আমাদের সাহায্য করুন, যেন দুনিয়া আফগানিস্তানকে ত্যাগ না করে
সাহরা করিমি আফগান চলচ্চিত্র নির্মাতা। চলচ্চিত্রে পিএইচডি করা প্রথম এবং একমাত্র আফগান নারী। ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ছবি নিয়ে এসেছিলেন এই নির্মাতা। তাঁর চলচ্চিত্র ‘হাওয়া’, ‘মরিয়ম’, ‘আয়েশা’ ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে হরাইজন পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিল। আফগানিস্তানের বর্তমান অবস্থা নিয়ে বিশ্বচলচ্চিত্র দরবারে খোলা চিঠি পাঠিয়েছেন সাহরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই চিঠি শেয়ার করেছেন ভারতীয় নির্মাতা অনুরাগ কশ্যপ, চিঠিটি নিয়ে করা ‘ভ্যারাইটি’র প্রতিবেদন শেয়ার করেছেন বাংলাদেশের নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। প্রথম আলোর পাঠকের জন্য চিঠিটি তুলে ধরা হলো।
আমার নাম সাহরা করিমি। আমি একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা এবং ১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত আফগানিস্তানের একমাত্র সরকারি মালিকানাধীন সিনেমা প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান আফগান ফিল্মের বর্তমান মহাপরিচালক।
ভগ্নহৃদয় আর গভীর আশা নিয়ে আপনাদের লিখছি। আফগানিস্তানের চমৎকার জনগণ, বিশেষ করে চিত্রনির্মাতাদের তালেবানের হাত থেকে বাঁচাতে আপনারা আমার সঙ্গে যোগ দিতে পারেন। কয়েক সপ্তাহ ধরে অনেকগুলো প্রদেশ দখল করেছে তালেবান। গণহারে তারা আমাদের মানুষজনকে হত্যা করেছে। অনেক শিশু অপহরণ করেছে তারা। মেয়েদের তারা নিজেদের মানুষজনের কাছে ‘শিশুবধূ’ হিসেবে বিক্রি করে দিয়েছে। পোশাকের জন্য তারা একজন নারীকে খুন করেছে পর্যন্ত। উপড়ে ফেলেছে এক নারীর চোখ। আমাদের প্রিয় এক কৌতুকাভিনেতাকে তারা নিপীড়ন করে মেরে ফেলেছে। আমাদের ঐতিহাসিক একজন কবিকে তারা হত্যা করেছে। সরকারের সংস্কৃতি ও যোগাযোগ বিভাগের প্রধানকে তারা হত্যা করেছে। সরকারসংশ্লিষ্ট মানুষদের তারা গোপনে মেরে ফেলেছে। সবার সামনে তারা আমাদের মানুষদের ফাঁসিতে ঝুলিয়েছে। হাজার হাজার পরিবারকে বাস্তুচ্যুত করেছে। প্রদেশগুলো থেকে পালিয়ে আসা পরিবারগুলো কাবুলের ক্যাম্পে আছে। খুবই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তারা দিনযাপন করছে। ক্যাম্পগুলোতে লুটপাট চলছে। দুধের অভাবে বাচ্চা মারা যাচ্ছে। এটা একটা মানবিক সংকট, এখনো সারা বিশ্ব চুপ করে আছে।
যদিও আমরা জানি এটা ঠিক নয়, তবু এই নীরবতায় আমরা অভ্যস্ত হয়ে উঠছি। আমরা জানি আমাদের মানুষদের ত্যাগ করার এই সিদ্ধান্ত ভুল। এই যে তাড়াহুড়ো করে সৈন্য প্রত্যাহার, এটা বিশ্বাসঘাতকতা। পশ্চিমাদের শীতল যুদ্ধজয়ে আমরা আফগানরা সবকিছু করেছিলাম। তারপর আমাদের জনগণকে ভুলে যাওয়া হলো, যার পরিণতি তালেবান কালো শাসন। ২০ বছরে আমাদের দেশে বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্য যে ব্যাপক অর্জন সাধিত হয়েছিল, সবকিছু হারিয়ে যেতে পারে।
আপনাদের কণ্ঠস্বর আমাদের দরকার। গণমাধ্যম, সরকার এবং বিশ্বমানবাধিকার সংস্থাগুলো তাদের সুবিধামতো নীরব হয়ে আছে। যেন তালেবানের সঙ্গে এই ‘শান্তি চুক্তি’ কোনোকালে বৈধ ছিল। কখনোই এটা বৈধ ছিল না। স্বীকৃতি তাদের ক্ষমতায় আসার আত্মবিশ্বাস দিয়েছে। এ আলোচনা প্রক্রিয়ার পুরো সময়ে তালেবান আমাদের জনগণকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করেছে। আমার দেশে একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে আমি যে কঠোর পরিশ্রম করেছি, তার সবকিছুই বিফলে যাওয়ার ঝুঁকিতে আছে। যদি তালেবানরা ক্ষমতায় যায়, তারা শিল্পকলা নিষিদ্ধ করে দেবে। তাদের পরবর্তী হিটলিস্টে থাকতে পারি আমি ও অন্যান্য নির্মাতা।
তারা নারী অধিকারকে চুলোয় পাঠাবে। আমাদের ঘরের ভেতরে ঢুকিয়ে দেওয়া হবে। আমাদের কণ্ঠস্বর ও অভিব্যক্তিগুলোকে টুঁটি চেপে ধরা হবে। তালেবান যখন ক্ষমতায় ছিল, স্কুলে একটা মেয়েও ছিল না। এখন ৯০ লাখেরও বেশি আফগান মেয়ে স্কুলে আছে। অবিশ্বাস্য হচ্ছে হেরাতের বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থীর ৫০ শতাংশই নারী। তালেবানের কাছে তৃতীয় বৃহত্তম এই শহরটির সদ্যই পতন হয়েছে। অবিশ্বাস্য এসব অর্জন সম্পর্কে খুব কমই জানে বিশ্ব। সামান্য এই কয়েক সপ্তাহে অনেকগুলো স্কুল ধ্বংস করেছে তালেবানরা। আবারও ২০ লাখ মেয়েকে জোর করে স্কুল থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে।
এই দুনিয়াকে আমি বুঝি না। এই নীরবতাও আমি বুঝি না। এখানেই আমি রয়ে যাব, আমার দেশের জন্য লড়ে যাব। কিন্তু একা আমি এটা করতে পারব না। আপনাদের মতো মিত্র আমার দরকার। আমাদের এখানে যা ঘটছে, দুনিয়াকে তা জানানোর কাজে আমাদের সাহায্য করুন প্লিজ। এখানে, এই আফগানিস্তানে যা ঘটছে, আপনার দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যমকে তা অবহিত করে আমাদের সাহায্য করুন প্লিজ। আফগানিস্তানের বাইরে আমাদের কণ্ঠস্বর হোন। তালেবান যদি কাবুল দখল করে নেয়, ইন্টারনেট বা যোগাযোগের অন্য মাধ্যমে ব্যবহারের সুযোগ আর আদৌ হয়তো আমাদের থাকবে না। আমাদের কণ্ঠস্বর হওয়ার কাজে আপনাদের চলচ্চিত্রকার, শিল্পীদের নিয়োজিত করুন।
এটা কোনো গৃহযুদ্ধ না, এটা প্রক্সি যুদ্ধ। এটা একটা আরোপিত যুদ্ধ। তালেবানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকাণ্ডের জের এই যুদ্ধ। যতটা পারেন, এসব তথ্য আপনাদের মিডিয়ায় শেয়ার করুন, আপনাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমাদের নিয়ে লিখুন।
দুনিয়ার উচিত হবে না আমাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া। আফগান নারী, শিশু, শিল্পী ও চলচ্চিত্রকারদের হয়ে আপনার কণ্ঠ ও সমর্থন আমাদের দরকার। এ মুহূর্তে এই সমর্থনটাই হতে পারে আমাদের জন্য সর্বোচ্চ সাহায্য, এটাই আমাদের এখন সবচেয়ে বেশি দরকার।
আমাদের সাহায্য করুন, যেন দুনিয়া আফগানিস্তানকে ত্যাগ না করে, তালেবান কাবুল দখল করে নেওয়ার আগেই আমাদের সাহায্য করুন। হাতে আমাদের অল্প সময়, হয়তো কয়েকটা দিন মাত্র আছে। আপনাদের অনেক ধন্যবাদ। অন্তর থেকে আপনাদের বিশুদ্ধ ও সাচ্চা দিলের আমি প্রশংসা করি।
বিনীত
সাহরা করিমি
এন-কে


আপনার মতামত লিখুন