খুঁজুন
, ,

দখল-দূষণে অস্তিত্ব সংকটে কর্ণফুলী

ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: Saturday, 4 July, 2026, 9:25 am
দখল-দূষণে অস্তিত্ব সংকটে কর্ণফুলী

একসময় চট্টগ্রামের প্রাণ হিসেবে পরিচিত কর্ণফুলী নদী আজ দখল, দূষণ ও অপরিকল্পিত শিল্পায়নের চাপে ক্রমেই প্রাণহীন হয়ে পড়ছে। যে নদীকে ঘিরে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর, শিল্পাঞ্চল ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের বিকাশ ঘটেছে, সেই নদীতেই এখন প্রতিদিন বিনা বাধায় ফেলা হচ্ছে শিল্পকারখানার অপরিশোধিত রাসায়নিক বর্জ্য, নগরের পয়োবর্জ্য, প্লাস্টিক-পলিথিন, গৃহস্থালির কঠিন বর্জ্য এবং কৃষিতে ব্যবহূত বিভিন্ন রাসায়নিক। দীর্ঘদিনের এই অনিয়ন্ত্রিত দূষণে কর্ণফুলীর পানি, তলদেশ, জীববৈচিত্র্য এবং নদীনির্ভর মানুষের জীবন-জীবিকা ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে পড়েছে। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সাম্প্রতিক সমীক্ষাও সেই উদ্বেগকেই আরো স্পষ্ট করেছে।

জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সমীক্ষা অনুযায়ী, কর্ণফুলী নদীর ৭৯টি স্থানে দূষণের চিহ্ন পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ৭৭টি স্থানেই দূষণের মাত্রা ভয়াবহ। শুধু চট্টগ্রাম নগরীতেই ২৩টি স্থান দিয়ে দূষণকারী বর্জ্য নদীতে পড়ছে। নগরের ১৯টি খাল এখন কার্যত শিল্প ও গৃহস্থালির বর্জ্য বহনের নালায় পরিণত হয়েছে। এসব খাল দিয়ে প্রতিদিন ডায়িং কারখানা, বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান, গৃহস্থালি এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের তরল ও কঠিন বর্জ্য সরাসরি কর্ণফুলীতে গিয়ে মিশছে। একই চিত্র দেখা যাচ্ছে রাঙ্গুনিয়া, বোয়ালখালী ও কর্ণফুলী উপজেলা জুড়েও।

সমীক্ষায় উঠে এসেছে, কর্ণফুলী উপজেলার নদী তীরে গড়ে ওঠা সিমেন্ট কারখানা, তেল শোধনাগার, চিনি শিল্প, ফিশিং কমপ্লেক্স, বিদ্যুেকন্দ্র, জাহাজ নির্মাণ ও মেরামত শিল্প থেকে প্রতিনিয়ত বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত বর্জ্য নদীতে ফেলা হচ্ছে। নগরের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চল, ডায়িং কারখানা, তেলের ডিপো, সার কারখানা এবং অন্যান্য শিল্পপ্রতিষ্ঠানের রাসায়নিক বর্জ্য ড্রেন ও খালের মাধ্যমে সরাসরি নদীতে গিয়ে পড়ছে। কৃষিজমিতে ব্যবহূত কীটনাশক ও রাসায়নিক সারও বৃষ্টির পানি ও খালের মাধ্যমে নদীতে মিশে দূষণের মাত্রা আরো বাড়িয়ে তুলছে।

চট্টগ্রাম ওয়াসার তথ্য উদ্ধৃত করে সমীক্ষায় বলা হয়েছে, নগরীতে প্রতিদিন প্রায় সাড়ে ৩ কোটি লিটার স্যুয়ারেজ বর্জ্য উত্পন্ন হয়। কার্যকর স্যুয়ারেজ ব্যবস্থা না থাকায় এর অধিকাংশই কোনো ধরনের পরিশোধন ছাড়াই কর্ণফুলীতে গিয়ে পড়ে। এর সঙ্গে যোগ হচ্ছে বিভিন্ন শিল্পকারখানার অপরিশোধিত তরল বর্জ্য। পরিবেশ অধিদপ্তরের ২০১৬ সালের জরিপেও উল্লেখ করা হয়েছিল, প্রতিদিন প্রায় ১৫ থেকে ২০ কোটি লিটার গৃহস্থালি ও পয়োবর্জ্য নদীতে পতিত হচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে এভাবে দূষিত বর্জ্য জমতে জমতে নদীর পানির স্বাভাবিক গুণাগুণ নষ্ট হচ্ছে, কমছে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ এবং ধীরে ধীরে ধ্বংস হচ্ছে নদীর প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র।

কর্ণফুলীর আরেকটি বড় সংকট হয়ে উঠেছে প্লাস্টিক ও পলিথিন দূষণ। রাউজান থেকে মোহনা পর্যন্ত নদীর বিস্তীর্ণ এলাকায় প্লাস্টিক বর্জ্যের স্তর জমে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাচ্ছে। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সমীক্ষায় বলা হয়েছে, প্রতিদিন প্রায় ২৫০ মেট্রিক টন প্লাস্টিক ও পলিথিন বর্জ্য নগরী থেকে বিভিন্ন খাল ও নালার মাধ্যমে কর্ণফুলীতে এসে পড়ে। গবেষণা সংস্থা সিপিডির এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের উপকূলীয় নদীগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি, প্রায় ৩৯ শতাংশ প্লাস্টিক বর্জ্য জমা হচ্ছে কর্ণফুলী নদীতে। এই প্লাস্টিক নদীর তলদেশে জমে শুধু নাব্যতা কমাচ্ছে না, মাছ, জলজ উদ্ভিদ এবং অন্যান্য প্রাণীর স্বাভাবিক জীবনচক্রও ব্যাহত করছে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ নদী ড্রেজিং করতে গিয়ে নদীর তলদেশে দুই থেকে তিন মিটার পুরু পলিথিন ও প্লাস্টিকের স্তর পাওয়া গেছে। ড্রেজারের পাইপে বারবার প্লাস্টিক আটকে যাওয়ায় স্বাভাবিক খনন কার্যক্রম ব্যাহত হয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, নদীর তলদেশে এভাবে প্লাস্টিক জমতে থাকলে ভবিষ্যতে নাব্যতা রক্ষা আরো কঠিন হয়ে পড়বে।

সরেজমিনে শাহ আমানত সেতু, চাক্তাই ও রাজাখালী খাল এলাকায় দেখা গেছে, নদীর তীর জুড়ে ছড়িয়ে আছে পলিথিন, প্লাস্টিক ও নানা ধরনের কঠিন বর্জ্য। কোথাও কোথাও বর্জ্য জমে পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেছে। চাক্তাই ও রাজাখালী খাল দিয়ে প্রবাহিত কালো, দুর্গন্ধযুক্ত রাসায়নিক মিশ্রিত পানি সরাসরি কর্ণফুলীতে গিয়ে পড়ছে। একই চিত্র বোয়ালখালীর কালুরঘাট, শিকলবাহা, গোমদণ্ডী, শাকপুরা, পতেঙ্গা, কর্ণফুলী উপজেলা এবং নাসিরাবাদ শিল্পাঞ্চলসংলগ্ন এলাকাতেও দেখা যায়। বিভিন্ন শিল্পকারখানার বর্জ্য খাল ও ড্রেনের মাধ্যমে নিরবচ্ছিন্নভাবে নদীতে প্রবাহিত হচ্ছে।

চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালি-বাকলিয়া) আসনের সংসদ সদস্য আবু সুফিয়ান বলেন, চট্টগ্রামের প্রাণ কর্ণফুলী নদী আজ দখলে দূষণে বিপর্যস্ত। নদীর তীর দখল করে বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। যার কারণে কর্ণফুলী ক্রমশ সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। এছাড়া প্রতিদিন ৩৭টি খাল দিয়ে নগরীর কয়েক হাজার টন প্লাস্টিক, পলিথিন ও মানবসৃষ্ট বর্জ্য নদীতে এসে পড়ছে। এতে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে জীববৈচিত্রকে হুমকির মধ্যে ফেলেছে। মাছের প্রজাতি বিলুপ্ত হচ্ছে। তাই কর্ণফুলীর প্রতি দায়িত্বশীল হওয়া এবং নদীকে জীবন্ত রাখা দেশের সমৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত জরুরি। তাই কর্ণফুলীর অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ বর্জ্য শোধনাগার স্থাপনসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর হওয়া এবং জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করার পদক্ষেপ নিতে হবে।

Feb2
Feb2

মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কারাগারে শ্যামল-মোজাম্মেল-রুপা

ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: Monday, 24 August, 2026, 2:52 pm
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কারাগারে শ্যামল-মোজাম্মেল-রুপা

চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্ন করার নামে উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তিন সাংবাদিককে গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। একইসঙ্গে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ২৫ অক্টোবর দিন ধার্য করা হয়েছে।

সোমবার (২৪ আগস্ট) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর সদস্য বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ আদেশ দেন। প্যানেলের অপর সদস্য বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।

তিন সাংবাদিক হলেন, জাতীয় প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্ত, একাত্তর টেলিভিশনের সাবেক প্রধান সম্পাদক মোজাম্মেল বাবু এবং একই প্রতিষ্ঠানের সাবেক প্রধান প্রতিবেদক ফারজানা রুপা।

ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ। সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর জহিরুল আমিন, মার্জিনা রায়হান, তারেক আবদুল্লাহসহ অন্যান্য প্রসিকিউটর।

শুনানিতে প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ জানান, জুলাই গণঅভ্যুত্থান-সংশ্লিষ্ট মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় তিন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ১৭ আগস্ট প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট জারি করা হয়েছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে তাদের আজ ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়েছে। এ মামলায় তিনজনকেই গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর আবেদন করছে প্রসিকিউশন। একইসঙ্গে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য দুই মাস সময় চান তিনি।

শুনানি শেষে প্রসিকিউশনের আবেদন মঞ্জুর করে শ্যামল দত্ত, মোজাম্মেল বাবু ও ফারজানা রুপাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। পাশাপাশি তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য পরবর্তী তারিখ নির্ধারণ করা হয়।

প্রসিকিউশন জানায়, ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই গণভবনে একটি সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওই দিন তাকে প্রশ্ন করার নামে কিছু উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়েছিলেন কয়েকজন সাংবাদিক। এর পরিপ্রেক্ষিতে আন্দোলনকারীদের রাজাকারের বাচ্চা ও রাজাকারের নাতিপুতি বলেছিলেন শেখ হাসিনা।

রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ, ওই উসকানিমূলক প্ররোচনার ধারাবাহিকতায় জুলাইয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়। এ মামলায় ১৪ জুলাইয়ের ওই ঘটনার বিষয়ে তদন্ত চলছে।

নুসরাত হত্যা : হাইকোর্টে দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড, ১০ জন খালাস

ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: Monday, 24 August, 2026, 1:11 pm
নুসরাত হত্যা : হাইকোর্টে দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড, ১০ জন খালাস

ফেনীর সোনাগাজীর বহুল আলোচিত মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত হত্যা মামলায় সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার বরখাস্ত হওয়া অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলাসহ দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড, ১০ আসামিকে খালাস ও চার আসামিকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দিয়েছেন হাইকোর্ট।

সোমবার (২৪ আগস্ট) দুপুরে বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন।

মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়েছে যে দুই আসামির তারা হলেন-সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা (৫৭) এবং শাহাদাত হোসেন শামীম(২০)।

আলোচিত এই মামলায় ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল ২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর রায় দিয়েছিলেন। রায়ে মাদ্রাসার বরখাস্ত হওয়া অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলাসহ ১৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।

নথিপত্র অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা নিজ কক্ষে ডেকে নিয়ে নুসরাতের শ্লীলতাহানি করেন। এ ঘটনায় মামলা হলে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।

মামলা তুলে না নেওয়ায় ৬ এপ্রিল মাদ্রাসার ছাদে ডেকে নিয়ে নুসরাতের হাত-পা বেঁধে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই বছরের ১০ এপ্রিল নুসরাতের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান (নোমান) সোনাগাজী থানায় মামলা করেন। পরে মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়।

হত্যার দায় স্বীকার অভিযুক্ত দুই খুনি সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসের

ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: Monday, 24 August, 2026, 12:59 pm
হত্যার দায় স্বীকার অভিযুক্ত দুই খুনি সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসের

রংপুর নগরীতে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষকসহ পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার দায় স্বীকার করেছে দুই অভিযুক্ত খুনি সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস। তারা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। জবানবন্দি গ্রহণ শেষে রোববার (২৩ আগস্ট) রাত সাড়ে ১১টার দিকে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন আদালত।

এদিন বিকেল ৫টার দিকে দুই আসামিকে আদালতে হাজির করা হয়। পরে মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতের বিচারক মো. রফিকুল ইসলামের কাছে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন তারা।

বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও কোতয়ালী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মিলন চ্যাটার্জি।

তিনি বলেন, গ্রেপ্তার দুই যুবক আদালতে হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। তারা নিজেদের দায় স্বীকার করায় তাদের আর রিমান্ডে নেওয়ার প্রয়োজন হয়নি। পরে তাদের প্রিজন ভ্যানে করে কারাগারে নেওয়া হয়।

গত শনিবার রাত ১১টার দিকে নগরীর ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের কামাল কাছনা মাছুয়াপাড়া (দাসপাড়া) এলাকার একটি নির্মাণাধীন বাড়ি থেকে এ চারজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

তারা হলেন—রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ভোলা (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী (২৩) ও ছেলে আয়ুস চক্রবর্তী প্রিয়ম (১২)।

নিহতদের মুখ ঝলসানো

এদিকে ভয়াবহ এ হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার চারজনের মুখই ঝলসানো ছিল। তাদের মুখমণ্ডল থেকে দাহ্য (তরল) পদার্থ পাওয়া গেছে। তবে এটি কোনো রাসায়নিক কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয় পুলিশ। ফরেনসিক পরীক্ষার প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পরই এ বিষয়ে স্পষ্ট হওয়া যাবে বলে জানিয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

রোববার সন্ধ্যায় এ তথ্য জানান রংপুর সিআইডির পুলিশ সুপার (ভারপ্রাপ্ত) সুমিত চৌধুরী। ধারণা করা হচ্ছে, হত্যার আগে বা পরে দাহ্য পদার্থ ছিটিয়ে তাদের মুখ ঝলসে দেওয়া হয়েছিল।

সুমিত চৌধুরী বলেন, নিহতদের মুখ প্রাথমিক অবস্থায় বীভৎস বা ঝলসানো ছিল। মুখের কাছে কিছু তরল পড়ে ছিল। তাতে আমরা প্রাথমিকভাবে অনুমান করেছিলাম, কোনো রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়েছে কি না। যে চিকিৎসক ফরেনসিক করবেন, তাকে আমরা এ ব্যাপারে বলেছি। তাদের শরীরে কোনো রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়েছে কি না, ফরেনসিক প্রতিবেদন পেলে এটা নিশ্চিত হতে পারব।

রোববার সন্ধ্যায় রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে চারজনের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে রাতে মরদেহগুলো দখিগঞ্জ শ্মশানে দাহ করা হয়। এ সময় স্বজনেরা চারজনের মুখমণ্ডল ঝলসানো দেখতে পান।

প্রীতিলতার ছোট বোন পূজা চক্রবর্তী বলেন, সন্ধ্যায় মরদেহগুলো হস্তান্তরের পর আমরা দেখতে পাই, তাদের মুখগুলো ঝলসানো। এর আগে পুলিশ আমাদের মরদেহের কাছে যেতে দেয়নি।

তবে মরদেহের ময়নাতদন্তকারী রংপুর মেডিকেলের ফরেনসিক মেডিসিনের ডা. বাবলু কিশোর বিশ্বাস জানান, মরদেহগুলো পঁচে যাবার কারণে দেখতে এমন মনে হচ্ছে, কোনো এসিডে ঝলসানোর ঘটনা নেই।

মামলার এজাহারে যা আছে

এদিকে হত্যাকাণ্ডের এ ঘটনায় রোববার কোতয়ালী থানায় হত্যা মামলা করেছেন নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড়ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী। মামলায় কোনো আসামির নাম উল্লেখ করা হয়নি। অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে করা মামলায় আসামির সংখ্যাও উল্লেখ করা হয়নি।

এজাহার অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার ২০ আগস্ট রাত সাড়ে ১১টার দিকে গণপতির স্ত্রী প্রীতিলতার মোবাইল ফোন থেকে তার ছোট বোন পূজা চক্রবর্তীর সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে কথা হয়। এরপর পরিবারের সদস্যরা ঘুমিয়ে পড়েন। পরদিন শুক্রবার রাত ২টা ৪০ মিনিট থেকে শনিবার রাত ৮টা ৪৫ মিনিটের মধ্যে কোনো এক সময় হত্যাকাণ্ডটি ঘটে বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।

শনিবার রাত ৮টা ৪৫ মিনিটে পূজা আবারও বড় বোন প্রীতিলতাকে ফোন করেন। তখন পরিবারের চারজনের মোবাইল ফোনই বন্ধ পান তিনি। সন্দেহ হওয়ায় রাতে স্বামী বিপুল আচার্যকে নিয়ে বোনের বাড়িতে যান পূজা।

বাড়িটি তখন অন্ধকারে আচ্ছন্ন ছিল। ভেতর থেকেও কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে প্রতিবেশীর বাড়ির ওপর দিয়ে গণপতির বাড়ির ছাদে ওঠেন পূজা। জানালার তালা ভেঙে টর্চের আলোয় ঘরের ভেতর তাকিয়ে তিনি দেখেন, জিনিসপত্র এলোমেলো। একই সঙ্গে বাড়ির ভেতর থেকে পঁচা দুর্গন্ধ বের হচ্ছিল।

এজাহারে আরও বলা হয়েছে, আলমারি, শোকেস, আসবাব, কাপড়চোপড়সহ বিভিন্ন জিনিসপত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল। এতে হত্যার পর ঘটনাটিকে অন্যভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়ে থাকতে পারে বলে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে।

এক মাস আগে প্রভিডেন্ট ফান্ডের ১৫ লাখ টাকা উত্তোলন করেন শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী

রংপুর জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক আবুল কালাম আজাদ বলেন, প্রায় এক মাস আগে গণপতি চক্রবর্তী তার প্রভিডেন্ট ফান্ডের ১৫ লাখ টাকা উত্তোলন করেন। বাড়ির অসম্পূর্ণ কাজ শুরু করবেন বলে তিনি এই টাকা তুলেছিলেন। তবে সেই তিনি টাকা ব্যাংকে রেখেছিলেন নাকি বাড়িতে, তা বলতে পারব না।

গণপতির বড় ভাই ও মামলার বাদী গোপীনাথ চক্রবর্তী বলেন, গণপতি নগরীর দাসপাড়া (মাছুয়াপাড়া) এলাকায় নিজ বাড়িতে বসবাস করতেন। নির্মাণাধীন তিনতলা বাড়িটির দ্বিতীয় তলার কাজ শেষ হয়েছে। বাড়ির অসম্পূর্ণ কাজ শুরু করার কথা ছিল তার।

প্রভিডেন্ট ফান্ডের ১৫ লাখ টাকা সম্পর্কে তিনি কিছুই জানেন না দাবি করে বলেন, ব্যাংকে খোঁজ নিলে এ টাকার তথ্য পাওয়া যাবে। আমরা এখনো খোঁজ নিতে পারিনি।

বাসার ছাদে ইয়াবা সেবন, বাধা দেয়ায় হত্যাকাণ্ড

এদিকে, একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় দুইজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবনের সময় ওই শিক্ষকের কাছে ধরা পড়ে যাওয়ার পর তারা হত্যাকাণ্ড ঘটায় বলে জানিয়েছে পুলিশ।

গ্রেপ্তার দুজন হলেন মুগ্ধ দাস (২৩) ও সিদ্ধার্থ দাস (১৯)। সম্পর্কে তারা আত্মীয় এবং দুজনেরই বাড়ি মাছুয়াপাড়া এলাকায়। রোববার ভোরে তাদেরকে গ্রেপ্তার করা হয়। মুগ্ধ নগরের সিটি বাজারে মাছের দোকানে কাজ করেন আর সিদ্ধার্থ প্রায় আট বছর ধরে একটি জুয়েলারির দোকানে কারিগর হিসেবে কাজ করছেন।

রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ সংবাদ সম্মেলনে বলেন, দুই খুনি মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে পাশের বিল্ডিংয়ের ওপর দিয়ে গণপতির বাড়ির ছাদে আসে। তারা ছাদে বসে ইয়াবা সেবন করছিল। শব্দ পেয়ে গণপতি চক্রবর্তী ছাদে গিয়ে আড্ডা দেওয়ার বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে তার গলায় থাকা গামছা পেঁচিয়ে তাকে হত্যা করা হয়। তার চিৎকার শুনে সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় প্রীতিলতা চক্রবর্তীকেও গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়। এরপর মায়ের চিৎকারে এগিয়ে আসা মেয়ে প্রার্থী চক্রবর্তীকেও গামছা ও রশি দিয়ে গলায় পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়। খুনিরা জানিয়েছে- গামছা দিয়ে পেঁচিয়ে ধরার পরও প্রার্থী চক্রবর্তীর মৃত্যু হচ্ছিল না, প্রায় চার-পাঁচ মিনিট লাগে তার প্রাণ যাওয়ার ক্ষেত্রে। সেই সময় তারা রশি দিয়ে তার গলায় এবং মুখে পেঁচিয়ে ধরে। সর্বশেষে ঘুমন্ত অবস্থায় শিশু প্রিয়মকে কাপড় পেঁচিয়ে ও বালিশচাপা দিয়ে হত্যা করা হয়।

তিনি আরও জানান, হত্যাকাণ্ডের পর অভিযুক্তরা বাসার একটি বাথরুমে গোসল করে, ডাইনিং টেবিলে বসে খেজুর ও অবশিষ্ট ইয়াবা সেবন করে। এরপর জুমার নামাজের সময় রাস্তাঘাট ফাঁকা হলে তারা কিছু স্বর্ণালংকার নিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে যায় এবং সেগুলো নিকটবর্তী একটি মন্দিরের পেছনে পরিত্যক্ত জায়গায় লুকিয়ে রাখে। অভিযুক্তদের দেখানো মতে সেসব আলামত জব্দ করা হয়েছে।

পুলিশ কমিশনার বলেন, তদন্তকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য অভিযুক্তরা ইচ্ছাকৃতভাবে ঘরের জিনিসপত্র এলোমেলো করে রাখে, যাতে পুলিশ এটিকে ডাকাতি বলে মনে করে। এছাড়া আঙুলের ছাপ যাতে না থাকে সেজন্য বাসার দুটি মোবাইল ফোন ডিটারজেন্ট মিশ্রিত পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয় বলেও জানান তিনি।

কিছু বিষয় নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া

কাকতালীয়ভাবে হত্যাকাণ্ডের শিকার একই পরিবারের চারজন, অভিযুক্ত দুই আসামি, আসামি গ্রেপ্তারে নেতৃত্ব দেয়া পুলিশ কর্মকর্তা, ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসক এবং মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সবাই একই ধর্মাবলম্বী হওয়ার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে চলছে মিশ্রপ্রতিক্রিয়া। এমনকি এক আসামির পরনের শার্ট এবং গোয়েন্দা পুলিশের এক কর্মকর্তার পরনে থাকা শার্ট একই রকম হওয়ায়, অনেকেই বিভিন্ন প্রশ্ন তুলেছেন।