শীতের প্রস্তুতি
শরৎ প্রায় শেষ। শীতের আগমনী বার্তা জানান দিচ্ছে ভোরের বাতাস। ভোরে ঠান্ডা শীতল বাতাসের সঙ্গে ঘাসের ডগায় জমছে শিশির বিন্দু। পথপ্রান্তর আর রাজপথে উড়ছে ধুলোবালি। ফসলের মাঠে শীতের সবুজ শাক সবজির চারা বেড়ে উঠছে তর তর করে। এসবই প্রকৃতির শীতের আয়োজন। কিন্তু শহর বন্দর নগরবাসীর শীতের আয়োজন বা প্রস্তুতি কতটুকু? এই পরিবর্তিত আবহাওয়া মোকাবেলা করার জন্য আমাদের প্রস্তুতি কেমন হওয়া উচিত তাই উঠে এসেছে এবারের ফ্যামিলি নিড বিভাগে।
চাঁদর শাল আর সোয়েটার প্রসঙ্গ
মহিলাদের শীতের পোশাক তুলনামূলক ভাবে ঢাকায় বেশি পাওয়া যায়। শীতে শাল, সোয়েটার, হুডি, কার্ডিগান ও নরমাল চাদর এ দেশের মহিলারা বেশি ব্যবহার করেন। বাংলাদেশের নারীদের ঐতিহ্য গত একটি শীতের পোশাক চাঁদর। এখনও সেই চাঁদর ঐতিহ্য বহাল রয়েছে। এখন সেই চাদরের সাথে সাথে শাল পরেন অনেকে। আগে পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে বেশির ভাগ চাদর আসত। এখন দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান মানসম্পন্ন শাল তৈরি করছে তার মধ্যে রয়েছে আড়ং, দেশি দশ। শীত জেকে বসার আগেই আপনার পছন্দের শালটি কিনে নিতে পারেন।
যা করা জরুরি
সেপ্টেম্বর শেষে অক্টোবরের শুরুতে ভোরে উত্তরদিক থেকে বয়ে চলা ঠান্ডা বাতাস শরীরে আছড়ে পড়ার পর যেন অন্যরকম অনুভ‚তি হয়। এই শীতল বাতাস বেশিক্ষণ গায়ে লাগার পর আচমকা সর্দিকাঁশি অথবা জ্বর হতে পারে। বিশেষ করে নবজাতক, শিশু কিশোরদের সমস্যা বেশি হয়। তাই এই সময় পাতলা চাঁদর, পাতলা কাঁথা অথবা কুইল্ট ব্যবহার করতে পারেন সকালবেলা। শীত জেঁকে বসার আগে তুলে রাখা লেপ, কাথা, কম্বল, কুইল্ট, কম্ফোটার, চাদর, জ্যাকেট, মাফলার, সোয়েটার, ফুলশীভ গেঞ্জি, শাল বের করে অন্তত দুইবার রোদে দিন। বিশেষ করে শিশুদের শীতের কাপড় খুব ভালোভাবে এপাশ ওপাশ উল্টিয়ে রোদে দিয়ে জার্ম ফ্রি করে নিন। শীত শেষে শীতের কাপড় তুলে রাখার পর আলমারি, ওয়্যারড্রপ বাক্সে ছোট ছোট ধুলিকনা থেকে এক ধরনের অতিক্ষুদ্র কিট তৈরি হয়। এই কিটসহ জামা, কাপড়, লেপ, কম্বল, চাঁদর পরলে তা নাকে প্রবেশ করে এলার্জি তৈরি করে শরীরে। সঙ্গে সঙ্গে হাঁচিকাশি শুরু হয়। অনেকের এই হাঁচিকাশি পুরো শীতকাল পর্যন্ত স্থায়ী হয়। তা থেকে গলা ব্যথা, বুকে কফ জমে সৃষ্টি হয় শ্বাসকষ্ট। এই শ্বাসকষ্ট থেকে শুরু হয় অ্যাজমা সমস্যা। তাই এখনই পুরনো কাপড় মচমচে করে রোদে শুকিয়ে অথবা ধুইয়ে সম্ভব হলে ইস্ত্রি করে পড়া উচিত। নতুন কেনা কোনো শীতের কাপড়ের বেলায় একই ধরনের নিয়ম অনুসরণ করা উচিত। গত শীতের পর আপনি শীতের কাপড় যদি কোনো লন্ড্রি বা ড্রাইওয়াশে দিয়ে থাকেন তবে মনে করে এখনই তা তুলে আনুন।
লেপ কম্বল কেনার এই তো সময়
শীত জেকে বসার আগেই খোঁজ করুন ভালো আরামদায়ক কম্বল, কুইল্ট, কম্ফোটার বা লেপের। রাজধানীর বড় বড় সুপার মার্কেট, সুপারসপে ইতিমধ্যে শীতের পণ্য সাজিয়ে বসেছে দোকানীরা। আপনি দেখে শুনে দরদাম করে ভালো মানের পণ্যটি বেছে নিন। শীতের শুরুতে আপনি ব্যবহার করতে পারেন হালকা কুইল্ট। অনেকটা মোটা চাঁদরের মতো সেলাই করা এই কুইল্ট বেশির ভাগ আমদানী করা। ইদানিং আমাদের দেশেও তৈরি হচ্ছে এই কুইল্ট। আমাদের দেশে শীতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয় লেপ। শিমুল তুলা বা কৃত্তিম তুলার লেপ রেডিমেট পাওয়া যায়। তবে শৌখিন মানুষেরা শিমুল তুলা দিয়ে লেপ বানিয়ে শীতে ব্যবহার করতে বেশি পছন্দ করেন। ইদানিং শহরে লেপের প্রচলন অনেকটা কমে এসেছে। এখন অনেকের পছন্দ শীতে কম্বল মুরি দিয়ে ঘুমানো। তুলতুলে নানা রঙের কম্বল দেখতেও চমৎকার। কম্বল পুরোটাই বিদেশ থেকে আমদানি করা। কোনো কম্বল সিঙ্গেল কোনোটা আবার ডাবল। কোয়ালিটি ভেদে এর দাম নির্ধারিত হয়। ভালো সিঙ্গেল একটি কম্বল ২ থেকে ৪ হাজার টাকার মধ্যে পাওয়া যায়। ডাবল ভালো মানের একটি কম্বল পাওয়া যায় ৩ তাজার ৫’শ থেকে ৮ হাজার টাকার মধ্যে। একটি কুইল্ট বা কম্পোটার পাওয়া যায় ২ থেকে ৪ হাজারের মধ্যে। লেপ সাধারণত রেডিমেট কেনার চাইতে তৈরি করে নেয়াই ভালো। শিমুল তুলার একটি ডাবল মাপের ভালো লেপের খরচ পড়বে কাপড় মুজুরীসহ ৩ থেকে ৬ হাজার টাকা।
শিশুদের শীতের পোশাক
শিশুদের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম। তাই ঋতু পরিবর্তন হয়ে শীতের আগমনে শিশুদের শীতজনিত নানা রোগ দেখা দেয়। এ থেকে রেহাই পেতে প্রয়োজন সচেতনতা। শীত আসার সাথে সাথে
পোশাক পরিধানে অভিভাবকদের যত্নবান হওয়া উচিৎ। রাতে পায়জামা ফুলশীভ মোটা কাপড়ে শার্ট পরে ঘুমানো উচিৎ। শিশুদের জন্য আলাদা লেপ, কুইল্ট ও ছোট কম্বল পাওয়া যায় ইচ্ছে করলে ব্যবহার করতে পারেন। শীতের সময় শিশুদেরকে গরম কাপড়ে জড়িয়ে রাখা জরুরি। যেমন পা মোজা, মাথায় টুপি বা হ্যাট, গায়ে সোয়েটার এবং ফ্যালালীন বা পশমী কাপড়ের প্যান্ট বা ট্রাউজার পরতে দেয়া উচিৎ। শীতের সময় সকালে শিশু স্কুলে যাওয়ার সময় তার নাকে মেডিকেডেট মাস্ক, স্কুলের সোয়েটারের উপর একটি জ্যাকেট এবং মাথায় টুপি বা হ্যাট পরানো উচিৎ। কারণ শীতের সময় প্রচুর ধুলোবালি বাতাসে উড়ে বেড়ায়। রাজধানীর বিভিন্ন মার্কেটে শিশুদের প্রচুর শীতের পোশাকের ভালো ভালো আউটলেট রয়েছে। যেমন আর্টিসান, বেবিসপ এবং দেশি দশের আউটলেট। এসব আউটলেটে শিশুদের মানসম্পন্ন সোয়েটার, জ্যাকেট, মোটা পশমী কাপড়ের শার্ট প্যান্ট, ট্রাউজার, মোজা, টুপি, হ্যাট পাওয়া যায়। এ ছাড়াও আছে ফুলশীভ গেঞ্জি, হাত মোজা এবং হুডি। আছে বিভিন্ন ধরনের হাফ সোয়েটার ও শার্ট। এই পোশাকগুলোর বেশির ভাগ এক্সপোর্ট কোয়ালিটি তাই দাম একটু বেশি।
জ্যাকেট মাফলার হুডি ও টুপি
একটা সময় শুধু ছেলেরা শীতে জ্যাকেট পরতো। এখন ছেলে- মেয়ে, শিশু কিশোর কিশোরী সবার জন্যই জ্যাকেট তৈরি হয়। বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মানের জ্যাকেট তৈরি করে থাকে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান যেমন ক্যাটস আই, ইনফিনিটি, আর্টিসান। শিশুদের জন্য ভালো মানের জ্যাকেট তৈরি করে বেবী সপ। সুতি, আর্টিফিসিয়াল বিভিন্ন ধরনের জ্যাকেট কিনতে পারেন এবারের শীতে। তুলনামূলকভাবে দেশে তৈরি জ্যাকেট দামে সস্তা। জ্যাকেটের সাথে সাথে ছেলেদের হুডি খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে গত কয়েক বছর ধরে।
কী খাবেন
শীতে প্রচুর ভিটামিন সি জাতীয় ফল ও সবজি খেতে হবে। এতে কোল্ড অ্যালার্জির সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে। গরম খাবার হিসেবে হালকা লিকারের লেবু চা কিংবা ঘরে তৈরি ভেজিটেবল স্যুপ খেতে পারেন। এছাড়াও মৌসুমের শাকসবজি খেতে হবে। গাজর এবং টমেটো ভালো করে ধুয়ে কাঁচা খেতে হবে। অ্যান্টি অক্সিডেন্টযুক্ত খাবার ত্বক ভালো রাখে।
শীতকালে অনেকেই পানি কম খান। ত্বক ভালো রাখতে প্রচুর পানি খেতে হবে। সঙ্গে খাবার তালিকায় প্রোটিন এবং ফ্যাটও রাখা জরুরি।
জুতো
জুতোর দিকে নজর দিন। হাই বুটস না হলেও অ্যাঙ্কেল বুটস পরতে পারেন। না হলে এখন নানা স্টাইলের ফ্যাশনেবল স্নিকার্স পেয়ে যাবেন। কোনোটা আবার বুটসের মতোই দেখতে। এই শীতে পোশাকের সঙ্গে ব্লক হিলসও পরতে পারেন। আবার পা ফাটার সমস্যা যাদের বেশি তারা নানা রকম কিউট মোজা পরতে পারেন।
ত্বক-চুলের যত্ন
শীতকালে ত্বক আর্দ্রতা হারায়। ঘরের ভেতর ও বাইরের তাপমাত্রায় যেহেতু একটা পার্থক্য দেখা যায়, তাই ত্বকের আর্দ্রতার ভারসাম্যও নষ্ট হয়ে যায়। স্বাভাবিকভাবেই শুকনো হাওয়ায় ত্বক ফাটতে শুরু করে। তাই দিনে তিন-চারবার ময়েশ্চারাইজার লাগাতে ভুলবেন না। মুখ ধোয়ার পর মুখে ভেজা ভাব থাকা অবস্থায় ময়েশ্চারাইজার লাগান। শীতকালে শরীরের অয়েল গ্রান্ড থেকে তেল কম নিঃসৃত হয় বলে হাত-পায়ের ত্বক শুষ্ক ও খসখসে হয়ে যায়। গোসলের সময় দীর্ঘক্ষণ ধরে গোসল করবেন না কিংবা গোসলে গরম পানি ব্যবহার করবেন না। কারণ এগুলো ত্বকের শুষ্কতা আরো বাড়িয়ে তোলে।
রাতে ঘুমাতে যাওয়ার সময় ময়েশ্চারাইজার মেখে ঘুমান। মনে রাখতে হবে, ত্বক একেবারে শুকিয়ে নিয়ে তারপর ময়েশ্চারাইজার মাখলে কাজ হবে না। ত্বকে ভেজা ভাব থাকতেই ময়েশ্চারাইজার মাখতে হবে। ত্বকের শুষ্কভাব দূর করতে গ্লিসারিন কিংবা অলিভ অয়েল নিয়মিত মাখতে পারেন। গ্লিসারিন হলো সবচেয়ে ভালো ময়েশ্চারাইজার। একভাগ গ্লিসারিনের সাথে দুভাগ পানি মিশিয়ে ব্যবহার করুন। গ্লিসারিনের আঠা-আঠা ভাবটা দূর করার জন্য গ্লিসারিন মাখার পর একটা ভিজে তোয়ালে বা কাপড় হালকা করে ত্বকে চেপে ধরলে আঠাভাব চলে যাবে। মাঝে মাঝে ম্যানিকিউর ও পেডিকিউর করাতে পারেন। শীতে চুলের বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে পারে। আগা ফাটা, নির্জীব হয়ে যাওয়া, গ্রোথ কমে যাওয়া, খুশকি ও চুল পড়া শীতকালে বেড়ে যায়। তাই চুলে নিয়মিত তেল ম্যাসাজ করুন। সপ্তাহে দুইবারের বেশি শ্যাম্পু না করাই ভালো। চুলে ময়েশ্চারাইজার বজায় রাখার জন্য ভালো কন্ডিশনার ব্যবহার করুন।
ঘরের প্রস্তুতি
শীতে ঘরের মেঝে যেহেতু ঠাণ্ডা থাকে তাই মেঝেতে ব্যবহার করতে পারেন শতরঞ্জি, ফ্লোর ম্যাট কিংবা মাদুর। কার্পেটে ধুলা আটকে যায় তাই কার্পেট ব্যবহার না করাই ভালো। যাদের ধুলা-বালিতে অ্যালার্জি আছে তাদের কার্পেটে সমস্যা হতে পারে। এছাড়াও ঘরের জানালায় ভারি পর্দা ব্যবহার করতে পারেন এই সময়টাতে। তবে ঘরের যে জানালা দিয়ে রোদ আসে, ঘরে রোদ ঢোকার জন্য সেই জানালার পর্দা সরিয়ে রাখুন। রুম হিটার, ওয়াটার হিটার, গিজার ইত্যাদি যন্ত্রপাতি ঠিক আছে কিনা দেখে নিন। নষ্ট হয়ে থাকলে এখনই সারিয়ে ফেলুন সেগুলো।
বাগানের যত্ন
শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে শীতে ত্বকের মতোই বারান্দার বা বাগানের গাছগুলোও মলিন হয়ে যায়। তাই এইসময়ে গাছেরও বাড়তি যত্ন প্রয়োজন। খেয়াল রাখুন যেন প্রতিদিন সকালের হালকা রোদ পায় গাছগুলো। প্রতিদিন টবের মাটির দিকে খেয়াল রাখুন। মাটি শুকিয়ে গেলেই পানি দিন। তবে অতিরিক্ত পানি দেয়া যাবে না। আর খুব বেশি কুয়াশা কিংবা ঠাণ্ডা পরলে গাছগুলোকে রাতের বেলা ঘরে ঢুকিয়ে রাখুন। দিনের বেলা রোদ উঠলে আবার বারান্দায় দিয়ে দিন।
শীতে প্রচুর ধুলা থাকে বাতাসে। তাই সপ্তাহে অন্তত একদিন গাছের পাতা ধুয়ে দিন এবং পাতায় পানি স্প্রে করুন। অনেক গাছেরই পাতা ঝরে যায় এই সময়ে। কিন্তু গাছ কিন্তু বেঁচে থাকে। তাই পানি দেওয়া বন্ধ করা যাবেনা পাতা ঝরে গেলেও।


আপনার মতামত লিখুন