খুঁজুন
, ,

রেকর্ড বৃষ্টিপাতে জলাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণে তৎপর চসিক মেয়র, ১০১ সদস্যের র‌্যাপিড রেসপন্স টিম গঠন

ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: Tuesday, 7 July, 2026, 8:37 pm
রেকর্ড বৃষ্টিপাতে জলাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণে তৎপর চসিক মেয়র, ১০১ সদস্যের র‌্যাপিড রেসপন্স টিম গঠন

চট্টগ্রামে চলতি মৌসুমের ২৪ ঘণ্টায় ৩৮৬.৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা গত ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাতের মধ্যেও জলাবদ্ধতায় জনভোগান্তি কমাতে মাঠে থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করছেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন।

মঙ্গলবার তিনি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকা, কাতালগঞ্জ, টাইগারপাস, পাঁচলাইশসহ বিভিন্ন জলাবদ্ধতাপ্রবণ ও পাহাড়ঘেঁষা এলাকা সরেজমিন পরিদর্শন করেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও সংস্থাগুলোকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন।

পরিদর্শনকালে মেয়র বলেন, “চট্টগ্রামে মৌসুমের রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়েছে। এই বৃষ্টির কারণে যাতে নগরবাসী দীর্ঘসময় জলাবদ্ধতার দুর্ভোগে না পড়েন, সে লক্ষ্যে আমরা বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছি। আমি নিজে মাঠে থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি।”

তিনি বলেন, বর্তমানে নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের প্রায় ৭০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং এর সুফল ইতোমধ্যে নগরবাসী পাচ্ছেন। তবে অবশিষ্ট প্রায় ৩০ শতাংশ কাজ, বিশেষ করে হিজড়া খাল, জামালখান খাল ও গুলজার খালের কাজ শেষ না হওয়ায় কয়েকটি এলাকায় এখনও জলাবদ্ধতার সমস্যা রয়ে গেছে।

মেয়র জানান, কাতালগঞ্জ ও পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকার পানি মূলত হিজড়া খাল দিয়ে নিষ্কাশিত হয়। কিন্তু এলাকাটি ভৌগোলিকভাবে নিচু হওয়ায় ভারী বর্ষণে সাময়িকভাবে পানি জমে যায়। তবে বৃষ্টি বন্ধ হওয়ার পর সাধারণত এক থেকে দেড় ঘণ্টার মধ্যেই পানি নেমে যায়।

তিনি বলেন, হিজড়া খালের কাজ সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ারিং ব্রিগেড বাস্তবায়ন করছে। বর্ষা শুরুর আগে কাজের একটি অংশ স্থগিত রাখতে হয়েছে। বর্ষা শেষে কাজ শেষ হলে এই এলাকার জলাবদ্ধতার সমস্যাও অনেকাংশে দূর হবে।

ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, নগরীর বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, মির্জাপুর, বৃহত্তর বাকলিয়া, চকবাজার, কোতোয়ালী, দেওয়ানহাট, লালখান বাজার, আকবরশাহ, হালিশহর ও বন্দর এলাকায় এবার উল্লেখযোগ্য জলাবদ্ধতা দেখা যায়নি, যা চলমান উন্নয়নকাজের ইতিবাচক ফলাফল।

তিনি আরও বলেন, আগ্রাবাদ কমার্স কলেজের সামনে গুলজার খালের কিছু কাজ এখনও চলমান রয়েছে। সেটিও শেষ হলে আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকাতেও জলাবদ্ধতা অনেকাংশে কমে আসবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

মেয়র বলেন, “আমরা বলেছিলাম ৭০ শতাংশ জলাবদ্ধতা কমবে। আজকের পরিস্থিতি সেই বাস্তবতারই প্রমাণ। অবশিষ্ট ৩০ শতাংশ সমস্যার সমাধানও চলমান প্রকল্পগুলো শেষ হলে সম্ভব হবে। এছাড়া ৪০টি খালের উন্নয়নে নতুন ডিপিপি বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে বলে আমরা আশা করছি।”

পরিদর্শনকালে ভারী বর্ষণে লালখান বাজার এলাকায় কয়েকটি বড় গাছ উপড়ে পড়া এবং এয়ারপোর্ট রোডের একটি অংশ ধসে যাওয়ার বিষয়েও দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন মেয়র।

পাঁচলাইশ-কাতালগঞ্জ এলাকায় যত্রতত্র বর্জ্য ফেলার কারণে জলাবদ্ধতা আরও প্রকট হচ্ছে উল্লেখ করে মেয়র বলেন, কিছু ক্লাব, কমিউনিটি সেন্টার ও ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠান অনুষ্ঠান শেষে ব্যবহৃত ককশিট, প্লাস্টিক ও অন্যান্য অপচনশীল বর্জ্য নালা-নর্দমায় ফেলে দিচ্ছে। এসব বর্জ্য পানিতে না মিশে ড্রেনেজ ব্যবস্থাকে বাধাগ্রস্ত করছে।

তিনি বলেন, নালা পরিষ্কারের সময় টুকরিভর্তি পলিথিন, প্লাস্টিক ও ককশিট পাওয়া গেছে। এগুলো পানি চলাচলে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। যারা এভাবে বর্জ্য ফেলছে, তাদের বিরুদ্ধে ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে অভিযান পরিচালনা করা হবে এবং আইন অনুযায়ী জরিমানা ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মেয়র নগরবাসীকেও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়নই নয়, নাগরিকদের দায়িত্বশীল আচরণও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের পতেঙ্গা কেন্দ্রের তথ্যমতে, মঙ্গলবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ৩৮৬.৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা চলতি মৌসুমের সর্বোচ্চ। একই সময়ে আমবাগান আবহাওয়া অফিসে ৩০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়।

১০১ সদস্যের র‌্যাপিড রেসপন্স টিম গঠন

পরিদর্শন শেষে টাইগারপাসস্থ চসিক কার্যালয়ে বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করেন মেয়র।

সভায় দুর্যোগকালীন জরুরি সেবা নিশ্চিত করতে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন-রেড ক্রিসেন্টের ১০১ সদস্যবিশিষ্ট র‌্যাপিড রেসপন্স টিম গঠনের ঘোষণা দেন তিনি।

এ কমিটিতে চসিকের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও সচিব মো. আশরাফুল আমিনকে আহ্বায়ক এবং চট্টগ্রাম সিটি রেড ক্রিসেন্টের সেক্রেটারি গোলাম বাকি মাসুদকে সদস্যসচিব করা হয়েছে।

মেয়র বলেন, “আমরা রেড ক্রিসেন্টের ভলান্টিয়ারদের সহযোগিতায় একটি সার্বক্ষণিক মনিটরিং সেল গঠন করেছি। যেকোনো দুর্যোগ বা জরুরি পরিস্থিতিতে এই র‌্যাপিড রেসপন্স টিম তাৎক্ষণিকভাবে মাঠে কাজ করবে।”

এ সময় রেড ক্রিসেন্টের পক্ষ থেকে নগরবাসীকে যেকোনো জরুরি সহযোগিতার জন্য ০১৮০৫-৭৮৩৩৮৯ নম্বরে যোগাযোগ করার আহ্বান জানানো হয়।

টানা বর্ষণের ফলে পাহাড়ধসের আশঙ্কা বৃদ্ধি পাওয়ায় বিভিন্ন পাহাড়ঘেঁষা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা পরিদর্শন করেন মেয়র। এ সময় তিনি বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলেন এবং সম্ভাব্য দুর্ঘটনা এড়াতে দ্রুত আশ্রয়কেন্দ্রে বা নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার অনুরোধ জানান। একই সঙ্গে তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে নজরদারি জোরদার এবং প্রয়োজনে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন।

Feb2
Feb2

মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কারাগারে শ্যামল-মোজাম্মেল-রুপা

ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: Monday, 24 August, 2026, 2:52 pm
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কারাগারে শ্যামল-মোজাম্মেল-রুপা

চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্ন করার নামে উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তিন সাংবাদিককে গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। একইসঙ্গে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ২৫ অক্টোবর দিন ধার্য করা হয়েছে।

সোমবার (২৪ আগস্ট) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর সদস্য বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ আদেশ দেন। প্যানেলের অপর সদস্য বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।

তিন সাংবাদিক হলেন, জাতীয় প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্ত, একাত্তর টেলিভিশনের সাবেক প্রধান সম্পাদক মোজাম্মেল বাবু এবং একই প্রতিষ্ঠানের সাবেক প্রধান প্রতিবেদক ফারজানা রুপা।

ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ। সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর জহিরুল আমিন, মার্জিনা রায়হান, তারেক আবদুল্লাহসহ অন্যান্য প্রসিকিউটর।

শুনানিতে প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ জানান, জুলাই গণঅভ্যুত্থান-সংশ্লিষ্ট মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় তিন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ১৭ আগস্ট প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট জারি করা হয়েছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে তাদের আজ ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়েছে। এ মামলায় তিনজনকেই গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর আবেদন করছে প্রসিকিউশন। একইসঙ্গে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য দুই মাস সময় চান তিনি।

শুনানি শেষে প্রসিকিউশনের আবেদন মঞ্জুর করে শ্যামল দত্ত, মোজাম্মেল বাবু ও ফারজানা রুপাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। পাশাপাশি তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য পরবর্তী তারিখ নির্ধারণ করা হয়।

প্রসিকিউশন জানায়, ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই গণভবনে একটি সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওই দিন তাকে প্রশ্ন করার নামে কিছু উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়েছিলেন কয়েকজন সাংবাদিক। এর পরিপ্রেক্ষিতে আন্দোলনকারীদের রাজাকারের বাচ্চা ও রাজাকারের নাতিপুতি বলেছিলেন শেখ হাসিনা।

রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ, ওই উসকানিমূলক প্ররোচনার ধারাবাহিকতায় জুলাইয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়। এ মামলায় ১৪ জুলাইয়ের ওই ঘটনার বিষয়ে তদন্ত চলছে।

নুসরাত হত্যা : হাইকোর্টে দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড, ১০ জন খালাস

ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: Monday, 24 August, 2026, 1:11 pm
নুসরাত হত্যা : হাইকোর্টে দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড, ১০ জন খালাস

ফেনীর সোনাগাজীর বহুল আলোচিত মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত হত্যা মামলায় সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার বরখাস্ত হওয়া অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলাসহ দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড, ১০ আসামিকে খালাস ও চার আসামিকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দিয়েছেন হাইকোর্ট।

সোমবার (২৪ আগস্ট) দুপুরে বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন।

মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়েছে যে দুই আসামির তারা হলেন-সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা (৫৭) এবং শাহাদাত হোসেন শামীম(২০)।

আলোচিত এই মামলায় ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল ২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর রায় দিয়েছিলেন। রায়ে মাদ্রাসার বরখাস্ত হওয়া অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলাসহ ১৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।

নথিপত্র অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা নিজ কক্ষে ডেকে নিয়ে নুসরাতের শ্লীলতাহানি করেন। এ ঘটনায় মামলা হলে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।

মামলা তুলে না নেওয়ায় ৬ এপ্রিল মাদ্রাসার ছাদে ডেকে নিয়ে নুসরাতের হাত-পা বেঁধে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই বছরের ১০ এপ্রিল নুসরাতের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান (নোমান) সোনাগাজী থানায় মামলা করেন। পরে মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়।

হত্যার দায় স্বীকার অভিযুক্ত দুই খুনি সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসের

ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: Monday, 24 August, 2026, 12:59 pm
হত্যার দায় স্বীকার অভিযুক্ত দুই খুনি সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসের

রংপুর নগরীতে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষকসহ পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার দায় স্বীকার করেছে দুই অভিযুক্ত খুনি সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস। তারা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। জবানবন্দি গ্রহণ শেষে রোববার (২৩ আগস্ট) রাত সাড়ে ১১টার দিকে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন আদালত।

এদিন বিকেল ৫টার দিকে দুই আসামিকে আদালতে হাজির করা হয়। পরে মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতের বিচারক মো. রফিকুল ইসলামের কাছে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন তারা।

বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও কোতয়ালী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মিলন চ্যাটার্জি।

তিনি বলেন, গ্রেপ্তার দুই যুবক আদালতে হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। তারা নিজেদের দায় স্বীকার করায় তাদের আর রিমান্ডে নেওয়ার প্রয়োজন হয়নি। পরে তাদের প্রিজন ভ্যানে করে কারাগারে নেওয়া হয়।

গত শনিবার রাত ১১টার দিকে নগরীর ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের কামাল কাছনা মাছুয়াপাড়া (দাসপাড়া) এলাকার একটি নির্মাণাধীন বাড়ি থেকে এ চারজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

তারা হলেন—রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ভোলা (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী (২৩) ও ছেলে আয়ুস চক্রবর্তী প্রিয়ম (১২)।

নিহতদের মুখ ঝলসানো

এদিকে ভয়াবহ এ হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার চারজনের মুখই ঝলসানো ছিল। তাদের মুখমণ্ডল থেকে দাহ্য (তরল) পদার্থ পাওয়া গেছে। তবে এটি কোনো রাসায়নিক কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয় পুলিশ। ফরেনসিক পরীক্ষার প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পরই এ বিষয়ে স্পষ্ট হওয়া যাবে বলে জানিয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

রোববার সন্ধ্যায় এ তথ্য জানান রংপুর সিআইডির পুলিশ সুপার (ভারপ্রাপ্ত) সুমিত চৌধুরী। ধারণা করা হচ্ছে, হত্যার আগে বা পরে দাহ্য পদার্থ ছিটিয়ে তাদের মুখ ঝলসে দেওয়া হয়েছিল।

সুমিত চৌধুরী বলেন, নিহতদের মুখ প্রাথমিক অবস্থায় বীভৎস বা ঝলসানো ছিল। মুখের কাছে কিছু তরল পড়ে ছিল। তাতে আমরা প্রাথমিকভাবে অনুমান করেছিলাম, কোনো রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়েছে কি না। যে চিকিৎসক ফরেনসিক করবেন, তাকে আমরা এ ব্যাপারে বলেছি। তাদের শরীরে কোনো রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়েছে কি না, ফরেনসিক প্রতিবেদন পেলে এটা নিশ্চিত হতে পারব।

রোববার সন্ধ্যায় রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে চারজনের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে রাতে মরদেহগুলো দখিগঞ্জ শ্মশানে দাহ করা হয়। এ সময় স্বজনেরা চারজনের মুখমণ্ডল ঝলসানো দেখতে পান।

প্রীতিলতার ছোট বোন পূজা চক্রবর্তী বলেন, সন্ধ্যায় মরদেহগুলো হস্তান্তরের পর আমরা দেখতে পাই, তাদের মুখগুলো ঝলসানো। এর আগে পুলিশ আমাদের মরদেহের কাছে যেতে দেয়নি।

তবে মরদেহের ময়নাতদন্তকারী রংপুর মেডিকেলের ফরেনসিক মেডিসিনের ডা. বাবলু কিশোর বিশ্বাস জানান, মরদেহগুলো পঁচে যাবার কারণে দেখতে এমন মনে হচ্ছে, কোনো এসিডে ঝলসানোর ঘটনা নেই।

মামলার এজাহারে যা আছে

এদিকে হত্যাকাণ্ডের এ ঘটনায় রোববার কোতয়ালী থানায় হত্যা মামলা করেছেন নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড়ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী। মামলায় কোনো আসামির নাম উল্লেখ করা হয়নি। অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে করা মামলায় আসামির সংখ্যাও উল্লেখ করা হয়নি।

এজাহার অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার ২০ আগস্ট রাত সাড়ে ১১টার দিকে গণপতির স্ত্রী প্রীতিলতার মোবাইল ফোন থেকে তার ছোট বোন পূজা চক্রবর্তীর সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে কথা হয়। এরপর পরিবারের সদস্যরা ঘুমিয়ে পড়েন। পরদিন শুক্রবার রাত ২টা ৪০ মিনিট থেকে শনিবার রাত ৮টা ৪৫ মিনিটের মধ্যে কোনো এক সময় হত্যাকাণ্ডটি ঘটে বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।

শনিবার রাত ৮টা ৪৫ মিনিটে পূজা আবারও বড় বোন প্রীতিলতাকে ফোন করেন। তখন পরিবারের চারজনের মোবাইল ফোনই বন্ধ পান তিনি। সন্দেহ হওয়ায় রাতে স্বামী বিপুল আচার্যকে নিয়ে বোনের বাড়িতে যান পূজা।

বাড়িটি তখন অন্ধকারে আচ্ছন্ন ছিল। ভেতর থেকেও কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে প্রতিবেশীর বাড়ির ওপর দিয়ে গণপতির বাড়ির ছাদে ওঠেন পূজা। জানালার তালা ভেঙে টর্চের আলোয় ঘরের ভেতর তাকিয়ে তিনি দেখেন, জিনিসপত্র এলোমেলো। একই সঙ্গে বাড়ির ভেতর থেকে পঁচা দুর্গন্ধ বের হচ্ছিল।

এজাহারে আরও বলা হয়েছে, আলমারি, শোকেস, আসবাব, কাপড়চোপড়সহ বিভিন্ন জিনিসপত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল। এতে হত্যার পর ঘটনাটিকে অন্যভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়ে থাকতে পারে বলে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে।

এক মাস আগে প্রভিডেন্ট ফান্ডের ১৫ লাখ টাকা উত্তোলন করেন শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী

রংপুর জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক আবুল কালাম আজাদ বলেন, প্রায় এক মাস আগে গণপতি চক্রবর্তী তার প্রভিডেন্ট ফান্ডের ১৫ লাখ টাকা উত্তোলন করেন। বাড়ির অসম্পূর্ণ কাজ শুরু করবেন বলে তিনি এই টাকা তুলেছিলেন। তবে সেই তিনি টাকা ব্যাংকে রেখেছিলেন নাকি বাড়িতে, তা বলতে পারব না।

গণপতির বড় ভাই ও মামলার বাদী গোপীনাথ চক্রবর্তী বলেন, গণপতি নগরীর দাসপাড়া (মাছুয়াপাড়া) এলাকায় নিজ বাড়িতে বসবাস করতেন। নির্মাণাধীন তিনতলা বাড়িটির দ্বিতীয় তলার কাজ শেষ হয়েছে। বাড়ির অসম্পূর্ণ কাজ শুরু করার কথা ছিল তার।

প্রভিডেন্ট ফান্ডের ১৫ লাখ টাকা সম্পর্কে তিনি কিছুই জানেন না দাবি করে বলেন, ব্যাংকে খোঁজ নিলে এ টাকার তথ্য পাওয়া যাবে। আমরা এখনো খোঁজ নিতে পারিনি।

বাসার ছাদে ইয়াবা সেবন, বাধা দেয়ায় হত্যাকাণ্ড

এদিকে, একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় দুইজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবনের সময় ওই শিক্ষকের কাছে ধরা পড়ে যাওয়ার পর তারা হত্যাকাণ্ড ঘটায় বলে জানিয়েছে পুলিশ।

গ্রেপ্তার দুজন হলেন মুগ্ধ দাস (২৩) ও সিদ্ধার্থ দাস (১৯)। সম্পর্কে তারা আত্মীয় এবং দুজনেরই বাড়ি মাছুয়াপাড়া এলাকায়। রোববার ভোরে তাদেরকে গ্রেপ্তার করা হয়। মুগ্ধ নগরের সিটি বাজারে মাছের দোকানে কাজ করেন আর সিদ্ধার্থ প্রায় আট বছর ধরে একটি জুয়েলারির দোকানে কারিগর হিসেবে কাজ করছেন।

রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ সংবাদ সম্মেলনে বলেন, দুই খুনি মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে পাশের বিল্ডিংয়ের ওপর দিয়ে গণপতির বাড়ির ছাদে আসে। তারা ছাদে বসে ইয়াবা সেবন করছিল। শব্দ পেয়ে গণপতি চক্রবর্তী ছাদে গিয়ে আড্ডা দেওয়ার বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে তার গলায় থাকা গামছা পেঁচিয়ে তাকে হত্যা করা হয়। তার চিৎকার শুনে সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় প্রীতিলতা চক্রবর্তীকেও গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়। এরপর মায়ের চিৎকারে এগিয়ে আসা মেয়ে প্রার্থী চক্রবর্তীকেও গামছা ও রশি দিয়ে গলায় পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়। খুনিরা জানিয়েছে- গামছা দিয়ে পেঁচিয়ে ধরার পরও প্রার্থী চক্রবর্তীর মৃত্যু হচ্ছিল না, প্রায় চার-পাঁচ মিনিট লাগে তার প্রাণ যাওয়ার ক্ষেত্রে। সেই সময় তারা রশি দিয়ে তার গলায় এবং মুখে পেঁচিয়ে ধরে। সর্বশেষে ঘুমন্ত অবস্থায় শিশু প্রিয়মকে কাপড় পেঁচিয়ে ও বালিশচাপা দিয়ে হত্যা করা হয়।

তিনি আরও জানান, হত্যাকাণ্ডের পর অভিযুক্তরা বাসার একটি বাথরুমে গোসল করে, ডাইনিং টেবিলে বসে খেজুর ও অবশিষ্ট ইয়াবা সেবন করে। এরপর জুমার নামাজের সময় রাস্তাঘাট ফাঁকা হলে তারা কিছু স্বর্ণালংকার নিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে যায় এবং সেগুলো নিকটবর্তী একটি মন্দিরের পেছনে পরিত্যক্ত জায়গায় লুকিয়ে রাখে। অভিযুক্তদের দেখানো মতে সেসব আলামত জব্দ করা হয়েছে।

পুলিশ কমিশনার বলেন, তদন্তকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য অভিযুক্তরা ইচ্ছাকৃতভাবে ঘরের জিনিসপত্র এলোমেলো করে রাখে, যাতে পুলিশ এটিকে ডাকাতি বলে মনে করে। এছাড়া আঙুলের ছাপ যাতে না থাকে সেজন্য বাসার দুটি মোবাইল ফোন ডিটারজেন্ট মিশ্রিত পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয় বলেও জানান তিনি।

কিছু বিষয় নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া

কাকতালীয়ভাবে হত্যাকাণ্ডের শিকার একই পরিবারের চারজন, অভিযুক্ত দুই আসামি, আসামি গ্রেপ্তারে নেতৃত্ব দেয়া পুলিশ কর্মকর্তা, ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসক এবং মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সবাই একই ধর্মাবলম্বী হওয়ার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে চলছে মিশ্রপ্রতিক্রিয়া। এমনকি এক আসামির পরনের শার্ট এবং গোয়েন্দা পুলিশের এক কর্মকর্তার পরনে থাকা শার্ট একই রকম হওয়ায়, অনেকেই বিভিন্ন প্রশ্ন তুলেছেন।