খুঁজুন
মঙ্গলবার, ২৮শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১৫ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বনের পশু জবাই দেয়ার আগে মনের পশুকে কোরবানি দিন

ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: বুধবার, ২৯ জুলাই, ২০২০, ৫:৫৭ অপরাহ্ণ
বনের পশু জবাই দেয়ার আগে মনের পশুকে কোরবানি দিন

অ আ আবীর আকাশ : পবিত্র কোরবানির ঈদ। মুসলিম উম্মাহর দ্বিতীয় বৃহত্তম আনন্দের দিন এই ঈদ-উল-আজহা বা কোরবানির ঈদ।

কোরবানির উদ্দেশ্য হল ত্যাগের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার নিদর্শন হিসেবে নিজের সবচেয়ে প্রিয় বস্তু মনে করে প্রতীকী অর্থে পশু কোরবানি করা। এ ধর্মীয় উৎসব তাই ত্যাগের মহিমা বিজড়িত।

হালাল পশু জবাইর মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহ তাদের ধর্মীয় কার্য সম্পাদন করেন। ঈদ-উল-আজহা বা কোরবানির পশু জবাই দেয়া ওয়াজিব। যার সামর্থ্য আছে সে কোরবানি দিবে, যার সামর্থ্য নেই দিবে না। সে ঈদের অন্যান্য নিয়মকানুন মেনে চলবে।দেখা গেছে এ ওয়াজিব পালন করতে গিয়ে আসল ফরজের খবর রাখছে না কেউ। নামাজের খবর নেই গরু নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছে। এ ফরজ মিস হলে লক্ষ ওয়াজিব দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়। তাহলে গোস্ত খাওয়ার জন্য ব্যতিব্যস্ত কোরবানির জন্য নয়! কোরবানির জন্য ব্যস্ত হওয়ার আগে ফরজ পালন করা অনেক অনেক বেশী জরুরী।

আল্লাহর জন্য, তার সৃষ্টির জন্য, মানবতার জন্য ত্যাগেও যে আনন্দ আছে, তা ব্যতিক্রমী ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে এ উৎসবে প্রতিফলিত হয়। সে জন্য কোরবানির পশুর সব মাংস কোরবানিকারীকে খাওয়ার অনুমতি দেয়া হয়নি।

এর এক-তৃতীয়াংশ গরিব মিসকিনকে, এক-তৃতীয়াংশ আত্মীয়স্বজনকে দেয়ার কথা বলা হয়েছে। কোরবানির উদ্দেশ্য পশু জবাই করে তার মাংস রান্না করে খাওয়া-দাওয়া করা নয়।

এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য হচ্ছে, আল্লাহর পথে, তার সৃষ্টির কল্যাণের পথে সর্বোচ্চ ত্যাগের পরীক্ষায় প্রতীকী অর্থে পশু কোরবানি করার মধ্য দিয়ে ত্যাগের শিক্ষা গ্রহণ করা। মহান আল্লাহ পাক তো আর কোরবানির মাংস চান না। তিনি পরীক্ষা করে দেখতে চান যে, তার বান্দারা তার জন্য, মানুষের জন্য, মানবতার জন্য ত্যাগের পরীক্ষায় পাস করতে পারে কি না।

সঠিকভাবে কোরবানির জন্য বেশি দাম দিয়ে বড় গরু কিনে শোডাউন করার কোনো প্রয়োজন নেই। এ কাজ যারা করেন, তারা কোরবানির অন্তর্নিহিত প্রকৃত তাৎপর্য বুঝতে না পেরেই তা করে থাকেন। ‘আল্লাহকে ভালোবেসে তার রাস্তায় ত্যাগের দৃষ্টান্ত হিসেবে আমি কোরবানি করছি’- এমন উপলব্ধি হৃদয়ে স্থান না পেলে সে কোরবানি শুধু গরু জবাই করে মাংস খাওয়ার ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।

কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্য কোরবানি নির্ধারণ করেছি, যাতে তারা আল্লাহর দেয়া চতুস্পদ জন্তু জবাই করার সময় আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে। অতএব তোমাদের আল্লাহ তো একমাত্র আল্লাহ, সুতরাং তারই আজ্ঞাবাহী থাক এবং বিনয়ীদের সুসংবাদ দাও।’ (সুরা হজ-৩৪) অগণিত হাদিসে রাসুল সা. কোরবানির ফজিলত ও এর বিধিবিধান আলোচনা করেছেন।

আমাদের সমাজে একটা মত প্রচলিত হয়ে গেছে যে, ‘কোরবানি না দিতে পারলে লজ্জা লাগা।’ আদতে এটা মোটেও লজ্জার কিছু নেই। অপরদিকে যে বা যারা কোরবানি দিবে তাদের কাছে গর্ব বা অহংকারবোধ হয়। এটাও ঠিক নয়। এর কারণ পশু জবাইর মাধ্যমে অহংকার, গর্ব করার কোনো ইস্যু দেখতে পাচ্ছি না। যারা পশু জবাই দিবে আর যারা পশু জবাই দিবে না তাদের মধ্যে যে ব্যক্তি পশু জবাই দিবে তার দায়িত্ব কর্তব্য বেশি। তার উচিত যে কোরবানি দিল না তার ঘরে গোপনে গোপনে গোস্ত পৌঁছে দেয়া। আদতে কি তা হচ্ছে?

আল্লাহ পবিত্র কোরআনে স্পষ্ট বলে দিয়েছেন, কোরবানির পশুর মাংস, রক্ত কিছুই আল্লাহর দরবারে পৌঁছে না; পৌঁছে একমাত্র তাকওয়া। আর এই তাকওয়ার উপস্থিতি না থাকলে পশু কোরবানির কোনো সার্থকতা নেই। এজন্য নিষ্পাপ পশুর গলায় ছুরি চালানোর আগে নিজের মনের পশুটাকে কোরবানি দিতে হবে। বছরের পর বছর ধরে মনের কোণে ঘাপটি মেরে থাকা অসভ্য পশুটি জবাই না দিতে পারলে গতানুগতিক পশু কোরবানিতে কোনোই ফায়দা নেই।

পবিত্র ঈদকে কেন্দ্র করে শহর থেকে গ্রামে শিশু-কিশোর আর তরুণদের বিরাজ করছে বাড়তি আনন্দ। বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, আনন্দের বিচিত্র চিত্র। কোরবানির পশুর প্রতি বাড়তি যত্ন-আত্মি আর পশুকে কেন্দ্র করে নানা ধরনের গল্প চলছে মুখে-মুখে। সড়কে কোরবানির উদ্দেশ্যে মানুষের জিজ্ঞাসু দৃষ্টি— দাম কত? ঈদের সকালে এই চিত্র নেবে ভিন্নরূপ। কোরবানি দেওয়া হবে পশু, ভাগ হবে মাংস। ধর্মীয় ব্যক্তিত্বরা বলছেন— কোরবানির পশুর মাংস তিন ভাগে ভাগ করা উত্তম। একভাগ দরিদ্রদের, একভাগ যিনি কোরবানি দেবেন তার, আরেক ভাগ আত্মীয়-স্বজনদের জন্য বরাদ্দ করা ভালো। সর্বোপরি, কোরবানির মূল শিক্ষা হচ্ছে— আত্মত্যাগের শিক্ষা। এই শিক্ষায় মহীয়ান হয়ে ওঠবে মুসলিম উম্মাহ্।

আজকাল আমাদের সমাজে কোরবানি অনেকটা ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। বিত্তশালীদের অর্থের দাপট দেখানোর বিশেষ সুযোগ এটা। তাকওয়ার পরিবর্তে মনের ভেতরে লুকিয়ে থাকা পশুটা এই কোরবানি উপলক্ষে আরও হৃষ্টপুষ্ট হয়ে ওঠে। কে কত বেশি দামের কোরবানি দিচ্ছেন এর প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার নিয়তে কেউ এক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা করলে সেটা নিশ্চয় ভালো জিনিস। তবে লৌকিকতায় কলুষিত প্রতিযোগিতার কোনো মূল্যায়ন আল্লাহর কাছে নেই। প্রত্যেকে তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী কোরবানি বা বিসর্জন দেবে এটাই আল্লাহ চান। কে কত দামি পশু কোরবানি করেছে সেটার দিকে আল্লাহর কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। তিনি শুধু দেখেন মানুষের অন্তর। দুনিয়ার সব মানুষকে ধোঁকা দিলেও কোনো অন্তর আল্লাহকে ধোঁকা দেয়ার সুযোগ পাবে না।

বছর ঘুরে ঈদুল আজহা আমাদের দুয়ারে হাজির। প্রতি বছরের মতো এবারও আমরা এই উৎসবে মেতে উঠবো সেটাই স্বাভাবিক। ধর্মস্বীকৃত এই উৎসব উদযাপনে নেই কোনো বাধা নিষেধ। তবে ধর্মীয় এই উৎসবের আমেজটা যেন নষ্ট না হয়; এর প্রকৃত দাবি যেন প্রতিফলিত হয় সে দিকেও আমাদের সবার নজর রাখতে হবে। ঈদুল আজহার ত্যাগের যে মহান শিক্ষা সেটা ব্যক্তিজীবনে ধারণ করতে হবে; সেই শিক্ষা ছড়িয়ে দিতে হবে সমাজ থেকে রাষ্ট্রে। ত্যাগের মানসিকতা গড়ে তুলতে পারলে আমাদের পরিবার থেকে রাষ্ট্র সবই আরও সুন্দর হবে নিঃসন্দেহে।

মুসনাদে আহমদ ও ইবনে মাজাহর একটি হাদিসে হজরত জায়েদ ইবনে আরকাম সূত্রে বর্ণিত, একবার সাহাবায়ে কেরাম রাসুল সা.কে প্রশ্ন করলেন, কোরবানি কী? উত্তরে আল্লাহর রাসুল সা. বলেন, এটি তোমাদের ধর্মীয় পিতা হজরত ইবরাহিম আ. প্রবর্তিত একটি সুন্নাত। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, এতে আমাদের কী লাভ হবে? নবীজি সা. বললেন, প্রতিটি পশমের বিনিময়ে তোমাদের জন্য রয়েছে নেকি। সাহাবায়ে কেরাম পুনরায় প্রশ্ন করলেন, ভেড়া এবং দুম্বার ক্ষেত্রেও কি এই সওয়াব পাওয়া যাবে? রাসুল সা. উত্তর দিলেন, হ্যাঁ, সওয়াব পাবে। এমনকি প্রতিটি পশমের বিনিময়ে সওয়াব দেওয়া হবে।

যারা পশু জবাই দিচ্ছেন বিশেষ করে কর্মজীবী,পুলিশ, রাজনৈতিক নেতা, চিকিৎসক, আমলা, ঠিকাদার, উকিল,সরকারি চাকরিজীবী,সাংবাদিক তারা কি নিজেরা অত্যন্ত সুক্ষভাবে একবার লক্ষ্য করেছেন যে কোরবানি দিচ্ছেন তার টাকায় কোনো ভেজাল আছে কিনা!
গরিব মজলুম অসহায়ের হক মেরে কোরবানির টাকা জমিয়েছেন কি? ঘুষ দুর্নীতি অনিয়ম বা কলমের খোঁচায় চুরি করে এমনকি দায়িত্ব-কর্তব্য যথাযথ পালন না করে শুধু শুধু টাকা তুলে কোরবানি দিচ্ছেন কি? কোনো পাওনাদার আপনার কাছে পাওনা রয়েছে কি? কাউকে ঠকিয়েছেন কখনো? তাহলে জেনে রাখুন আপনার পশু জবাই হবে গোস্ত খাওয়ার জন্য কিন্তু কোরবানি হবে না। এ কথাগুলোতে সন্দেহ থাকলে কোনো আলেম-ওলামার কাছ থেকে প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে নিন।

কোরবানির আসল বিষয় হচ্ছে ত্যাগ ও আত্মবিসর্জন। নিজেকে স্রষ্টার সামনে নিঃশর্তভাবে সমর্পণ। আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন তার সন্তুষ্টির জন্য পশু জবাই করতে, কোনো লাভ-ক্ষতির হিসাব না করে তা বাস্তবায়ন করাই হলো আনুগত্য। নিজের ছেলেকে জবাই করার মতো কঠিন নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল হজরত ইবরাহিম আ.কে। সেই মহাপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ইবরাহিম আ. খলিলুল্লাহ বা আল্লাহর বন্ধু হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন। কোরবানি হলো সুন্নতে ইবরাহিমি; প্রিয় সন্তানকে জবাই করার মতো কঠোর নির্দেশনা নয়, পশু জবাইয়ের মাধ্যমেই আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা সম্ভব। তবে সেটা নির্ভর করে নিয়ত ও ইখলাসের ওপর।

পশু কোরবানি দিয়ে কলিজা বা শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ, গোস্ত ফ্রিজ ভরালে আর গরিবের মাঝে যত্সামান্য গোস্ত দিয়ে দায়িত্ব পালন করলেন; তাহলেও কোরবানি হবে না। কোরবানি দিলে সহিহ শুদ্ধরুপে ইসলামী নিয়ম কানুন মেনে বুঝে তারপর কোরবানি দিন।গোশত খাওয়ার জন্য কোরবানি দেয়ার দরকার কি!

মানুষের মাঝে নিজের ব্যক্তিত্ব জাহির করার হীন উদ্দেশ্যে কোরবানী দিলে হবে না। যেহেতু রাজনীতি করেন যারা তাদের কোনো বেতন ভাতা নেই। সরকারি কোষাগার থেকে আসা গরিবের জন্য বরাদ্দ মেরে, চাঁদাবাজি, গলাবাজি, ধান্দাবাজি, তদবির করে, নির্বাচনে চেয়ারম্যান মেম্বার বানাবেন বলে টাকা নিয়ে কোরবানি দিলে হবেনা।
ঠিকাদাররা সরকারি কাজে অনিয়ম করে টাকা বাঁচিয়ে কোরবানি দিলেও হবে না।

যারা চাকরিজীবী, ফাইল ঠেকিয়ে, কাজ না করে, সরকারি কাজে অনিয়ম করে টাকা নিয়ে কোরবানির দিলেন তো কিছুই হবে না। কোরবানি দিতে হলে একনিষ্ঠ পরিশ্রমের টাকা, ঘামে ভেজা টাকায় পশু কোরবানি দিলেন তো মনের পশুও কোরবানি হয়ে গেল। অন্যথায় সবই বৃথা। লোকদেখানো, আত্মীয় স্বজনকে খাওয়ানোর উদ্দেশ্যে দেয়া কোরবানি মহান আল্লাহর দরবারে পৌঁছে না। বরং উল্টো গুনাগার হবেন। কারণ জীব হত্যা মহাপাপ। কোরবানির নামে প্রহসন নয়। আত্মীয় স্বজনকে খাওয়ানোর জন্য কোরবানির নামে পশু জবাইয়ের নাটক করবেন না। স্বচ্ছ হৃদয়ে, খাঁটি নিয়তে কোরবানি করলেই আল্লাহর দরবারে তা কবুল হবে। অন্যথায় এই ‘রক্তপাতে’ কোনো লাভ নেই। ভুলে গেলে চলবে না, ভালোবাসার ক্ষেত্রে উপহারের দাম বা আকৃতি কোনো ব্যাপার নয়; মূল বিষয় হল, দুই প্রেমিকের পরস্পরের প্রতি হৃদয়ের আকর্ষণ।

আমাদের কোরবানি কি আমাদের মধ্যে আল্লাহর প্রতি তেমন প্রেম, তার সৃষ্টির প্রতি তেমন ভালোবাসা সৃষ্টি করতে পারছে? যদি না পারে, তাহলে বুঝতে হবে, আমাদের কোরবানি শুধু পশু জবাই করে মাংস খাওয়ার মধ্যেই সীমিত হয়ে পড়েছে। প্রকৃত অর্থে আমাদের কোরবানি হয়তো কবুল হচ্ছে না।

আল্লাহপাকের দরবারে আমাদের কোরবানি তখনই কবুল হবে, যখন আমরা যৌথভাবে বনের ও মনের পশুকে একত্রে জবাই করতে পারব। আত্মপ্রচার, গর্ব, অহংকার, নিজেকে বড় করে দেখানো, বড় গরু কিনে শোডাউন করে নিজের বড়লোকি জাহির করার বাসনা মনের মধ্যে নিয়ে একাধিক পশু জবাই করলেও কোরবানি কবুল হবে না।

মনের মধ্যে অন্যের ক্ষতি করে নিজে লাভবান হওয়ার পাশবিকতাকে উজ্জীবিত করে বনের পশু কোরবানি করলে কোরবানি হবে না। বনের পশুর সঙ্গে মনের মধ্যে অন্যকে খুন, ধর্ষণ করার পাশবিকতা থাকলে তাকেও কোরবানির পশুর সঙ্গে জবাই করে দিতে হবে।

মুসলমান হিসেবে মহান আল্লাহ পাক আমাদেরকে সবাইকে সহিহ্ নেক আমলের মাধ্যমে পরিশুদ্ধ কাজের বিনিময়ে প্রাপ্ত অর্থে অন্তরের সকল কালিমা দূর করে মনের পশুকে কোরবানী দেয়ার পাশাপাশি পশু কোরবানী দেয়ার তৌফিক দান করুক, আমীন।

লেখক: কবি প্রাবন্ধিক কলামিস্ট ও সাংবাদিক।
সম্পাদক: আবীর আকাশ জার্নাল

Feb2

১০ মিলিমিটার বৃষ্টিতে সড়কের কোথাও হাঁটু, কোথাও বুকসমান পানি, ভোগান্তিতে মানুষ

ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল, ২০২৬, ৪:৪৮ অপরাহ্ণ
১০ মিলিমিটার বৃষ্টিতে সড়কের কোথাও হাঁটু, কোথাও বুকসমান পানি, ভোগান্তিতে মানুষ

টানা বৃষ্টিতে আবারও পানির নিচে তলিয়ে গেছে চট্টগ্রাম নগরের কয়েকটি সড়ক। আজ মঙ্গলবার সকাল থেকে নগরের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন পথচারীরা।

নগরের প্রবর্তক মোড়, আগ্রাবাদ, হালিশহর, নিউমার্কেট, তিন পুলের মাথা, কাতালগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় সড়কে পানি জমে চরম দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে। সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি দেখা গেছে প্রবর্তক মোড় এলাকায়।

দুপুরের দিকে প্রবর্তক মোড়ের বড় অংশ ডুবে যায় কালচে ও দুর্গন্ধযুক্ত পানিতে। গতকাল সোমবার যেখানে হাঁটুপানি ছিল, আজ সেখানে পানি উঠে বুকসমান। ওই পানির ভেতর দিয়েই রিকশা চালিয়ে যাওয়ার সময় কথা হয় চালক মোহাম্মদ সাইফুলের সঙ্গে। তিনি বলেন, খালের সংস্কারকাজ চলার কারণে কয়েক দিন ধরেই এখানে পানি জমছিল। বৃষ্টি হওয়ায় সেই পানি আরও বেড়ে গেছে। এখন চলাচল করাই কঠিন হয়ে পড়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, বদনা শাহ মাজার গেট থেকে প্রবর্তক মোড় পর্যন্ত পুরো সড়ক ডুবে আছে পানিতে। ওই অংশে হিজড়া খালের সম্প্রসারণকাজ চলছে। খালের মুখে দেওয়া অস্থায়ী বাঁধ পানিনিষ্কাশনের পথ বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে খালের পানি উপচে সরাসরি সড়কে উঠে আসছে। পানির কারণে যান চলাচল ধীর হয়ে পড়েছে। সামান্য একটি অংশ পার হতে সময় লাগছে দীর্ঘক্ষণ। অবশ্য এ সড়ক এড়িয়ে চলছেন যানবাহনের চালকেরা।

পথচারীদের দুর্ভোগ দেখা গেছে আরও বেশি। কেউ জুতা হাতে নিয়ে ও কাপড় গুটিয়ে নেমেছেন পানিতে। কেউ আবার সড়ক বিভাজকের ওপর দিয়ে ভারসাম্য রেখে পার হওয়ার চেষ্টা করছেন। বেসরকারি চাকরিজীবী ফারুক হাসান বলেন, ‘একটু বৃষ্টি হলেই প্রবর্তকে পানি জমে যায়। আজ তো অবস্থা আরও খারাপ। অফিসে যেতে গিয়ে মনে হচ্ছে যুদ্ধ করছি।’

একই চিত্র তুলে ধরলেন কলেজছাত্রী ইসরাত জাহান। তিনি বলেন, ‘রাস্তা দিয়ে হাঁটা যাচ্ছে না। পানি এত নোংরা যে নামতেও ভয় লাগে। কিন্তু অন্য কোনো পথ নেই। বাধ্য হয়েই নামতে হচ্ছে।’

যানবাহনের চালকদের জন্যও পরিস্থিতি কম ঝুঁকিপূর্ণ নয়। পানিতে ডুবে যাচ্ছে গাড়ির চাকা, কোথাও কোথাও ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক আবদুল মালেক বলেন, ‘সকাল থেকে শহরের অনেক জায়গায় ঘুরেছি। কোথাও হাঁটুপানি, কোথাও গোড়ালিসমান। পানি বেশি থাকলে গাড়ি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয় থাকে। যাত্রীরাও উঠতে চায় না। এতে আয়ও কমে যায়, ভোগান্তিও বাড়ে।’

নগরের আমতলের তিন রাস্তার মাথা এলাকায়ও পানি জমে থাকতে দেখা গেছে। কোথাও নালা উপচে পানি সড়কে উঠেছে, আবার কোথাও পানি নামার পথ বন্ধ থাকায় দীর্ঘ সময় ধরে জলাবদ্ধতা স্থায়ী হচ্ছে।

এদিকে নগরীতে সকাল নয়টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ১০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অফিস।

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ইখতিয়ার উদ্দীন আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘প্রবর্তকের পাশে জলাবদ্ধতা নিরসনে কাজ করছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। যার কারণে সাময়িকভাবে পানি চলাচলে সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে।’

তিনি জানান, চলমান উন্নয়নকাজ শেষ হলে ওই এলাকায় পানি জমার সমস্যা অনেকটাই কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।

গণতান্ত্রিক যাত্রা সুসংহত করতে ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই

ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল, ২০২৬, ৪:৩২ অপরাহ্ণ
গণতান্ত্রিক যাত্রা সুসংহত করতে ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই

গণতান্ত্রিক যাত্রা সুসংহত করতে রাষ্ট্রে ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, আমরা বিশ্বাস করি, যে রাষ্ট্রে আইনের শাসন, ন্যায়বিচার এবং মানবাধিকার নেই, সেই দেশ কখনোই একটি গণতান্ত্রিক মানবিক রাষ্ট্র হতে পারে না বা হয়ে উঠতে পারে না।

মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) দুপুরে এক আলোচনা সভায় প্রধানমন্ত্রী এ মন্তব্য করেন। রাজধানীর শাহবাগে শহীদ আবু সাঈদ ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে জাতীয় আইনগত সহায়তা দিবস-২০২৬ উপলক্ষ্যে এই আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এই সভার আয়োজন করে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসানের পর বাংলাদেশের জনগণ পুনরায় গণতন্ত্রের পথে হাঁটতে শুরু করেছে। এই গণতান্ত্রিক যাত্রা সুসংহত করতে রাষ্ট্রে ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই। আর এই ন্যায়বিচার সবার জন্যই প্রযোজ্য। একজন মানুষও যাতে অর্থের অভাবে এক্সেস টু জাস্টিস থেকে বঞ্চিত না হয়। সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখে সরকার লিগ্যালি কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছে। একজন ভুক্তভোগী টাকার অভাবে আইনজীবী সহায়তা নিতে পারবে না-এমনটা যেন না হয়, সেটি সরকার চেষ্টা করবে সর্বতোভাবে নিশ্চিত করতে।

আর্থিকভাবে সামর্থ্যবান নয়, এমন মানুষদের জন্য এক্সেস টু জাস্টিস নিশ্চিত করতে সরকার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে বলেও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রী তার সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরে বলেন, ন্যায়বিচারের কথা শুধু আইনের বইয়ে নয়। এটি প্রতিটি মানুষের জীবনেই সত্য এবং বাস্তব হয়ে উঠুক। এটি বর্তমান সরকারের প্রত্যাশা। ন্যায়বিচার কখনোই কেবল আদালত কেন্দ্রিক নয়, কোনো প্রক্রিয়া নয়। এটি একটি জীবন্ত মূল্যবোধ। যা রাষ্ট্রের প্রতিটি নীতি, প্রতিটি সিদ্ধান্ত এবং প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে অবশ্যই প্রতিফলিত হওয়া প্রয়োজন।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ন্যায়পরায়ণতা তখনই অর্থপূর্ণ হয়ে ওঠে যখন আইন মানুষের উপর প্রয়োগের একটি যান্ত্রিক উপায় না হয়ে বরং তাদের মর্যাদা সংরক্ষণ এবং প্রাপ্ত অধিকার নিশ্চিত করার একটি গভীর নৈতিক অঙ্গীকারের রূপ নেয়। বাংলাদেশের রাষ্ট্র গঠনের ইতিহাসেও এই ন্যায়বোধ একটি শক্তিশালী প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। যেহেতু ন্যায়বিচার প্রাপ্তি প্রতিটি মানুষের সাংবিধানিক অধিকার। সেই অধিকার যাতে প্রত্যেকটি মানুষ চর্চা করতে পারে তাদেরকে সরকার যথাসাধ্য লিগ্যাল এইড দেবে। এ লক্ষ্যে এরইমধ্যে সরকার সংশ্লিষ্ট বিধি-বিধানের প্রয়োজনীয় সংশোধন এনেছে।

অনুষ্ঠানে সেরা প্যানেল আইনজীবী হিসেবে ঢাকার সায়েম খান ও রাজশাহীর নীলিমা বিশ্বাস প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে ক্রেস্ট ও সম্মাননা গ্রহণ করেন।

এছাড়া সারাদেশে লিগ্যাল এইডের কার্যক্রম এগিয়ে নিতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সামাজিক ক্ষমতায়ন ও আইনি সুরক্ষা কর্মসূচি সেল ব্র্যাককে মনোনীত করা হয়। ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে সম্মাননা পত্র ও ক্রেস্ট গ্রহণ করেন।

লিগ্যাল এইড ব্যবস্থায় মামলা নিষ্পত্তির বিষয়টি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সারা বিশ্বে একটি কথা বিশেষভাবে প্রচলিত। সেটি হচ্ছে জাস্টিস ডিলেড ইজ জাস্টিস ডিনাই। অর্থাৎ বিচার বিলম্ব মানেই বিচার অস্বীকার। এই বাস্তবতা মাথায় রেখে লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে মামলার আগেই মধ্যস্থতার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, এই ব্যবস্থার মাধ্যমে এরইমধ্যে দেশের বিভিন্ন জেলায় কয়েক হাজার বা তারও বেশি হবে, হাজারেরও বেশি হবে…বিরোধ-বিবাদ স্বল্প সময় এবং খুব কম খরচে আদালতের বাইরেই নিষ্পত্তি করা সম্ভব হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে কয়েক মাস বা বছরের পরিবর্তে বরং কয়েকটি বৈঠকের মাধ্যমে সমস্যার সমাধানগুলো করা সম্ভব হয়েছে। এতে আদালত চাপ কমেছে। সরকারের খরচও হ্রাস পেয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, অনেক সময় মানুষ সমস্যা হলে প্রাথমিকভাবে সঠিক পরামর্শ না পাওয়ার কারণে একদিকে সাধারণ বিরোধ বড় হয় এবং পরে তা জটিল রূপ ধারণ করে। ফলে অনেক সময় মানুষ বিচার বিমুখ হয়ে যায় কিংবা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়। সুতরাং মানুষ যেন সহজে প্রাথমিক আইনি পরামর্শ গ্রহণ করতে পারে। এক্ষেত্রে সরকারের লিগ্যাল এইড হেল্পলাইন আরো কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে ব্যক্তিগতভাবে একজন নাগরিক হিসেবে আমি সেটি আশা করি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার বিশ্বাস করে, এক্সেস টু জাস্টিস। প্রতিটি নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। রাষ্ট্রের কোনো নাগরিক অর্থের অভাবে আইনের আশ্রয় কিংবা ন্যায্য বিচার থেকে বঞ্চিত থাকবে এটি একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কোনোভাবেই কাম্য বা প্রত্যাশিত নয়।

রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে আমাকেও দীর্ঘদিন কারাগারে থাকতে হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তখন আমি নিজে কারাগারে এমন অনেককে দেখেছি, যারা শুধুমাত্র আর্থিকভাবে অসচ্ছল হওয়ার কারণে বছরের পর বছর ধরে বিনা বিচারে কারাগারে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন বা হয়েছেন। একজন মানুষ অর্থের অভাবে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়া একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কাম্য নয়।

তিনি বলেন, যেকোনো রাষ্ট্র এবং সমাজের অগ্রগতি ও শান্তির ভিত্তি হচ্ছে ন্যায়বিচার। সব যুগেই মানুষ যা চেয়েছে তা হলো বৈষম্যহীন একটি সমাজ ব্যবস্থা। যেখানে তারা সমমর্যাদা এবং অধিকার নিয়ে বসবাস করবে। সমতা সহমর্মিতা এবং পারস্পরিক আস্থা একটা ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষঠ জন্য অবশ্যই অপরিহার্য।

ন্যায়বিচার শুধু আদালত বা আইনের বিষয় নয় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটি একটি মানবিক ও দায়িত্বশীল রাষ্ট্রব্যবস্থার মূল শক্তি। স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দিয়ে দেশের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার উপরে প্রতিষ্ঠার শক্ত ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। সেই ধারাবাহিক সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ায় সুগম করতে লিগাল এইড ফার্ম তৈরি করেছিলেন।

অনুষ্ঠানে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার, আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মনজুরুল হাসান প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।

লোহাগাড়ায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে মাইক্রোবাস, ৩ জনের মৃত্যু

ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল, ২০২৬, ১০:৫৪ পূর্বাহ্ণ
লোহাগাড়ায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে মাইক্রোবাস, ৩ জনের মৃত্যু

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের লোহাগাড়া উপজেলায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি মাইক্রোবাস খাদে পড়ে গেছে। এ ঘটনায় ওই গাড়িতে থাকা ৩ জন নিহত হয়েছেন। তবে তাদের পরিচয় পাওয়া যায়নি।

মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) সকাল সোয়া ৯টার দিকে উপজেলার চুনতি এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।

লোহাগাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল জলিল এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

তিনি বলেন, মাইক্রোবাসটি কক্সবাজার থেকে খাগড়াছড়ির উদ্দেশে যাচ্ছিল। গাড়িটি চুনতি এলাকায় পৌঁছালে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের পাশে খাদে পড়ে যায়। এতে হতাহতের ঘটনা ঘটে।