৩৫০ বছরের পুরোনো ছবির রহস্য উদ্ঘাটন
খোলা জানালার সামনে হাতে এক চিঠি নিয়ে দাঁড়িয়ে তরুণী। জানালায় তারই প্রতিচ্ছবি। একদৃষ্টিতে সেই চিঠির দিকে তাকিয়ে থাকা একটি তরুণীর ৩৫০ বছরের পুরোনো এক পেইন্টিং। খুব সাধারণ একটি ছবি মনে হলেও যেন সাধারণ নয়।
এই একটি ছবি ইতিহাসবিদদের ভাবিয়ে তুলেছে তিন শতাব্দী ধরে, যা নিয়ে আলোচনার শেষ নেই। প্রশ্নের শেষ নেই। বারবারই চিত্রকর্মটি পর্যবেক্ষণে নতুন নতুন তথ্য বেরিয়ে এসে দ্বিধাদ্বন্দ্বের সৃষ্টি করছে। ডাচ স্বর্ণযুগের একজন সফল চিত্রশিল্পী জোহানেস ভার্মির।
তার আঁকা ছবিগুলো প্রথম দেখায় অতি সাধারণ মনে হতে পারে। তবে এর মাঝে লুকিয়ে থাকে এক ভিন্ন বার্তা বা রহস্য বলা যেতে পারে। তেমনি একটি ছবি ‘গার্ল রিডিং এ লেটার অ্যাট অ্যান ওপেন উইন্ডো’ যার মাঝে ভার্মির লুকানো রহস্য উদ্ঘাটনে পিছু ছাড়ছেন না ইতিহাসবিদরা।
জার্মানির ড্রেসডেনে ভার্মির সকল কাজ, ছবিগুলো সংরক্ষিত আছে। সেখানকার একটি ছবি নিয়েই তুমুল আলোড়ন। খোলা জানালার সামনে চিঠি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা তরুণী, ১৬৫৭ সালে জোহাসের ভার্মিরের আঁকা সব থেকে রহস্যময় ছবিগুলোর একটি এই ‘গার্ল রিডিং এ লেটার অ্যাট অ্যান ওপেন উইন্ডো’। রহস্য কেন বলছি? কারণ, ইতিহাসবিদদের দাবি, ছবিটির মধ্যে ভার্মির একটি বার্তা দিতে চেয়েছেন। কিন্তু কী সেই বার্তা, তা একেকজন শতাব্দীর পর শতাব্দী একেকভাবে ব্যাখ্যা করে যাচ্ছেন, যা এখনো অবধি চলমান।
দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর ১৯৭৯ সালে এক এক্স-রে রিপোর্টের বদৌলতে সামনে আসে, ছবিতে একটি কিউপিডের স্মারক চিত্রকর্ম রয়েছে, যা প্রেমের রহস্যের কথা বলছে। কিউপিডের উন্মোচন চিঠির ধরনটিকে স্পষ্ট করে বলে দাবি করা হয়, ভার্মির তুলির আঁচড়ে প্রেম ও সুরের দেবতার বহিঃপ্রকাশ করেছেন। কিউপিড অর্থাৎ রোমানদের প্রণয়ের দেবতা বলা হয় যাকে। মেয়েটির চিঠি পড়ার বার্তায় ভালোবাসা, আবেগ-আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করার চেষ্টা করেছেন ভার্মির।
এর আগে এক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ওল্ড মাস্টার্স পিকচার গ্যালারির পরিচালক ও ইতিহাসবিদ স্টিফান কোজা বলেছিলেন, ভার্মির সত্যিকার অর্থে একজন পারফেকশনিস্ট। তিনি বেশ কয়েকবার কম্পোজিশন করে কিউপিডটিকে বিমূত করেছেন।
তবে ২০১৭ সালে, পেইন্টিংটি পরিষ্কারের কাজ শুরু করলে বেরিয়ে আসে নতুন তথ্য। গ্যালারিটির পরিচালক কোজা জানান, পেইন্টিংটির ধারাবাহিকতায় ভিন্নতা রয়েছে, ছবির সেই তরুণীর পেছনে খালি প্রাচীরের ভিন্ন রঙের বার্নিশ ছিল।
এদিকে, যখন গবেষকরা আর্কিওমেট্রি ল্যাবরেটরিতে নমুনাগুলো খুঁটিয়ে দেখছিলেন, তখন পেইন্টের স্তরের মধ্যে ময়লা লুকিয়ে থাকতে দেখেন তারা। কয়েক বছর সেটিকে আলোর নিচেও রাখা হয়, গবেষকরা অনুমান করেন, অনেকটা সময় পর এসে অন্য কোনো ব্যক্তি ছবিটিতে ওভারপেইন্ট করেছেন।
হয়তো আঠারো শতকের দিকে ছবিটিতে পুনরায় পেইন্ট করা হয়েছে। অর্থাৎ. এতসব গবেষণা, অনুসন্ধানের পর গবেষকরা দাবি করছেন ভার্মির এই ছবিটিতে তার মৃত্যুর পর তার মতো অন্য কোনো শিল্পীই পুনরায় ওভারপেইন্ট করেছেন। তবে, ‘গার্ল রিডিং এ লেটার অ্যাট অ্যান ওপেন উইন্ডো’-তে কিউপিড কে এঁকেছেন বা কেন করেছেন, তা হয়তো কখনো সমাধান করা সম্ভব হয়ে উঠবে না। পেইন্টিংটি আঠারো শতকের গোড়ার দিকে একটি ফরাসি সংগ্রহ থেকে এসেছিল। যখন খুব বেশি পরিচিতি ছিল না ভার্মির।
পেইন্টিংটিকে তার নতুন সংশোধনরূপে অর্থাৎ সেই কিউপিড নিয়ে পুনরায় প্রদর্শনের বিষয়টি নিয়ে, বর্তমানে জার্মান শহরের ড্রেসডেনের একটি গ্যালারি বিশ্বের শীর্ষ এই চিত্রশিল্পী ভার্মির ভক্তদের, উচ্চ প্রযুক্তির ইমেজিং কৌশল এবং প্রচুর নগদ অর্থ সংগ্রহ করছেন।
ছবিটি পুনরুদ্ধারের শুরুর সময় থেকে এখন অবধি এটি একটি আইকনিক চিত্রের আমূল পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন গবেষকরা। কিন্তু সর্বোপরি, বিশ্লেষকরা এই ৩৫০ বছরের পুরোনো পেইন্টিংকে ঘিরে একটি প্রশ্ন রেখেছেন, কিউপিডের উন্মোচনের পর ছবির সেই চিঠিটিকে আত্মিক নাকি শারীরিক কোনো ভালোবাসাকে ইঙ্গিত করেছেন চিত্রশিল্পী ভার্মির।
এন-কে


আপনার মতামত লিখুন