খুঁজুন
, ,

যুদ্ধ বন্ধ করুন : জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রী

ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: Saturday, 24 September, 2022, 9:17 am
যুদ্ধ বন্ধ করুন : জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সঙ্কট ও বিরোধ নিরসনে সংলাপের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে শান্তিপূর্ণ বিশ্ব গড়তে অস্ত্র প্রতিযোগিতা, যুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞা বন্ধ করতে বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘বিশ্ব বিবেকের কাছে আমার আবেদন, অস্ত্র প্রতিযোগিতা, যুদ্ধ, স্যাংশন বন্ধ করুন। শিশুকে খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপত্তা দিন। শান্তি প্রতিষ্ঠা করুন।’ জাতিসংঘ সদর দফতরে সাধারণ পরিষদের ৭৭তম অধিবেশনে আজ প্রদত্ত ভাষণে প্রধানমন্ত্রী এ আহ্বান জানান।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, যুদ্ধ বা একতরফা জবরদস্তিমূলক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, পাল্টা-নিষেধাজ্ঞার মত বৈরীপন্থা কখনও কোন জাতির মঙ্গল বয়ে আনতে পারে না। পারস্পরিক আলাপ-আলোচনাই সঙ্কট ও বিরোধ নিষ্পত্তির সর্বোত্তম উপায়।

তিনি বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি যে সংঘাতের মূল কারণগুলো সমাধান না করে আমরা শান্তি বজায় রাখতে পারি না।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা ইউক্রেন ও রাশিয়ার সংঘাতের অবসান চাই। নিষেধাজ্ঞা, পাল্টা-নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে একটি দেশকে শাস্তি দিতে গিয়ে নারী, শিশুসহ ও গোটা মানবজাতিকেই শাস্তি দেওয়া হয়। এর প্রভাব কেবল একটি দেশেই সীমাবদ্ধ থাকে না বরং সকল মানুষের জীবন-জীবিকা মহাসঙ্কটে পতিত হয়। মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়। মানুষ খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়। বিশেষ করে, শিশুরাই বেশি কষ্ট ভোগ করে। তাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে হারিয়ে যায়।

তিনি বলেন, আমরা দেখতে চাই, একটি শান্তিপূর্ণ বিশ্ব-যেখানে থাকবে বর্ধিত সহযোগিতা, সংহতি, পারস্পরিক সমৃদ্ধি এবং ঐকবদ্ধ প্রচেষ্টা। আমাদের একটি মাত্র পৃথিবী এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এই গ্রহকে আরও সুন্দর করে রেখে যাওয়া আমাদের দায়িত্ব।

কোভিড-১৯ মহামারী প্রাদুর্ভাবের পর এই প্রথম ১৯৩টি সদস্য দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানদের সশরীরে উপস্থিতির মাধ্যমে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৭তম অধিবেশন ১৩ থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে সংস্থার সদর দফতরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

শেখ হাসিনা বলেন, এই অধিবেশন এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে যখন খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার সঙ্গে বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তন, সহিংসতা ও সংঘাত, কোভিড-১৯ মহামারির মত একাধিক জটিল এবং বহুমাত্রিক প্রতিকূলতায় পৃথিবী নামক আমাদের এই গ্রহ আজ জর্জরিত। মানবিক চাহিদা গভীর হচ্ছে, জলবায়ু লক্ষ্যগুলি মূলত অপূর্ণ থেকে যাচ্ছে, বৈষম্য আরও প্রকট হচ্ছে।

তিনি বলেন, বিশ্ব নেতারা সাধারণ পরিষদ হলে ব্যক্তিগতভাবে বিবৃতি বিনিময় করবেন, ‘একটি সঙ্কটপূর্ণ সন্ধিক্ষণ: আন্তঃসংযুক্ত প্রতিকূলতাসমূহের রূপান্তরমূলক সমাধান।’ শীর্ষক এবারের প্রতিপাদ্যটি এ সকল প্রতিকূলতা মোকাবিলায় এবং আমাদের অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করে শান্তিপূর্ণ ও টেকসই পৃথিবী গড়ে তোলার উপায় খুঁজে বের করার জন্য সকলের ঐক্যবদ্ধ আকাক্সক্ষার প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। আর এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য আমাদের এখনই সম্মিলিত উদ্যোগ নিতে হবে।

শেখ হাসিনার ভাষণে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, শান্তি ও স্থিতিশীলতা, জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা, কোভিড-১৯ মহামারী, ফিলিস্তিন এবং অভিবাসন বিষয়ক বৈশ্বিক ও বাংলাদেশের দৃষ্টিভঙ্গি উল্লেখযোগ্যভাবে স্থান পেয়েছে।

শেখ হাসিনা বলেন, গত আড়াই বছরে বিশ্ব যখন করোনাভাইরাস মহামারীর বিধ্বংসী প্রভাব থেকে পুনরুদ্ধার করতে শুরু করেছে, তখন রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত বিশ্বকে একটি সম্মিলিত অনিশ্চয়তায় নিমজ্জিত করেছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের ক্ষেত্রে সহায়তা-প্রার্থী ঝঁকিপূর্ণ দেশগুলো এখন আরও প্রতিকূলতার মুখে পড়েছে। বর্তমানে আমরা এমন একটি সঙ্কটময় সময় অতিক্রম করছি, যখন অতীতের যেকোন সময়ের চেয়ে অধিক পারস্পরিক সংহতি প্রদর্শন করা আবশ্যক।

তিনি বলেন, আমাদের প্রমাণ করতে হবে যে, সঙ্কটের মুহূর্তে বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হল জাতিসংঘ। তাই সর্বস্তরের জনগণের বিশ্বাস ও আস্থা অর্জনের জন্য জাতিসংঘকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে সকলের প্রত্যাশা পূরণে কাজ করতে হবে।

এই পরিপ্রেক্ষিতে, ‘গ্লোবাল ক্রাইসিস রেসপন্স গ্রুপ’ গঠন করায় জাতিসংঘের মহাসচিবকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এই গ্রুপের একজন চ্যাম্পিয়ন হিসেবে, আমি বর্তমান পরিস্থিতির গুরুত্ব ও সঙ্কটের গভীরতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি বৈশ্বিক সমাধান নিরূপণ করতে অন্যান্য বিশ্ব নেতাদের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছি।’

তিনি জাতির পিতার রেখে যাওয়া পররাষ্ট্র নীতি ‘সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, করো সঙ্গে বৈরিতা নয়’ এর উল্লেখ করে বলেন, বাংলাদেশ জন্মলগ্ন থেকেই এই প্রতিপাদ্য-উদ্ভূত জোটনিরপেক্ষ নীতি অনুসরণ করে আসছে।

১৯৭৪ সালের ২৫-এ সেপ্টেম্বর এই মহান পরিষদে জাতির পিতা প্রদত্ত ভাষণের একটি চুম্বকাংশ তিনি উদ্ধৃত করেন।

জাতির পিতা বলেছিলেন, ‘শান্তির প্রতি যে আমাদের পূর্ণ আনুগত্য তা এই উপলব্ধি থেকে জন্মেছে যে,

একমাত্র শান্তিপূর্ণ পরিবেশেই আমরা আমাদের কষ্টার্জিত জাতীয় স্বাধীনতার ফল আস্বাদন করতে পারবো এবং ক্ষুধা, দারিদ্র্য, রোগ-শোক, অশিক্ষা ও বেকারত্বের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার জন্য আমাদের সকল সম্পদ ও শক্তি নিয়োগ করতে সক্ষম হব।’

তিনি বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের এই বক্তব্য এখনও সমভাবে প্রাসঙ্গিক। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বিশ্বাস করতেন যে, শান্তি হল বিশ্বের সকল নারী-পুরুষের আশা-আকাক্সক্ষার বাস্তব প্রতিরূপ। যুদ্ধের ফলে মানবজাতি, বিশেষ করে শিশু ও নারীরা চরম কষ্ট ভোগ করে। কত মানুষ রিফিউজি হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশে কোভিড-১৯ মহামারির শুরু থেকে এ সঙ্কট মোকাবেলায় বাংলাদেশ মূলত তিনটি বিষয়ের দিকে লক্ষ্য রেখে কৌশল নির্ধারণ করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রথমত, মহামারি সংক্রমণ ও বিস্তাররোধ করতে আমরা জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা প্রসারিত করেছি। দ্বিতীয়ত, আমাদের অর্থনীতিকে সুরক্ষিত রাখতে কৌশলগত আর্থিক প্রণোদনা প্রদান করেছি, এবং তৃতীয়ত, আমরা জনগণের জীবিকা সুরক্ষিত রেখেছি।

এসব উদ্যোগ মহামারিজনিত মৃত্যুর সংখ্যা হ্রাস করার পাশাপাশি মানুষের দুর্ভোগ কমাতে সাহায্য করেছে, বলেন তিনি।

রোহিঙ্গা সঙ্কট সমাধানে জাতিসংঘের কার্যকর ভূমিকা রাখার পাশাপাশি বিশ্ব নেতাদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০১৭ সালে স্বদেশ থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে তাদের গণহারে বাংলাদেশে প্রবেশের ইতোমধ্যে পাঁচ বছর পূর্ণ হয়েছে। রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে নিরাপদে ও মর্যাদার সঙ্গে প্রত্যাবাসনের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরীতে দ্বিপাক্ষিক, ত্রিপাক্ষিক এবং জাতিসংঘসহ অন্যান্য অংশীজনদের নিয়ে আলোচনা সত্ত্বেও একজন রোহিঙ্গাকেও তাদের মাতৃভূমিতে ফেরত পাঠানো যায়নি। মিয়ানমারে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সশস্ত্র সংঘাত বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনকে আরও দূরুহ করে তুলছে। আশা করি, এ বিষয়ে জাতিসংঘ কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পদাঙ্ক অনুসরণ করে বরাবরের মতো এবারও জাতিসংঘে বাংলা ভাষায় ভাষণ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

বিশ্বসভায় প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে রোহিঙ্গা ইস্যুতে বিশ্ব নেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে আরও বলেন, বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের দীর্ঘায়িত উপস্থিতি বাংলাদেশের অর্থনীতি, পরিবেশ, নিরাপত্তা এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে। তাদের প্রত্যাবাসনের অনিশ্চয়তা সর্বস্তরে ব্যাপক হতাশার সৃষ্টি করেছে। মানবপাচার ও মাদক চোরাচালানসহ আন্তঃসীমান্ত অপরাধ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এমনকি এ পরিস্থিতি উগ্রবাদকেও ইন্ধন দিতে পারে। এ সঙ্কট প্রলম্বিত হতে থাকলে তা এই উপমহাদেশসহ বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী এ সময় একাত্তর সালে যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন এবং ’৭৫ সালে জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যার পর হত্যা-ক্যু’র রাজনীতির কথা তুলে ধরে বলেন, যুদ্ধের ভয়াবহতা, হত্যা-ক্যু-সংঘাতে মানুষের যে কষ্ট-দুঃখ-দুর্দশা হয়, ভূক্তভোগী হিসেবে আমি তা উপলব্ধি করতে পারি। তাই যুদ্ধ চাই না, শান্তি চাই, মানবকল্যাণ চাই। মানুষের অর্থনৈতিক উন্নতি চাই। আগামী প্রজন্মের জন্য শান্তিময় বিশ্ব, উন্নত-সমৃদ্ধ জীবন নিশ্চিত করতে চাই। তাই বিশ্ব নেতাদের প্রতি আমার আকুল আবেদন- যুদ্ধ, অস্ত্র প্রতিযোগিতা বন্ধ করুন। সমুন্নত হোক মানবিক মূল্যবোধ। আসুন, সবাইকে এক সঙ্গে নিয়ে হাতে হাত মিলিয়ে আমরা একটি উত্তম ভবিষ্যত তৈরির পথে এগিয়ে যাই।

প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে অন্তর্ভূক্তিমূলক জলবায়ু কার্যক্রমের প্রসারের জন্য বিশ্ব নেতৃবৃন্দকে আহ্বান জানিয়ে বলেন, মানবজাতির জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হলো জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাব। জলবায়ু নিয়ে প্রতিশ্রুতি দেওয়া আর ভাঙার একটি দুষ্টচক্র আমরা অতীতে দেখেছি। আমাদের এখনই এই অবস্থা থেকে বের হয়ে আসতে হবে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবেলায় প্যারিস চুক্তি বাস্তবায়নের সঙ্গে এবং টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ঠ অর্জনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ অসংখ্য পদক্ষেপ নিয়েছে। ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরামের সভাপতি থাকাকালে আমরা ‘মুজিব ক্লাইমেট প্রস্পারিটি প্লান’ গ্রহণ করি, যার লক্ষ্য হল বাংলাদেশকে ‘ঝুঁকির পথ থেকে জলবায়ু সহনশীলতা ও জলবায়ু সমৃদ্ধির টেকসই পথের’ দিকে নিয়ে যাওয়া। জলবায়ু পরিবর্তন এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ সম্পর্কিত আমাদের জাতীয় পরিকল্পনা এবং নীতিগুলো জেন্ডার সংবেদনশীল করে তৈরি করা হয়েছে। ঝুঁকিতে থাকা অন্যান্য দেশগুলোকে তাদের নিজস্ব জলবায়ু সমৃদ্ধি পরিকল্পনা প্রণয়ণে সহায়তা করতে আমরা প্রস্তুত আছি। অন্তর্ভুক্তিমূলক জলবায়ু কার্যক্রমের প্রসারের জন্য তিনি বিশ্ব নেতৃবৃন্দকে আহ্বান জানান।

প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে তাঁর সরকারের আমলে দ্রুতগতিতে দেশ এগিয়ে যাওয়ার বাস্তবচিত্র বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরে বলেন, একটি টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সবার

জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক শান্তিপূর্ণ সমাজ এবং সামাজিক সম্প্রীতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। তিনি বলেন, বাংলাদেশ এখন বিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল পাঁচটি অর্থনীতির মধ্যে অন্যতম।

তিনি বলেন, জিডিপির হিসাবে আমাদের অবস্থান ৪১তম। বিগত এক দশকে আমরা দারিদ্র্যের হার ৪১ শতাংশ থেকে ২০ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে এনেছি। আমাদের মাথাপিছু আয় মাত্র এক দশকে তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়ে ২ হাজার ৮২৪ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। তিনি বলেন, কোভিড-১৯-এর প্রাদুর্ভাবের পূর্বে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক এক পাঁচ শতাংশ। এর আগে, আমরা টানা তিন বছর ৭ শতাংশের বেশি জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছি। মহামারি চলাকালেও ২০২০-২১ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনীতি ৬ দশমিক নয় চার শতাংশ হারে প্রসারিত হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ এবং অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও পাল্টা নিষেধাজ্ঞার ফলে সরবরাহ ব্যবস্থায় ব্যাঘাত এবং জ্বালানি, খাদ্যসহ নানা ভোগ্যপণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি পেয়েছে। এ কারণে, আমাদের মত অর্থনীতি মারাত্মক চাপের মুখে পড়েছে। মুল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পেয়েছে। এ অবস্থা কাটিয়ে ওঠার জন্য আমরা বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করছি।

তিনি বলেন, ২০২৬ সালে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ হতে উন্নয়নশীল দেশে উত্তীর্ণ হতে যাচ্ছে। আমরা ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি জ্ঞানভিত্তিক উন্নত দেশে রূপান্তরিত করার জন্য এবং ২১০০ সালের মধ্যে একটি সমৃদ্ধ ও জলবায়ু-সহিষ্ণু বদ্বীপে উন্নীত করার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি। তিনি বলেন, সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা, খাদ্য নিরাপত্তা, মা ও শিশু মৃত্যু হ্রাস, লিঙ্গ বৈষম্য, নারীর ক্ষমতায়ন ইত্যাদি ক্ষেত্রে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। গত এক দশকে সাক্ষরতার হার ৫০ শতাংশ থেকে ৭৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। আমরা তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিতকরণের ওপর অধিক গুরুত্বারোপ করেছি। আমাদের শিশুমৃত্যুর হার প্রতি হাজারে ২১ জনে এবং প্রতি লাখ জীবিত জন্মে মাতৃমৃত্যু হার ১৭৩ জনে নেমে এসেছে। মানুষের গড় আয়ু এখন ৭৩ বছরের অধিক।

প্রধানমন্ত্রী এ প্রসঙ্গে আরও বলেন, আমরা সমাজের সবচেয়ে দুর্বল ব্যক্তিদের প্রতি বিশেষ মনযোগ দিয়েছি যাতে সমাজের কেউ পিছিয়ে না থাকে। স্বামী-পরিত্যাক্তা নারী, বিধবা, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, তৃতীয় লিঙ্গ এবং অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠির সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিদ্যমান সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতা বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ মানুষ সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় উপকৃত হচ্ছেন।

স্বপ্নের পদ্মা সেতু নির্মাণের কথা জাতিসংঘে তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, উন্নত ভৌত অবকাঠামো মজবুত অর্থনৈতিক কাঠামোর ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। এজন্য আমরা নদীর তলদেশের টানেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে এবং ম্যাস র‌্যাপিড ট্রানজিট সিস্টেমসহ টেকসই বৃহৎ অবকাঠামো নির্মাণ করছি। আমাদের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থায় সম্প্রতি যুক্ত হয়েছে আমাদের নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত ‘পদ্মা বহুমুখী সেতু’। এটি বাংলাদেশের স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে সহজতর করবে এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ বৃদ্ধি করবে। এই সেতু জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে ১ দশমিক দুই-তিন শতাংশ হারে অবদান রাখবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জটিল বৈশ্বিক সঙ্কট অনেক উন্নয়নশীল দেশের বিগত কয়েক দশকের উন্নয়ন অগ্রযাত্রাকে স্থবির করে দিচ্ছে। এই মুহূর্তে ২০৩০-এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা তাদের অনেকের কাছেই একটি অধরা স্বপ্ন বলে মনে হচ্ছে। আমরা দেখছি, কীভাবে নিত্য-নতুন প্রযুক্তি বিশ্বকে দ্রুত পরিবর্তন করে ফেলছে। এই প্রযুক্তিগুলো ব্যবহারের সকলের ন্যায্য এবং সমান সুযোগ পাওয়া অপরিহার্য। ক্রমবর্ধমান প্রযুক্তিগত বিভাজন অবশ্যই দূর করতে হবে। বাংলাদেশসহ ১৬টি দেশ এখন স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উন্নীত হওয়ার পথে। তবে, ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক সঙ্কট আমাদের টেকসই উত্তরণের পথে গুরুতর প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে। আমাদের উন্নয়নের অংশীজনদের কাছে বর্ধিত এবং কার্যকর সহযোগিতার আহ্বান জানাই। এ বিষয়ে দোহা কর্মসূচিকে আমরা স্বাগত জানাই।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটি দায়িত্বশীল সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে, বাংলাদেশ তার জনগণের মানবাধিকার সংরক্ষণ ও উন্নয়নে অঙ্গীকারাবদ্ধ। জনগণের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক অধিকার নিশ্চিত করার জন্য আমরা একটি সামগ্রিক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক পন্থা অবলম্বন করেছি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আমরা হিজড়া জনগোষ্ঠীর প্রয়োজনীয় অধিকার ও কল্যাণ সাধনের জন্য সংশ্লিষ্ট আইনি বিধি-বিধান প্রণয়ন করেছি। তিনি বলেন, দেশের সকল ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারের জন্য বিনামূল্যে আবাসন প্রদানের লক্ষ্যে ‘আশ্রয়ণ’ শীর্ষক একটি প্রকল্প আমরা বাস্তবায়ন করছি। ১৯৯৭ সাল থেকে আমার নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে বিগত ১৮ বছরে প্রায় ৩৫ লাখেরও বেশি মানুষের আবাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী সাইবার-অপরাধ এবং সাইবার সহিংসতা মোকাবেলার লক্ষ্যে একটি আন্তর্জাতিক বাধ্যতামূলক চুক্তি প্রণয়নে একসঙ্গে কাজ করার জন্য সদস্য দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, বাংলাদেশে সন্ত্রাস ও সহিংস উগ্রপন্থার বিষয়ে আমরা ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতি গ্রহণ করেছি। বাংলাদেশের ভূখ-ে কোনোরূপ সন্ত্রাসী কার্যকলাপ বা জনগণের ক্ষতি হয় এমন কোন কর্মকা- সংঘটিত হতে দেই না।

তিনি বলেন, পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তাররোধসহ সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণের জন্য আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা ২০১৯ সালে পারমাণবিক অস্ত্র নিষিদ্ধকরণ বিষয়ক ঐতিহাসিক চুক্তি অনুস্বাক্ষর করি। আমরা ধারাবাহিকভাবে শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে আমাদের অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করে আসছি। আমাদের শান্তি-কেন্দ্রিক পররাষ্ট্রনীতির প্রতিফলন হিসেবে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে সৈন্য ও পুলিশ প্রেরণকারী দেশগুলোর মধ্যে আমরা বর্তমানে শীর্ষে অবস্থান করছি।

শেখ হাসিনা বলেন, শান্তিরক্ষাসহ, জাতীয় ও স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি, বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা প্রদান, নারী ও অন্যান্য পিছিয়ে পড়া গোষ্ঠীর ক্ষমতায়নের মাধ্যমে একটি টেকসই সমাজ গঠন করতে এ সকল অঞ্চলের জনগণকে তাঁরা সাহায্য করে যাচ্ছেন। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আমাদের অনেক শান্তিরক্ষী নিহত হয়েছেন। তিনি বলেন, আমরা বিশ্বাস করি যে, দ্বন্দ্ব-সংঘাতের মূল কারণগুলোর সমাধান ব্যতিত টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। জাতিসংঘ শান্তি বিনির্মাণ কমিশনের বর্তমান সভাপতি হিসেবে আমরা সংঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে সহযোগিতার উদ্দেশ্যে বহুমাত্রিক অংশীজনদের একসঙ্গে কাজ করার একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরিতে চেষ্টা করে যাচ্ছি। নারী, শিশু, শান্তি ও নিরাপত্তা এজেন্ডাকে আরও শক্তিশালী করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতেও আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, বলেন তিনি।

Feb2
Feb2

কলকাতায় মারা গেছেন ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রোটন

ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: Saturday, 10 October, 2026, 8:35 pm
কলকাতায় মারা গেছেন ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রোটন

নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুল হায়দার চৌধুরী রোটন মারা গেছেন। ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি।

শনিবার (১০ অক্টোবর) সকাল ৭টায় ভারতের কলকাতার একটি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।

চট্টগ্রাম মহানগর যুবলীগের সদস্য জয়নাল আবেদীন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, সকাল ৭টার কিছুক্ষণ পর রোটনের মৃত্যু হয়। তার লাশ দেশের আনার প্রস্তুতি চলছে।

ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এনামুল হক শামীম বিষয়টি জানিয়েছেন। ‍তিনি লেখেন, বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক, আমাদের সবার অত্যন্ত প্রিয়, আমার ভাই, সহযোদ্ধা, সুখ-দুঃখের সাথী,পরম স্নেহের মাহফুজুল হায়দার চৌধুরী রোটন আমাদের মাঝে আর নেই (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। ছোট ভাইয়ের মতো স্নেহস্পদ ও রাজপথের সহযোদ্ধাকে হারানোর বেদনা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। এত দ্রুত রোটন আমাদের মাঝে নেই ভাবতেই খুব কষ্ট হচ্ছে।

মাহফুজুল হায়দার চৌধুরী রোটন ২০০৬ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ওই কমিটির সভাপতি ছিলেন মাহমুদ হাসান রিপন।

ছাত্রলীগের রাজনীতি শেষ করে পরে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতেও সক্রিয় ছিলেন তিনি। চট্টগ্রামের রাউজানের এই রাজনীতিবিদ ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছিলেন। ২০২১ সালে আওয়ামী লীগের শ্রম ও জনশক্তিবিষয়ক উপকমিটির সদস্য হিসেবেও মনোনীত হন তিনি।

চট্টগ্রামে প্রথমবার জেলা প্রশাসকের হাতে মহালয়ার উদ্বোধন

ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: Saturday, 10 October, 2026, 7:56 pm
চট্টগ্রামে প্রথমবার জেলা প্রশাসকের হাতে মহালয়ার উদ্বোধন

চট্টগ্রামে প্রথমবারের মতো কোনো জেলা প্রশাসক মহালয়ার অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেছেন বলে জানিয়েছেন পূজা উদ্‌যাপন পরিষদের নেতারা।

শনিবার (১০ অক্টোবর) চট্টগ্রাম জেলা পূজা উদ্‌যাপন পরিষদ আয়োজিত ‘শুভ মহালয়া ২০২৬’ অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। তাঁর এই অংশগ্রহণকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের প্রকাশ হিসেবে দেখছেন আয়োজকেরা।

অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসক বলেন, দীর্ঘ ২১ বছর মাঠ প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে কাজ করলেও এত বড় পরিসরে মহালয়ার আয়োজন দেখার সুযোগ তাঁর আগে হয়নি। চট্টগ্রামের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও বৈচিত্র্যের সঙ্গে এই আয়োজন তাঁকে নতুনভাবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে।

জাহিদুল ইসলাম বলেন, চট্টগ্রাম জাতিগত ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ একটি জেলা। বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের সহাবস্থান এ অঞ্চলের ঐতিহ্য। এই বৈচিত্র্য বাংলাদেশের গর্ব, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ধরে রাখতে হবে।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম জেলা পূজা উদ্‌যাপন পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক অর্পণ কান্তি ব্যানার্জী, সাধারণ সম্পাদক আইনজীবী নিখিল কুমার নাথ, যুগ্ম সম্পাদক আইনজীবী নটু চৌধুরীসহ জেলা ও বিভিন্ন উপজেলা এবং থানা পর্যায়ের নেতারা।

আয়োজকদের সঙ্গে পৃথক কথোপকথনে জানা যায়, তাঁদের জানামতে, এর আগে চট্টগ্রামের কোনো জেলা প্রশাসক মহালয়ার অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেননি। জেলা প্রশাসকের উপস্থিতি ও সহযোগিতার আশ্বাসে তাঁরা সন্তোষ প্রকাশ করেন।

পূজা উদ্‌যাপন পরিষদের নেতারা জানান, জেলা প্রশাসক অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে তাঁদের সঙ্গে সময় কাটিয়েছেন এবং আসন্ন দুর্গাপূজায় প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। তাঁর আন্তরিক আচরণ ও সহযোগিতাপূর্ণ মনোভাবকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন তাঁরা।

তবে চট্টগ্রামে এর আগে কোনো জেলা প্রশাসক মহালয়ার অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেছেন কি না, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

উদ্বোধনী বক্তব্যে জেলা প্রশাসক বলেন, শুধু জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন করলেই উৎসব সফল হয় না। দর্শনার্থীরা কতটা নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যে ধর্মীয় আচার পালন করতে পারছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

নারী দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা, সুশৃঙ্খল যাতায়াত ও স্বেচ্ছাসেবকদের সক্রিয় উপস্থিতি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

জেলা প্রশাসক বলেন, স্বেচ্ছাসেবকদের দৃশ্যমান ও সুশৃঙ্খলভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। উৎসবে আসা প্রত্যেকে যেন সুন্দর অভিজ্ঞতা নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারেন, তা নিশ্চিত করা আয়োজকদের দায়িত্ব।

তিনি বলেন, উৎসবের আনন্দময় স্মৃতি মানুষের মধ্যে নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতি ভালোবাসা বাড়ায়। তাই আয়োজনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দর্শনার্থীদের স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করতে হবে।

আগামী ১৬ অক্টোবর থেকে শুরু হতে যাওয়া শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে জেলা প্রশাসনের প্রস্তুতির কথাও তুলে ধরেন জাহিদুল ইসলাম মিঞা।

তিনি জানান, পূজার প্রস্তুতি নিয়ে ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সভা হয়েছে। সরকার এবারের উৎসবের জন্য বরাদ্দ বাড়িয়েছে। দর্শনার্থীদের উপস্থিতি বেশি হতে পারে, এমন বিবেচনায় নিরাপত্তা ও সার্বিক ব্যবস্থাপনায় গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

জেলা প্রশাসক বলেন, শনিবার তিনি হাটহাজারীর একটি পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেছেন। অন্যান্য মণ্ডপের প্রস্তুতিও পর্যবেক্ষণ করা হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি আয়োজক ও স্বেচ্ছাসেবকদের সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে দুর্গাপূজা উদ্‌যাপনে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সহযোগিতার আশ্বাস দেন তিনি।

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য রক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের মিলেমিশে বসবাস বাংলাদেশের অন্যতম শক্তি। এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে সবার আন্তরিক প্রচেষ্টা প্রয়োজন।

পরে আয়োজকদের ধন্যবাদ জানিয়ে শুভ মহালয়া অনুষ্ঠানের উদ্বোধন ঘোষণা করেন জেলা প্রশাসক।

জলাবদ্ধতা নিরসনে নাগরিকদের দায়িত্বশীল হতে হবে: মেয়র

ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: Saturday, 10 October, 2026, 6:17 pm
জলাবদ্ধতা নিরসনে নাগরিকদের দায়িত্বশীল হতে হবে: মেয়র

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেছেন, শহরকে নিজের শহর হিসেবে মনে করে এর সম্পদ, পরিবেশ ও সৌন্দর্য রক্ষায় প্রত্যেক নাগরিককে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। নাগরিকদের সচেতনতা, দায়িত্ববোধ ও সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া জলাবদ্ধতাসহ নগরীর কোনো সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

শনিবার (১০ অক্টোবর) চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের জলাবদ্ধতা নিরসনে শিক্ষার্থী-অভিভাবক উদ্বুদ্ধকরণ কমিটির কার্যক্রমের শুভ উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রধান শিক্ষা কর্মকর্তা ও উপসচিব ড.কিসিঞ্জার চাকমা।

মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, এই শহর শুধু আমার শহর নয়। এই শহরে আমাদের পূর্বপুরুষরা ছিলেন, আমরা আছি এবং আমাদের সন্তান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এখানে বসবাস করবে। আমরা যতদিন পর্যন্ত মনে করতে না পারব যে এই শহর আমার, ততদিন সত্যিকার অর্থে শহরকে সুন্দর ও বাসযোগ্য রাখা সম্ভব হবে না। শহরের প্রতি এই মালিকানাবোধ ও দায়িত্ববোধ প্রতিটি নাগরিকের মধ্যে তৈরি করতে হবে।

তিনি বলেন, চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। কিন্তু শুধু অবকাঠামোগত প্রকল্প দিয়ে জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। খাল-নালা ও ড্রেন পরিষ্কার রাখার পাশাপাশি যেখানে-সেখানে ময়লা-আবর্জনা না ফেলা, নালা-নর্দমায় বর্জ্য না ফেলা এবং পানি চলাচলের পথ দখল বা বাধাগ্রস্ত না করার বিষয়ে নাগরিকদের সচেতন হতে হবে। নাগরিক সচেতনতা ছাড়া জলাবদ্ধতা নিরসনের কোনো উদ্যোগই পুরোপুরি সফল হবে না।

মেয়র আরও বলেন, আমরা অনেক সময় কোনো অনিয়ম দেখলে নিজের দায়িত্ব পালন না করে শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা করি। কিন্তু একজন নাগরিক হিসেবে অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করাও আমাদের দায়িত্ব। গতকাল বাংলাদেশের প্রথম ২ দশমিক ২ কিলোমিটার সাইকেল ট্র্যাক পরিদর্শন করেছি। আজ সেখানে একটি লরি রাখা হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এটি কি আমাদের নাগরিক দায়িত্ববোধের পরিচয়? কেউ যদি সাইকেল ট্র্যাক দখল করে, ফুটপাত দখল করে বা নগরীর কোনো স্থাপনা নষ্ট করে, তাহলে শুধু মেয়র বা সিটি কর্পোরেশনকে দোষারোপ না করে নাগরিকদেরও প্রতিবাদ করতে হবে।

তিনি বলেন, ফুটপাত পথচারীদের চলাচলের জন্য, ব্যক্তিগত গাড়ি রাখার জন্য নয়। কিন্তু আমরা নিজেরাই ফুটপাত দখল করে গাড়ি রাখছি, আবার ফুটপাত দখলমুক্ত করতে গেলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সমালোচনা করছি। এভাবে একটি শহরকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা সম্ভব নয়। অনিয়মকারীর বিরুদ্ধে যেমন ব্যবস্থা নিতে হবে, তেমনি নাগরিকদেরও অনিয়মের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হবে।

মেয়র বলেন, শুধু সচেতনতার কথা বললেই হবে না, আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও কার্যকর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। মানুষ যখন দেখবে কোনো অনিয়মের জন্য জরিমানা বা শাস্তির মুখোমুখি হতে হচ্ছে, তখন অন্যরাও আইন মেনে চলতে উৎসাহিত হবে। গণসচেতনতা তখনই কার্যকর হয়, যখন তার সঙ্গে আইনের প্রয়োগ ও দৃশ্যমান জবাবদিহি নিশ্চিত করা যায়।

তিনি বলেন, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নগরীর বিভিন্ন স্থানে বিপুলসংখ্যক ডাস্টবিন স্থাপন করেছে। কিন্তু অনেক ডাস্টবিন চুরি হয়ে যাচ্ছে। নগরীর কোনো সম্পদ চুরি হতে দেখলে সেটিকে নিজের সম্পদ মনে করে নাগরিকদের প্রতিবাদ করতে হবে। একইভাবে নগরীর সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য লাগানো গাছ, স্থাপনা কিংবা অন্যান্য অবকাঠামো কেউ ক্ষতিগ্রস্ত করলে বা নিয়ে গেলে সেটিও প্রতিরোধ করা নাগরিকদের দায়িত্ব। কারণ এসব সম্পদ জনগণের টাকায় তৈরি; এগুলোর ওপর প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার রয়েছে।

মেয়র বলেন, চট্টগ্রামকে গ্রিন, ক্লিন, হেলদি ও সেফ সিটি হিসেবে গড়ে তুলতে হলে সিটি কর্পোরেশনের পাশাপাশি নাগরিক সমাজ, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষকসহ সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। বিশেষ করে শিক্ষার্থীরা সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের দূত হিসেবে কাজ করতে পারে। একজন শিক্ষার্থী তার পরিবারকে সচেতন করতে পারে, পরিবার থেকে সেই সচেতনতা সমাজে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এভাবেই একটি সচেতনতামূলক কর্মসূচি ধীরে ধীরে সামাজিক আন্দোলনে রূপ নিতে পারে।

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, জলাবদ্ধতা নিরসনে নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন পরিচালিত ৭২টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৫২ হাজার শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবারের সদস্যসহ প্রায় ২ লাখ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মেয়রের নির্দেশনায় গত ৬ আগস্ট ২০২৬ তারিখে ২০ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। পরবর্তীতে উপদেষ্টাদের পরামর্শে ১০৩ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ৭২টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রাতিষ্ঠানিক কমিটি গঠন সম্পন্ন হয়েছে।

এ কার্যক্রমের আওতায় পরিচ্ছন্নতা অভিযান, লিফলেট ও স্টিকার বিতরণ, প্রচার অভিযান, বিতর্ক, রচনা ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা এবং গ্রিন অ্যাম্বাসেডর ঘোষণাসহ সাত দফা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া প্রতিটি শ্রেণিকে পাঁচ ভাগে ভাগ করে সপ্তাহের পাঁচ দিন পরিচ্ছন্নতার দায়িত্ব পালন, শিক্ষার্থীদের পরিচ্ছন্নতার শপথ পাঠ, প্রতি মাসে দুইবার প্রাতিষ্ঠানিক পরিচ্ছন্নতা অভিযান এবং প্রতি দুই মাসে অভিভাবক সমাবেশ আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিটি শিক্ষার্থীর মাধ্যমে তার পরিবারে পরিচ্ছন্নতা ও জলাবদ্ধতা নিরসনের বার্তা পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

মেয়র বলেন, শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে অভিভাবক, অভিভাবকের মাধ্যমে পরিবার ও সমাজকে সম্পৃক্ত করে জলাবদ্ধতা নিরসনে একটি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। নগরীর খাল, নালা, ড্রেন ও জলপ্রবাহের পথ পরিষ্কার রাখার পাশাপাশি যত্রতত্র বর্জ্য ফেলা বন্ধ করতে হবে। শুধু সিটি কর্পোরেশনের কর্মীদের ওপর নির্ভর করলে হবে না; নাগরিকদের নিজেদের দায়িত্বও পালন করতে হবে।

তিনি বলেন, চট্টগ্রামকে একটি পরিকল্পিত, পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে হলে আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন প্রয়োজন। শুধু সমালোচনা নয়, ইতিবাচক কাজে অংশগ্রহণ করতে হবে। অনিয়ম দেখলে প্রতিবাদ করতে হবে, নিজেরাও আইন মেনে চলতে হবে এবং অন্যদের আইন মানতে উৎসাহিত করতে হবে। তাহলেই আমরা সম্মিলিতভাবে একটি সুন্দর চট্টগ্রাম গড়ে তুলতে পারব।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রধান শিক্ষা কর্মকর্তা ড. কিসিঞ্জার চাকমা,চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সভাপতি জাহিদুল আলম কচি এবং থিয়েটার ইনস্টিটিউট চট্টগ্রামের পরিচালক ওভিক ওসমান। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক আব্দুল হক। সদস্য সচিব মো. জাহাঙ্গীর আলম সিকদারের তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন রোমিলা বড়ুয়া।