টানা বৃষ্টিতে চট্টগ্রামে পাহাড়ধসের শঙ্কা, প্রশাসনের মাইকিং
নিম্নচাপের প্রভাবে দুদিন ধরে টানা বৃষ্টিতে চট্টগ্রামে পাহাড় ধসের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এ অবস্থায় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে বাসিন্দাদের সরে যেতে মাইকিং করছে জেলা প্রশাসন। সেইসঙ্গে প্রস্তুত রাখা হয়েছে নগরের সবকটি আশ্রয়কেন্দ্র। পাহাড়ের আশপাশের স্কুল, কলেজ, মসজিদ, মাদ্রাসাগুলোকেও আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
চট্টগ্রাম আবহাওয়া অধিদপ্তরের উপপরিচালক আবহাওয়াবিদ মোহাম্মদ আবদুর রহমান খান বলেন, ‘সোমবার (৬ জুলাই) দুপুর ১২টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসে ১২৮ দশমিক ২ মিলিমিটার এবং আমবাগানে ৮২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে।’
আবহাওয়ার এই বৈরী অবস্থায় আরও কয়েকদিন চলতে পারে। এ অবস্থায় রোববার রাত থেকে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে বসবাসরতদের সরিয়ে আনতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং করা হচ্ছে। আজ সকালেও নগরের বিভিন্ন স্থানে মাইকিং করা হয়। নগরের টাংকির পাহাড় এবং আমিন জুট মিল এলাকা, পাহাড়িকা, সমবায় আবাসিক, সমসামিত গৃহ নির্মাণ, মিয়ার পাহাড়, মুরাদপুর রেল স্টেশন সংলগ্ন রেলওয়ের পাহাড় ও আশেপাশে মাইকিং করা হচ্ছে।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, ‘আবহাওয়া অধিদপ্তর ৩ নম্বর বিপদ সংকেত জারি করেছে। এরই প্রেক্ষিতে পাহাড় ধসের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এ কারণে সকাল থেকে মাইকিং করে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে বসবাসকারীদের আশ্রয় কেন্দ্রে যাওয়ার জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘শনিবার রাত থেকেই চট্টগ্রামে বৃষ্টিপাত হচ্ছে। মানুষের জানমাল রক্ষার্থে ছয়জন সহকারী কমিশনারের (ভূমি) নেতৃত্বে মানুষের জানমাল রক্ষায় জেলা প্রশাসনের কয়েকটি টিম কাজ করছে। মাইকিং থেকে শুরু করে মানুষকে ঝুঁকিপূর্ণ স্থান থেকে সরে যেতে নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে প্রশাসনের পক্ষ থেকে। নগরের আকবরশাহ ঝিল ১, ২ ও ৩ নম্বর এলাকা, বিজয়নগর পাহাড়, শান্তিনগর পাহাড়, বেলতলীঘোনা পাহাড় থেকে লোকজনকে সরিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে।’
বাকলিয়া সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) শিফাত বিনতে আরা বলেন, ‘ঝুঁকিপূর্ণ মতিঝর্ণা সংলগ্ন পাহাড়ে মাইকিং করা হয়েছে। বাকলিয়া এলাকায় দুপুর থেকে মাইকিং করা হয়েছে নদীর পাড়ের লোকজন যেন সতর্ক থাকে এবং যেন নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যায়।’
আগ্রাবাদ সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) তানভীর হাসান তুরান বলেন, ‘লালখান বাজার পোড়া কলোনি বস্তি এলাকা, ঢেবারপাড়, আমবাগান সংলগ্ন পাহাড়ে বসবাসরত বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে মাইকিং করে সতর্ক করা হচ্ছে। এছাড়াও উত্তর হালিশহর সংলগ্ন সমুদ্রপাড়ের কাছে বসবাসকারী মানুষজনকে বাসস্থান খালি করতে মাইকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’
টানা বৃষ্টির কারণে ছন্দপতন ঘটেছে নগরবাসীর স্বাভাবিক জীবনে। বই-খাতা হাতে বিদ্যালয়ের উদ্দেশে রাস্তায় বের হয় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়। এইচএসসি ও আলিম পরীক্ষার্থীদের দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি। সড়কে গাড়ি চলাচল কম থাকায় যানজট তেমন কোথাও দেখা যায়নি। তাছাড়া নগরের নিম্নাঞ্চলে এবার জলাবদ্ধতা তৈরি না হওয়ায় স্বস্তি প্রকাশ করেছেন চট্টগ্রাম সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা রাতভর জলজটপ্রবণ এলাকাগুলোতে পানি নেমে যাওয়ার পথ তৈরি করে দিয়েছেন। মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন রবিবার রাতেই নগরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকা পরিদর্শন করে পানি নিষ্কাশন পরিস্থিতি, খাল-নালা ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার কার্যকারিতা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মীদের দায়িত্ব পালনের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করেন। চসিকের তথ্য অনুযায়ী, বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশনের কারণে নগরবাসীর স্বাভাবিক চলাচল বজায় ছিল।
পরিদর্শনকালে মেয়র শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘নগরবাসীকে জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ থেকে মুক্ত রাখতে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা ও প্রকৌশল বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিরলসভাবে কাজ করছেন। খাল, নালা ও ড্রেন নিয়মিত পরিষ্কার এবং পানি প্রবাহ সচল রাখার ফলে সারাদিনের বৃষ্টির পরও নগরীতে কোনো উল্লেখযোগ্য জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়নি। এ অর্জন ধরে রাখতে নিয়মিত মনিটরিং ও রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে। কোথাও যাতে পানি জমে মানুষের দুর্ভোগ না হয়, সে বিষয়ে আমরা সর্বোচ্চ সতর্ক রয়েছি। নগরবাসীর সহযোগিতাও এক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন জানিয়েছেন, বৃষ্টির কারণে যাতে পানি না উঠে প্রকল্প এলাকায় সেজন্য ঢাকা থেকে প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী মাইন উদ্দিনকে সার্বক্ষণিক মনিটরিং করা এবং ঘুরে দেখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি গভীর রাত পর্যন্ত সেনাবাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে নিম্নঅঞ্চলগুলোর ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং পানি চলাচল তদারকি করেন।
এদিকে আগামী সাত দিন দেশের চট্টগ্রামসহ, সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগ বিভাগ এবং এসব অঞ্চলের উজানে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস দিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। এর প্রভাবে আগামী পাঁচ দিনে পূর্বাঞ্চল ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের নদ-নদীর পানি দ্রুত বেড়ে বান্দরবান, কক্সবাজার, ফেনী, চট্টগ্রাম ও খাগড়াছড়ি জেলার কিছু স্থানে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে। এসব জেলায় স্বল্পমেয়াদী বন্যা হতে পারেও বলে সতর্ক করা হয়েছে।


আপনার মতামত লিখুন