আসনের সংসদ সদস্য এনামুল হক এনাম।

এসময় আমীর খসরু বলেন, চট্টগ্রাম নগরীতে সাইকেল চালানো ও হাঁটার সুযোগ বাড়াতে মেয়র যে উদ্যোগ নিয়েছেন, তা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। বিমানবন্দর সড়কের এই সাইকেল ট্র্যাক কেবল শুরু। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় পর্যায়ক্রমে আরও সাইকেল ট্র্যাক ও ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা প্রয়োজন, যাতে মানুষ শরীরচর্চা, বিনোদন ও দৈনন্দিন চলাচলের জন্য এসব সুবিধা ব্যবহার করতে পারেন।

মন্ত্রী আরও বলেন, নাগরিকদের জন্য হাঁটার জায়গা, সাইকেল চালানোর পথ ও উন্মুক্ত পরিসর তৈরি করা কোনো বিলাসিতা নয়, এগুলো মানুষের দৈনন্দিন জীবনের মৌলিক চাহিদার অংশ। মানুষকে ঘরের মধ্যে বন্দি রেখে সুস্থ ও সুন্দর জীবন নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তাই নগরীর খালের দুই পাড়সহ উপযুক্ত জায়গাগুলোতে হাঁটার পথ নির্মাণের উদ্যোগ নিতে হবে। এ ধরনের নাগরিক সুবিধা সম্প্রসারণে সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যদেরও নিজ নিজ এলাকায় উদ্যোগী হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

সভাপতির বক্তব্যে মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, বাংলাদেশের প্রথম সাইকেল ট্র্যাক নির্মাণ চট্টগ্রাম নগরীর জন্য একটি গর্বের অর্জন। প্রায় তিন কিলোমিটার দীর্ঘ এই ট্র্যাকের পাশাপাশি হাঁটার পথ নির্মাণ এবং দুই পাশের সৌন্দর্যবর্ধনে বিভিন্ন প্রজাতির ফুলগাছ লাগানো হয়েছে। পরিকল্পিতভাবে সবুজায়ন ও নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করার মাধ্যমে বিমানবন্দর সড়ককে আরও নান্দনিক করে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে।

মেয়র বলেন, বিমানবন্দর এলাকা থেকে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে পর্যন্ত সড়কের সৌন্দর্যবর্ধন ও উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নাগরিকদের জন্য সাইক্লিং ও হাঁটার সুযোগ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রীর পরামর্শ ও উৎসাহ এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। মন্ত্রীর সংসদীয় এলাকা থেকে এই কার্যক্রম শুরু করতে পেরে তিনি আনন্দিত।

তিনি বলেন, চট্টগ্রাম নগরীতে বড় সড়কের পাশাপাশি খালকেন্দ্রিক উন্নয়নেও সাইকেল ট্র্যাক ও ওয়াকওয়ে নির্মাণের সম্ভাবনা রয়েছে। খালের দুই পাড়ে প্রয়োজনীয় জায়গা পাওয়া গেলে সেখানে হাঁটার পথ, সাইকেল চালানোর সুবিধা ও সবুজায়ন করা সম্ভব হবে। এতে নগরবাসীর শরীরচর্চার সুযোগ বাড়ার পাশাপাশি নগরীর সৌন্দর্যও বৃদ্ধি পাবে।

নগরীর উন্নয়ন অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে মেয়র বলেন, শুধু উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করলেই হবে না, সেগুলো রক্ষা করার দায়িত্বও সবার। সাইকেল ট্র্যাক ও ওয়াকওয়ে যেন অবৈধ দখল, স্থাপনা কিংবা প্রতিবন্ধকতার কারণে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে না পড়ে, সে জন্য চসিকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা কর্মচারীদের নিয়মিত তদারকি করতে হবে। পাশাপাশি গাছপালার পরিচর্যা ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে হবে।

মেয়র আরও জানান, বিমানবন্দর সড়ক থেকে দেওয়ানহাট পর্যন্ত সড়কের স্থায়িত্ব বাড়াতে আরসিসি সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি বন্দরের ভারী যানবাহনের চাপ সামলানো এবং সড়কের দীর্ঘস্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করার বিষয়েও কাজ করছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম ওয়াসার চেয়ারম্যান আলহাজ্ব ইদ্রিস মিয়া, ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী সেলিম মোহাম্মদ জানে আলম, চসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও সচিব মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন, প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন শামীম মোহাম্মদ খান, প্রধান প্রকৌশলী আনিসুর রহমান, নির্বাহী প্রকৌশলী আশিকুল ইসলাম, সহকারী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আলী সহ বিভিন্ন পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তা, সাইক্লিস্ট ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ।