সাতকানিয়ায় নির্বাচনি সহিংসতায় আগ্নেয়াস্ত্রসহ গ্রেপ্তার ৮
চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় নির্বাচনি সহিংসতায় আগ্নেয়াস্ত্রসহ ৮ জনকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব। গতকাল সোমবার দিবাগত রাতে চট্টগ্রাম মহানগরী, চন্দনাইশ, সাতকানিয়া, বান্দরবান সদর ও রাজধানীর তেজকুনীপাড়া থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
আজ মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজারের র্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান সংস্থাটির আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, গত ৭ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার খাগরিয়া ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কয়েকজন অস্ত্রধারী দুষ্কৃতকারী ব্যাপক সহিংসতা ও নাশকতা চালায়। ওই সহিংসতার ঘটনায় সাতকানিয়া থানায় বেশ কয়েকটি মামলা করা হয়। সুষ্ঠু নির্বাচনি পরিবেশ বিঘ্ন ঘটায় গণমাধ্যমে সহিংসতাকারীদের চিহ্নিত করে গুরুত্বের সঙ্গে সংবাদ প্রকাশিত হয়। এরই প্রেক্ষিতে র্যাব সহিংসতা ও নাশকতার সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় নিতে ৮ জনকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব।
খন্দকার আল মঈন জানান, বান্দরবান সদর থেকে সহিংসতায় অংশগ্রহণকারী নাসির উদ্দিন (৩১), মো. মোরশেদ (২৬), কোরবান আলী (৩৭), মো. ইসমাঈলকে (৫৫) সাতকানিয়া থেকে গ্রেপ্তার করে র্যাব-১৫। পরে তাদের দেখানো মতে সাতকানিয়ার খাগরিয়া থেকে উদ্ধার করা হয় সহিংসতায় ব্যবহৃত তিনটি একনলা বন্দুক, একটি দোনলা বন্দুক, একটি ওয়ান শুটারগান, অন্যান্য দেশীয় অস্ত্র ও ৪২ রাউন্ড গোলাবারুদ।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, একই রাতে র্যাব-৭ এর অপর একটি অভিযানে চট্টগ্রাম মহানগরী থেকে সহিংসতায় জাড়ানো মো. জসিমকে (২৪), সাতকানিয়া থেকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং গ্রেপ্তারকৃত জসিম এর দেওয়া তথ্যানুসারে চট্টগ্রামের চান্দনাইশ থেকে মো. মিন্টুকে (২৬) গ্রেপ্তার করা হয়। আগে গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্য অনুসারে ঢাকা মহানগরীর তেজকুনীপাড়া এলাকা থেকে সহিংসতার নেতৃত্ব প্রদানকারী মো. কায়েস (২২) এবং তার সহযোগী মো. নুরুল আবছারকে (৩৩) গ্রেপ্তার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃতরা সহিংসতায় তাদের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। এ ঘটনায় সাতকানিয়ার খাগরিয়া ইউনিয়নের দুটি কেন্দ্রের নির্বাচন স্থগিত করা হয়।
চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার খাগরিয়া ইউনিয়নে সহিংসতার ঘটনায় দুজন নিহত ও অন্তত অর্ধশতাধিক আহত হয় জানিয়ে গ্রেপ্তারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে খন্দকার আল মঈন বলেন, ‘গ্রেপ্তারকৃত মো. কায়েস গত দুই বছর যাবত চট্টগ্রামে একটি কোম্পানিতে চাকরি করে আসছে। পাশাপাশি সাতকানিয়া উপজেলায় বিভিন্ন সময়ে সংঘটিত সহিংসতা ও হামলার ঘটনায় নেতৃত্ব প্রদান করে থাকে। সে এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের জন্য ৩০-৪০ জনের একটি সন্ত্রাসী দল পরিচালনা করত। তিনি বিভিন্ন মাধ্যম থেকে আগ্নেয়াস্ত্র ও দেশীয় অস্ত্র সংগ্রহ করে তার দলের সদস্যদের সরবরাহ করত বলে জানা যায়। এ সহিংসতার ঘটনায় তার নেতৃত্বে জসিম, মোর্শেদ, মিন্টু, আবছারসহ আরো শতাধিক সশস্ত্র সন্ত্রাসী সাতকানিয়ার খাগরিয়া ইউনিয়নে বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা চালায়। সহিংসতা পরবর্তীতে তিনি ঢাকায় আত্মগোপন করেন। এ ঘটনায় গ্রেপ্তারকৃত ৮ জনই সাতকানিয়া থানায় বিস্ফোরকদ্রব্য আইনে দায়েরকৃত মামলায় এজাহারভুক্ত আসামি। এর আগে মো. কায়েসের বিরুদ্ধে সাতকানিয়া থানায় সহিংসতার মামলা রয়েছে।’
‘গ্রেপ্তারকৃত নাসির একটি কোম্পানির চট্টগ্রাম বন্দর শাখার কর্মচারী। তিনি ২০১১-১৩ সাল পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যে প্রবাসী ছিলেন। পরবর্তীতে দেশে এসে ঢাকার শাহবাগে ফুল বিক্রি করতেন। তিনি এ নির্বাচনি সহিংসতায় সশস্ত্র দলের নেতৃত্ব প্রদান করেছে বলে জানা যায়। সহিংসতাকালীন নাসিরকে মেরুন রংয়ের মাফলার ও মুখে লাল-সবুজ রং এর মাস্ক পরিহিত অবস্থায় একটি একনলা বন্দুক হাতে দেখা যায়। পরবর্তীতে সে বান্দরবানের গহিন জঙ্গলে আত্মগোপন করেন।’
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, গ্রেপ্তারকৃত আবছার ঢাকায় একটি কাভার্ড ভ্যান সমিতির ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। যখনি সাতকানিয়ায় কোন সহিংসতার সম্ভাবনা দেখা দেয় তখন তিনি এলাকায় চলে যান। তিনি নির্বাচনের পূর্বে ঢাকা থেকে সাতকানিয়াতে যান এবং কায়েসের নির্দেশে সাতকানিয়ার খাগরিয়াতে সহিংসতাকালীন সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের বিভিন্ন দিকনির্দেশনা ও নেতৃত্ব প্রদান করে। পরবর্তীতে আবছার ঢাকায় চলে আসেন ও আত্মগোপনে যান। কায়েসকেও আত্মগোপনে থাকতে সহায়তা করেন। আবছারকে ঢাকার তেজকুনীপাড়া থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।
খন্দকার আল মঈন বলেন, ‘গ্রেপ্তারকৃত মোরশেদ কায়েসের গ্রুপের একজন অন্যতম সক্রিয় সদস্য। তিনি পেশায় একজন সিএনজি চালক। তাকে ঘটনার দিনে একটি একনলা বন্দুক হাতে সহিংসতা ও নাশকতা চালাতে দেখা যায়। সহিংসতার পর তিনি সাতকানিয়াতে আত্মগোপনে যান। গ্রেপ্তারকৃত জসিম খাগরিয়ার বাসিন্দা ও পেশায় রাজমিস্ত্রী হলেও চুরি, ছিনতাই এবং ডাকাতিসহ বিভিন্ন সহিংসতায় বিভিন্ন সময়ে অংশ নেন তিনি। সহিংসতাকালীন একটি ছবিতে লাল জ্যাকেট পরিহিত অবস্থায় তাকে কার্তুজ/অ্যামোনিশনের একটি বস্তাসহ মোরশেদের পাশে দেখা যায়। সহিংসতার পর সে চট্টগ্রাম মহানগরীতে আত্মগোপন করেন।’
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, গ্রেপ্তারকৃত মিন্টু পেশায় গাড়ি চালক। তিনি বিগত ১৩-১৪ বছর যাবত চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় ভাড়ায় মাইক্রোবাস চালিয়ে আসছে। কায়েসের নির্দেশে তিনি সহিংসতার উদ্দেশ্যে বাইরে থেকে অস্ত্র পরিবহণ করেন। এ ছাড়া তার তত্ত্বাবধানে সহিংসতার উদ্দেশ্যে ৩০-৩৫ জন বহিরাগতকে বিভিন্ন পরিবহণের মাধ্যমে নিয়ে আসা হয়। সহিংসতাকালীন তাকে একটি আগ্নেয়াস্ত্রসহ হামলায় অংশ নিতে দেখা যায়। কোরবান আলী পেশায় একজন নিরাপত্তাকর্মী। সে বর্ণিত সহিংসতাকারীদের লাঠিসোঠা ও অন্যান্য দেশীয় অস্ত্র সরবরাহ করার মাধ্যমে সহিংসতায় প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করে। সহিংসতার পরবর্তীতে সে সাতকানিয়াতে আত্মগোপনে থাকেন। তার বাসা থেকে দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। গ্রেপ্তারকৃত ইসমাঈল পেশায় একজন জমির দালাল। আগে রংপুর থেকে তামাক সংগ্রহ করে সাতকানিয়ার বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করতেন। তিনি সাতকানিয়ার খাগরিয়া ইউনিয়নে সহিংসতায় লাঠিসোঠা ও অন্যান্য দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রের মাধ্যমে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। তিনি সহিংসতার পরবর্তীতে সাতকানিয়াতে আত্মগোপনে থাকে।
খন্দকার আল মঈন বলেন, ‘ জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃত কায়েস বেশ কয়েকজন ব্যক্তির কাছ থেকে ভাড়ায় অস্ত্র সংগ্রহ করত বলে তথ্য পাওয়া যায়। অস্ত্র সংগ্রহ করে কায়েস তার বিশ্বস্ত সদস্যদেরকে অস্ত্র সরবরাহের দায়িত্ব দিতেন। তারা গ্রুপের অন্যান্য সদস্যদেরকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সহিংসতায় অস্ত্র সরবরাহ করতেন। কার্যশেষে অস্ত্র ফেরত দিলে তারা স্থানীয় কবরস্থান ও পুকুরপাড়সহ বিভিন্ন স্থানে সেসব অস্ত্র লুকিয়ে রাখতেন।’
এন-কে


আপনার মতামত লিখুন