আইসিইউর দরজার সামনে তখন নীরব আতঙ্ক। ভেতরে লাইফ সাপোর্টে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে ১২ বছরের এক শিশু। চোখের নিচ দিয়ে ঢুকে যাওয়া গুলি তার মস্তিষ্কের বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। পাশে কান্নায় ভেঙে পড়া পরিবার। হাসপাতালের করিডোরজুড়ে উৎকণ্ঠা আর অসহায় অপেক্ষা।
ঠিক এমন সময় সেখানে উপস্থিত হন সারা দেশে মানবিক ডিসি হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়, কোনো প্রটোকল নয়—একজন প্রশাসক নয়, যেন একজন অভিভাবক হিসেবেই তিনি ছুটে যান গুলিবিদ্ধ শিশু রেশমা আক্তারের শয্যার পাশে।
চট্টগ্রাম নগরীর বায়েজিদ থানাধীন রৌফাবাদ শহীদ মিনার গলি এলাকায় গতকাল বৃহস্পতিবার
রাত আনুমানিক ৯টা ৫০ মিনিটে ৫ থেকে ৬ জন মুখোশধারী সন্ত্রাসী যুবক হাসান ওরফে রাজুকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। এতে হাসান ঘটনাস্থলেই নিহত হন। আর সেই গোলাগুলির শিকার হয় পথচারী নিরীহ শিশু রেশমা আক্তার। পরিবারের জন্য পান আনতে বাসা থেকে বের হয়েছিল সে।
গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাকে দ্রুত নগরীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে তাকে আইসিইউতে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়।
ঘটনার খবর পেয়ে আজ শুক্রবার (৮ মে) হাসপাতালে যান জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম। সঙ্গে ছিলেন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ মাহবুবুল হক। আইসিইউতে থাকা শিশুটির শারীরিক অবস্থার খোঁজ নেন তিনি। চিকিৎসকদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কথা বলেন। নিজে হাতে রেশমার সিটি স্ক্যান রিপোর্টও দেখেন।
চিকিৎসকেরা তাকে জানান, শিশুটির অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন। গুলিটি চোখের ভেতর দিয়ে ঢুকে মস্তিষ্কে মারাত্মক ক্ষতি করেছে। কথাগুলো শুনে দৃশ্যত আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন জেলা প্রশাসক।
হাসপাতালে উপস্থিত কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, রেশমার মায়ের কান্না শুনে কিছু সময় নীরবে দাঁড়িয়ে ছিলেন জেলা প্রশাসক। পরে পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দেন এবং তাদের আর্থিক সংকটের বিষয়টি জানতে পেরে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক নগদ আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন।
তবে সেখানে গিয়ে শুধু সহানুভূতি প্রকাশ করেই থেমে থাকেননি তিনি। চিকিৎসকদের উদ্দেশে বলেন, শিশুটির চিকিৎসায় যেন কোনো ধরনের অবহেলা না হয়। সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার অনুরোধ জানান তিনি।
জেলা প্রশাসক সাংবাদিকদের বলেন, “একজন নিরীহ শিশুর এভাবে সন্ত্রাসের শিকার হওয়া অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। এই ঘটনা মানবিকভাবে আমাদের সবাইকে নাড়া দিয়েছে। কোনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডকেই ছাড় দেওয়া হবে না।”
তিনি আরও বলেন, “ঘটনার খবর পাওয়ার পর থেকেই আমি নিয়মিত খোঁজখবর নিচ্ছি। এটি অবশ্যই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির একটি ঘটনা। বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও পুলিশ সুপারের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কাজ করছে। যারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে, তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার জন্য আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করছি।”
চট্টগ্রামে সন্ত্রাস ও অস্ত্রধারী অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথাও পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
তিনি বলেন,“যেভাবে জঙ্গল সলিমপুরে অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে অপরাধীদের বিতাড়িত করে একসময়কার অপরাধের অভয়ারণ্যকে প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে, ঠিক একইভাবে এ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
রেশমার পরিবারের আর্থিক দুরবস্থার কথাও তুলে ধরেন জেলা প্রশাসক। তিনি বলেন, শিশুটির বাবা মোঃ রিয়াজ আহমেদ একজন প্রতিবন্ধী ও অত্যন্ত অসহায় মানুষ। পান বিক্রি করে তিনি পাঁচ সন্তানের সংসার চালান। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।
কিন্তু রেশমার জন্য জেলা প্রশাসকের ব্যস্ততা সেখানেই শেষ হয়নি। পরবর্তীতে শিশুটির শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হলে চিকিৎসকেরা তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেন। বিষয়টি জানামাত্র জেলা প্রশাসক নিজেই ফোন করেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দীনকে।
তিনি অনুরোধ জানান, শিশুটিকে দ্রুত আইসিইউতে ভর্তি করে জরুরি অপারেশনের ব্যবস্থা করতে।
একই সঙ্গে রেশমার ভাই মো. এজাজ হোসেনের সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করেন তিনি। অ্যাম্বুলেন্সে থাকায় ফোন রিসিভ করতে না পারলেও পরে জেলা প্রশাসকের স্টাফ অফিসার তাকে ফোন করে জানান, ডিসি ইতিমধ্যেই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং রেশমার চিকিৎসায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দীন বলেন, “জেলা প্রশাসক নিজেও হাসপাতাল পরিচালনা কমিটির একজন সদস্য। তিনি বিভিন্ন সময় দরিদ্র ও অসহায় রোগীদের জন্য ফোন করে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে চিকিৎসার অনুরোধ করেন। আজও রেশমার সুচিকিৎসার জন্য ফোন করেছেন। আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে শিশুটির চিকিৎসা করব।”
রেশমার ভাই মো. এজাজ হোসেন বলেন, “একজন জেলা প্রশাসক ছুটির দিনেও আমাদের মতো সাধারণ পরিবারের পাশে দাঁড়াতে সরাসরি হাসপাতালে এসেছেন। শুধু আর্থিক সহায়তা দিয়েই দায়িত্ব শেষ করেননি, পরে আবার ফোন করে চিকিৎসার খোঁজ নিয়েছেন। তিনি সত্যিই একজন মানবিক জেলা প্রশাসক।”
বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামোয় জেলা প্রশাসকের পদ সাধারণত ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের প্রতীক হিসেবেই বেশি পরিচিত। তবে চট্টগ্রামের এই ঘটনায় উঠে এসেছে ভিন্ন এক চিত্র—একজন প্রশাসক, যিনি আহত এক শিশুর শয্যার পাশে দাঁড়িয়ে শুধু দায়িত্বই পালন করেননি, মানবিকতারও পরিচয় দিয়েছেন।
রক্তাক্ত রেশমার হাসপাতালের বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে হয়তো তিনি একটি শিশুর জীবন ফিরিয়ে দেওয়ার নিশ্চয়তা দিতে পারেননি। কিন্তু অন্তত এই বার্তাটি তিনি দিয়েছেন—রাষ্ট্রের দরজা সাধারণ মানুষের জন্য এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি।
আপনার মতামত লিখুন